০৯:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

সীমান্ত সুরক্ষায় নজর বাংলাদেশের

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘর্ষে গোলাগুলি, মর্টারশেল ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দে এখনো কাঁপছে পুরো সীমান্ত এলাকা। বিশেষ করে তুমব্রু সীমান্তে দুজনের মৃত্যুতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে দ্বিগুণ। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়ন, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন থেকে শুরু করে টেকনাফের হোয়াইক্যং এবং হ্নীলা ইউনিয়ন পর্যন্ত সীমান্ত এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে বিজিবি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত পেরিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় দেশটির সেনা-বিজিপিসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা প্রতিদিনই বাংলাদেশে প্রবেশ করে আশ্রয় নেওয়ায় সাধারণ জনমনে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আশ্রিতদের সহসাই নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব নয়। গত কয়েকদিনের টানা সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি ও মর্টারশেলের শব্দে জনশূন্য হয়ে পড়েছে সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রাম। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে আপাতত সীমান্ত
সুরক্ষার দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে ও মিয়ানমারের পশ্চিমে ২৭১ কিলোমিটার অর্থাৎ ১৬৮.৪ মাইল এলাকাজুড়ে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকা। দীর্ঘ এ সীমান্তপথ বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার অন্তর্ভুক্ত। সীমান্তবর্তী বেশিরভাগ পথই বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় বিস্তৃত। এর মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রয়েছে। সেই রাজ্যটি মূলত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গাদের বসবাস ছিল। এ রাজ্যের পূর্ণ দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনী। তারই ধারাবাহিকতায় দফায় দফায় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ায় সামরিক জান্তা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। জান্তা সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন আর গণহত্যায় চাপের মুখে পড়ে আরাকান যোদ্ধারা। ২০১৭ সালে জান্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন আর গণহত্যার ভয়ে একেক সময় প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। এ ঢল চলে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এরই মধ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। এরপরই মিয়ানমার সামরিক জান্তা বাহিনীকে হঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠে আরাকান যোদ্ধারা। তারা পিপলস ডেমেসাক্রেটিক ফোর্স (পিডিএফ) ও অ্যানথিক আর্মড অর্গানাইজেশন (ইআরও) সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে দেশটির সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। গত ২ মাস ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ চালিয়ে আসছিল দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এরপর ক্রমেই তারা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আরাকান আর্মিরা বাংলাদেশের নিকটবর্তী রাখাইন রাজ্য দখলে নিতে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর¿ হামলা চালায়। জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সশস্ত্র যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় ভারি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। এরমধ্যে মর্টারশেল ও গোলাগুলিতে পিছু হটতে শুরু করে বিজিপি ও সামরিক জান্তা। মুহূর্মুহু হামলায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ৩টি পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দবানের নাইখ্যংছড়ির ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্ত ও কক্সবাজারের টেকনাফের উখিয়ায় পালংখালির বটতলী সীমান্ত, থাইংখালী, পুটিবনিয়া সীমান্তের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। ওপারের মর্টারশেল ও গোলাগুলির ঘটনায় বাংলাদেশি এক নারী ও রোহিঙ্গা পুরুষ নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হন। আতঙ্কিত সীমান্তের বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের সামনে টিকতে না পেরে রাখাইন রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন দেশটির সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) সহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। সবশেষ গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উখিয়া, টেকনাফ এবং তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বিজিপি সদস্যসহ দেশটির অন্যান্য বাহিনীর সর্বমোট ৩২৮ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন বলে সবুজ বাংলাকে জানিয়েছেন বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম।
এদিকে স্থানীয়রা জানায়, সীমান্তে উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে ওপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর লোকজনও অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুপ্রবেশ করছে। গত মঙ্গলবার উখিয়ার পালংখালী সীমান্তের সাতটি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় অস্ত্রসহ ২৪ জনকে আটক করেছেন স্থানীয়রা। অনুপ্রবেশে বাধা দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ছোড়া হাতবোমার আঘাতে আহত হয়েছেন চারজন। তারা হলেন উখিয়া উপজেলার থাইংখালী গ্রামের মোবারক, আয়ুবুল ইসলাম, কালু ও আব্বু। এর আগে পালংখালী ইউনিয়নের রহমতের বিল, নলবনিয়া, পুটিবনিয়া, ধামনখালীসহ আরও কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে কয়েক দফায় বিজিপির সদস্যরা প্রবেশ করেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এসময় আরসা, আরএসওসহ কয়েকটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠির সদস্যরাও অনুপ্রবেশ করেছেন। এভাবে তাদের সশস্ত্র অবস্থায় এপার-ওপার যাতায়াতে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা ধারণা করছেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠির অবাধ বিচরণে ও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এপার-ওপার যাতায়াত করা অনেকটাই ঝুঁকির মুখে পড়বে বাংলাদেশের ভূখন্ড।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. জেনারেল (অবঃ) হারুন অর রশিদ বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে এরই মধ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। এতে সময়ের ব্যবধানে বিশ^নেতারা আশ^াস দিলেও এখনো প্রত্যাবাসনের কোনো উদ্যোগই কার্যকর হয়নি। এতে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে সংঘাতের ঘটনায় দেশটির সামরিক জান্তা ও বিজিপিসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে আমাদের দেশে ঢুকে পড়ছে। এখনো এ দেশে প্রবেশের জন্য সীমান্তের ওপারে অপেক্ষায় রয়েছে মিয়ানমারের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে যারা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সহসাই সে দেশে ফেরানো সম্ভব নয়, সুতরাং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত তাদের ফিরিয়ে নিতে কুটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদারের পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত সুরক্ষায় মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা ৩টি জেলা রাঙামাটি, কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তজুড়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। তা না হলে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। এদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান ও বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন জানান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্তের ওপারে তেমন কোনো গোলাগুলির শব্দ পায়নি স্থানীয়রা। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত পরিদর্শনকালে কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, অবৈধভাবে আর একজনকেও বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ধৈর্য ধারণ করে, মানবিক থেকে এবং আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেশ মাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে।

