একমুখী গাড়ি চলাচল নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা রোধ, গতি সৃষ্টিসহ বিশ্বমানের সড়ক যোগাযোগ
নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম ঢাকা মহাসড়ক উন্নীত করা হয় চার লেনে। দশ বছর কাজ চলার পর ২০১৬ সালের ২
জুলাই সড়কটি উদ্বোধন করা হয়। ওই সময় প্রকল্পটিতে ব্যয় করা হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু
অপরিকল্পিত মিডিয়ান গ্যাপের কারণে ব্যস্ততম মহাসড়কটি দিনে দিনে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই মহাসড়কে চলাচল করছে। নিত্য দুর্ভোগের পাশাপাশি
অসংখ্য মানুষকে পোড়াতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকার বাড়তি জ্বালানি। অহেতুক নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার
শ্রমঘণ্টা। এই মহাসড়কে কিছু মিডিয়ান গ্যাপ তৈরি করে এই দুর্ভোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করার
সুযোগ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।
সূত্রে জানা যায়, দেশের যান চলাচলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ৪ হাজার কোটির বেশি টাকা
ব্যয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে দেশের প্রধান
এই মহাসড়কে চার লেনে গাড়ি চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। চট্টগ্রামের সিটি গেট
থেকে দাউদকান্দি টোল প্লাজা পর্যন্ত ১৯০ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের মাঝখানে
প্রায় সাড়ে ১৬ ফুট প্রস্থ একটি ডিভাইডার রয়েছে। ডিভাইডারটির দুই পাশে নির্মাণ করা হয়েছে
৯.৩ মিটার বা সাড়ে ৩০ ফুট প্রস্থ মহাসড়ক। প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার গাড়ি চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা
নির্ধারণ করে মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যে এই সড়কে
যান চলাচলের সংখ্যা হিসাব নিকাশ উলট পালট করে দিয়েছে। বর্তমানে এই মহাসড়ক দিয়ে গড়ে পঞ্চাশ
হাজারের বেশি গাড়ি চলাচল করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তারা বলেন, মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার মাধ্যমে দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কটিতে যান চলাচলে
বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনের আশা করা হয়েছিল। চার ঘণ্টায় ঢাকা চট্টগ্রাম যাতায়াতের স্বপ্নও
দেখেছিল মানুষ। কিন্তু নানা বিশৃঙ্খলা এবং প্রতিকূলতায় সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। প্রশস্ত করা
ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে রাস্তার একটি অংশজুড়ে অবৈধ পার্কিং এবং দোকানপাটের
দখলে থাকায় যান চলাচলে প্রত্যাশিত গতি আনা সম্ভব হয়নি। মহাসড়কের অসংখ্য পয়েন্ট দিনে রাতে
যানজট লেগে থাকে। তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে মিডিয়ান গ্যাপের স্বল্পতা। রাস্তাটির অনেক
গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবহুল এলাকায় মিডিয়ান গ্যাপ না থাকায় সংকট তৈরি করছে। পুরো মহাসড়কে
বিশাল ডিভাইডার তৈরি করা হলেও রাস্তা পারাপারের গ্যাপগুলো রাখা হয়েছে অপর্যাপ্ত এবং অপরিকল্পিতভাবে।
স্থানীয়রা জানান, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে লাখ লাখ মানুষের বসবাস। স্কুল কলেজ, হাট
বাজারসহ নানা ধরনের স্থাপনা রয়েছে সড়কের উভয় পাশে। এসব স্থাপনায় মানুষকে আসা যাওয়া করতে হয়।
নানা প্রয়োজনে রাস্তা পারাপার করতে হয়। ব্যক্তিগত গাড়ি, পণ্য পরিবহনের ছোট ভ্যান কিংবা রিকশাসহ
নানা ধরনের বাহন নিয়েও চলাচল করে মানুষ। কিন্তু মিডিয়ান গ্যাপ না থাকায় এসব বাহনকে ট্রাফিক
আইন মেনে ১৫/২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়তি ঘুরতে হয়। এজন্য অধিকাংশ সময় আইনের তোয়াক্কা না
করে ঝুঁকি নিয়ে এসব গাড়ি উল্টো পথে চলাচল করে। উল্টো পথে চলা গাড়িগুলো শুধু নিজেরাই
