০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ক্রমেই সৌন্দর্য হারাচ্ছে জাতীয় মসজিদ

●ফুটপাত ও ভ্রাম্যমাণ দোকানে ঘেরা চারপাশ
●জরাজীর্ণ অবস্থায় পূর্ব দিকের রাস্তা ও প্রধান গেট
●অপরিচ্ছন্ন মসজিদ আঙিনা ও নামাজের স্থান
●বিশ্রামের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে ক্লান্ত ও ছিন্নমূল মানুষ

 

দেশের অন্যতম পুরোনো একটি স্থাপনা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশেষ আগ্রহে থাকে মসজিদটির সৌন্দর্য দর্শন ও সেখানে নামাজ আদায় করা। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটির সৌন্দর্য্য যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে ফুটপাত-ভ্রাম্যমাণ দোকানে ঘেরা, অপরিচ্ছন্ন আঙিনা আর ভ্রাম্যমাণ ক্লান্ত ও ছিন্নমূল মানুষের বিশ্রামের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে দেশের জাতীয় এই মসজিদটি। বিশেষ করে মসজিদের পূর্বপাশের রাস্তা ও প্রধান গেট খুব জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জাতীয় মসজিদের সামনে দিয়ে নতুন কোনো পথচারী বা মুসল্লি চলাচল করলেও তার হয়ত  বিশ্বাস হতে কষ্ট হবে যে- এটা বায়তুল মোকাররম। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা বিরাজ করলেও মসজিদটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা উন্নয়নমূলক কোনো কাজ ধর্ম মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প তালিকায় দেখা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের গেটসংলগ্ন গোটা এলাকাজুড়ে রয়েছে ফুটপাতের দোকান। চলছে নানা সামগ্রীর বেচাকেনা। অবশ্য রমজান উপলক্ষে দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলা চলছে। তবে এর বাইরেও দক্ষিণ গেট ঘিরে বসেছে বহু অস্থায়ী দোকানপাট। এমনকি দক্ষিণ পাশের সিড়িতেও কয়েকজন হকারকে বসে জিনিসপত্র বিক্রি করতে দেখা যায়। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ ও ছিন্নমূল নানা শ্রেণির মানুষ সেখানে বসে বা শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন।

একই অবস্থা দেখা গেছে পূর্বদিকেও। সিড়ি দিয়ে ওঠার পর টিনশেডের বাইরে খোলা চত্বরে নানা শ্রেণির ছিন্নমূল মানুষকে সেখানে শোয়া অবস্থায় দেখা যায়। দেখে বিশ^াস করা কঠিন যে, এটা একটা জাতীয় মসজিদ। তাছাড়া পূর্ব পাশের সড়কের অবস্থা চরম বেহাল। বর্তমানে সড়কটিতে যানবাহন বা মানুষের চলাচল অযোগ্য হয়ে রয়েছে। নানা জটিলতায় হারাতে বসেছে পূর্ব পাশের প্রধান গেটের সৌন্দর্য। একসময় সংস্কার বা পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু হলেও তা বর্তমানে বন্ধ থাকায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে এ পাশটি। গেটসংলগ্ন এলাকায় আছে অস্থায়ী নানা সামগ্রীর দোকান।

এছাড়া পশ্চিম পাশে বায়তুল মোকাররম মার্কেটসংলগ্ন সড়কজুড়েও রয়েছে অস্থায়ী বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির বাইরের সৌন্দর্য যেন হারিয়ে গেছে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের দখলে। যদিও এসব দোকানপাটের সঙ্গে বায়তুল মোকাররমের কোনো সম্পৃক্ততা বা নিয়ন্ত্রণ নেই বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটের পাশের একটি দোকানদার সবুজ বাংলাকে জানান, ফুটপাতের এসব দোকানের সঙ্গে বায়তুল মোকাররম বা সিটি করপোরেশনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দীর্ঘদিন ধরে যারা দখল করে আছেন তারাই মূলত ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফুটপাত বিক্রি বা ভাড়ার বিষয়টিও তাদের নিয়ন্ত্রণেই হয়। তবে এসব ব্যবসার জন্য সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাশালী লোকদের নির্ধারিত হারে টাকা দেয়া লাগে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মসজিদের উত্তর পাশের চত্বরে একটি ফুলের বাগান থাকলেও তা পরিচর্যার অভাবে যেন জঙ্গলে রূপ নিচ্ছে। সেখানে নানা পরিত্যক্ত জিনিসপত্রও ফেলে রাখা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে মুসল্লিরা নামাজ পড়লেও সেখানে প্রায় সময় ধুলাবালি লেগে থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর মসজিদের মূল অংশ, করিডোর এবং পাশের বিভিন্ন অংশে ভ্রাম্যমাণ ক্লান্ত মানুষ ও ছিন্নমূল লোকজনের শুয়ে ও ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়।

