১১:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বজ্রপাতে মৃত্যু : তালগাছ বনাম বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন প্রকল্প সমাচার

আমাদের দেশে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বজ্রপাতও একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিছুদিন আগেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বজ্রপাত খুব একটা আলোচনার মধ্যে ছিল না। কিন্তু বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকায় হাল সময়ে তা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কাজ করে এমন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, আমাদের দেশে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ৩১৬২ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭৯ জন, যা ক্রমাগতভাবে বাড়তে বাড়তে ২০২১ সালে এসে এক বছরে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬২ জনে। ২০২২-২০২৩ সালের চিত্রও একই। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে তালগাছের উচ্চতা এবং এর কাণ্ডের বহিঃস্তরে পুরু কার্বনের আস্তরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বজ্রপাত নিরোধকল্পে সারা দেশে ৪০ লাখ তালগাছের চারা লাগানোর উদ্যোগ নেয়। অতঃপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষণা মতে, সারা দেশে ৩৮ লাখ তালের চারা রোপণ করা হয়েছে মর্মে জানা যায়। নিঃসন্দেহে এটি ছিল খুবই আশাব্যঞ্জক খবর।
কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষণায় চারা রোপণের তথ্য থাকলেও বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল কি না তা জানা যায়নি।
এরই মধ্যে চার বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আমরা আমজনতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উদ্যোগে সরকারি খরচে তালের চারা রোপণের এই প্রকল্পটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বাস্তবে কী পরিমাণ চারা রোপণ করা হয়েছিল, আর তা থেকে কী পরিমাণ বেঁচে আছে এবং এ প্রকল্পের পিছে সরকারি খাজাঞ্চিখানা থেকে কী পরিমাণ কড়ি ঢালা হয়েছে তার প্রকৃত খবর আমরা জানি না। তবে সন্দিগ্ধ মহলের খোঁজখবরে যা বেরিয়ে এসেছে, তা সেই একই পুরোনো কাহিনি, Ñকাজীর গরু কেবল কিতাবেই আছে, গোয়ালে নেই বা ছিল না কখনো। চারা রোপণের দুই বছর যেতে না যেতেই চারা কোথাও মরে গেছে, কোথাও চারা না লাগিয়েই টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ এ কাজে নাকি খরচ হয়ে গেছে ১০০ কোটি টাকা। ১০০ কোটি! অবশ্য আমাদের মতো আমজনতার কাছে ১০০ কোটি টাকা স্বপ্নে দেখারও অতীত বলে মনে হলেও অনেকের কাছেই আজকাল তা ডালভাতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্দিগ্ধ মহলের এহেন ধারণা যে একেবারে অমূলক নয় তা বোঝা যায় এ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের সাম্প্রতিক সন্দেহজনক কথাবার্তা থেকেই।
গেল মাসেই বিভিন্ন মাধ্যমে খবর হয় যে, বজ্রনিরোধক হিসেবে ‘তালগাছ প্রকল্প’ ফেল মারায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এখন বজ্রপাত নিরোধে ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড প্রকল্প’ নিয়ে মাঠে নেমেছে। এরই মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা গেছে, ‘তালগাছ বজ্রপাত ঠেকাতে সফল’, এটি নাকি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। মেনে নিলাম তিনি নেক কথা বলেছেন, কিন্তু ‘তালগাছ বজ্রপাত ঠেকাতে সফল নয়’, এমন কোনো প্রমাণিত তথ্য উনার কাছে আছে কি না তা তিনি বলেননি। এরও আগে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, একটি তালগাছ বড় হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ বছর। এত বছর অপেক্ষা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তাই এখন উনারা বজ্রপাত নিরোধে যৌক্তিক এক প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন। এ প্রকল্পের আওতায় এখন উনারা দেশের বজ্রপাত প্রবণ ১৫টি জেলায় ৬৭৯৩টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসাবেন এবং ৩৩৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করবেন। এ কাজে উনারা খরচ করবেন মাত্র ১৩২১ কোটি টাকা। অথচ এর আগে তালগাছের চারা রোপণ প্রকল্পে ব্যয়িত ১০০ কোটি টাকা কোথায়, কিভাবে ব্যয় হলো, ব্যয়কৃত টাকায় রোপণকৃত তালের চারাগুলোর কী পরিমাণ টিকে আছে অথবা আদৌ টিকে আছে কি না, কার বা কাদের ভুলে প্রকল্পটি ভেস্তে গেল তার কোনো হিসাব-নিকাশ আছে কি না বা ব্যর্থতায় কাউকে জবাবদিহি করতে হয়েছে কি না তার কোনো খবর আমরা জানি না।
শোনা যায় একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নকল্পে এরই মধ্যে সরকারের আরো কয়েকটি সংস্থা কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে আছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২৩১ কোটি টাকার বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন প্রকল্প এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি বহুমুখী প্রকল্পের একাংশে অনুরূপ দণ্ড স্থাপন প্রকল্প।
একই কাজে সরকারের একাধিক সংস্থা ভিন্ন ভিন্নভাবে অর্থ ব্যয় কেন করছে, সেটি এক বড় প্রশ্ন বটে।
সে যাই হোক, বজ্রপাত ঠেকাতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি মাঠে-ঘাটে কর্মজীবী মানুষের মৃত্যু ঠেকানো যায়, তাহলে সে প্রকল্পের পেছনে শত শত কোটি টাকা খরচেও আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু শত শত কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণকে জায়েজ করতে গিয়ে যখন আমজনতা ও পশু-পাখির পরম বন্ধু এবং পরিবেশবান্ধব তালগাছকে ভিলেন বানানো হয়, তখন একটু-আধটু আপত্তি আছে বৈকি!
বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু জানি, তা হলো আকাশে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে কয়েকটি কারণে আমরা বিদ্যুৎ চমকানো দেখতে পাই এবং তা থেকে বজ্র নিনাদ হয়। এই নিনাদের সময় একটি কারণ থেকে হয় বজ্রপাত। খুব সরলভাবে যদি বলি বজ্রপাতের কারণ হলো আকাশে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক চার্জ থেকে ‘ক্লাউড টু গ্রাউন্ড’ ডিসচার্জিং অবস্থা। এরূপ ‘ক্লাউড টু গ্রাউন্ড’ ডিসচার্জিং অবস্থা তৈরির কারণে আকাশ থেকে ভূ-পৃষ্ঠ বরাবর বৈদ্যুতিক স্পার্কিংয়ের প্রবাহকেই বজ্রপাত বলে। এই বৈদ্যুতিক চার্জের প্রবাহ প্রাকৃতিক কন্ডাক্টর হিসেবে আমাদের আশপাশের বড় বড় গাছের মাধ্যমে তা ভূ-পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে চলে যায়, যার ফলে ঘরে অবস্থান করলে আমরা বজ্রপাতের বিপদ থেকে রক্ষা পাই। এই সময়ে যে গাছ যত উঁচু, সে গাছই তত উৎকৃষ্ট পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। আমাদের দেশের তালগাছগুলোর গড় উচ্চতা ১০০ ফুটের কাছাকাছি এবং তালগাছ আমাদের দেশের উঁচু বৃক্ষগুলোর মধ্যে অন্যতম। তালগাছের বাকলে থাকে পুরু কার্বনের স্তর। ফলে উঁচু হওয়ায় এবং বহিঃত্বক পুরু কার্বনের আস্তরে আবৃত থাকায় সর্বোপরি দেশের সর্বত্র জন্মায় বিধায় বজ্রনিরোধক হিসেবে তালগাছই সবচেয়ে নিরাপদ প্রাকৃতিক নিরোধক। এতকাল আমরা এটাই জেনে এসেছি। সে কারণেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে বিশাল যজ্ঞ করে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। অথচ ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার পর উক্ত সংস্থাটির সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, তালগাছ বজ্রপাত ঠেকাতে সফল, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যদি তারা তা-ই জানেন, তাহলে কোন যুক্তিতে উনারা ১০০ কোটি টাকা খরচ করার এহেন ছেলেখেলার প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন? এর জবাব তো তাদেরই দিতে হবে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, এখানে কাউকেই জবাবদিহি করতে হয় না। যার ফলে ১০০ কোটি টাকা অহেতুক খরচ করার পর তারা একই কাজে অনায়াসে ১৩২১ কোটি টাকার অন্য প্রকল্প গ্রহণ করতে পারেন।
প্রসঙ্গক্রমে যে বিষয়টি এসে যায় তা হলো, আমরা খাদ্য গ্রহণ করি বেঁচে থাকার জন্য। প্রতিদিনকার ভক্ষণকৃত খাদ্যকে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের দেহের যাবতীয় রোগবালাই প্রতিহত করার মাধ্যমেই আমরা বেঁচে থাকি। কিন্তু কখনো কখনো ভক্ষণকৃত খাদ্যের উপাদান কোনো কোনো রোগবালাই থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে না। তখন আমরা কৃত্রিম উপায়ে অর্থাৎ ওষুধ সেবন করে এসব রোগবালাই প্রতিহত করে থাকি। কিন্তু ওষুধ সেবন ছাড়া স্বাভাবিক উপায়ে অর্থাৎ দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণ করে রোগ প্রতিহত করতে পারিনি বলে আমরা কখনোই স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত থাকি না। বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে তালগাছসহ অন্যান্য বৃক্ষও তেমনি একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যা সব সময় শতভাগ কার্যকর হবে এমন ভাবার কোনো যুক্তি নেই। প্রাকৃতিক গাছপালার মাধ্যমে অব্যাহতভাবে বজ্রপাতে মৃত্যু বৃদ্ধি ঠেকানো যাচ্ছে না বিধায় এক্ষেত্রে ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন’ প্রকল্প গ্রহণ যুক্তিসংগতই বটে। কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর জন্য এর আগে গৃহীত ‘তালগাছের চারা রোপণ’ প্রকল্পটি কেন বাদ দিতে হবে, সেটাই বোধগম্য হচ্ছে না।
তালগাছ শুধু প্রাকৃতিক উপায়ে বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে আমাদের উপকার করে তা কিন্তু নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানাভাবে তালগাছ কাজে লাগে :
তালগাছের কাণ্ড থেকে সংগৃহীত রস জ্বাল করে সরাসরি খাওয়া যায় এবং তা থেকে তালমিছরি তৈরি হয়। জ্বাল করা ঘন রস থেকে পাটালি গুড়, তাড়ি তৈরি হয়। পাকা তালের রস থেকে জনপ্রিয় বাঙালি খাবার, যেমনÑ তালের পিঠা, পায়েস, তালের বড়া, ক্ষীর ইত্যাদি তৈরি হয়। তাছাড়া অপরিপক্ব তালের বীজের ভেতরের শ্বাস খাদ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।
