পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা সমাধান ছাড়া শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের পর শান্তিচুক্তি হলেও আজও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। ভূমি কমিশন কার্যকর না থাকায় পাহাড়ি জনগণের জমি ফেরত না দিয়ে, উল্টো তাদের জমি দখল, উচ্ছেদ ও বৈষম্য এখনো অব্যাহত রয়েছে।
আজ সোমবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘ভূমি কমিশনকে সক্রিয়করণ ও পার্বত্য চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। সভার আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন কমিটি। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের দিপায়ন খীসা।
সভায় অংশ নেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতা, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ছাত্র–যুব প্রতিনিধিরা। মতবিনিময় সভার শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হক বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সব আদিবাসী, ভূমিহীন ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধান এবং তাদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি। শান্তিচুক্তি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষ ভেবেছিল দেশে নতুন পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং সীমান্ত সড়ক নির্মাণের নামে কৃষিজমি দখল ও পাহাড়িদের উচ্ছেদ অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি বলেন, “যত দিন পর্যন্ত পাহাড়ি জনগণের মৌলিক অধিকার, ভূমি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা না আসবে, তত দিন শান্তি আসবে না। সরকারকে অবশ্যই ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি প্রতিটি ধারা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।”
বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, “২৭ বছর হয়ে গেলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। ভূমি কমিশন কার্যক্রম শুরু করতে গেলেই সেটলার বাঙালিদের বাধার মুখে পড়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে সরকার আদিবাসী সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেয়, অন্যদিকে মৌলবাদী গোষ্ঠীর চাপে পিছিয়ে আসে। এই দ্বিচারিতা চলতে থাকলে কখনো সমাধান আসবে না।”
তিনি আরও বলেন, “ভূমি সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি পাহাড়ে সামরিক প্রভাব ও প্রশাসনিক বৈষম্যও শেষ করতে হবে। না হলে পাহাড়ের মানুষ কখনোই প্রকৃত অর্থে নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারবে না।”
বিপ্লবি ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “ভূমি কমিশন গঠন ও শান্তিচুক্তি সত্ত্বেও আজও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। উল্টো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর ভূমি দখল, নারী নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বেড়েছে। গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র এখানে সাময়িক শাসন বজায় রেখেছে।”
তিনি বলেন, “ভূমি সমস্যা সমাধান ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি কল্পনাও করা যাবে না। পাহাড়ের মানুষের ঐতিহাসিক অধিকারকে অস্বীকার করলে কেবল সংঘাতই দীর্ঘস্থায়ী হবে।”
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার অন্যতম হচ্ছে ভুমি সমস্যা। আমাদের দেশে অনেক আইন হয় বিধিমালা হয় কিন্ত সেগুলো কখনো বাস্তবায়ন হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভুমি সমস্যা সমাধান ব্যতীত সেখানকার অধিবাসীদের সমস্যাকে সমাধান করা যাবে না। পার্বত্য চুক্তি নিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার আগে আগ্রহ দেখালেও ক্ষমতা যাওয়ার পরে সে আগ্রহ আর থাকে না। আমি দেখতে পাই, একটি স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী গোষ্ঠীর কারণে পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী শব্দ সংবলিত গ্রাফিতি বাদ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, “বাংলাদেশে আইন হয়, বিধিমালা হয়, কিন্তু কার্যকর হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ভূমি কমিশন হয়েছে, শান্তিচুক্তি হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। সারা দেশে যেখানে গণতান্ত্রিক নিয়মে প্রশাসন চলে, সেখানে পাহাড়ে এখনও সাময়িক শাসন অব্যাহত রয়েছে। এই বৈষম্যমূলক নীতি বন্ধ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্রকে দ্বিচারিতা পরিহার করে ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভূমি সমস্যা রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব।”
পরিশেষে যুগ্ন সমন্বয়কারী খাইরুল ইসলাম পার্বত্য চ্টগ্রামের ভ’মি সমস্যা নিরসন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সমর্থন ও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে আলোচনা সভা সমাপ্ত করেন।
এমআর/সবা






















