০৪:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ফেনী জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ

জানালার গ্রিল আগলে ধরে বুক সমান পানিতে ভেজা অবস্থায় বাঁচার দীর্ঘ আকুতি নিয়ে মেয়েটি ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে কাটিয়েছে দুই রাত দুই দিন। জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসার নেতৃত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকদল মুমুর্ষ হতবিহ্বল অবস্থায় কয়েক ঘন্টার চেষ্টায় পাকা ইটের দেওয়াল ভেঙ্গে উদ্ধার করে মেয়েটিকে। শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যার পানিতে ঘরবন্দী একটি মেয়েকে উদ্ধারের কথা জানালেন ফেনীর অন্যতম দ্বীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া রশীদিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি শহীদুল্লাহ দাঃ বাঃ ছাহেব।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বে থাকা মাদরাসার ছাত্র মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, দুপুরের কিছুটা পর, কালিদহ ইউনিয়নের মাইজবাড়ীয়া হয়ে পনের ষোলজনকে উদ্ধার করে আমরা ফিরছিলাম মাদরাসার দিকে।
পথিমধ্যে দুইজন লোক আমাদেরকে বললো পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি বাড়ীতে তালাবদ্ধ ঘরে একটা মেয়ে আটকা পড়েছে। দয়া করে মেয়েটিকে উদ্ধার করুণ। আমরা গতিপথ পরিবর্তন করে ঐ দুইজনকে সাথে করে নৌকা নিয়ে ছুটি মেয়েটির সন্ধানে।
অঠাঁই থৈ থৈ পানির তীব্র স্রোতের বীপরীতে চলছিলো নৌকা। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর গাছপালা আর এলোমেলো বাঁশ ঝাড় ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার কোন উপায় দেখছিলামনা।লোকগুলো জানায় বাঁশঝাড় পেরোলেই মেয়েটির বাড়ী। অন্যকোন পথ হয়ে ঘুরে যাবারও উপায় নেই। শুরু হয় বাঁশঝাড় কেটে ধীরে ধীরে নৌকা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা। বাড়ীর কাছে গিয়ে নৌকা আটকে যায় টিনের বেড়ার সাথে। টিন থেকে নৌকা সরিয়ে নিয়ে ঘুরে বাড়ীর পেছন দিক দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করি। জোরে আওয়াজ দিয়ে ডাকতে থাকি, ঘরে কেউ আছেন? ঘরে কেউ আছেন? কয়েকবার ডাকার পর কান্নার শব্দ শুনতে পাই। নৌকা ঘুরিয়ে সামনের দিকে যেতেই দেখি ২০-২২ বছর বয়সের একটি মেয়ে জানালার গ্রীল ধরে কান্না চোখে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির চোখে মুখে আতংকের ছাপ। আমরা তাকে উদ্ধার করতে এসেছি জানালে সে শান্ত হয়। কিন্তু তাকে উদ্ধার করা সহজ ছিলোনা। পাকা দালান ঘর। স্টীলের দরজা। দরজায় তালা দেয়া। পানির এক দেড় ফুট নীচে তালা ডুবে থাকায় তালা ভাঙ্গা সম্ভব হচ্ছিলোনা। ঘরের ছাদ এবং অপর কোন দিক থেকে মেয়েটিকে বের করা যায় কিনা সেই চেষ্টা করেও কোন পথ পেলামনা। ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে প্রায়। অগত্যা বহু কষ্টে পাকা দেওয়াল ভেঙ্গে মেয়েটিকে নৌকায় তুলতে সক্ষম হই। ভয় এবং পানিতে দাঁড়িয়ে থাকার ধকলে সে কাঁপছিলো। তাকে উষ্ণতার জন্য জ্যাকেট পরাই। তার চোখ, মুখ পেকাসে। পা দুটো যেন রক্তশূণ্য সাদা। অভুক্ত অসাড় শরীর। আর কেউ আছে কিনা ডাকাডাকি করে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘনিয়ে আসা রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং বিপদসংকুল তীব্র পানির স্রোতে পথ হাতড়ে মাইজবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে যখন পৌঁছাই তখন রাত ৮ টা। আশ্রয় কেন্দ্রের লোকজন স্থান সংকুলান হবেনা বলে কোনভাবেই মেয়েটিকে তুলে নিতে রাজি হলোনা। এতো রাতে মেয়েটিকে নিয়ে কোথায় যাবো, কি করবো কিছুই স্থির করতে পারছিলাম না। সঙ্গে থাকা স্থানীয় ছেলেরা বললো মাইজবাড়ীয়া বাজার মসজিদের দ্বিতীয় তলায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। আমরা যেন সেখানে একটু খোঁজ করি। নৌকা