০৯:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বন্ধের দ্বারপ্রান্তে নারায়নহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

ফটিকছড়ি উপজেলার নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘নারায়ণহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ আজ চরম সংকটে। শিক্ষক এবং অর্থসংকটে বিদ্যালয়টি কার্যত বন্ধের দ্বারপ্রান্তে । গেল এসএসসি পরীক্ষায় মাত্র দুই শিক্ষার্থী অংশ নিলেও উভয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, যা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে শতভাগ ফেল করার রেকর্ড। এ নিয়ে ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় সমালোচনা। এক সময়কার এ প্রতিষ্ঠান আজ অবহেলিত শিক্ষাকেন্দ্রে।
২০০১ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি এক সময় এলাকার নারী শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে অবহেলিত এক শিক্ষা কেন্দ্রে। বড় মাঠ, লম্বা (সেমি পাকা) ভবন, সবুজ বেষ্টিত মনোরম পরিবেশ সবই টিক গোছানো । তবে এখন বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। খাতা-কলমে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৭০ জন হলেও উপস্থিতি খুবই কম। ৭ জন শিক্ষক। শ্রেণি কক্ষগুলো ভাঙাচোরা, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, প্রধান শিক্ষকের কক্ষও স্যাঁতসেঁতে। বিদ্যালয়ের মাঠে গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ আর ঝোপঝাড়ে ছেয়ে আছে চত্বর। শিক্ষার্থী বাড়াতে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে পড়ালেখার সুযোগ থাকলেও ভালো শিক্ষক না থাকায় বাড়ছে না শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষক সুখেন্দু বিকাশ দে বলেন, ‘বিদ্যালয়টি একক অনুদানে চলছে। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা নেই। অল্প বেতনে মানসম্পন্ন শিক্ষক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাই পাঠদানেও ঘাটতি। বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া। সরকারি সহায়তা পেলে মানসম্পন্ন শিক্ষক রাখা সম্ভব। বাড়বে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও।’
সহকারী শিক্ষিকা আশাশ্রী নন্দী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীর স্বল্পতা পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকাসহ নানা সংকটে বিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি কোনো সহায়তা ছাড়া এই বিদ্যালয়ের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব না।’
দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্যার-ম্যাডামরা অনেক সময় আসেন না, ক্লাস ঠিকঠাক হয় না। আমার পরিবার বলেছে, অন্য স্কুলে নিয়ে যাবে। আমরা ভালোভাবে পড়তে চাই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘একসময় মেয়েকে এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। কিন্তু শিক্ষক সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা আর অনুপযুক্ত পরিবেশ দেখে তাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।’ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি শওকত হোসেন সিকদার বলেন, ‘আমাদের একান্ত অনুরোধ, শর্তসাপেক্ষে হলেও যদি সরকার শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা ভালো শিক্ষক রাখতে পারব। তাহলে শিক্ষার্থী বাড়বে, ফলাফলও ভালো হবে। আমরা এতটুকু সুযোগ চাই।’
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সরকারি সহায়তা, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টি আবার আগের স্বগৌরবে ফিরে আসবে। অন্যথায়, এটি হয়ে উঠবে আরও একটি হারিয়ে যাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ড. সেলিম রেজা বলেন, বিদ্যালয়টি নন এমপিওভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। আমরা প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তির জন্য দুইবার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু, এমপিওভুক্তি করা সম্ভব হয়নি। যার প্রেক্ষিতে শিক্ষকদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। আর সেই প্রভাবে ছাত্র-ছাত্রীরাও কমতে শুরু করেছে। খাতা-কলমে ১৭০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও আমরা সর্বসাকুল্যে ৪০-৪৫ জনের ওপরে শিক্ষার্থী কখনোই পায়নি। এবার এসএসসি পরীক্ষায় দুইজন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে দু’জনই ফেল করেছে। যেটা বিদ্যালয়টির জন্য আরেকটি বড় দুঃসংবাদ। বিদ্যালয়টিকে টিকিয়ে রাখতে আসলে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছি।
এমআর/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

