০২:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘প্রেমের বিয়ে’ বলেই মিথ্যা হত্যা মামলা, মৃত্যুর কারণ ক্যান্সার 

ন্যায়বিচার চাইলেন শ্বশুরবাড়ির স্বজনরা
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক, পালিয়ে বিয়ে, অতঃপর ৪ মাস যেতে না যেতেই দশম শ্রেণী পড়ুয়া মাদ্রাসা ছাত্রী পাপিয়ার মৃত্যু…। কিন্তু এই মৃত্যু কি শারিরীক নির্যাতনে, নাকি রোগ্রাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু _এনিয়ে ধুম্রজাল দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, শিক্ষার্থী পাপিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তার বাবা হত্যা মামলা দায়ের করলেও ছেলে পক্ষের দাবি, বিয়ের আগে থেকেই ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলো পাপিয়া _যা বিয়ের আগে ছেলে বা তার পরিবারের কেউেই জানতেন না। তবে বিয়ের পর ক্যান্সারের কথা জানলেও শেষ রক্ষা হয়নি, চিকিৎসা চলাকালীন হঠাৎ করেই মারা যায় মাদ্রাসা ছাত্রী পাপিয়া। মেয়ের পরিবারের দাবি, ধর্ষণ ও অত্যাচার নির্যাতনেই পাপিয়ার মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইনিউয়নের নারায়নপুর গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় স্বামী হোসাইন ও তাদের স্বজনদের আসামী করে নান্দাইল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে মেয়ে পাপিয়া আক্তারের বাবা আবু কালাম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নান্দাইলের বাকচান্দা ফাজিল মাদ্রাসায় দাখিলে (দশম) অধ্যয়নরত অবস্থায় পাশের গ্রামের হোসাইন নামক তারই এক সহপাঠীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে পাপিয়া আক্তারের। এরপর প্রেমের টানে দু’জনেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে করেন। এর একদিন পরই কাজীর মাধ্যমে বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন তারা। বিষয়টি জানতে পেরে পাপিয়ার পিতা গ্রামের লোকজনের কাছে বিচার প্রার্থী হলে পরদিন অনুষ্ঠিত সালিশের মাধ্যমে পাপিয়াকে তার পিতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর পাপিয়া বাপের বাড়ি থেকে আবারও পালিয়ে হোসাইনের সাথে নারায়ণগঞ্জ চলে যান। সেখানে একটি পোশাক কারখানায় কাজ নিয়ে বসবাস করতে থাকেন। এতে ক্ষুব্ধ আবু কালাম গত ২১ অক্টোবর বাদি হয়ে ময়মনসিংহে বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে হোসাইনের নামে একটি অপহরণ মামলা করেন। এরপর কোর্ট পিবিআইকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলে।
সরেজমিনে গিয়ে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেজিস্ট্রি করার মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করা হলেও হোসাইনের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন পাপিয়ার বাবা । স্বামী-স্ত্রী হিসাবে তিনমাস একত্রে বসবাস করার পর পাপিয়ার শরীরে পূর্বের ক্যান্সার রোগ দেখা দেওয়ার পর ক্যান্সারের ব্যয়বহুল চিকিৎসা একা সামলাতে না পেরে অবশেষে পাপিয়াকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় হোসাইন। এরপর সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এসব প্রসঙ্গে হোসাইনের মামা আব্দুল আওয়াল বলেন, পাপিয়া যে ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলো সে আমাদের কাউকেই জানায়নি। বিয়ের পর আমরা যখন জানতে পারি, তখন নিয়তি হিসেবে ধরে নিয়েই চার চিকিৎসার উদ্যোগ নেই আমরা। কিন্তু এরপর জোর করে তার বাবা-মা আমাদের থেকে মেয়েকে নিয়ে যায়। পরে যখন আবারও সে পালিয়ে ফিরে আসে, তখনই তার শারিরীক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এরপরও আমার ভাগ্নে তাকে গ্রহণ করে নেয় এবং চিকিৎসা করাতে থাকে। একটা পর্যায়ে যখন সে আর পারছিলো না, তখন পাপিয়ার বাবার সহযোগিতা চায় ছেলে। তখন তারা চিকিৎসার কথা বলে পাপিয়াকে আবারও ফিরিয়ে নেয়। এমনকি সেখানেই থাকা অবস্থায় গত ১৬ ডিসেম্বর পাপিয়া মারা যায়।