তালের রয়েছে বহুবিধ ভেষজ গুণ। তালে পাওয়া যায় ভিটামিন এ, বি ও সি। এতে আছে উচ্চমাত্রায় জিংক, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং আয়রনসহ নানাবিধ খনিজ উপাদান; আরো আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান।
তালগাছের অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম।
তালপাতায় ঘর ছাওয়া হয়, পুতুল ও হাতপাখা তৈরি করা হয়। তালপাতায় চাটাই, মাদুর, আঁকার পট ইত্যাদি তৈরি হয়। এতদ্ব্যতীত তালের কাণ্ড দিয়ে ঘরের খুঁটি, নৌকা ইত্যাদি তৈরি করা যায়। বর্তমানে কুটির শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে তালগাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। পূর্ণ বয়স্ক একটি তালগাছ থেকে একজন কৃষক বছরে গড়ে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।
তালগাছের এমন অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণেই হয়তো গ্রামীণ জীবনে ধনসম্পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলে ‘সালিশ মানি, তবে তালগাছটি হবে আমারই’ Ñএই প্রবাদটি উদ্ধৃত করা হতো, যার প্রয়োগ এই হাল আমলেও গ্রাম, শহর সর্বত্র জুতসইভাবে হয়ে চলেছে।
তালগাছ একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, যা শত শত বছর বেঁচে থাকতে পারে। তালগাছের জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু গুণ অনেক বেশি। ফলে আমাদের হাওর অঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চল যেখানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার দরুন অন্য বড় বৃক্ষ সহজে জন্মায় না, সেখানে পরিকল্পিত উপায়ে তালগাছ জন্মানো যেতে পারে। এ ছাড়া যেকোনো অনুর্বর জায়গা, যেখানে অন্য কোনো গাছ জন্মায় না, সেখানে তালগাছ সহজেই বেঁচে থাকে এবং অনায়াসে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। তালগাছের তেমন কোনো রোগবালাই নেই এবং এটি খুবই কষ্টসহিষ্ণু। তালের আঁটি থেকে কোনোমতে একবার অঙ্কুরটি গজাতে পারলে এটির সাধারণত মৃত্যু হয় না। গরু-ছাগলের দ্বারাও এটি তেমন একটা নষ্ট হয় না।
তালগাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে বলে ভূমিক্ষয়, ভূমিধস, বাঁধ, নদীভাঙন ইত্যাদি ঠেকাতে তালগাছ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তালগাছের শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে বিধায় ঝড়ে হেলে পড়ে না এবং কাণ্ড অনেক শক্ত বিধায় ভেঙে পড়ে না। ফলে সামুদ্রিক ঝড়ের গতি কমানোর নিমিত্তে উপকূল এলাকায় ব্যাপকভাবে তালগাছ রোপণ করে সুন্দরবনের সহায়ক শক্তি হিসেবে তালগাছকে কাজে লাগানো যেতে পারে। একইভাবে আমাদের হাওর অঞ্চলসহ অন্যান্য নিম্নাঞ্চলে অধিক হারে তালের চারা রোপণ করে ঐসব অঞ্চলকে টর্নেডো ও কালবৈশাখী ঝড়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।
তালগাছের আরো একটি বড় গুণ হলো, এর শিকড় মাটির গভীরে চলে যাওয়ায় উপরিভাগের মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় না এবং ডালপালাবিহীন উঁচু বৃক্ষ হওয়ায় সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হয় না। ফলে ক্ষেতের আইলে তালগাছ লাগানো হলেও আশপাশের ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না।
ওপরে বর্ণিত এত সব আর্থিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অবদানের বাইরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও তালগাছের রয়েছে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
