6:38 pm, Sunday, 21 June 2026

একই চেয়ারে ৭ বছর! কালীগঞ্জ ইউএনও অফিসে  যুথিকা বিশ্বাসের ‘একচ্ছত্র সাম্রাজ্য’

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার যুথিকা বিশ্বাস।

সরকারি চাকরিতে তিন বছর পর পর বদলির স্পষ্ট নীতিমালা থাকলেও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয়ে যেন কোনো নিয়মই খাটছে না। কোনো এক ‘অদৃশ্য খুঁটির’ জোরে বিগত ৭ বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে আছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) যুথিকা বিশ্বাস। দীর্ঘ সময় একই চেয়ার আঁকড়ে থাকার সুবাদে তিনি অফিসটিতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব একচ্ছত্র সিন্ডিকেট। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ফাইল আটকে কোটি টাকার ফাইল বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যুথিকা বিশ্বাস ১৯৯৯ সালে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১৫ সালে কালীগঞ্জে পোস্টিং পাওয়ার পর ২০১৭ সালে নিয়ম অনুযায়ী তাকে পার্শ্ববর্তী কোটচাঁদপুর উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য তদবিরের জোরে মাত্র ছয় মাস পরেই আবার রাজকীয়ভাবে কালীগঞ্জে ফিরে আসেন তিনি। এরপর পদোন্নতি পেয়ে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এখানেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেই থেকে আজ অবধি তাকে আর কেউ নাড়াতে পারেনি।
অভিযোগ রয়েছে, দাফতরিক ফাইলের চাবিকাঠি নিজের হাতে রেখে যুথিকা বিশ্বাস ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেছেন। সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি তার নিজের গ্রাম মহাদেবপুরের তিনজনকে উপজেলার বিভিন্ন দফতরে মাস্টাররোলে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন।
কোনো প্রকার সরকারি নিয়োগপত্র ছাড়াই অমিত বিশ্বাস নামের এক বহিরাগত যুবককে ইউএনও অফিসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও কম্পিউটারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া যুথিকা বিশ্বাসের প্রভাবে একই গ্রামের সুবোদ বিশ্বাসকে ইউএনওর গাড়িচালক এবং অলিভ বিশ্বাসকে উপজেলা মৎস্য অফিসে মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এই কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ৫ বছরে তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। অথচ এই সময়ে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার প্রকৃত বেতন ও ভাতা বাবদ প্রাপ্তি ছিল মাত্র ২৩ লাখ টাকা। সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ—বিবিধ ফাইল আটকে রাখা, সরকারি অনুদান বরাদ্দ থেকে কমিশন কাটা এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এই বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ অর্জিত হয়েছে।
অভিযোগের পাহাড় সামনে থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক কর্মকর্তা যুথিকা বিশ্বাস নির্বিকার। সমস্ত দায় অস্বীকার করে তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের (মাস্টাররোল) নিয়োগ দিয়েছেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আর বদলির বিষয়টি সম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রথীন্দ্রনাথ রায় জানান, “এই পদগুলোর বদলি ও পদায়নের বিষয়টি খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে। তবে দীর্ঘ সময় একই স্থানে থাকা এবং সুনির্দিষ্ট অনিয়মের এই বিষয়টি তদন্তের জন্য আমরা যথাস্থানে লিখিতভাবে জানাবো।”
কালীগঞ্জের স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং সরকারি অফিসের এই ‘ওপেন সিক্রেট’ দুর্নীতি থামাতে অবিলম্বে যুথিকা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শু/সবা
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

5 − 3 =

About Author Information

একই চেয়ারে ৭ বছর! কালীগঞ্জ ইউএনও অফিসে  যুথিকা বিশ্বাসের ‘একচ্ছত্র সাম্রাজ্য’

একই চেয়ারে ৭ বছর! কালীগঞ্জ ইউএনও অফিসে  যুথিকা বিশ্বাসের ‘একচ্ছত্র সাম্রাজ্য’

Update Time : ০৬:২৩:৫৪ pm, Sunday, ২১ জুন ২০২৬
সরকারি চাকরিতে তিন বছর পর পর বদলির স্পষ্ট নীতিমালা থাকলেও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয়ে যেন কোনো নিয়মই খাটছে না। কোনো এক ‘অদৃশ্য খুঁটির’ জোরে বিগত ৭ বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে আছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) যুথিকা বিশ্বাস। দীর্ঘ সময় একই চেয়ার আঁকড়ে থাকার সুবাদে তিনি অফিসটিতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব একচ্ছত্র সিন্ডিকেট। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ফাইল আটকে কোটি টাকার ফাইল বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যুথিকা বিশ্বাস ১৯৯৯ সালে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১৫ সালে কালীগঞ্জে পোস্টিং পাওয়ার পর ২০১৭ সালে নিয়ম অনুযায়ী তাকে পার্শ্ববর্তী কোটচাঁদপুর উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য তদবিরের জোরে মাত্র ছয় মাস পরেই আবার রাজকীয়ভাবে কালীগঞ্জে ফিরে আসেন তিনি। এরপর পদোন্নতি পেয়ে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এখানেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেই থেকে আজ অবধি তাকে আর কেউ নাড়াতে পারেনি।
অভিযোগ রয়েছে, দাফতরিক ফাইলের চাবিকাঠি নিজের হাতে রেখে যুথিকা বিশ্বাস ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেছেন। সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি তার নিজের গ্রাম মহাদেবপুরের তিনজনকে উপজেলার বিভিন্ন দফতরে মাস্টাররোলে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন।
কোনো প্রকার সরকারি নিয়োগপত্র ছাড়াই অমিত বিশ্বাস নামের এক বহিরাগত যুবককে ইউএনও অফিসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও কম্পিউটারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া যুথিকা বিশ্বাসের প্রভাবে একই গ্রামের সুবোদ বিশ্বাসকে ইউএনওর গাড়িচালক এবং অলিভ বিশ্বাসকে উপজেলা মৎস্য অফিসে মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এই কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ৫ বছরে তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। অথচ এই সময়ে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার প্রকৃত বেতন ও ভাতা বাবদ প্রাপ্তি ছিল মাত্র ২৩ লাখ টাকা। সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ—বিবিধ ফাইল আটকে রাখা, সরকারি অনুদান বরাদ্দ থেকে কমিশন কাটা এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এই বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ অর্জিত হয়েছে।
অভিযোগের পাহাড় সামনে থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক কর্মকর্তা যুথিকা বিশ্বাস নির্বিকার। সমস্ত দায় অস্বীকার করে তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের (মাস্টাররোল) নিয়োগ দিয়েছেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আর বদলির বিষয়টি সম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রথীন্দ্রনাথ রায় জানান, “এই পদগুলোর বদলি ও পদায়নের বিষয়টি খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে। তবে দীর্ঘ সময় একই স্থানে থাকা এবং সুনির্দিষ্ট অনিয়মের এই বিষয়টি তদন্তের জন্য আমরা যথাস্থানে লিখিতভাবে জানাবো।”
কালীগঞ্জের স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং সরকারি অফিসের এই ‘ওপেন সিক্রেট’ দুর্নীতি থামাতে অবিলম্বে যুথিকা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শু/সবা