আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নির্বাচন ও আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক আয়োজন নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা ও সংশয়ের কথা এখনও শোনা গেলেও এটিও সত্য যে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রশ্নে মানুষের প্রত্যাশা এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্পষ্ট ও দৃঢ়। সরকার এবং নির্বাচন কমিশন উভয়ই বারবার জানিয়ে এসেছে—কোনোভাবেই সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না।
এই অবস্থানের সবচেয়ে দৃঢ় ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচন নিয়ে সময়সূচি বা বিলম্বের গুজবকে এক কথায় নাকচ করে তিনি বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়—১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেওয়া এই বক্তব্য মূলত একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের চেয়েও বেশি—এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ঘোষণা। দেশের স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থেই নির্ধারিত সময়ের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তবে বাস্তবতা হলো, অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে ভোটার ও প্রার্থীদের একটি অংশ এখনও নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। নির্বাচন কমিশন সেই উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ যথার্থভাবেই বলেছেন, এই নির্বাচন অনেকটা লাইনচ্যুত একটি ট্রেনকে আবার লাইনে ফিরিয়ে আনার মতো। ন্যূনতম সংস্কার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বদল এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে যদি এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেটিই হবে একটি বড় সাফল্য।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে থাকবে—যা নির্বাচনী ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন একই কণ্ঠে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছেন। তাদের বক্তব্যে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলার ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা ভোটের মাঠে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।
বিশেষ করে সেনাবাহিনী প্রধানের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—সশস্ত্র বাহিনী এখানে শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করে জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষার জন্য মাঠে থাকবে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় নির্বাচন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মতবিনিময় সভা এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি পরিদর্শন এই বার্তাই দেয় যে, দায়িত্ব পালনে শুধু নির্দেশ নয়, তদারকি ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সংকটকালে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নতুন কিছু নয়। দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা—সব ক্ষেত্রেই তারা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে দেশকে গভীর সংকট থেকে রক্ষায় যে ভূমিকা তাঁরা পালন করেছেন, তা জাতি দীর্ঘদিন স্মরণ করবে। ক্ষমতার প্রতি নয়, বরং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে তাঁদের অবস্থান টেকসই গণতন্ত্রের জন্য এক বিরল দৃষ্টান্ত।
তবু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে সশস্ত্র বাহিনীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। গুজব, অপপ্রচার ও মিথ্যা বয়ানের মাধ্যমে বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করা। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা ও তিন বাহিনী প্রধানের দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতায় এসব অপচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নতুন শক্তি তরুণ ভোটাররা। চার কোটির বেশি তরুণ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তাঁরা কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নন; বরং প্রার্থীর যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চান। এই তরুণ ভোটারদের কাছেও সশস্ত্র বাহিনী ভোটের মাঠে নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সরকারের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদানের সিদ্ধান্ত তাঁদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে—রাষ্ট্র সত্যিই একটি ভালো নির্বাচন চায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অর্থবহ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তারা যদি জনগণের আস্থাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তবে এই নির্বাচন শুধু একটি ভোটের দিন নয়—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন সূচনার মাইলফলক হয়ে উঠবে।
লেখক : এম আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
