একসময় আমাদের গ্রামীণজীবনে প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়, ক্ষেতের আইলে, উঁচু মাটির ঢিবিতে, নদীর পাড়ে, রাস্তার ঢালে যত্রতত্র তালগাছ দেখা যেত। এসব গাছ আমাদের চিরসবুজ প্রকৃতিকে অধিকতর সবুজের রঙে রাঙিয়ে রাখত। আর এসব তালগাছে ঝুলে থাকত বাবুইপাখির বাসা, যা একটুখানি হাওয়ায় দুলতে থাকত। শুধু কী বাবুইপাখি! শকুন, বাজপাখিসহ নানা রকম বড় বড় পাখির আস্তানা ছিল তালগাছ। ইদানীং তালগাছের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকায় এসব পাখিও আজকাল তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় পরিবেশের কার্যকর ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনেও তালগাছের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। এ কাজে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পাশাপাশি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়েরও দায় আছে। এ দুটি সংস্থা পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবেশ নিয়ে কাজ করে, এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (এনজিও) সঙ্গে নিয়ে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণপূর্বক আমাদের অতিপরিচিত তালগাছকে শুধু বজ্রনিরোধক হিসেবেই নয়, অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশ সুরক্ষার একটি কার্যকর প্রাকৃতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। জানামতে, দেশের সর্ববৃহৎ এনজিও ‘ব্র্যাক’ অত্যন্ত ফলপ্রসূভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। এ ক্ষেত্রে ‘ব্র্যাক’-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
আশাব্যঞ্জক খবর হলো, তালগাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বজ্রপাত ঠেকানোর লক্ষ্যে এরই মধ্যে সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ ব্যক্তি উদ্যোগে অসংখ্য তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। আমরা প্রায়ই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রাস্তার দুই ধারে সারি সারি তালের চারার দৃষ্টিনন্দন ছবি দেখতে পাই। আমরা এখন প্রায়ই খবর পাই, একজনের দেখাদেখি অন্যজন রাস্তার পাশে, ক্ষেতের আইলে, বাড়ির ছোট্ট আঙিনায় এক বা একাধিক তালের চারা রোপণ করে যাচ্ছেন, যা এরই মধ্যে একটা বৃক্ষরোপণ আন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে। এমন একটা অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তালগাছ সম্পর্কে কোনো প্রকার নেতিবাচক ধারণা প্রচার করা মোটেও উচিত নয়, বরং এ আন্দোলনকে আরো বেগবান করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
তালগাছ নিয়ে কবিগুরুর বিখ্যাত কবিতার প্রথম তিন লাইন উদ্ধৃত করে শেষ করছি:
‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।’
কবিগুরুর কবিতার সেই তালগাছ এই চিরায়ত সবুজ বাংলার প্রকৃতিতে একটি, দুটি করে নয়, বরং শত শত কোটি তালগাছ সারা দেশের আনাচে-কানাচে অন্য সব গাছকে ছাড়িয়ে আকাশে উঁকি মারতে থাকুক।
লেখক : সোনালী ব্যাংক পিএলসির সাবেক ডিজিএম, কবি ও প্রাবন্ধিক

বজ্রপাতে মৃত্যু : তালগাছ বনাম বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন প্রকল্প সমাচার

আপডেট সময় : ১০:৩৩:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৪

আমাদের দেশে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বজ্রপাতও একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিছুদিন আগেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বজ্রপাত খুব একটা আলোচনার মধ্যে ছিল না। কিন্তু বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকায় হাল সময়ে তা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কাজ করে এমন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, আমাদের দেশে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ৩১৬২ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭৯ জন, যা ক্রমাগতভাবে বাড়তে বাড়তে ২০২১ সালে এসে এক বছরে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬২ জনে। ২০২২-২০২৩ সালের চিত্রও একই। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে তালগাছের উচ্চতা এবং এর কাণ্ডের বহিঃস্তরে পুরু কার্বনের আস্তরের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বজ্রপাত নিরোধকল্পে সারা দেশে ৪০ লাখ তালগাছের চারা লাগানোর উদ্যোগ নেয়। অতঃপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষণা মতে, সারা দেশে ৩৮ লাখ তালের চারা রোপণ করা হয়েছে মর্মে জানা যায়। নিঃসন্দেহে এটি ছিল খুবই আশাব্যঞ্জক খবর।
কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষণায় চারা রোপণের তথ্য থাকলেও বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল কি না তা জানা যায়নি।
এরই মধ্যে চার বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আমরা আমজনতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উদ্যোগে সরকারি খরচে তালের চারা রোপণের এই প্রকল্পটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বাস্তবে কী পরিমাণ চারা রোপণ করা হয়েছিল, আর তা থেকে কী পরিমাণ বেঁচে আছে এবং এ প্রকল্পের পিছে সরকারি খাজাঞ্চিখানা থেকে কী পরিমাণ কড়ি ঢালা হয়েছে তার প্রকৃত খবর আমরা জানি না। তবে সন্দিগ্ধ মহলের খোঁজখবরে যা বেরিয়ে এসেছে, তা সেই একই পুরোনো কাহিনি, Ñকাজীর গরু কেবল কিতাবেই আছে, গোয়ালে নেই বা ছিল না কখনো। চারা রোপণের দুই বছর যেতে না যেতেই চারা কোথাও মরে গেছে, কোথাও চারা না লাগিয়েই টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ এ কাজে নাকি খরচ হয়ে গেছে ১০০ কোটি টাকা। ১০০ কোটি! অবশ্য আমাদের মতো আমজনতার কাছে ১০০ কোটি টাকা স্বপ্নে দেখারও অতীত বলে মনে হলেও অনেকের কাছেই আজকাল তা ডালভাতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্দিগ্ধ মহলের এহেন ধারণা যে একেবারে অমূলক নয় তা বোঝা যায় এ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের সাম্প্রতিক সন্দেহজনক কথাবার্তা থেকেই।
গেল মাসেই বিভিন্ন মাধ্যমে খবর হয় যে, বজ্রনিরোধক হিসেবে ‘তালগাছ প্রকল্প’ ফেল মারায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এখন বজ্রপাত নিরোধে ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড প্রকল্প’ নিয়ে মাঠে নেমেছে। এরই মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা গেছে, ‘তালগাছ বজ্রপাত ঠেকাতে সফল’, এটি নাকি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। মেনে নিলাম তিনি নেক কথা বলেছেন, কিন্তু ‘তালগাছ বজ্রপাত ঠেকাতে সফল নয়’, এমন কোনো প্রমাণিত তথ্য উনার কাছে আছে কি না তা তিনি বলেননি। এরও আগে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, একটি তালগাছ বড় হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ বছর। এত বছর অপেক্ষা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তাই এখন উনারা বজ্রপাত নিরোধে যৌক্তিক এক প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন। এ প্রকল্পের আওতায় এখন উনারা দেশের বজ্রপাত প্রবণ ১৫টি জেলায় ৬৭৯৩টি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসাবেন এবং ৩৩৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করবেন। এ কাজে উনারা খরচ করবেন মাত্র ১৩২১ কোটি টাকা। অথচ এর আগে তালগাছের চারা রোপণ প্রকল্পে ব্যয়িত ১০০ কোটি টাকা কোথায়, কিভাবে ব্যয় হলো, ব্যয়কৃত টাকায় রোপণকৃত তালের চারাগুলোর কী পরিমাণ টিকে আছে অথবা আদৌ টিকে আছে কি না, কার বা কাদের ভুলে প্রকল্পটি ভেস্তে গেল তার কোনো হিসাব-নিকাশ আছে কি না বা ব্যর্থতায় কাউকে জবাবদিহি করতে হয়েছে কি না তার কোনো খবর আমরা জানি না।
শোনা যায় একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নকল্পে এরই মধ্যে সরকারের আরো কয়েকটি সংস্থা কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে আছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২৩১ কোটি টাকার বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন প্রকল্প এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি বহুমুখী প্রকল্পের একাংশে অনুরূপ দণ্ড স্থাপন প্রকল্প।
একই কাজে সরকারের একাধিক সংস্থা ভিন্ন ভিন্নভাবে অর্থ ব্যয় কেন করছে, সেটি এক বড় প্রশ্ন বটে।
সে যাই হোক, বজ্রপাত ঠেকাতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি মাঠে-ঘাটে কর্মজীবী মানুষের মৃত্যু ঠেকানো যায়, তাহলে সে প্রকল্পের পেছনে শত শত কোটি টাকা খরচেও আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু শত শত কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণকে জায়েজ করতে গিয়ে যখন আমজনতা ও পশু-পাখির পরম বন্ধু এবং পরিবেশবান্ধব তালগাছকে ভিলেন বানানো হয়, তখন একটু-আধটু আপত্তি আছে বৈকি!
বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু জানি, তা হলো আকাশে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে কয়েকটি কারণে আমরা বিদ্যুৎ চমকানো দেখতে পাই এবং তা থেকে বজ্র নিনাদ হয়। এই নিনাদের সময় একটি কারণ থেকে হয় বজ্রপাত। খুব সরলভাবে যদি বলি বজ্রপাতের কারণ হলো আকাশে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক চার্জ থেকে ‘ক্লাউড টু গ্রাউন্ড’ ডিসচার্জিং অবস্থা। এরূপ ‘ক্লাউড টু গ্রাউন্ড’ ডিসচার্জিং অবস্থা তৈরির কারণে আকাশ থেকে ভূ-পৃষ্ঠ বরাবর বৈদ্যুতিক স্পার্কিংয়ের প্রবাহকেই বজ্রপাত বলে। এই বৈদ্যুতিক চার্জের প্রবাহ প্রাকৃতিক কন্ডাক্টর হিসেবে আমাদের আশপাশের বড় বড় গাছের মাধ্যমে তা ভূ-পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে চলে যায়, যার ফলে ঘরে অবস্থান করলে আমরা বজ্রপাতের বিপদ থেকে রক্ষা পাই। এই সময়ে যে গাছ যত উঁচু, সে গাছই তত উৎকৃষ্ট পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। আমাদের দেশের তালগাছগুলোর গড় উচ্চতা ১০০ ফুটের কাছাকাছি এবং তালগাছ আমাদের দেশের উঁচু বৃক্ষগুলোর মধ্যে অন্যতম। তালগাছের বাকলে থাকে পুরু কার্বনের স্তর। ফলে উঁচু হওয়ায় এবং বহিঃত্বক পুরু কার্বনের আস্তরে আবৃত থাকায় সর্বোপরি দেশের সর্বত্র জন্মায় বিধায় বজ্রনিরোধক হিসেবে তালগাছই সবচেয়ে নিরাপদ প্রাকৃতিক নিরোধক। এতকাল আমরা এটাই জেনে এসেছি। সে কারণেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে বিশাল যজ্ঞ করে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। অথচ ১০০ কোটি টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার পর উক্ত সংস্থাটির সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, তালগাছ বজ্রপাত ঠেকাতে সফল, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যদি তারা তা-ই জানেন, তাহলে কোন যুক্তিতে উনারা ১০০ কোটি টাকা খরচ করার এহেন ছেলেখেলার প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন? এর জবাব তো তাদেরই দিতে হবে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, এখানে কাউকেই জবাবদিহি করতে হয় না। যার ফলে ১০০ কোটি টাকা অহেতুক খরচ করার পর তারা একই কাজে অনায়াসে ১৩২১ কোটি টাকার অন্য প্রকল্প গ্রহণ করতে পারেন।
প্রসঙ্গক্রমে যে বিষয়টি এসে যায় তা হলো, আমরা খাদ্য গ্রহণ করি বেঁচে থাকার জন্য। প্রতিদিনকার ভক্ষণকৃত খাদ্যকে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের দেহের যাবতীয় রোগবালাই প্রতিহত করার মাধ্যমেই আমরা বেঁচে থাকি। কিন্তু কখনো কখনো ভক্ষণকৃত খাদ্যের উপাদান কোনো কোনো রোগবালাই থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে না। তখন আমরা কৃত্রিম উপায়ে অর্থাৎ ওষুধ সেবন করে এসব রোগবালাই প্রতিহত করে থাকি। কিন্তু ওষুধ সেবন ছাড়া স্বাভাবিক উপায়ে অর্থাৎ দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণ করে রোগ প্রতিহত করতে পারিনি বলে আমরা কখনোই স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত থাকি না। বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে তালগাছসহ অন্যান্য বৃক্ষও তেমনি একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যা সব সময় শতভাগ কার্যকর হবে এমন ভাবার কোনো যুক্তি নেই। প্রাকৃতিক গাছপালার মাধ্যমে অব্যাহতভাবে বজ্রপাতে মৃত্যু বৃদ্ধি ঠেকানো যাচ্ছে না বিধায় এক্ষেত্রে ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন’ প্রকল্প গ্রহণ যুক্তিসংগতই বটে। কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর জন্য এর আগে গৃহীত ‘তালগাছের চারা রোপণ’ প্রকল্পটি কেন বাদ দিতে হবে, সেটাই বোধগম্য হচ্ছে না।
