পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসীরা যেন নিরাপদ পরিবেশে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন কমিটি।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-এর সাগর–রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম, যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, আদিবাসী অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমিলা, আদিবাসী অধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা এবং পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন হবে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন। এ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ভোট দিতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসী নারীরা যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে নানা ধরনের হয়রানি ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান, প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী—বিশেষ করে আদিবাসী নারী ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে নিরাপদ পরিবেশে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
শামসুল হুদা আরও বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সারা বিশ্বে শান্তিরক্ষা মিশনে যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তা সমগ্র জাতির জন্য গর্বের বিষয়। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগামী নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের সমস্যা এক নয়—এ কথা উল্লেখ করে লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, সমতলের মতো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমান অধিকার বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না। পাহাড়ের জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে একটি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে উপেক্ষিত হয়ে আসছে। তাই এই জনগোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, এসব জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলেও দীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তিটির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু সমস্যার মধ্যে ভূমি সমস্যা অন্যতম এবং সবচেয়ে জটিল। তাই এই ভূমি সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান জরুরি। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যক্রম সচল রাখা এবং জেলা পরিষদে নির্বাচন আয়োজন করা প্রয়োজন।
আদিবাসী অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমিলা বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীরা বারবার নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। সরকার একাত্তর কিংবা চব্বিশের চেতনায় বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। বহু রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও আদিবাসীদের অধিকার ও বাস্তব সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে কেউ তুলে ধরেনি।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসতে হবে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং আগামী সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত দাবিসমূহ তুলে ধরেন।
ক. অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি:
১. দূরবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে অস্থায়ী আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করা;
২. সমতল ও পাহাড়ে ভোটকেন্দ্রগামী সকল আদিবাসী ভোটারদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং অযথা হয়রানি বন্ধ করা।
খ. নির্বাচনপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ ও আগামী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও দাবি:
১. সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন;
২. পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান;
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিকীকরণ ও স্থানীয় শাসন নিশ্চিতকরণে চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ ক্ষমতায়ন;
৪. পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত থেকে প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা;
৫. দেশের মূলধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা;
৬. ইউনিয়ন পরিষদসহ সকল স্তরের স্থানীয় সরকারে সমতলের আদিবাসীদের জন্য বিশেষ আসন সংরক্ষণ এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ;
৭. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন।
শু/সবা






















