পৌষের হাড়কাঁপানো শীত। চারদিকে কুয়াশার ঘনঘটা। যখন সামর্থ্যবান মানুষ লেপ-কম্বলের ওমে আচ্ছন্ন, তখন একদল তরুণ ছুটছে মেঠোপথ ধরে। উদ্দেশ্য—শীতের প্রকোপে জুবুথুবু হয়ে পড়া অসহায় মানুষগুলোর গায়ে এক চিলতে উষ্ণতা জড়িয়ে দেওয়া। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘চলো পাল্টাই ফাউন্ডেশন’-এর একঝাঁক শিক্ষার্থী এবার এমনই এক মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘উষ্ণতার আবরণ’।
কুয়াশার চাদর সরিয়ে এক পশলা আলো দীর্ঘদিনের সুনিপুণ পরিকল্পনা আর একনিষ্ঠ পরিশ্রমের পর সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের ৪টি গ্রামে এই কার্যক্রমের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়। তবে এই কম্বল বিতরণ কেবল দায়সারা কোনো আয়োজন ছিল না। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা দিনের পর দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালিয়েছেন। বিশেষ করে নারী সদস্যরা প্রতিটি ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখেছেন কার শীতবরণ করার মতো বস্ত্র নেই। সেই যাচাই-বাছাই শেষে ১০০টি প্রকৃত প্রাপ্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ভালোবাসার এই স্মারক।

বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি গ্রামের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব রহিমা বানু (ছদ্মনাম)। হাড়কাঁপানো শীতে একটি জীর্ণ পাতলা কাঁথাই ছিল তার একমাত্র সম্বল। নতুন কম্বলটি হাতে পেয়ে ঝাপসা চোখে তিনি বলেন, “বাবা, এই জাড়ের (শীতের) মইধ্যে একখান গরম কাপড়ের লাই কত মানুষের দুয়ারে গেছি। আইজ এই পোলাপাইনগুলা নিজে ঘরে আইসা কম্বল দিয়া গেল। আল্লায় তাগো ভালা করুক। এই রাইতে এহন একটু শান্তিতে ঘুমাইতে পারমু।”
‘উষ্ণতার আবরণ’-এর এই যাত্রা কেবল শুরু। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্বিতীয় ধাপে তারা ছুটে যাবেন নদীভাঙন ও দুর্গম চরাঞ্চলে। যেখানে শীতের কামড় আরও ভয়াবহ। কিন্তু সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও মানবিক মিশনটি অপেক্ষা করছে তৃতীয় ধাপে। প্রতি বছর নোয়াখালীর একটি লোকাল ট্রেনে চড়ে নোয়াখালী থেকে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে এই তরুণরা। ট্রেন যখন স্টেশনে ২ মিনিটের বিরতি দেয়, তখন তারা প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষের গায়ে নিঃশব্দে জড়িয়ে দেন উষ্ণ কম্বল।
নিজেদের পড়াশোনার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, ২০২৪ সালের প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় ত্রাণ বিতরণ কিংবা শীতবস্ত্র বিতরণ—সবখানেই নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে নোবিপ্রবির এই শিক্ষার্থীরা।
সংগঠনটির উপদেষ্টা ও ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুবাইয়ান আসিফ তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ” ‘চলো পাল্টাই’ শব্দগুলোই এই সংগঠনটিকে বর্ণনা করার জন্য যথেষ্ট। মানবিক সমাজ গঠনে এই মেধাবী মুখগুলো নিজেদের মূল্যবান সময় ব্যয় করছে। একজন উপদেষ্টা হিসেবে আমি গর্ববোধ করি যে, মানবসেবার এই মহৎ যাত্রায় আমিও ক্ষুদ্র অংশ হতে পেরেছি। অসহায় মানুষের শেষ ভরসা হোক এই সংগঠন। এটাই আমার কামনা।”
“চলো পাল্টাই ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূর নবি বলেন, আমরা চাই না কোনো মানুষই শীতের প্রকোপে অসহায় হয়ে পড়ুক। ‘উষ্ণতার আবরণ’ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা সেই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি যাদের কথা কেউ ভাবে না। চরের মানুষ কিংবা রেলস্টেশনের ছিন্নমূল মানুষ—সবার কাছেই আমরা পৌঁছে দিতে চাই ভালোবাসার ওম। আমাদের এই স্বপ্নযাত্রায় যারা পাশে ছিলেন, তাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বদলে যাক সমাজ, হাসুক মানবতা।”
জানুয়ারির নিষ্ঠুর শীত আরও বাড়ছে। কনকনে হাওয়ায় কাঁপছে দরিদ্রের কুঁড়েঘর। কিন্তু নোবিপ্রবির এই একনিষ্ঠ সেবকদের বিশ্বাস—যদি সামান্য কিছু মানুষের পিঠও ‘উষ্ণতার আবরণে’ ঢেকে দেওয়া যায়, তবেই সমাজের চালচিত্র কিছুটা হলেও পাল্টাবে। শত শত পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়ে চলো পাল্টাই ফাউন্ডেশন প্রমাণ করে দিল, তারুণ্য যখন জাগে, তখন কুয়াশা সরিয়ে মানবতার আলো ঠিকই বিচ্ছুরিত হয়।
শু/সবা


