তিনি বলেন, পাপিয়া মারা যাওয়ার পর তার লাশ ময়না তদন্তের জন্য পুলিশের মাধ্যমে মর্গে পাঠানো হয়। কিন্তু কোন রিপোর্ট আসার আগেই পাপিয়াকে স্বামীর বাড়ির লোকজন কর্তৃক অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে এমন অভিযোগ এনে গত ১৯ ডিসেম্বর থানায় একটি মামলা করে বাবা আবু কালাম। সে মামলায় হোসাইন ছাড়াও তার পিতা-মাতা ও চাচাসহ মোট ছয়জনকে আসামী করা হয়েছে।
হোসাইনের নানী রোকেয়া বেগম জানান, নারায়ণগঞ্জ থাকাবস্থায় পাপিয়ার ক্যান্সার রোগটি পুনরায় দেখা দেওয়ার সময় তার একটি চোখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়। হোসাইনের পক্ষে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব হবে না ভেবে পাপিয়ার পিতা আবু কালামের কাছে লোকজনের মাধ্যমে কিছু টাকা চায়। কিন্তু টাকা দিতে অস্বীকার করে পাপিয়াকে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বলেন আবু কালাম। কথা অনুযায়ি গত ৬ সেপ্টেম্বর হোসাইন পাপিয়াকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তার বাপের বাড়ির সামনে দিয়ে আসে। এরপর বাপের বাড়িতে মারা যায়।
স্থানীয় চা দোকানী বাদল মিয়া জানান,পালিয়ে যাবার পর অনুষ্ঠিত সালিশে তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পাপিয়ার বাবা সকলকে জানান যে তার মেয়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত, তাই তার নিয়মিত চিকিৎসার দরকার। এসময় মেয়েটিকে ফেরত নিয়ে চিকিৎসার কথা বলেন তিনি। এরপর পাপিয়া সুস্থ হলে এবং রাজি থাকলে পরবর্তীতে হোসাইনের হাতে আবারও তুলে দেওয়ার কথা জানান তিনি। কিন্তু ফেরত যাবার পর মেয়েটি আবারও হোসাইনের কাছেই চলে যায়। সেখানে থাকাবস্থায় ক্যান্সারে আক্রান্ত মেয়েটি মারাত্বকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাপের বাড়িতেই মারা যায় পাপিয়া। এখন যদি শুধু শুধু ছেলের পরিবারকে দোষারোপ করে মিথ্যা মামলা দিয়ে দেওয়া হয়, তা হলো গুরুতর অন্যায়।
রুহুল আমিন নামক আরেক এলাকাবাসী বলেন, মেয়েটি যে আগেই ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলো, সেটি হোসাইনের কাছে গোপন করাটাই ছিলো মেয়ের বড় অন্যায়। এরপরও যখন হোসেন মেনে নিলো এবং চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হলো, তখন আবার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া ছিলো তারা বাবার আকে ভুল সিদ্ধান্ত। সেখানে নিয়ে তাকে ভালো কোন চিকিৎসা করানো হয়নি বলেই আমরা জেনেছি। তার চেয়ে বরং মেয়েটা আমাদের কাছে থাকলে যেকোন মূল্যে আমরা তার চিকিৎসা করাতাম। প্রয়োজনে এলাকাবাসীর কাছে হাত পেতে হলেও আমরা তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু উল্টো তার বাবার বাড়িতে মারা যাওয়ার পর তারা ছেলে ও তার আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিলো। এটা তিনি ভালো কাজ করেননি।
