❖ হিমোফিলিয়া রোগীর সঙ্গে বিবাহিত নিকটাত্মিয়ের সন্তানদের এই রোগ হয়
❖এই রোগে আক্রান্ত হয় ছেলে শিশু, বাহক হয় মেয়েরা
❖ দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ৩৩২৮ জন
পুরুষদের বংশানুক্রমিক রোগ হচ্ছে হিমোফিলিয়া। যা পুরুষ তার রোগী বাবা, দাদা, নানা, মামা, চাচার জীনগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে বা বাহক মায়ের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়। এই রোগে একবার আক্রান্ত হলে তা থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই রক্তের এই জটিল রোগ থেকে মুক্ত থাকতে প্রতিটি সন্তানের জন্মদান সুপরিকল্পিত ও চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। সারা বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আজ বুধবার দেশে বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ইক্যুইট্যাবল একসেস ফর অল : রিকগনাইজিং অল ব্লিডিং ডিজঅর্ডারস’।
এ প্রসঙ্গে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও রক্তরোগ মেডিসিন ও ব্লাড ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, হিমোফিলিয়া একটি রক্তক্ষরণজনিত জন্মগত রোগ, যা বংশানুক্রমে ছেলেদের হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে শরীরের কোনো জায়গায় আঘাত পেলে বা সামান্য কেটে গেলে ওই স্থান থেকে যে রক্তক্ষরণ হয়, তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হিমোফিলিয়া রোগীর ক্ষেত্রে সহজে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না অথবা বিলম্বিত হয়।
তিনি বলেন, যদি বাবা সুস্থ ও মা বাহক হন, তবে ছেলেসন্তানের রোগী হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ আর মেয়েসন্তানের বাহক হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। আবার, যদি বাবা রোগী ও মা সুস্থ হন, তবে সব ছেলে সন্তানই সুস্থ হবে এবং সব মেয়ে সন্তানই বাহক হবে। সুতরাং প্রত্যেক হিমোফিলিয়া পুরুষ রোগী বিয়ে করতে পারবেন, তবে সন্তান নেওয়ার সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বা রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। আবার যদি বাবা রোগী ও মা বাহক হন, তবে ছেলেসন্তানের রোগী হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ আর মেয়ে সন্তানের রোগী হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ, বাহক হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ। সাধারণত মেয়েরা হিমোফিলিয়ার রোগী হয় না, রোগের বাহক হয়। তবে দুয়েকটি ক্ষেত্রে মেয়েরাও আক্রান্ত হতে পারে। হিমোফিলিয়ার রোগীর সঙ্গে আত্মীয়ের (মামাতো, খালাতো বোনের) বিয়ে হলে ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই এ রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
হিমোফিলিয়া সোসাইটি অব বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী, তাদের বর্তমানে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ৩৩২৮ জন। তবে, ধারণা করা হয়, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার হিমোলিফিয়ায় আক্রান্ত রোগী আছে।
ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এই রোগের লক্ষণ প্রসঙ্গে বলেন, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নাভি থেকে রক্ত পড়া, যখন হামাগুড়ি দিতে শেখে, তখন আপনাআপনি হাঁটু, কনুই, পায়ের গোড়ালি ফুলে যাওয়া, খেলাধুলার সময় সামান্য আঘাতে মাংসপেশিতে কালো কালো দাগ পড়া, গিরা ফুলে যাওয়া। দাঁত পড়ার সময় অতিরিক্ত রক্ত পড়া, খতনা করার সময় প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়া ইত্যাদি। হিমোফিলিয়া রোগীর ক্ষেত্রে সহজে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না।
ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব হিমোফিলিয়ার তথ্যমতে, শতকরা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ নারী ও কন্যা হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। যা পুরুষের আক্রান্তের ৩০ শতাংশ। প্রতি পাঁচজন নারীর একজন মাসিককালে অতিরিক্ত রক্তপাত এবং দীর্ঘদিন রক্তপাত বন্ধ না হওয়ার জটিলতায় ভোগে। কিন্তু এটি নারীর প্রতি অবদমিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অপ্রকাশিত থেকে যায়। ধীরে ধীরে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলে এই সংখ্যাটা আরো বাড়বে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)’র তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে ১২ জন হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত। দেশটিতে প্রতিবছর ৪০০ ছেলে শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
হিমোফিলিয়া রোগটি পুরোপুরি সারানোর মতো কোনো চিকিৎসা নেই। তাই এটির প্রতিরোধের উপর জোর দিয়ে ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের জেনেটিক টেস্টিং, জেনেটিক কাউন্সেলিং ও প্রিনাটাল টেস্ট করে অনাগত সন্তান রোগী না বাহক, তা নিশ্চিত হয়ে হিমোফিলিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা কমানো যায়। এ রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল তাই সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করাই উত্তম।






















