০৯:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিলেটে সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ যেন ‘সোনার হরিণ’

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ৪৪ বছর বয়সী আব্দুর রহমানের স্ত্রী ও দুই মেয়ে। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত আব্দুর রহমানের জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সরকারি হাসপাতালে কোথাও একটি বেডও খালি ছিল না। আর্থিকভাবেও অসচ্ছল পরিবারটি বেসরকারি হাসপাতালে নিতে পারেনি। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।

এমন ঘটনা সিলেটে নতুন নয়। প্রতিদিনই সরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ না পেয়ে অনেক রোগী মৃত্যুর মুখে পড়ছেন। কারণ, পুরো সিলেট বিভাগজুড়েই সরকারি আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ভয়াবহ রকম কম। গুরুতর রোগীদের জন্য এসব শয্যা যেন এখন ‘সোনার হরিণ’।

সিলেট বিভাগীয় শহর ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে আসা গুরুতর রোগীদের ভরসার স্থান মূলত এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু এখানে মাত্র ৩০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে, যা প্রায় সবসময় পূর্ণ থাকে। ফলে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়াতে হয় রোগীর স্বজনদের। অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় ঝরে যায় প্রাণ।

 

হবিগঞ্জের বাহুবল থেকে আসা এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “ডাক্তার বলেছেন, রোগীকে বাঁচাতে আইসিইউ দরকার। কিন্তু এখানে জায়গা নেই। বেসরকারি হাসপাতালে গেলে দিনে লাখ টাকার বেশি খরচ—আমরা কীভাবে চালাব?”

গোয়াইপাড়ার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম শিউলি বলেন, “শুধু আইসিইউ বেড না পাওয়ার কারণে গত এক মাসে আমাদের দুই আপনজনকে হারিয়েছি। চিকিৎসা এখন গরিব মানুষের জন্য বিলাসিতা হয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যখন বেড মেলে না, তখন বুক ভেঙে যায়। অথচ টাকার অভাবে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগও আমাদের নেই।”

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সিলেট বিভাগে সরকারি আইসিইউ শয্যার সংখ্যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে মাত্র ৫-৬টি। অনেক জেলা হাসপাতালে গড়ে ১০–২০টির বেশি শয্যা নেই। যা অত্যন্ত অপ্রতুল। সময়মতো আইসিইউ না পাওয়ায় শত শত মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে।

ওসমানী হাসপাতালের আইসিইউ কনসালটেন্ট ডা. জাহিদ হোসাইন বলেন, “এই হাসপাতালে মাত্র ৩০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬০০–২ হাজার ৭০০ রোগী ভর্তি থাকেন। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে কমপক্ষে ১০০টি ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড (আইসিইউ, এইচডিইউ, সিসিইউ) থাকা উচিত। আমরা সেই সংখ্যার কাছাকাছিও নেই। শুধু আইসিইউ নয়, জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতিরও ঘাটতি আছে।”

শামসুদ্দিন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মিজানুর রহমান জানান, “আমাদের এখানে ১৬টি আইসিইউ বেড রয়েছে, এর মধ্যে দুটি ডায়ালাইসিস সুবিধাসহ। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে সব বেড সবসময় চালু রাখা সম্ভব হয় না। পূর্ণাঙ্গ টিম ও যন্ত্রপাতি ছাড়া কার্যকর সেবা দেওয়া কঠিন।”

সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন, “সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সংকট বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন শত শত রোগী সেবা নিতে আসে, কিন্তু জায়গার সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সবাইকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে ধাপে ধাপে শয্যা বৃদ্ধি, যন্ত্রপাতি সংযোজন ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নত করার চেষ্টা চলছে।”

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বলেন, “করোনাকালে শামসুদ্দিন হাসপাতালসহ কয়েকটি উপজেলায় আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছিল, যা সাময়িকভাবে সহায়তা করেছে। বাজেট অনুমোদন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হলে আইসিইউ শয্যা বাড়বে, আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত হবে এবং সেবা আরও বিস্তৃত হবে। আমরা আশাবাদী, এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে সিলেটের রোগীরা আর এভাবে অবহেলিত হবেন না।”

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, “ওসমানী হাসপাতাল মূলত ৫০০ শয্যার, সেটিকে ৯০০-তে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ২,৫০০–৩,০০০ রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে ভীড় ও সংকট স্বাভাবিক। আমরা জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। ক্যান্সার হাসপাতালের কয়েকটি ফ্লোরে কার্ডিওলজি ও শিশু ইউনিট সরিয়ে আইসিইউ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছে। শামসুদ্দিন হাসপাতালের পাশে নতুন ভবন চালুরও প্রস্তুতি চলছে।”

সিলেটের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সেবা বর্তমানে শুধু একটি প্রয়োজন নয়, বরং একটি প্রাপ্য অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো—এই সেবা এখনো অধিকাংশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সরকারি পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা থাকলেও, বাস্তবায়নের গতি যদি দ্রুত না হয়, তাহলে প্রতিদিনই জীবন হেরে যাবে অপেক্ষার কাছে।

এমআর/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

সিলেটে সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ যেন ‘সোনার হরিণ’