নিয়ে এগিয়ে গেলাম মসজিদের দিকে। সেখানে তাদের কতিপয় আত্মীয় থাকায় তার সহযোগিতায় তাকে ঐখানে তুলে দিয়ে ঐ রাতে আমরা আর মাদরাসায় ফিরে যাবার সাহস করি নাই। আবদুল্লাহ বলেন, সারাদিন স্রোতবাহী পানির সাথে লড়াই করে পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার করে এক এক জায়গার আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে দিতে রাত নয়টা সাড়ে নয়টা। পাহালিয়া নদীর তীব্র স্রোত ঠেলে মাদরাসায় যাওয়া বিপজ্জনক মনে করে আমরা ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যাই। মাদরাসা এলাকায় স্রোত কতটা ভয়ংকর ছিলো তা এখন হয়তো ভাষায় বুঝাতে পারবোনা, শুধু এই টুকু আন্দাজ দিই, মাদরাসার মসজিদ সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের বিল্ডিংয়ের দুরত্বে যাতায়াতের জন্য মোটা দড়ি বাঁধা হয়। এরপরও স্রোত ঠেলে এগিয়ে চলা ভীতিকর ছিলো। মাদরাসার পূর্বদিকে একেবারে সামনে থাকা পাহালিয়া নদী। নদীতে উত্তাল স্রোতের কারনে স্পীড বোর্ট, বড় বড় নৌকাও ঐ পথ দিয়ে চলতোনা।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রবিবার সকাল সাড়ে ১১টায় বৃহত্তর নোয়াখালী ও কুমিল্লার অন্যতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসায় যাই বন্যা উত্তর পরিস্থিতি অবলোকন করতে।
 ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের কালিদাস পাহালিয়া নদীর তীরে লস্করহাট নামক স্থানে অবস্থিত জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসা। এটি কওমি মাদ্রাসা হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছে। রশিদ আহমদ লুধিয়ানভির শিষ্য মুফতি শহিদুল্লাহ দা. বা. ১৯৯৪ সালে এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প কয়েকজন ছাত্র নিয়ে একটি জীর্ণ মসজিদে মাদ্রাসাটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে চারটি সুবৃহৎ ভবন। প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী, আড়াই শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা কর্মচারী। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
কথা হয় মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি শহীদুল্লাহ দাঃ বাঃ’র সাথে। তিনি জানান, শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যার দুইদিন আগে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হয়। বন্যা শুরুর আগ থেকেই টানা বৃষ্টি আর বন্যার আভাস থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়। খুব অল্প সংখ্যক ছাত্র শিক্ষক মাদরাসায় ছিলেন। এদিকে এলাকায় পানির চাপ বাড়তে থাকলে কিছু লোক মাদরাসায় আশ্রয় চাইতে আসে। আমরা সানন্দে তাদের জায়গা করে দিই। পরবর্তীতে পানির তীব্রতা আরো বাড়তে থাকলে দলে দলে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ মাদরাসার আশ্রয়ে আসতে শুরু করে। অনেকে গরু ছাগলও নিয়ে আসে। মাদরাসার নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় গবাদি পশু, দক্ষিণ পাশের ভবনে নারী ও শিশু এবং অন্যান্য ভবন গুলোতে পুরুষরা আশ্রয় নেয়। প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষের ঠাঁই হয়েছে মাদরাসায়। আশ্রিতদের খাবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, দুইদিন আমরা খাবার যায়জোগাড় করে চালিয়েছি। এর মধ্যে বিভিন্ন মানবিক ব্যক্তি ও সংস্থা ত্রান সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। মাদরাসার স্বেচ্ছাসেবক দল বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে আটকে পড়া বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। অনেককে ঘরের চাল কেটে, দেয়াল ভেঙ্গে উদ্ধার করতে হয়েছে।
মাদরাসায় সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনটি বৃহৎ জেনারেটর নষ্ট হয়েছে। ছাত্রদের খাবার তৈরির বিভিন্ন বৃহৎ আকারের মিক্সার মেশিন নষ্ট হয়েছে। বাগানের চারাগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় গাছও নষ্ট হয়েছে। ছাত্রদের কিছু বেডিং, কিতাবাদী পানিতে নষ্ট হয়েছে।
