০৫:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৩৮ বছর ধরে ডোম ছাড়াই চলছে রামেকের মর্গ

নারী ডোম নিয়োগের দাবি
পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে চলছে ময়নাতদন্তের কাজ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতলে ৩৮ বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে ডোম পদটি। ঐতিহ্যবাহি প্রাচিন এ হাসপাতালটিতে নেই পেশাদার
ডোম। ফলে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই ময়নাতদন্তের সময় ডোমের কাজ করেন। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা বলেন, পেশাদার ডোম না থাকায়
তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারিভাবে হাসপাতালগুলোতে ডোম নিয়োগ আবশ্যক হলেও নানা জটিলতায় তা হয়নি। বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে
প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডোম নিয়োগের অনুরোধ করা হয়েছে। এদিকে, নিহত নারী হোক আর পুরুষ হাসপাতালগুলোতে ময়নাতদন্ত করেন পুরুষ ডোম।
নিহত নারীদের স্বজনেরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় নারীরা কাজ করছেন। এমনকি মৃত নারীদের মরদেহ উদ্ধারে কাজও করেন নারীরা। কিন্তু নারীদের ময়নাতদন্তের কাজ করছেন পুরুষেরা। নিহত নারীর ক্ষেত্রে নারী ডোম দিয়ে ময়নাতদন্ত করা দরকার। প্রতিটি হাসপাতালে নারীদের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগের দাবি জানান তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে রামেক হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম নিশিপদ দাসের মৃত্যুর পর আর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এরপর থেকে ফাঁকা পড়ে আছে পদটি। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম না থাকলেও থেমে নেই ময়নাতদন্তের কাজ। বর্তমানে ডোম নিশিপদ দাসের ছেলে শ্রী তপন দাস কাজ করেন ময়নাতদন্তের। যদিও শ্রী তপন দাস ডোম নন। তিনি রামেক হাসপাতালের ক্লিনার। ডোম না থাকায় তাকে দিয়ে ময়নাতদন্তের কাজগুলো করাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের লাশকাটা ঘরে (মর্গ) পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত প্রতিদিনের ঘটনা। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা,
কিংবা হত্যার পর রাজশাহী জেলার মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত হয় এই লাশকাটা ঘরেই। বর্তমানে তপনের সঙ্গে কাজ করেন বিপন, রনি, সনি, হৃদয়, রঞ্জন,
সুমন, মোহন, বাবর, সঞ্জয়। তারা ময়নাতদন্তের পরে সেলাই, মরদেহ দড়ি দিয়ে বাঁধা ও ভ্যানের ওপরে তোলা-নামার কাজগুলো করে থাকেন। তারাও কেউ
নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী নন।
তপন বলেন, ১৯৯২ সালে হাসপাতালে ক্লিনার পদে যোগ দেন তিনি। যোগদানের দুই বছরের মাথায় মারা যান তার বড় ভাই অবিনাশ দাস। তার ভাই
অবিনাশ বাবা নিশিপদের সঙ্গে ডোমের কাজ করতেন। দাদা ডিসি অফিসের অধীনে কাজ করতো। তাকেও বাবার মতো ২০ টাকা বেতন দেওয়া
হতো। এই হাসপাতালে একমাত্র তার বাবার ডোম পদে চাকরি ছিল। তার মৃত্যু হয় ১৯৮৬ সালে। এরপর থেকে ৩৮ বছর শূন্য পড়ে আছে পদটি। তপন বলেন, বর্তমানে আমি ছাড়াও ময়নাতদন্তের রুমে কাজ করছেন আরও ৮ থেকে ১০ জন। ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তারা সহযোগিতা করে
থাকেন। যেমন- হাসপাতাল থেকে কাঁধে করে মরদেহ মর্গ পর্যন্ত নিয়ে আসতে চারজনের প্রয়োজন। যদিও মাঝে মধ্যে ভ্যান ব্যবহার হয়ে থাকে।
তারপরেও ভ্যানে উঠানোর জন্যও চারজন লাগে। এছাড়া কাটা, সেলাই করা, মরদেহ উঠা-নামা করা, প্যাকেট করা ইত্যাদি কাজেও লোকবল লাগে। এসব
কাজের জন্য চার থেকে পাঁচজন করে দরকার হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মরদেহের নমুনা সংগ্রহ। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে মরদেহ থেকে বিভিন্ন নমুনা
সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো কেমিক্যালের বয়ামে রাখা হয়। ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় সংগ্রহ করা নমুনাগুলো। আগে
এগুলো ঢাকায় পাঠানো হত। তখন ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসতে অনেক দেরি হত। এতে করে বিচার কাজ শুরু হতেও সময় লাগত। বর্তমানে ময়নাতদন্তের  নমুনাগুলো রাজশাহী সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এতে করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এগুলো গুরুত্বসহকারে সংগ্রহ করতে লোকবল লাগে। এসব কাজ একা সম্ভব না। তপন ডোম আরও জানান, বর্তমান মর্গের পাশে একটি রুমে আগে
ময়নাতদন্ত হত। এছাড়াও সার্কিট হাউসের পাশে নদীর ধারে একটি রুমে ময়নাতদন্ত হত। তখন সিভিল সার্জনের অধীনে ছিলো ময়নাতদন্তের বিষয়টি।
তারপরে ময়নাতদন্তের রুমে নিয়ে আসা হলো সদর হাসপাতালে। পরবর্তীতে এটি মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পেসের ভেতরে স্থানান্তরিত হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এফএম শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘রামেক হাসপাতালে ডোমের পদ নেই। এখানে শুধু লাশ রাখা
হয়। লাশের ময়নাতদন্তের কাজ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ করেন।’ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের অধ্যক্ষ নওশাদ আলী বলেন,
‘আমাদের হাসপাতালে কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম নেই। চুক্তিতে নেওয়া একজন ডোম দিয়ে কাজ করাতে হয়। এখানে প্রতিদিন একাধিক লাশের
ময়নাতদন্ত হয়। ডোম না থাকার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘ডোম হতে হয় পেশাদার। পৈতৃক পেশা হিসাবে অনেকেই এ
কাজ করেন।’
জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আনারুল কবীর বলেন, রাজশাহী ‘বিভাগের প্রতিটি হাসপাতালে ডোম সংকট রয়েছে। বিষয়টি
নিয়ে আমরা কাজ করছি। ডোম নিয়োগের বিষয়টি একটি সরকারি প্রক্রিয়া। তাই সময় লাগছে। আশা করছি, দ্রুত ডোম সংকট কেটে যাবে।’

শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদে নোয়াখালীতে বিক্ষোভ মিছিল

৩৮ বছর ধরে ডোম ছাড়াই চলছে রামেকের মর্গ

আপডেট সময় : ০২:১০:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ অক্টোবর ২০২৩

নারী ডোম নিয়োগের দাবি
পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে চলছে ময়নাতদন্তের কাজ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতলে ৩৮ বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে ডোম পদটি। ঐতিহ্যবাহি প্রাচিন এ হাসপাতালটিতে নেই পেশাদার
ডোম। ফলে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই ময়নাতদন্তের সময় ডোমের কাজ করেন। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা বলেন, পেশাদার ডোম না থাকায়
তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারিভাবে হাসপাতালগুলোতে ডোম নিয়োগ আবশ্যক হলেও নানা জটিলতায় তা হয়নি। বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে
প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডোম নিয়োগের অনুরোধ করা হয়েছে। এদিকে, নিহত নারী হোক আর পুরুষ হাসপাতালগুলোতে ময়নাতদন্ত করেন পুরুষ ডোম।
নিহত নারীদের স্বজনেরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় নারীরা কাজ করছেন। এমনকি মৃত নারীদের মরদেহ উদ্ধারে কাজও করেন নারীরা। কিন্তু নারীদের ময়নাতদন্তের কাজ করছেন পুরুষেরা। নিহত নারীর ক্ষেত্রে নারী ডোম দিয়ে ময়নাতদন্ত করা দরকার। প্রতিটি হাসপাতালে নারীদের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগের দাবি জানান তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে রামেক হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম নিশিপদ দাসের মৃত্যুর পর আর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এরপর থেকে ফাঁকা পড়ে আছে পদটি। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম না থাকলেও থেমে নেই ময়নাতদন্তের কাজ। বর্তমানে ডোম নিশিপদ দাসের ছেলে শ্রী তপন দাস কাজ করেন ময়নাতদন্তের। যদিও শ্রী তপন দাস ডোম নন। তিনি রামেক হাসপাতালের ক্লিনার। ডোম না থাকায় তাকে দিয়ে ময়নাতদন্তের কাজগুলো করাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের লাশকাটা ঘরে (মর্গ) পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত প্রতিদিনের ঘটনা। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা,
কিংবা হত্যার পর রাজশাহী জেলার মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত হয় এই লাশকাটা ঘরেই। বর্তমানে তপনের সঙ্গে কাজ করেন বিপন, রনি, সনি, হৃদয়, রঞ্জন,
সুমন, মোহন, বাবর, সঞ্জয়। তারা ময়নাতদন্তের পরে সেলাই, মরদেহ দড়ি দিয়ে বাঁধা ও ভ্যানের ওপরে তোলা-নামার কাজগুলো করে থাকেন। তারাও কেউ
নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী নন।
তপন বলেন, ১৯৯২ সালে হাসপাতালে ক্লিনার পদে যোগ দেন তিনি। যোগদানের দুই বছরের মাথায় মারা যান তার বড় ভাই অবিনাশ দাস। তার ভাই