 

 

 

স/ম

ফুটপাত থেকে হকার মুক্ত করতে চসিকের ফের অভিযান

সীমান্ত সুরক্ষায় নজর বাংলাদেশের

আপডেট সময় : ১২:৩৩:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘর্ষে গোলাগুলি, মর্টারশেল ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দে এখনো কাঁপছে পুরো সীমান্ত এলাকা। বিশেষ করে তুমব্রু সীমান্তে দুজনের মৃত্যুতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে দ্বিগুণ। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়ন, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন থেকে শুরু করে টেকনাফের হোয়াইক্যং এবং হ্নীলা ইউনিয়ন পর্যন্ত সীমান্ত এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে বিজিবি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত পেরিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় দেশটির সেনা-বিজিপিসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা প্রতিদিনই বাংলাদেশে প্রবেশ করে আশ্রয় নেওয়ায় সাধারণ জনমনে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আশ্রিতদের সহসাই নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব নয়। গত কয়েকদিনের টানা সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি ও মর্টারশেলের শব্দে জনশূন্য হয়ে পড়েছে সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রাম। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে আপাতত সীমান্ত
সুরক্ষার দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে ও মিয়ানমারের পশ্চিমে ২৭১ কিলোমিটার অর্থাৎ ১৬৮.৪ মাইল এলাকাজুড়ে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকা। দীর্ঘ এ সীমান্তপথ বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার অন্তর্ভুক্ত। সীমান্তবর্তী বেশিরভাগ পথই বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় বিস্তৃত। এর মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রয়েছে। সেই রাজ্যটি মূলত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গাদের বসবাস ছিল। এ রাজ্যের পূর্ণ দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনী। তারই ধারাবাহিকতায় দফায় দফায় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ায় সামরিক জান্তা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। জান্তা সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন আর গণহত্যায় চাপের মুখে পড়ে আরাকান যোদ্ধারা। ২০১৭ সালে জান্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন আর গণহত্যার ভয়ে একেক সময় প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। এ ঢল চলে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এরই মধ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। এরপরই মিয়ানমার সামরিক জান্তা বাহিনীকে হঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠে আরাকান যোদ্ধারা। তারা পিপলস ডেমেসাক্রেটিক ফোর্স (পিডিএফ) ও অ্যানথিক আর্মড অর্গানাইজেশন (ইআরও) সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে দেশটির সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। গত ২ মাস ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ চালিয়ে আসছিল দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এরপর ক্রমেই তারা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আরাকান আর্মিরা বাংলাদেশের নিকটবর্তী রাখাইন রাজ্য দখলে নিতে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর¿ হামলা চালায়। জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সশস্ত্র যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় ভারি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। এরমধ্যে মর্টারশেল ও গোলাগুলিতে পিছু হটতে শুরু করে বিজিপি ও সামরিক জান্তা। মুহূর্মুহু হামলায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ৩টি পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দবানের নাইখ্যংছড়ির ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্ত ও কক্সবাজারের টেকনাফের উখিয়ায় পালংখালির বটতলী সীমান্ত, থাইংখালী, পুটিবনিয়া সীমান্তের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। ওপারের মর্টারশেল ও