মাদরাসা ক্যাম্পাসে হাঁটতে গিয়ে দেখাগেল নানান যায়গায় কোরআন শরীফসহ কিতাবাদী রোদে শুকাতে দেয়া হয়েছে। একটি ডিঙি নৌকায় সদ্য আলকাতরা দিয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন এবং উন্নত জাতের ফুল, ফল ও গাছের চারার নার্সারীতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেনারেটর গুলো মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে। মাদরাসার বারান্দা এবং শ্রেণী কক্ষে পাঠদান চলতে দেখা গেছে। তবে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম বলে মনে হয়েছে।  অপর একজন শিক্ষক জানান, বহুদুর দুরান্তের জেলার ছাত্র আছে এখানে। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী জেলায় বন্যা হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো রাস্তায়, বাড়ির উঠানে পানি জমে আছে। বিশেষ করে বন্যার করনে উপস্থিতি কিছুটা কম। সপ্তাহখানেকের মধ্যে উপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
মাদরাসা এলাকার বাসাবাড়ি গাছপালাতে লাল ছোপ ছোপ পানির দাগ লেগে আছে। পাহালিয়া নদীতে দেখাগেছে পানি তলানীতে। সেই পানিতে সয়লাভ হয়েছে জমিন, ঘর-বাড়ি। প্রায় পনের ফুট পানির প্লাবনে বিপর্যস্ত হয়েছে সমগ্র জনজীবন। আস্তে আস্তে মানুষ স্বাভাবিক জীবনের উচ্ছাসে ফিরে যাচ্ছে। পনেরদিন পূর্বে মোটবী ইউনিয়নেরর লক্ষীপুর গ্রামের খোলা মাঠে দেখেছি জমাট পানিতে মাঠের দুইপ্রান্তে দুটি মৃত গরু। বন্যার পানির সাথে গরুগুলো ভেসে এসেছিলো। সেদিন মাদরাসা থেকে ফেরার পথে ঐ একই মাঠে দেখলাম কৃষকেরা ধানের চারা রোপন করছে। মাঠ জুড়ে উজ্জ্বল রোদের হাসি। কৃষকের দেহ থেকে পিনকি দিয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে নিংড়ানো মাঠে। আবার ফুলে ফসলে রঙ্গীন হয়ে উঠবে সবুজ মাঠ।
জনপ্রিয় সংবাদ

ফেনী জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ

আপডেট সময় : ০৪:৫০:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৪
জানালার গ্রিল আগলে ধরে বুক সমান পানিতে ভেজা অবস্থায় বাঁচার দীর্ঘ আকুতি নিয়ে মেয়েটি ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে কাটিয়েছে দুই রাত দুই দিন। জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসার নেতৃত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকদল মুমুর্ষ হতবিহ্বল অবস্থায় কয়েক ঘন্টার চেষ্টায় পাকা ইটের দেওয়াল ভেঙ্গে উদ্ধার করে মেয়েটিকে। শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যার পানিতে ঘরবন্দী একটি মেয়েকে উদ্ধারের কথা জানালেন ফেনীর অন্যতম দ্বীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া রশীদিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি শহীদুল্লাহ দাঃ বাঃ ছাহেব।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বে থাকা মাদরাসার ছাত্র মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, দুপুরের কিছুটা পর, কালিদহ ইউনিয়নের মাইজবাড়ীয়া হয়ে পনের ষোলজনকে উদ্ধার করে আমরা ফিরছিলাম মাদরাসার দিকে।
পথিমধ্যে দুইজন লোক আমাদেরকে বললো পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি বাড়ীতে তালাবদ্ধ ঘরে একটা মেয়ে আটকা পড়েছে। দয়া করে মেয়েটিকে উদ্ধার করুণ। আমরা গতিপথ পরিবর্তন করে ঐ দুইজনকে সাথে করে নৌকা নিয়ে ছুটি মেয়েটির সন্ধানে।
