দারিদ্রতা সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি সাদিকুর রহমানের। দারিদ্রতাকে জয় করে কিভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন সাদিকুর রহমান, সেই গল্প বলব আজ। জেলা ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গ্রাম সাখুয়া। সে গ্রামেরই এক দরিদ্র স্কুল মাস্টারের ছেলে সাদিকুর রহমান। বাড়ির লোকজন তাকে রাহাত বলেই ডাকেন। তিন বোন আর দুই ভাইয়ের মাঝে সাদিকুরই ছোট। বাবার সামান্য বেতন। সংসারে ছিলো নানা টানাপড়েন। সাখুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাইমারী শেষ করেন তিনি। ওই স্কুলের সহ-শিক্ষক ছিলেন তার বাবা শওকত আলী। বাবার কাছেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি।
জানা যায়, প্রথম দিকে পড়ালেখায় মনোযোগ ছিলনা তার। স্কুলের অন্য শিক্ষকদেরও ভয় পেতেন, যার কারণে পড়ালেখায় আগ্রহ ছিল কম। এর কারণে ৫ম শ্রেণিতে উঠে রোল তার পিছনে চলে যায়। তখনও তিনি ভালো করে পড়তে পারতেন না। শুধু বাংলা রিডিংটাই পড়তে পারতেন। অংক ইংরেজি পড়তে পারতেন না। ২০০৪ সালে তাকে তার বড় বোন সাখুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন। বোনের তত্বাবধানে পড়ালেখা শুরু করেন তিনি। ৭ম শ্রেণিতে তার রোল হয় দুই। পরে ৮ম থেকে ১০ম পর্যন্ত প্রথম হয়। তিনি বড়বোন আর শ্রেণি শিক্ষক বরকত আলীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শিক্ষক বরকত আলীর হাত ধরে অনেকের মতো তিনিও দেখতেন বড় হওয়ার স্বপ্ন। এসএসসিতে জিপিএ ৪.৮৮ পেয়ে ত্রিশাল সরকারি নজরুল কলেজে ভর্তি হন তিনি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর পড়ালেখায় মনোযোগ হারান সাদিকুর। সে সময় বন্ধুদের নিয়ে বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকতেন। এর ফলে ২০১০ সালে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় ফেইল করেন। এরপর বাড়িতেই ভবঘুরে অবস্থায় সময় কাটাতেন সাদিকুর। ২০১১ সালে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় পরীক্ষার তিন মাস আগে দারুন ভাবে পড়াশুনায় মনোযোগ দেন তিনি। জিপিএ ২.৯০ নিয়ে নজরুল কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পাবলিশ বিশ^বিদ্যালয়ে ফরম তোলার যোগ্যতা ছিলনা। পরে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন, সেখানে অনার্সে ২য় মেরিড লিস্টে বাংলা বিষয় আসে তার। ২০১৫ সালে অনার্স তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ২০১৬ সালের দিকে তাদের সংসারে আর্থিক অভাব অনটন দেখা দিলে পাশর্^বর্তী চকরামপুর বাজারে অবস্থিত আমজাত আলী মডেল স্কুলে শিক্ষকতা করার প্রস্তাব পান। পরে সেখানে তিন হাজার টাকা মাসিক বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। তারপর থেকেই তার জীবন যুদ্ধটা শুরু হয়। সকাল ৬টা থেকে টিউশন করতেন ১০টা পর্যন্ত আবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্কুলে ক্লাশ নিতেন এবং বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হোম টিউশন শেষ করে বাসায় ফিরে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন তিনি। আবার রাত ৮টা থেকে রাত ১২টা কিংবা আরো গভীর রাত পর্যন্ত নিজের পড়া চালিয়ে যেতেন তিনি। এইভাবে ২ থেকে ৩ বছর চলার পর ২০১৯ সনের ডিসেম্বর মাসে তিনি প্রাইমারী