এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল নোমান। দুজনই বীর মুক্তিযোদ্ধা। চট্টগ্রামের
রাজনীতিতে দেশের বড় দুই দলের বড় দুই নেতা। স্থানীয়ভাবে তাঁদের বিশেষ পরিচিতি আছে
‘মামা-ভাগিনা’ হিসেবে। রাজপথে ‘মামা-ভাগিনা’র ‘রাজনীতির যুদ্ধ’ ছিল বেশ
উপভোগের।
মামা হলেন বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির প্রবীণ নেতা আবদুল্লাহ আল
নোমান। আর ভাগিনা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক হ্যাট্রিক মেয়র ও আওয়ামী লীগ
নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন
আবদুল্লাহ আল নোমানের রাজনীতির বয়স অর্ধশতাব্দীর বেশি। একসময়ের বামপন্থি রাজনীতিক
নোমান আশির দশকে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যোগ দেন বিএনপিতে। দলটির জন্ম থেকেই যুক্ত
আছেন তিনি। বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হয়েছেন কয়েকবার। পালন করেছেন একাধিক
মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রির দায়িত্ব। এখন দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান। কিন্তু ‘অভিমান’ কিংবা
বয়সের ভারে নোমান আগের মতো ‘সক্রিয়’ নন স্থানীয় রাজনীতির মাঠে! অন্যদিকে মহিউদ্দিন
চৌধুরীও নেই দুনিয়ায়। ফলে চট্টগ্রামবাসী মামা-ভাগিনার সেই অম্লমিষ্টির রাজনীতি দেখার
সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৯৯৪ সাল থেকে প্রায় ১৬ বছর টানা তিনবার চট্টগ্রামের মেয়রের দায়িত্ব
পালন করেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নগরের কোতোয়ালী আসনে ভোটযুদ্ধে
নেমেছিলেন দুজন। জয়ী হয়েছিলেন মামা নোমান। তবে মেয়র পদে নির্বাচনে মহিউদ্দিন-
নোমান কখনো মুখোমুখি হননি।
দুজনের গ্রামের বাড়িও একই এলাকায় চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায়। ভোটের মাঠে সব সময়
থাকতেন বিপরীত মেরুতে। তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত সখ্যতা থাকলেও কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু
নির্মাণসহ নানা ইস্যুতে নোমানের বিরুদ্ধে মাঠ গরম করেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
রাজনীতির মাঠের এই দুই পাক্কা খেলোয়াড় ছিলেন ভালো বন্ধুও। সেই বন্ধুত্বকে দুই দলের অনেকে
বলতেন ‘আঁতাত’। তবে রাজনীতিতে সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ‘সৌন্দর্য’ বিকশিত করেছেন
নোমান-মহিউদ্দিন। ফলে দুজনই সমান জনপ্রিয় এখনো।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে আসল মামা-ভাগিনার সম্পর্ক না হলেও নোমান বললেন, ‘এটি রক্তের
সম্পর্কের আত্মীয়ের চাইতেও বেশি।’
‘চট্টলবীর’ মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর
তিনি মারা যান। প্রায় সাত বছর ধরে নেই দুনিয়ায়। কিন্তু রাজনীতির মাঠে এখনো ভাগিনা
মহিউদ্দিনকে ‘মিস’ করেন আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, ‘আমরা দুজন
আয়ুববিরোধী আন্দোলন করেছি একসঙ্গে। তিনি তখন সিটি কলেজে পড়তেন। আমি
চট্টগ্রাম কলেজে। এরশাদবিরোধী সম্মিলিত আন্দোলনেও দুজনই ছিলাম চট্টগ্রামের অন্যতম
প্রধান।’
এরশাদবিরোধী সেই আন্দোলনের কথা স্মরণ করে নোমান বলেন, ‘আন্দোলনের একপর্যায়ে