গোলাগুলির ঘটনায় বাংলাদেশি এক নারী ও রোহিঙ্গা পুরুষ নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হন। আতঙ্কিত সীমান্তের বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের সামনে টিকতে না পেরে রাখাইন রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন দেশটির সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) সহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। সবশেষ গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উখিয়া, টেকনাফ এবং তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বিজিপি সদস্যসহ দেশটির অন্যান্য বাহিনীর সর্বমোট ৩২৮ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন বলে সবুজ বাংলাকে জানিয়েছেন বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম।
এদিকে স্থানীয়রা জানায়, সীমান্তে উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে ওপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর লোকজনও অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুপ্রবেশ করছে। গত মঙ্গলবার উখিয়ার পালংখালী সীমান্তের সাতটি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় অস্ত্রসহ ২৪ জনকে আটক করেছেন স্থানীয়রা। অনুপ্রবেশে বাধা দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ছোড়া হাতবোমার আঘাতে আহত হয়েছেন চারজন। তারা হলেন উখিয়া উপজেলার থাইংখালী গ্রামের মোবারক, আয়ুবুল ইসলাম, কালু ও আব্বু। এর আগে পালংখালী ইউনিয়নের রহমতের বিল, নলবনিয়া, পুটিবনিয়া, ধামনখালীসহ আরও কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে কয়েক দফায় বিজিপির সদস্যরা প্রবেশ করেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এসময় আরসা, আরএসওসহ কয়েকটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠির সদস্যরাও অনুপ্রবেশ করেছেন। এভাবে তাদের সশস্ত্র অবস্থায় এপার-ওপার যাতায়াতে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তারা ধারণা করছেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠির অবাধ বিচরণে ও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এপার-ওপার যাতায়াত করা অনেকটাই ঝুঁকির মুখে পড়বে বাংলাদেশের ভূখন্ড।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. জেনারেল (অবঃ) হারুন অর রশিদ বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে এরই মধ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। এতে সময়ের ব্যবধানে বিশ^নেতারা আশ^াস দিলেও এখনো প্রত্যাবাসনের কোনো উদ্যোগই কার্যকর হয়নি। এতে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে সংঘাতের ঘটনায় দেশটির সামরিক জান্তা ও বিজিপিসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে আমাদের দেশে ঢুকে পড়ছে। এখনো এ দেশে প্রবেশের জন্য সীমান্তের ওপারে অপেক্ষায় রয়েছে মিয়ানমারের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে যারা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সহসাই সে দেশে ফেরানো সম্ভব নয়, সুতরাং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত তাদের ফিরিয়ে নিতে কুটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদারের পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত সুরক্ষায় মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা ৩টি জেলা রাঙামাটি, কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তজুড়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। তা না হলে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। এদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান ও বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন জানান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্তের ওপারে তেমন কোনো গোলাগুলির শব্দ পায়নি স্থানীয়রা। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত পরিদর্শনকালে কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, অবৈধভাবে আর একজনকেও বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ধৈর্য ধারণ করে, মানবিক থেকে এবং আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেশ মাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে।

 

 

 

স/ম