স্কুলে চাকুরি পান এবং চকরামপুর থেকে ত্রিশালে চলে যান তিনি। করোনায় পড়াশুনায় কিছুটা স্থবিরতা চলে আসে তার। তখন পড়ালেখা করতে পারেননি তিনি। ২০২১ সালে ২১তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার আগে পড়ালেখা শুরু করেন। যার ফলে প্রথমবার ৪১তম বিসিএস প্রিলিমিনারীতে পাশ করেন। এর আগে ৪০তম বিসিএসএ পরীক্ষা দিলেও পাশ করতে পারেননি তিনি। পরে ভাইভা দেন, সেখানে ক্যাডার আসেনি, নন ক্যাডারে ইন্সট্রাক্টর পদে সুপারিশপত্র পান। এরপর ২০২৩ সালে ৪৩তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন তিনি।
৪৩তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত সাদিকুর রহমান রাহাত বলেন, ৪৩তম বিসিএস রেজাল্ড যখন প্রকাশিত হবে সেদিন সকাল থেকে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। বিকেল ৫টার দিকে যখন রেজাল্ড প্রকাশিত হল, তখন রেজাল্ড শীট ডাউনলোড করে দেখা শুরু করলাম। প্রথম দিকে আমার রোলটা চোখে পড়েনি। পরে একজনকে ফোন দিলাম, তখন সে বলল তুমি ত বাংলা লেকচারার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছো। তখন আমি খুবই খুশি হলাম এবং আনন্দিত হলাম। ওই মূহুর্তে চোখে কান্না চলে আসলো এবং সাথে সাথে আমার বাবা মা সবাইকে জানালাম। এছাড়া পরিবারের সকল আত্মীয় স্বজনদেরকে খবরটি জানালাম তারাও খুব খুশি হলো।
সাদিকুর রহমানের বাবা শওকত আলী মাস্টার বলেন, অনেক কষ্ট করে সে পড়ালেখা করছে। সে বিসিএস এ সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় আমি খুব খুশি। এদিকেও সাদিকুরের মা ফজিলা খাতুনও ছেলের সাফল্যে গর্বিত হওয়ার কথা জানিয়ে সবার কাছে ছেলের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
সাদিকুরের ফুফু কাজল রেখা বলেন, সাদিকুর ছোট থেকেই শান্ত স্বভাবের ছিল। তার এই সাফল্যে তাদের পরিবারের সবাই গর্বিত। কর্মক্ষেত্রে আরো সফলতা কামনা করেন তার ফুফু।
সাদিকুরের স্ত্রী আফসানা আক্তার বলেন, তার স্বামী অক্লান্ত পরিশ্রম করছে বলেই, তার সাফল্য পেয়েছে। তার ওই সাফল্যে আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
আমজাদ আলী মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক জিয়াউর রহমান বলেন, সাদিকুর রহমান আমার স্কুলেই শিক্ষকতা করতেন। এখানে তিনি আড়াই বছর শিক্ষকতা করেছেন। সহ-শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রিয় ছিলেন তিনি। তার সাফল্যে আমরা গর্ববোধ করছি।
সাদিকুর রহমান আরও বলেন, আমার জীবনে লক্ষ্য থাকবে যে কিভাবে আমি শিক্ষা ক্ষেত্রে আমার স্টুডেন্টদেরকে সেরাটা দেওয়া যায়। উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা ক্ষেত্রে যতটুকু পরিবর্তন আনা সম্ভব, আমার দ্বারা যতটুকু উপকৃত করতে পারি ততটুকু চেষ্টা করবো। চাকুরি জীবনে সবটুকু দেওয়ার প্রত্যয় তার। তিনি দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চেয়ে আগামীতে মানুষের দোয়া ও ভালবাসা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আশা তার।
শিরোনাম
দারিদ্রতা সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার সাদিকুর রহমানের
-
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি - আপডেট সময় : ০২:০৩:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৪
- ।
- 206
জনপ্রিয় সংবাদ




