এদিকে পাপিয়ার বাবার বাড়িতে গিয়ে তার পিতা আবু কালামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার মেয়ের পূর্বে কোন রোগই ছিল না। হোসাইন এবং তার স্বজনদের নির্যাতনের কারণেই সে অসুস্থ হয় এবং তার একটি চোখও নষ্ট হয়ে যায়। তাকে আমরা বাড়িতে আনার পর মূমুর্ষ অবস্থায় প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাই। সেখান থেকে পরে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে এবং সেখান থেকে পুনরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। এমনকি সর্বশেষে ঢাকার মিরপুর ডেল্টা হাসপাতালে চিকিৎসা করাই। শেষে বাড়িতে নিয়ে আসার পর গত ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে সে মারা যায়।
তিনি বলেন, আমার মেয়ে বিয়ে হয়েছে এমন কাগজপত্র তারা দেখাতে পারবে না। আর ক্যান্সার হয়ছে তাদের অত্যাচারে কারণে। এখন কাগজপত্রে যদি তারা দোষী প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের বিচার হবে।
এই প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা বিএমএ’র সাবেক সভাপতি ডা. মতিউর রহমান ভূইয়া বলেন, পাপিয়ার মস্তিষ্কের সিটিস্ক্যান ও বায়োপসি পরীক্ষার দুটি রিপোর্ট দেখে মনে হয়েছে তার (পাপিয়ার) শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর আসল কারণ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না দেখে বলা যাবে না।
মামলা প্রসঙ্গে নান্দাইল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি)ফরিদ আহমেদ জানান, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। ময়না তদন্তের রিপোট হাতে না আসা পর্যন্ত এটি হত্যা না ক্যান্সার সেটি বলা যাচ্ছেনা। রিপোর্ট হাতে আসলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জনপ্রিয় সংবাদ

ভোটে দেখতে আসবেন প্রায় ৫০০ বিদেশি সাংবাদিক-পর্যবেক্ষক: ইসি সচিব আখতার

‘প্রেমের বিয়ে’ বলেই মিথ্যা হত্যা মামলা, মৃত্যুর কারণ ক্যান্সার 

আপডেট সময় : ০৮:২২:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক, পালিয়ে বিয়ে, অতঃপর ৪ মাস যেতে না যেতেই দশম শ্রেণী পড়ুয়া মাদ্রাসা ছাত্রী পাপিয়ার মৃত্যু…। কিন্তু এই মৃত্যু কি শারিরীক নির্যাতনে, নাকি রোগ্রাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু _এনিয়ে ধুম্রজাল দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, শিক্ষার্থী পাপিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তার বাবা হত্যা মামলা দায়ের করলেও ছেলে পক্ষের দাবি, বিয়ের আগে থেকেই ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলো পাপিয়া _যা বিয়ের আগে ছেলে বা তার পরিবারের কেউেই জানতেন না। তবে বিয়ের পর ক্যান্সারের কথা জানলেও শেষ রক্ষা হয়নি, চিকিৎসা চলাকালীন হঠাৎ করেই মারা যায় মাদ্রাসা ছাত্রী পাপিয়া। মেয়ের পরিবারের দাবি, ধর্ষণ ও অত্যাচার নির্যাতনেই পাপিয়ার মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইনিউয়নের নারায়নপুর গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় স্বামী হোসাইন ও তাদের স্বজনদের আসামী করে নান্দাইল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে মেয়ে পাপিয়া আক্তারের বাবা আবু কালাম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নান্দাইলের বাকচান্দা ফাজিল মাদ্রাসায় দাখিলে (দশম) অধ্যয়নরত অবস্থায় পাশের গ্রামের হোসাইন নামক তারই এক সহপাঠীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে পাপিয়া আক্তারের। এরপর