অঠাঁই থৈ থৈ পানির তীব্র স্রোতের বীপরীতে চলছিলো নৌকা। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর গাছপালা আর এলোমেলো বাঁশ ঝাড় ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার কোন উপায় দেখছিলামনা।লোকগুলো জানায় বাঁশঝাড় পেরোলেই মেয়েটির বাড়ী। অন্যকোন পথ হয়ে ঘুরে যাবারও উপায় নেই। শুরু হয় বাঁশঝাড় কেটে ধীরে ধীরে নৌকা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা। বাড়ীর কাছে গিয়ে নৌকা আটকে যায় টিনের বেড়ার সাথে। টিন থেকে নৌকা সরিয়ে নিয়ে ঘুরে বাড়ীর পেছন দিক দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করি। জোরে আওয়াজ দিয়ে ডাকতে থাকি, ঘরে কেউ আছেন? ঘরে কেউ আছেন? কয়েকবার ডাকার পর কান্নার শব্দ শুনতে পাই। নৌকা ঘুরিয়ে সামনের দিকে যেতেই দেখি ২০-২২ বছর বয়সের একটি মেয়ে জানালার গ্রীল ধরে কান্না চোখে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির চোখে মুখে আতংকের ছাপ। আমরা তাকে উদ্ধার করতে এসেছি জানালে সে শান্ত হয়। কিন্তু তাকে উদ্ধার করা সহজ ছিলোনা। পাকা দালান ঘর। স্টীলের দরজা। দরজায় তালা দেয়া। পানির এক দেড় ফুট নীচে তালা ডুবে থাকায় তালা ভাঙ্গা সম্ভব হচ্ছিলোনা। ঘরের ছাদ এবং অপর কোন দিক থেকে মেয়েটিকে বের করা যায় কিনা সেই চেষ্টা করেও কোন পথ পেলামনা। ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে প্রায়। অগত্যা বহু কষ্টে পাকা দেওয়াল ভেঙ্গে মেয়েটিকে নৌকায় তুলতে সক্ষম হই। ভয় এবং পানিতে দাঁড়িয়ে থাকার ধকলে সে কাঁপছিলো। তাকে উষ্ণতার জন্য জ্যাকেট পরাই। তার চোখ, মুখ পেকাসে। পা দুটো যেন রক্তশূণ্য সাদা। অভুক্ত অসাড় শরীর। আর কেউ আছে কিনা ডাকাডাকি করে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘনিয়ে আসা রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং বিপদসংকুল তীব্র পানির স্রোতে পথ হাতড়ে মাইজবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে যখন পৌঁছাই তখন রাত ৮ টা। আশ্রয় কেন্দ্রের লোকজন স্থান সংকুলান হবেনা বলে কোনভাবেই মেয়েটিকে তুলে নিতে রাজি হলোনা। এতো রাতে মেয়েটিকে নিয়ে কোথায় যাবো, কি করবো কিছুই স্থির করতে পারছিলাম না। সঙ্গে থাকা স্থানীয় ছেলেরা বললো মাইজবাড়ীয়া বাজার মসজিদের দ্বিতীয় তলায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। আমরা যেন সেখানে একটু খোঁজ করি। নৌকা নিয়ে এগিয়ে গেলাম মসজিদের দিকে। সেখানে তাদের কতিপয় আত্মীয় থাকায় তার সহযোগিতায় তাকে ঐখানে তুলে দিয়ে ঐ রাতে আমরা আর মাদরাসায় ফিরে যাবার সাহস করি নাই। আবদুল্লাহ বলেন, সারাদিন স্রোতবাহী পানির সাথে লড়াই করে পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার করে এক এক জায়গার আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে দিতে রাত নয়টা সাড়ে নয়টা। পাহালিয়া নদীর তীব্র স্রোত ঠেলে মাদরাসায় যাওয়া বিপজ্জনক মনে করে আমরা ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যাই। মাদরাসা এলাকায় স্রোত কতটা ভয়ংকর ছিলো তা এখন হয়তো ভাষায় বুঝাতে পারবোনা, শুধু এই টুকু আন্দাজ দিই, মাদরাসার মসজিদ সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের বিল্ডিংয়ের দুরত্বে যাতায়াতের জন্য মোটা দড়ি বাঁধা হয়। এরপরও স্রোত ঠেলে এগিয়ে চলা ভীতিকর ছিলো। মাদরাসার পূর্বদিকে একেবারে সামনে থাকা পাহালিয়া নদী। নদীতে উত্তাল স্রোতের কারনে স্পীড বোর্ট, বড় বড় নৌকাও ঐ পথ দিয়ে চলতোনা।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রবিবার সকাল সাড়ে ১১টায় বৃহত্তর নোয়াখালী ও কুমিল্লার অন্যতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসায় যাই বন্যা উত্তর পরিস্থিতি অবলোকন করতে।
 ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের কালিদাস পাহালিয়া নদীর তীরে লস্করহাট নামক স্থানে অবস্থিত জামেয়া রশিদীয়া মাদ্রাসা। এটি কওমি মাদ্রাসা হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছে। রশিদ আহমদ লুধিয়ানভির শিষ্য মুফতি শহিদুল্লাহ দা. বা. ১৯৯৪ সালে এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প কয়েকজন ছাত্র নিয়ে একটি জীর্ণ মসজিদে মাদ্রাসাটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে চারটি সুবৃহৎ ভবন। প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী, আড়াই শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা কর্মচারী। এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