ঝুঁকিতে থাকে না, সোজা পথে চলা গাড়িগুলোকেও ঝুঁকিতে ফেলে।
মহাসড়কটিতে স্পিড লিমিট রাখা হয়েছে ৪০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। কিন্তু সড়কের কোথাও কেউ
স্পিড লিমিট মানেন না। দ্রুত বেগের একেকটি গাড়ির সামনে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ি
সামনে পড়ে। রিকশা, টেঙি, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস সবই আসে উল্টো দিক থেকে। এতে
মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির
কারণে মহাসড়কে চলাচল করা গাড়িগুলোর গতিও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় যানজটে আটকা পড়ে
কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিটি গেট থেকে শুরু করে সীতাকুন্ড, মীরসরাই,
ফেনী ও কুমিল্লাসহ বিস্তৃত এলাকায় মিডিয়ান গ্যাপের অভাবে প্রতিদিন শত শত গাড়ি উল্টো পথে
চলাচল করে। রাস্তার দুদিকে দেখা যায় উল্টো পথে চলা গাড়ি। উল্টো দিকের এসব গাড়ির পাশ কাটিয়ে
নির্দিষ্ট রাস্তায় থাকা গাড়িগুলোকে সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রিত গতিতে এগুতে হচ্ছে। উল্টো পথের গাড়িগুলোর
গতিও থাকে সীমিত। এতে করে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তাটির সুফল পুরোপুরি
মিলছে না।
উল্টো পথে আসা একাধিক চালক বলেন, মিডিয়ান গ্যাপের অভাব সড়কজুড়ে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি
করেছে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এই যন্ত্রণা থেকে
নিস্তার পেতে আমাদেরকে কিছু পথ রং সাইডে চলতে হয়। ১-২ কিমি রং সাইডে চলে ১৫-২০
কিলোমিটার বাড়তি ঘোরা থেকে রক্ষা পাই।
সীতাকুন্ডের পন্থিছিলা এলাকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ি নিয়ে ১
কিলোমিটার দূরের সীতাকুন্ডে বাজারে যেতে হলে ১৫ কিলোমিটার বাড়তি ঘুরতে হয়। আধা
কিলোমিটার রং সাইডে গিয়ে বাকি আধা কিলোমিটার গেলে বাজার পেয়ে যাই। তাই ঝুঁকি নিয়ে
রং সাইডে চলতে হয়। পন্থিছিলা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণে শেখ পাড়ায় মিডিয়ান গ্যাপ দিয়ে
রাস্তা পারাপার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এজন্য পন্থিছিলা থেকে শেখ পাড়া পর্যন্ত আধা কিলোমিটার
জায়গা তাকে উল্টো পথে আসতে হয়। এটি করতে গিয়ে প্রতিদিনই তাকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে।
মাঝেমধ্যে পুলিশকে টাকা দিতে হয়। কিন্তু এটি না করে সঠিক পথে যেতে তাকে উত্তর দিকে সাড়ে ৭
কিলোমিটার গিয়ে বড় দারোগারহাট ঘুরে আসতে হয়। ফলে উভয় পথে তাকে ১৫ কিলোমিটার অতিরিক্ত
ঘুরে শ’খানেক টাকার জ্বালানি এবং ২০/২৫ মিনিট সময় নষ্ট করতে হয়।
তিনি জানান, শেখ পাড়া থেকে বড় দারোগারহাট পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকায় কোনো
মিডিয়ান গ্যাপ না থাকায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটির হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন ঝুঁকি
নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বড় ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সীতাকুন্ডের তিন ইউনিয়নের কয়েক লাখ
মানুষ।
একই ধরনের অবস্থা সীতাকুন্ডের আর আর জুট মিলের পাশ থেকে কুমিরা পর্যন্ত এলাকায়। পাঁচ
কিলোমিটারের বেশি এলাকায় কোনো মিডিয়ান গ্যাপ নেই। মীরসরাইয়েও একই অবস্থা দেখা গেছে।
এতে হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি ‘জীবন হাতে নিয়ে’ চলাচল করার মতো ঘটনা
ঘটছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, মিডিয়ান গ্যাপের বিষয়টি এলাকার বসতি,
প্রয়োজনসহ বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে করা হয়। রাস্তাটি যখন প্রশস্ত করা হয়েছিল তখন বিষয়গুলো
খেয়াল করে করা হয়েছিল। ঘন ঘন মিডিয়ান গ্যাপ থাকলে যান চলাচলের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মহাসড়কে স্বল্প দূরত্বে মিডিয়ান গ্যাপ দেওয়ার সুযোগ নেই।




