প্রেমের টানে দু’জনেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে করেন। এর একদিন পরই কাজীর মাধ্যমে বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন তারা। বিষয়টি জানতে পেরে পাপিয়ার পিতা গ্রামের লোকজনের কাছে বিচার প্রার্থী হলে পরদিন অনুষ্ঠিত সালিশের মাধ্যমে পাপিয়াকে তার পিতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর পাপিয়া বাপের বাড়ি থেকে আবারও পালিয়ে হোসাইনের সাথে নারায়ণগঞ্জ চলে যান। সেখানে একটি পোশাক কারখানায় কাজ নিয়ে বসবাস করতে থাকেন। এতে ক্ষুব্ধ আবু কালাম গত ২১ অক্টোবর বাদি হয়ে ময়মনসিংহে বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে হোসাইনের নামে একটি অপহরণ মামলা করেন। এরপর কোর্ট পিবিআইকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলে।
সরেজমিনে গিয়ে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেজিস্ট্রি করার মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করা হলেও হোসাইনের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন পাপিয়ার বাবা । স্বামী-স্ত্রী হিসাবে তিনমাস একত্রে বসবাস করার পর পাপিয়ার শরীরে পূর্বের ক্যান্সার রোগ দেখা দেওয়ার পর ক্যান্সারের ব্যয়বহুল চিকিৎসা একা সামলাতে না পেরে অবশেষে পাপিয়াকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় হোসাইন। এরপর সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এসব প্রসঙ্গে হোসাইনের মামা আব্দুল আওয়াল বলেন, পাপিয়া যে ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলো সে আমাদের কাউকেই জানায়নি। বিয়ের পর আমরা যখন জানতে পারি, তখন নিয়তি হিসেবে ধরে নিয়েই চার চিকিৎসার উদ্যোগ নেই আমরা। কিন্তু এরপর জোর করে তার বাবা-মা আমাদের থেকে মেয়েকে নিয়ে যায়। পরে যখন আবারও সে পালিয়ে ফিরে আসে, তখনই তার শারিরীক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এরপরও আমার ভাগ্নে তাকে গ্রহণ করে নেয় এবং চিকিৎসা করাতে থাকে। একটা পর্যায়ে যখন সে আর পারছিলো না, তখন পাপিয়ার বাবার সহযোগিতা চায় ছেলে। তখন তারা চিকিৎসার কথা বলে পাপিয়াকে আবারও ফিরিয়ে নেয়। এমনকি সেখানেই থাকা অবস্থায় গত ১৬ ডিসেম্বর পাপিয়া মারা যায়।
তিনি বলেন, পাপিয়া মারা যাওয়ার পর তার লাশ ময়না তদন্তের জন্য পুলিশের মাধ্যমে মর্গে পাঠানো হয়। কিন্তু কোন রিপোর্ট আসার আগেই পাপিয়াকে স্বামীর বাড়ির লোকজন কর্তৃক অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে এমন অভিযোগ এনে গত ১৯ ডিসেম্বর থানায় একটি মামলা করে বাবা আবু কালাম। সে মামলায় হোসাইন ছাড়াও তার পিতা-মাতা ও চাচাসহ মোট ছয়জনকে আসামী করা হয়েছে।
হোসাইনের নানী রোকেয়া বেগম জানান, নারায়ণগঞ্জ থাকাবস্থায় পাপিয়ার ক্যান্সার রোগটি পুনরায় দেখা দেওয়ার সময় তার একটি চোখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়। হোসাইনের পক্ষে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব হবে না ভেবে পাপিয়ার পিতা আবু কালামের কাছে লোকজনের মাধ্যমে কিছু টাকা চায়। কিন্তু টাকা দিতে অস্বীকার করে পাপিয়াকে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বলেন আবু কালাম। কথা অনুযায়ি গত ৬ সেপ্টেম্বর হোসাইন পাপিয়াকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তার বাপের বাড়ির সামনে দিয়ে আসে। এরপর বাপের বাড়িতে মারা যায়।