কথা হয় মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি শহীদুল্লাহ দাঃ বাঃ’র সাথে। তিনি জানান, শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যার দুইদিন আগে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হয়। বন্যা শুরুর আগ থেকেই টানা বৃষ্টি আর বন্যার আভাস থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়। খুব অল্প সংখ্যক ছাত্র শিক্ষক মাদরাসায় ছিলেন। এদিকে এলাকায় পানির চাপ বাড়তে থাকলে কিছু লোক মাদরাসায় আশ্রয় চাইতে আসে। আমরা সানন্দে তাদের জায়গা করে দিই। পরবর্তীতে পানির তীব্রতা আরো বাড়তে থাকলে দলে দলে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ মাদরাসার আশ্রয়ে আসতে শুরু করে। অনেকে গরু ছাগলও নিয়ে আসে। মাদরাসার নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় গবাদি পশু, দক্ষিণ পাশের ভবনে নারী ও শিশু এবং অন্যান্য ভবন গুলোতে পুরুষরা আশ্রয় নেয়। প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষের ঠাঁই হয়েছে মাদরাসায়। আশ্রিতদের খাবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, দুইদিন আমরা খাবার যায়জোগাড় করে চালিয়েছি। এর মধ্যে বিভিন্ন মানবিক ব্যক্তি ও সংস্থা ত্রান সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। মাদরাসার স্বেচ্ছাসেবক দল বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে আটকে পড়া বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। অনেককে ঘরের চাল কেটে, দেয়াল ভেঙ্গে উদ্ধার করতে হয়েছে।
মাদরাসায় সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনটি বৃহৎ জেনারেটর নষ্ট হয়েছে। ছাত্রদের খাবার তৈরির বিভিন্ন বৃহৎ আকারের মিক্সার মেশিন নষ্ট হয়েছে। বাগানের চারাগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় গাছও নষ্ট হয়েছে। ছাত্রদের কিছু বেডিং, কিতাবাদী পানিতে নষ্ট হয়েছে।
মাদরাসা ক্যাম্পাসে হাঁটতে গিয়ে দেখাগেল নানান যায়গায় কোরআন শরীফসহ কিতাবাদী রোদে শুকাতে দেয়া হয়েছে। একটি ডিঙি নৌকায় সদ্য আলকাতরা দিয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন এবং উন্নত জাতের ফুল, ফল ও গাছের চারার নার্সারীতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেনারেটর গুলো মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে। মাদরাসার বারান্দা এবং শ্রেণী কক্ষে পাঠদান চলতে দেখা গেছে। তবে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম বলে মনে হয়েছে।  অপর একজন শিক্ষক জানান, বহুদুর দুরান্তের জেলার ছাত্র আছে এখানে। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী জেলায় বন্যা হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো রাস্তায়, বাড়ির উঠানে পানি জমে আছে। বিশেষ করে বন্যার করনে উপস্থিতি কিছুটা কম। সপ্তাহখানেকের মধ্যে উপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
মাদরাসা এলাকার বাসাবাড়ি গাছপালাতে লাল ছোপ ছোপ পানির দাগ লেগে আছে। পাহালিয়া নদীতে দেখাগেছে পানি তলানীতে। সেই পানিতে সয়লাভ হয়েছে জমিন, ঘর-বাড়ি। প্রায় পনের ফুট পানির প্লাবনে বিপর্যস্ত হয়েছে সমগ্র জনজীবন। আস্তে আস্তে মানুষ স্বাভাবিক জীবনের উচ্ছাসে ফিরে যাচ্ছে। পনেরদিন পূর্বে মোটবী ইউনিয়নেরর লক্ষীপুর গ্রামের খোলা মাঠে দেখেছি জমাট পানিতে মাঠের দুইপ্রান্তে দুটি মৃত গরু। বন্যার পানির সাথে গরুগুলো ভেসে এসেছিলো। সেদিন মাদরাসা থেকে ফেরার পথে ঐ একই মাঠে দেখলাম কৃষকেরা ধানের চারা রোপন করছে। মাঠ জুড়ে উজ্জ্বল রোদের হাসি। কৃষকের দেহ থেকে পিনকি দিয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে নিংড়ানো মাঠে। আবার ফুলে ফসলে রঙ্গীন হয়ে উঠবে সবুজ মাঠ।