অবিনাশ বাবা নিশিপদের সঙ্গে ডোমের কাজ করতেন। দাদা ডিসি অফিসের অধীনে কাজ করতো। তাকেও বাবার মতো ২০ টাকা বেতন দেওয়া
হতো। এই হাসপাতালে একমাত্র তার বাবার ডোম পদে চাকরি ছিল। তার মৃত্যু হয় ১৯৮৬ সালে। এরপর থেকে ৩৮ বছর শূন্য পড়ে আছে পদটি। তপন বলেন, বর্তমানে আমি ছাড়াও ময়নাতদন্তের রুমে কাজ করছেন আরও ৮ থেকে ১০ জন। ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তারা সহযোগিতা করে
থাকেন। যেমন- হাসপাতাল থেকে কাঁধে করে মরদেহ মর্গ পর্যন্ত নিয়ে আসতে চারজনের প্রয়োজন। যদিও মাঝে মধ্যে ভ্যান ব্যবহার হয়ে থাকে।
তারপরেও ভ্যানে উঠানোর জন্যও চারজন লাগে। এছাড়া কাটা, সেলাই করা, মরদেহ উঠা-নামা করা, প্যাকেট করা ইত্যাদি কাজেও লোকবল লাগে। এসব
কাজের জন্য চার থেকে পাঁচজন করে দরকার হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মরদেহের নমুনা সংগ্রহ। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে মরদেহ থেকে বিভিন্ন নমুনা
সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো কেমিক্যালের বয়ামে রাখা হয়। ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় সংগ্রহ করা নমুনাগুলো। আগে
এগুলো ঢাকায় পাঠানো হত। তখন ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসতে অনেক দেরি হত। এতে করে বিচার কাজ শুরু হতেও সময় লাগত। বর্তমানে ময়নাতদন্তের  নমুনাগুলো রাজশাহী সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এতে করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এগুলো গুরুত্বসহকারে সংগ্রহ করতে লোকবল লাগে। এসব কাজ একা সম্ভব না। তপন ডোম আরও জানান, বর্তমান মর্গের পাশে একটি রুমে আগে
ময়নাতদন্ত হত। এছাড়াও সার্কিট হাউসের পাশে নদীর ধারে একটি রুমে ময়নাতদন্ত হত। তখন সিভিল সার্জনের অধীনে ছিলো ময়নাতদন্তের বিষয়টি।
তারপরে ময়নাতদন্তের রুমে নিয়ে আসা হলো সদর হাসপাতালে। পরবর্তীতে এটি মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পেসের ভেতরে স্থানান্তরিত হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এফএম শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘রামেক হাসপাতালে ডোমের পদ নেই। এখানে শুধু লাশ রাখা
হয়। লাশের ময়নাতদন্তের কাজ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ করেন।’ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের অধ্যক্ষ নওশাদ আলী বলেন,
‘আমাদের হাসপাতালে কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম নেই। চুক্তিতে নেওয়া একজন ডোম দিয়ে কাজ করাতে হয়। এখানে প্রতিদিন একাধিক লাশের
ময়নাতদন্ত হয়। ডোম না থাকার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘ডোম হতে হয় পেশাদার। পৈতৃক পেশা হিসাবে অনেকেই এ
কাজ করেন।’
জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আনারুল কবীর বলেন, রাজশাহী ‘বিভাগের প্রতিটি হাসপাতালে ডোম সংকট রয়েছে। বিষয়টি
নিয়ে আমরা কাজ করছি। ডোম নিয়োগের বিষয়টি একটি সরকারি প্রক্রিয়া। তাই সময় লাগছে। আশা করছি, দ্রুত ডোম সংকট কেটে যাবে।’