তালগাছ শুধু প্রাকৃতিক উপায়ে বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে আমাদের উপকার করে তা কিন্তু নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানাভাবে তালগাছ কাজে লাগে :
তালগাছের কাণ্ড থেকে সংগৃহীত রস জ্বাল করে সরাসরি খাওয়া যায় এবং তা থেকে তালমিছরি তৈরি হয়। জ্বাল করা ঘন রস থেকে পাটালি গুড়, তাড়ি তৈরি হয়। পাকা তালের রস থেকে জনপ্রিয় বাঙালি খাবার, যেমনÑ তালের পিঠা, পায়েস, তালের বড়া, ক্ষীর ইত্যাদি তৈরি হয়। তাছাড়া অপরিপক্ব তালের বীজের ভেতরের শ্বাস খাদ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।
তালের রয়েছে বহুবিধ ভেষজ গুণ। তালে পাওয়া যায় ভিটামিন এ, বি ও সি। এতে আছে উচ্চমাত্রায় জিংক, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং আয়রনসহ নানাবিধ খনিজ উপাদান; আরো আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান।
তালগাছের অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম।
তালপাতায় ঘর ছাওয়া হয়, পুতুল ও হাতপাখা তৈরি করা হয়। তালপাতায় চাটাই, মাদুর, আঁকার পট ইত্যাদি তৈরি হয়। এতদ্ব্যতীত তালের কাণ্ড দিয়ে ঘরের খুঁটি, নৌকা ইত্যাদি তৈরি করা যায়। বর্তমানে কুটির শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে তালগাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। পূর্ণ বয়স্ক একটি তালগাছ থেকে একজন কৃষক বছরে গড়ে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।
তালগাছের এমন অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণেই হয়তো গ্রামীণ জীবনে ধনসম্পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলে ‘সালিশ মানি, তবে তালগাছটি হবে আমারই’ Ñএই প্রবাদটি উদ্ধৃত করা হতো, যার প্রয়োগ এই হাল আমলেও গ্রাম, শহর সর্বত্র জুতসইভাবে হয়ে চলেছে।
তালগাছ একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, যা শত শত বছর বেঁচে থাকতে পারে। তালগাছের জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু গুণ অনেক বেশি। ফলে আমাদের হাওর অঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চল যেখানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার দরুন অন্য বড় বৃক্ষ সহজে জন্মায় না, সেখানে পরিকল্পিত উপায়ে তালগাছ জন্মানো যেতে পারে। এ ছাড়া যেকোনো অনুর্বর জায়গা, যেখানে অন্য কোনো গাছ জন্মায় না, সেখানে তালগাছ সহজেই বেঁচে থাকে এবং অনায়াসে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। তালগাছের তেমন কোনো রোগবালাই নেই এবং এটি খুবই কষ্টসহিষ্ণু। তালের আঁটি থেকে কোনোমতে একবার অঙ্কুরটি গজাতে পারলে এটির সাধারণত মৃত্যু হয় না। গরু-ছাগলের দ্বারাও এটি তেমন একটা নষ্ট হয় না।
তালগাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে বলে ভূমিক্ষয়, ভূমিধস, বাঁধ, নদীভাঙন ইত্যাদি ঠেকাতে তালগাছ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তালগাছের শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে বিধায় ঝড়ে হেলে পড়ে না এবং কাণ্ড অনেক শক্ত বিধায় ভেঙে পড়ে না। ফলে সামুদ্রিক ঝড়ের গতি কমানোর নিমিত্তে উপকূল এলাকায় ব্যাপকভাবে তালগাছ রোপণ করে সুন্দরবনের সহায়ক শক্তি হিসেবে তালগাছকে কাজে লাগানো যেতে পারে। একইভাবে আমাদের হাওর অঞ্চলসহ অন্যান্য নিম্নাঞ্চলে অধিক হারে তালের চারা রোপণ করে ঐসব অঞ্চলকে টর্নেডো ও কালবৈশাখী ঝড়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।