বন্ধের দ্বারপ্রান্তে নারায়নহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

আপডেট সময় : ০৮:৩৩:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫

ফটিকছড়ি উপজেলার নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘নারায়ণহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ আজ চরম সংকটে। শিক্ষক এবং অর্থসংকটে বিদ্যালয়টি কার্যত বন্ধের দ্বারপ্রান্তে । গেল এসএসসি পরীক্ষায় মাত্র দুই শিক্ষার্থী অংশ নিলেও উভয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, যা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে শতভাগ ফেল করার রেকর্ড। এ নিয়ে ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় সমালোচনা। এক সময়কার এ প্রতিষ্ঠান আজ অবহেলিত শিক্ষাকেন্দ্রে।
২০০১ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টি এক সময় এলাকার নারী শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে অবহেলিত এক শিক্ষা কেন্দ্রে। বড় মাঠ, লম্বা (সেমি পাকা) ভবন, সবুজ বেষ্টিত মনোরম পরিবেশ সবই টিক গোছানো । তবে এখন বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। খাতা-কলমে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৭০ জন হলেও উপস্থিতি খুবই কম। ৭ জন শিক্ষক। শ্রেণি কক্ষগুলো ভাঙাচোরা, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে, প্রধান শিক্ষকের কক্ষও স্যাঁতসেঁতে। বিদ্যালয়ের মাঠে গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ আর ঝোপঝাড়ে ছেয়ে আছে চত্বর। শিক্ষার্থী বাড়াতে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে পড়ালেখার সুযোগ থাকলেও ভালো শিক্ষক না থাকায় বাড়ছে না শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষক সুখেন্দু বিকাশ দে বলেন, ‘বিদ্যালয়টি একক অনুদানে চলছে। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা নেই। অল্প বেতনে মানসম্পন্ন শিক্ষক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাই পাঠদানেও ঘাটতি। বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া। সরকারি সহায়তা পেলে মানসম্পন্ন শিক্ষক রাখা সম্ভব। বাড়বে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও।’
সহকারী শিক্ষিকা আশাশ্রী নন্দী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীর স্বল্পতা পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকাসহ নানা সংকটে বিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি কোনো সহায়তা ছাড়া এই বিদ্যালয়ের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব না।’
দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্যার-ম্যাডামরা অনেক সময় আসেন না, ক্লাস ঠিকঠাক হয় না। আমার পরিবার বলেছে, অন্য স্কুলে নিয়ে যাবে। আমরা ভালোভাবে পড়তে চাই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘একসময় মেয়েকে এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। কিন্তু শিক্ষক সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা আর অনুপযুক্ত পরিবেশ দেখে তাকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।’ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি শওকত হোসেন সিকদার বলেন, ‘আমাদের একান্ত অনুরোধ, শর্তসাপেক্ষে হলেও যদি সরকার শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা ভালো শিক্ষক রাখতে পারব। তাহলে শিক্ষার্থী বাড়বে, ফলাফলও ভালো হবে। আমরা এতটুকু সুযোগ চাই।’
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সরকারি সহায়তা, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টি আবার আগের স্বগৌরবে ফিরে আসবে। অন্যথায়, এটি হয়ে উঠবে আরও একটি হারিয়ে যাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ড. সেলিম রেজা বলেন, বিদ্যালয়টি নন এমপিওভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। আমরা প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তির জন্য দুইবার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু, এমপিওভুক্তি করা সম্ভব হয়নি। যার প্রেক্ষিতে শিক্ষকদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। আর সেই প্রভাবে ছাত্র-ছাত্রীরাও কমতে শুরু করেছে। খাতা-কলমে ১৭০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও আমরা সর্বসাকুল্যে ৪০-৪৫ জনের ওপরে শিক্ষার্থী কখনোই পায়নি। এবার এসএসসি পরীক্ষায় দুইজন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে দু’জনই ফেল করেছে। যেটা বিদ্যালয়টির জন্য আরেকটি বড় দুঃসংবাদ। বিদ্যালয়টিকে টিকিয়ে রাখতে আসলে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছি।
এমআর/সবা