জাতীয়ভাবে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐক্য ভেঙে যায়। তখন কিন্তু চট্টগ্রামে আমাদের
দুজনের ঐক্য ভাঙেনি। প্রায় তিনমাস আমরা একসঙ্গে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। দলের
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত না মেনে দেশে এমন আঞ্চলিক ঐক্য নজিরবিহীন।’
বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে নোমান বলেন,
‘মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনীতি ছিল সাধারণ জনগণের জন্য। ছিল তাঁর উদারতা। তাঁর সঙ্গে
আমার সুসম্পর্কের কখনো অবনতি হয়নি। রাজনীতির বাইরে সামাজিক বন্ধন সবসময়
সুদৃঢ়-অটুট ছিল।’
বর্তমানে রাজনীতিতে প্রতিহিংসা বেশি জানিয়ে সাবেক মন্ত্রী নোমান বলেন, ‘দুজনের
মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল ঠিকই। কিন্তু কখনো প্রতিহিংসার আঁচড় লাগেনি এতটুকুন।
চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকান্ডে তিনি আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমিও তাঁকে
সহযোগিতা করেছি। এ জন্য দল ও সরকারে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছিলাম দুজনই। নানা বাধা
সত্বেও আমরা চট্টগ্রাম প্রশ্নে একমত ছিলাম।’
’৯১ এর জাতীয় নির্বাচনের কথা স্মরণ করে বিএনপি নেতা নোমান বলেন, ‘ওই সময়
কোতোয়ালী আসনে আমরা দুজন প্রতিদ্বিন্ধিসঢ়;দ্বতা করি। তিনি সামান্য ভোটে হেরে যান।
কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনো ক্ষোভ দেখিনি। তিনি আসলেই চট্টগ্রামদরদি রাজনীতিবিদ ছিলেন।’
বর্তমানে রাজনীতির ‘সুষ্ঠু’ পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে বলে মনে করেন আবদুল্লাহ আল নোমান।
তিনি বলেন, ‘এখন রাজনীতির ময়দানে অর্থবিত্ত ও লাঠিয়ালদের প্রাধান্য বেশি। পথচলতে বেশ
বেকায়দায় আছি। হে আল্লাহ, মহিউদ্দিনকে বেহেস্ত নসিব করুন।’
প্রথম মেয়র নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সেই ২৮ দফা চট্টগ্রামের উন্নয়নে রোডম্যাপ
বলে মনে করেন তাঁরই ঘনিষ্টজন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম
সুজন। তিনি বলেন, ‘তার মতো নেতা আর চট্টগ্রামে জন্ম হবে কীনা সন্দেহ। তিনি ছিলেন
চট্টগ্রামপ্রেমিক। চট্টগ্রাম ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। চট্টগ্রামের স্বার্থে প্রয়োজনে
বিরোধীদের সঙ্গেও হাত মেলাতেন।’
‘মামা-ভাগিনার রাজনীতি’ প্রসঙ্গে সুজন বলেন, ‘রাজনীতিতে এমন সুসম্পর্ক-পরিবেশ
থাকলে দেশ আরো এগিয়ে যাবে। তবে মহিউদ্দিন চৌধুরী নীতির প্রশ্নে সবসময় অটল ছিলেন।
চট্টগ্রামের স্বার্থ নিয়ে দলের ভেতরে হোক, বাইরে হোক কাউকে কোনো ছাড় দিতেন না।’
দুই নেতাই ‘চট্টগ্রামদরদি’ উল্লেখ করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম
আহ্ধসঢ়;বায়ক আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমরা মামা-ভাগিনার সেই রাজনীতি বেশ উপভোগ করতাম।
রাজনীতির ময়দানে দুজনের মধ্যে কোনো প্রতিহিংসা ছিল না। তবে প্রতিযোগিতা ছিল।
নোমান-মহিউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব। দল-মত নির্বিশেষে সবাই তাঁদের
সম্মান করেন। দুই নেতাকে চট্টগ্রামবাসী কোনো দিন ভুলবে না।’




















