আজ ৯ ডিসেম্বর, মুসলিম নারী জাগরণের পথিকৃৎ মহীয়সী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ও মৃত্যুদিন। ১৮৮০ সালের এই দিনে তিনি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তা ও সংগ্রামে অন্ধকারাচ্ছন্ন নারীনির্যাতন ও কুসংস্কারের গহ্বর থেকে মুক্তি পেয়েছিল পায়রাবন্দের নারীরা। আজ সেখানে মেয়েরা দলবেঁধে স্কুল–কলেজে যায়, কমেছে বাল্যবিয়ে—নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে চলেছে।
তবে রোকেয়ার জন্মভিটে এখনও অনেকাংশে অবহেলার ছাপ রয়ে গেছে। এ বছর রংপুরবাসীর প্রধান দাবি—ভারতের কলকাতার সোদপুরে সমাহিত বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ পায়রাবন্দে ফিরিয়ে আনা। বহু বছর ধরে চলা এই দাবি এবার আরও স্বরূপে জোরাল হচ্ছে।
২০০১ সালের জুলাই মাসে ১৫ একর ১৫ শতক জমিতে উদ্বোধন হয় ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র’-এর। ২০০৪ সালে অল্প সময়ের জন্য সেখানে সংগীত প্রশিক্ষণ শুরু হলেও পরবর্তীতে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রটিতে রয়েছে রেস্টহাউস, অডিটোরিয়াম, সেমিনার কক্ষ, লাইব্রেরি, গবেষণাগার, সংগ্রহশালা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নামাজঘর ও স্টাফ কোয়ার্টার। সামনে স্থাপিত আছে পিতলের তৈরি রোকেয়ার ভাস্কর্য। ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও দীর্ঘদিন সেখানে কোনো কার্যক্রম ছিল না।
স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ থাকা ও জমি ব্যবহারের অপব্যবহারের অভিযোগে স্থানীয়রা আন্দোলনে নামলে ২০১২ সালে উচ্চ আদালতের আদেশে বিকেএমইকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এবার নতুন করে কেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপপরিচালক আবিদ করিম মুন্না জানান, শুরুতে ৮০ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গবেষণা, সাহিত্য প্রচার, অনুবাদ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্মৃতিকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. পারভেজ বলেন, “বেগম রোকেয়ার জন্মভূমিকে আলোকিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তাঁর অসামান্য অবদান দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।”
রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া রোকেয়া কড়াকড়ির মাঝেই ভাইয়ের সহায়তায় গোপনে লেখাপড়া করেন। ১৮৯৮ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনকে বিয়ে করেন। দুই সন্তান শৈশবেই মারা যাওয়ার পর ১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ভাগলপুরে শিক্ষকতা করেন; পরে বিরোধিতার মুখে কলকাতায় গিয়ে ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সুলতানা’স ড্রিম ইতোমধ্যেই ইউনেসকোর ‘বিশ্বস্মৃতি’ তালিকায় স্থান পেয়েছে।
১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর সোদপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বেগম রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁকে জন্মভিটেতে ফিরিয়ে আনার দাবি আজও অম্লান।

