আপডেট সময় : ১১:৫৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ অক্টোবর ২০২৫

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ৪৪ বছর বয়সী আব্দুর রহমানের স্ত্রী ও দুই মেয়ে। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত আব্দুর রহমানের জীবন বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সরকারি হাসপাতালে কোথাও একটি বেডও খালি ছিল না। আর্থিকভাবেও অসচ্ছল পরিবারটি বেসরকারি হাসপাতালে নিতে পারেনি। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।

এমন ঘটনা সিলেটে নতুন নয়। প্রতিদিনই সরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ না পেয়ে অনেক রোগী মৃত্যুর মুখে পড়ছেন। কারণ, পুরো সিলেট বিভাগজুড়েই সরকারি আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ভয়াবহ রকম কম। গুরুতর রোগীদের জন্য এসব শয্যা যেন এখন ‘সোনার হরিণ’।

সিলেট বিভাগীয় শহর ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে আসা গুরুতর রোগীদের ভরসার স্থান মূলত এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু এখানে মাত্র ৩০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে, যা প্রায় সবসময় পূর্ণ থাকে। ফলে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়াতে হয় রোগীর স্বজনদের। অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় ঝরে যায় প্রাণ।

 

হবিগঞ্জের বাহুবল থেকে আসা এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “ডাক্তার বলেছেন, রোগীকে বাঁচাতে আইসিইউ দরকার। কিন্তু এখানে জায়গা নেই। বেসরকারি হাসপাতালে গেলে দিনে লাখ টাকার বেশি খরচ—আমরা কীভাবে চালাব?”

গোয়াইপাড়ার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম শিউলি বলেন, “শুধু আইসিইউ বেড না পাওয়ার কারণে গত এক মাসে আমাদের দুই আপনজনকে হারিয়েছি। চিকিৎসা এখন গরিব মানুষের জন্য বিলাসিতা হয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যখন বেড মেলে না, তখন বুক ভেঙে যায়। অথচ টাকার অভাবে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগও আমাদের নেই।”

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সিলেট বিভাগে সরকারি আইসিইউ শয্যার সংখ্যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে মাত্র ৫-৬টি। অনেক জেলা হাসপাতালে গড়ে ১০–২০টির বেশি শয্যা নেই। যা অত্যন্ত অপ্রতুল। সময়মতো আইসিইউ না পাওয়ায় শত শত মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে।

ওসমানী হাসপাতালের আইসিইউ কনসালটেন্ট ডা. জাহিদ হোসাইন বলেন, “এই হাসপাতালে মাত্র ৩০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। অথচ প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬০০–২ হাজার ৭০০ রোগী ভর্তি থাকেন। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে কমপক্ষে ১০০টি ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড (আইসিইউ, এইচডিইউ, সিসিইউ) থাকা উচিত। আমরা সেই সংখ্যার কাছাকাছিও নেই। শুধু আইসিইউ নয়, জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতিরও ঘাটতি আছে।”

শামসুদ্দিন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মিজানুর রহমান জানান, “আমাদের এখানে ১৬টি আইসিইউ বেড রয়েছে, এর মধ্যে দুটি ডায়ালাইসিস সুবিধাসহ। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে সব বেড সবসময় চালু রাখা সম্ভব হয় না। পূর্ণাঙ্গ টিম ও যন্ত্রপাতি ছাড়া কার্যকর সেবা দেওয়া কঠিন।”

সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন, “সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সংকট বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন শত শত রোগী সেবা নিতে আসে, কিন্তু জায়গার সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সবাইকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে ধাপে ধাপে শয্যা বৃদ্ধি, যন্ত্রপাতি সংযোজন ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নত করার চেষ্টা চলছে।”

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বলেন, “করোনাকালে শামসুদ্দিন হাসপাতালসহ কয়েকটি উপজেলায় আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছিল, যা সাময়িকভাবে সহায়তা করেছে। বাজেট অনুমোদন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হলে আইসিইউ শয্যা বাড়বে, আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত হবে এবং সেবা আরও বিস্তৃত হবে। আমরা আশাবাদী, এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে সিলেটের রোগীরা আর এভাবে অবহেলিত হবেন না।”

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, “ওসমানী হাসপাতাল মূলত ৫০০ শয্যার, সেটিকে ৯০০-তে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ২,৫০০–৩,০০০ রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে ভীড় ও সংকট স্বাভাবিক। আমরা জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। ক্যান্সার হাসপাতালের কয়েকটি ফ্লোরে কার্ডিওলজি ও শিশু ইউনিট সরিয়ে আইসিইউ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছে। শামসুদ্দিন হাসপাতালের পাশে নতুন ভবন চালুরও প্রস্তুতি চলছে।”

সিলেটের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সেবা বর্তমানে শুধু একটি প্রয়োজন নয়, বরং একটি প্রাপ্য অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো—এই সেবা এখনো অধিকাংশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সরকারি পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা থাকলেও, বাস্তবায়নের গতি যদি দ্রুত না হয়, তাহলে প্রতিদিনই জীবন হেরে যাবে অপেক্ষার কাছে।

এমআর/সবা