তালগাছের আরো একটি বড় গুণ হলো, এর শিকড় মাটির গভীরে চলে যাওয়ায় উপরিভাগের মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় না এবং ডালপালাবিহীন উঁচু বৃক্ষ হওয়ায় সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হয় না। ফলে ক্ষেতের আইলে তালগাছ লাগানো হলেও আশপাশের ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না।
ওপরে বর্ণিত এত সব আর্থিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অবদানের বাইরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও তালগাছের রয়েছে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
একসময় আমাদের গ্রামীণজীবনে প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়, ক্ষেতের আইলে, উঁচু মাটির ঢিবিতে, নদীর পাড়ে, রাস্তার ঢালে যত্রতত্র তালগাছ দেখা যেত। এসব গাছ আমাদের চিরসবুজ প্রকৃতিকে অধিকতর সবুজের রঙে রাঙিয়ে রাখত। আর এসব তালগাছে ঝুলে থাকত বাবুইপাখির বাসা, যা একটুখানি হাওয়ায় দুলতে থাকত। শুধু কী বাবুইপাখি! শকুন, বাজপাখিসহ নানা রকম বড় বড় পাখির আস্তানা ছিল তালগাছ। ইদানীং তালগাছের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকায় এসব পাখিও আজকাল তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় পরিবেশের কার্যকর ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনেও তালগাছের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। এ কাজে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পাশাপাশি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়েরও দায় আছে। এ দুটি সংস্থা পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবেশ নিয়ে কাজ করে, এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোকে (এনজিও) সঙ্গে নিয়ে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণপূর্বক আমাদের অতিপরিচিত তালগাছকে শুধু বজ্রনিরোধক হিসেবেই নয়, অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশ সুরক্ষার একটি কার্যকর প্রাকৃতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। জানামতে, দেশের সর্ববৃহৎ এনজিও ‘ব্র্যাক’ অত্যন্ত ফলপ্রসূভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। এ ক্ষেত্রে ‘ব্র্যাক’-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
আশাব্যঞ্জক খবর হলো, তালগাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বজ্রপাত ঠেকানোর লক্ষ্যে এরই মধ্যে সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ ব্যক্তি উদ্যোগে অসংখ্য তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। আমরা প্রায়ই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রাস্তার দুই ধারে সারি সারি তালের চারার দৃষ্টিনন্দন ছবি দেখতে পাই। আমরা এখন প্রায়ই খবর পাই, একজনের দেখাদেখি অন্যজন রাস্তার পাশে, ক্ষেতের আইলে, বাড়ির ছোট্ট আঙিনায় এক বা একাধিক তালের চারা রোপণ করে যাচ্ছেন, যা এরই মধ্যে একটা বৃক্ষরোপণ আন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে। এমন একটা অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তালগাছ সম্পর্কে কোনো প্রকার নেতিবাচক ধারণা প্রচার করা মোটেও উচিত নয়, বরং এ আন্দোলনকে আরো বেগবান করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
তালগাছ নিয়ে কবিগুরুর বিখ্যাত কবিতার প্রথম তিন লাইন উদ্ধৃত করে শেষ করছি:
‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।’
কবিগুরুর কবিতার সেই তালগাছ এই চিরায়ত সবুজ বাংলার প্রকৃতিতে একটি, দুটি করে নয়, বরং শত শত কোটি তালগাছ সারা দেশের আনাচে-কানাচে অন্য সব গাছকে ছাড়িয়ে আকাশে উঁকি মারতে থাকুক।
লেখক : সোনালী ব্যাংক পিএলসির সাবেক ডিজিএম, কবি ও প্রাবন্ধিক