কালীগঞ্জ(ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
তৈরি পোশাক বিক্রির মধ্য দিয়ে স্বপ্নের ব্যবসা শুরু। সীমিত লাভ তবুও ছিলনা হতাশা। স্বপ্ন একটাই উদ্যোক্তা হবো। পরের অধিনে চাকরী নয়। নিজেই তৈরী করবো অন্যের জন্যে উপার্জনের রাস্তা । স্বপ্নের ভোর না হতেই ২০১০ সালে প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করেন স্বপ্নবাজ এই নারী । এসময় সংসার সামলিয়ে ব্যবসাটা চালিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন ছিল।
তবুও তিনি থেমে যাননি। স্বামীর কাছ থেকে নেয়া ৪০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসাটা আরেকটু বড় করার চেষ্টাও করেন তিনি।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের বেথুলী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক মোশারফ হোসেন এবং গৃহিণী মা সোনালী বেগম দম্পতির একমাত্র কন্যা মাহমুদা নাসরিন লিমা। উপজেলার চাপরাইল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ঝিনাইদহ জেলা শহরের নুরুননাহার মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ২০০৬ সালে ঢাকা বাংলা কলেজে সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরের বছরই বাবা মা তাকে বিয়ে দেন ঝিনাইদহের ভুটিয়ারগাতী এলাকার বাসিন্দা এ.কে. আজাদের সাথে। জামাই ঢাকার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। একদিকে লেখাপড়া অপরদিকে সংসার সামলিয়ে স্বপ্ন পুরণে বিভোর।
গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে ই-কমার্সের জনপ্রিয়তার কথা ভেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পেইজ খুলে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৫ সালে প্রথম ্য়ঁড়ঃ;লিমাস বুটিক্য়ঁড়ঃ; নামে একটি ফেসবুক পেইজ খোলেন। নিজ গ্রামের মহিলাদের হাতের তৈরি নিজস্ব
ডিজাইনের মেয়েদের থ্রি পিস, ওয়ান পিস, ওড়না, হাতের কাজ করা শাড়ি, ব্লাউজ, বেড সিট তার পেইজ থেকে লাইভে এসে প্রদর্শন করেন। লাইভ দেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতারা তার পণ্যের ব্যাপারে আকৃষ্ট হন। ধীরে ধীরে ভালো সাড়াও পান ফলোয়ারদের কাছ থেকে।
ক্রেতারা তার লাইভ দেখে নিজের পছন্দমত পোশাকটি অর্ডার করেন। প্রতি লাইভে অর্ডার করা পণ্য কুরিয়ার এর মাধ্যমে পরবর্তী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে গ্রাহকের নিকট ক্যাশঅন ডেলিভারিতে পৌছানোর যাবতীয় কাজও লিমা নিজে হাতে করেন।” লিমাস বুটিকের” তৈরী পণ্যের গুণগত মানের কারণে এই পেজের ফলোয়ারদের নিকট অন্যরম এক আস্থার জায়গা করে নিতে সক্ষমও হয়েছেন তিনি। বর্তমানে ৬শ থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকার পোশাক পাওয়া যায় এবং ক্রেতারা তা নিয়মিত কিনছেন। বর্তমানে তার এই পেইজটির ফলোয়ার সংখ্যা ৩ লাখের অধিক।
ধীরে ধীরে তিনি অনলাইন এই পেজটাকে নিজের ব্যবসার অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। অটুট মনোবল ও দক্ষতা দিয়ে দুই সন্তানের জননী লিমা স্বামীর সংসার সামলিয়ে ই- কমার্স প্ল্যাটফর্মে সফলতার সাথে কাজ করে নিজেকে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি নিজেই তার সকল পণ্যের মডেল হিসেবে প্রর্দশন করেন। বিভিন্ন পোশাকে নিজের ছবি মডেল হিসেবে তুলে তিনি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন।
এসব মডেল ছবি ফেসবুক পেইজে এ নিয়মিত আপলোড দেন তিনি।ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নে বাবার গ্রামের বাড়ির অনেক নারীসহ আশপাশের ষাটবাড়িয়া, মনোহরপুর,পুকুরিয়া, মোস্তবাপুর, ভাটাডাঙ্গা, চাপরাইলসহ প্রায় ১৫ গ্রামের নারীরা লিমাস বুটিকের নিজস্ব ডিজাইনের পোশাকে হাতের কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। লিমাস বুটিকের কর্মী হাফিজা বেগম বলেন, অনেকদিন ধরে লিমা আপার সাথে কাজ করছি। ঘর সংসারের কাজ সেরে অবসরে লিমাস বুটিকের তৈরি পোশাকের উপর হাতের কাজ করে ভালো আয়ও করছি। এখন আমরা বেশ স্বাবলম্বী। লিমা ঢাকার উত্তরা এলাকার নিজের বাসার একটি আলাদা কক্ষে লিমাস বুটিকের অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করছেন। ব্যবসার প্রয়োজনে প্রধানত সব কাজ লিমা নিজে হাতে করতেই পছন্দ করেন। পণ্য তৈরি দেখভাল ও গ্রাম থেকে ঢাকা পাঠানোর ব্যাপারে তার মা-বাবা তাকে সহযোগিতা করে থাকেন। এভাবেই অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে সফল উদ্যোক্তা লিমা। তিনি ঘরে বসে প্রতিমাসে লাখ টাকার অধিক আয় করছেন ।
সফল নারী উদ্যোক্তা মাহমুদা নাসরিন লিমার জানান, মূলত হস্তশিল্পের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেই তিনি তৈরি পোশাকে হস্তশিল্পের নানা কারুকার্যসমৃদ্ধ পণ্য তৈরী ও বিক্রির ব্যাবসাটি বেছে নিয়েছি। পরিবার আমার এই কাজে প্রচুর উৎসাহ দেয় ও সাহস যোগায়। বিশেষ করে আমার মা-বাবা ও স্বামী আমাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে থাকেন। ভবিষ্যতে ঢাকা শহরে বড় ধরনের একটি লিমাস বুটিকের আউটলেট দেওয়ার স্বপ্ন রয়েছে আমার।


