স্থানীয় চা দোকানী বাদল মিয়া জানান,পালিয়ে যাবার পর অনুষ্ঠিত সালিশে তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পাপিয়ার বাবা সকলকে জানান যে তার মেয়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত, তাই তার নিয়মিত চিকিৎসার দরকার। এসময় মেয়েটিকে ফেরত নিয়ে চিকিৎসার কথা বলেন তিনি। এরপর পাপিয়া সুস্থ হলে এবং রাজি থাকলে পরবর্তীতে হোসাইনের হাতে আবারও তুলে দেওয়ার কথা জানান তিনি। কিন্তু ফেরত যাবার পর মেয়েটি আবারও হোসাইনের কাছেই চলে যায়। সেখানে থাকাবস্থায় ক্যান্সারে আক্রান্ত মেয়েটি মারাত্বকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাপের বাড়িতেই মারা যায় পাপিয়া। এখন যদি শুধু শুধু ছেলের পরিবারকে দোষারোপ করে মিথ্যা মামলা দিয়ে দেওয়া হয়, তা হলো গুরুতর অন্যায়।
রুহুল আমিন নামক আরেক এলাকাবাসী বলেন, মেয়েটি যে আগেই ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলো, সেটি হোসাইনের কাছে গোপন করাটাই ছিলো মেয়ের বড় অন্যায়। এরপরও যখন হোসেন মেনে নিলো এবং চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হলো, তখন আবার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া ছিলো তারা বাবার আকে ভুল সিদ্ধান্ত। সেখানে নিয়ে তাকে ভালো কোন চিকিৎসা করানো হয়নি বলেই আমরা জেনেছি। তার চেয়ে বরং মেয়েটা আমাদের কাছে থাকলে যেকোন মূল্যে আমরা তার চিকিৎসা করাতাম। প্রয়োজনে এলাকাবাসীর কাছে হাত পেতে হলেও আমরা তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু উল্টো তার বাবার বাড়িতে মারা যাওয়ার পর তারা ছেলে ও তার আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিলো। এটা তিনি ভালো কাজ করেননি।
এদিকে পাপিয়ার বাবার বাড়িতে গিয়ে তার পিতা আবু কালামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার মেয়ের পূর্বে কোন রোগই ছিল না। হোসাইন এবং তার স্বজনদের নির্যাতনের কারণেই সে অসুস্থ হয় এবং তার একটি চোখও নষ্ট হয়ে যায়। তাকে আমরা বাড়িতে আনার পর মূমুর্ষ অবস্থায় প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাই। সেখান থেকে পরে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে এবং সেখান থেকে পুনরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। এমনকি সর্বশেষে ঢাকার মিরপুর ডেল্টা হাসপাতালে চিকিৎসা করাই। শেষে বাড়িতে নিয়ে আসার পর গত ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে সে মারা যায়।
তিনি বলেন, আমার মেয়ে বিয়ে হয়েছে এমন কাগজপত্র তারা দেখাতে পারবে না। আর ক্যান্সার হয়ছে তাদের অত্যাচারে কারণে। এখন কাগজপত্রে যদি তারা দোষী প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের বিচার হবে।
এই প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা বিএমএ’র সাবেক সভাপতি ডা. মতিউর রহমান ভূইয়া বলেন, পাপিয়ার মস্তিষ্কের সিটিস্ক্যান ও বায়োপসি পরীক্ষার দুটি রিপোর্ট দেখে মনে হয়েছে তার (পাপিয়ার) শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর আসল কারণ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না দেখে বলা যাবে না।
মামলা প্রসঙ্গে নান্দাইল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি)ফরিদ আহমেদ জানান, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। ময়না তদন্তের রিপোট হাতে না আসা পর্যন্ত এটি হত্যা না ক্যান্সার সেটি বলা যাচ্ছেনা। রিপোর্ট হাতে আসলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।