জাতীয় মসজিদের এ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ও মার্কেট বিভাগের একজন কর্মকর্তা গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের গেটের বাইরে যেসব ফুটপাত দোকান ও ভ্রাম্যমাণ হকার রয়েছে তাদের সঙ্গে বায়তুল মোকাররমের কোনো সম্পৃক্ততা বা নিয়ন্ত্রণ নেই। মসজিদের সৌন্দর্য রক্ষায় আমরা মাঝে মাঝে তাদের উঠিয়ে দিই, তবে আবার তারা সেখানে বসে। একইভাবে মসজিদ এলাকায় যেসব ভাসমান লোক অবস্থান করে তাদেরও আমাদের খাদেমদের মাধ্যমে উঠিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু তারা অন্যদিক থেকে তাড়া খেয়ে আবার মসজিদে এসে অবস্থান নেয়। আমাদের সীমিত গার্ড দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণও সম্ভব হয় না। এসব ভাসমান মানুষের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে মসজিদের পরিবেশ ভালো থাকবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সৌন্দর্য রক্ষায় হকারমুক্ত ও ভাসমান মানুষমুক্ত পরিবেশ আমরাও চাই। তবে সামগ্রিকভাবে নানা কারণে তার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে মসজিদের কয়েকজন নিয়মিত মুসল্লি জানান, বিভিন্ন দেশের রাজধানীর প্রধান মসজিদগুলোর চিত্র থাকে খুবই সৌন্দর্যমন্ডিত। অথচ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশের জাতীয় মসজিদের চিত্র খুবই খারাপ। মসজিদটি যে সৌন্দর্যে তৈরি করা হয়, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে তাও হারিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্র্র্তৃপক্ষের জোর নজর দেয়া উচিত। তাছাড়া মসজিদের প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ করা জরুরি বলেও মত দেন তিনি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, মূলত বায়তুল মোকাররমের দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হাতে দেয়াই ভুল হয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্টরা মসজিদের সৌন্দর্য রক্ষার চেয়ে নতুন নতুন দোকান তৈরিতে মনোযোগ বেশি দেন। মসজিদটি বর্তমানে চরম সৌন্দর্যহীন অবস্থায় রয়েছে।

বায়তুল মোকাররমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা উন্নয়নমূলক কাজের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না- এ বিষয়ে গতকাল মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মু. আ. হামিদ জমাদ্দার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মন্ত্রণালয়টির চলমান কোনো প্রকল্পের তালিকায় বায়তুল মোকাররমের নাম নেই বলে ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রমতে, রাজধানী ঢাকায় একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণ এবং এর মাধ্যমে ইসলামী দ্বীনি শিক্ষার প্রচার ও প্রসার, ইসলামী প্রস্তক ও সাময়িকী প্রকাশ, মুসলিম বেকারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, দারুল উমুল ও দারুল ইফতা প্রতিষ্ঠা-ইত্যাদি ব্যাপক কর্মসূচিকে সামনে রেখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল ওমরাও খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং আলহ্বাজ আবদুল লতিফ ইবরাহীম বাওয়ানী প্রমুখ শিল্পপতির উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ‘বায়তুল মুকাররম সোসাইটি’ নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদ নির্মাণ ও উল্লেখিত কার্যসমূহের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য মসজিদসংলগ্ন একটি মার্কেটও প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

১৯৬০ সালের ফেব্র্রুয়ারি মাসে এ মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আইয়ুব খান। বায়তুল মোকাররম কমপ্লেক্স এর নকশা প্রণয়ন করেন প্রখ্যাত স্থপতি আবুল হোসেন থারিয়ানী। মসজিদটি সাত তলাবিশিষ্ট। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র্রে পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বর্তমানে মূল মসজিদে এবং দক্ষিণ ও পূর্ব সাহান মিলিয়ে সর্বমোট পয়ঁত্রিশ হাজারের বেশি মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদের অভ্যন্তরে অজুর ব্যবস্থাসহ নারীদের জন্য পৃথক নামাজ কক্ষ ও পাঠাগার রয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার নারী মুসল্লির নামাজের সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদে। মসজিদের নিচতলায় রয়েছে একটি বৃহত্তর ও অত্যাধুনিক সুসজ্জিত মার্কেট কমপ্লেক্স। রয়েছে কার পার্কিং, রাজধানী ঢাকার খ্যাতনামা জুয়েলারি, ইলেকট্রনিক্স, লেদার, ইসলামি পুস্তক ও টুপি, আতর, তসবির বিশাল মার্কেট বায়তুল মোকাররম অবস্থিত। এ মার্কেটে প্রায় এক হাজার দোকান রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন পরিচালক এ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্রমেই সৌন্দর্য হারাচ্ছে জাতীয় মসজিদ

আপডেট সময় : ০৭:২৮:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মার্চ ২০২৪

●ফুটপাত ও ভ্রাম্যমাণ দোকানে ঘেরা চারপাশ
●জরাজীর্ণ অবস্থায় পূর্ব দিকের রাস্তা ও প্রধান গেট
●অপরিচ্ছন্ন মসজিদ আঙিনা ও নামাজের স্থান
●বিশ্রামের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে ক্লান্ত ও ছিন্নমূল মানুষ

 

দেশের অন্যতম পুরোনো একটি স্থাপনা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশেষ আগ্রহে থাকে মসজিদটির সৌন্দর্য দর্শন ও সেখানে নামাজ আদায় করা। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটির সৌন্দর্য্য যেন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে ফুটপাত-ভ্রাম্যমাণ দোকানে ঘেরা, অপরিচ্ছন্ন আঙিনা আর ভ্রাম্যমাণ ক্লান্ত ও ছিন্নমূল মানুষের বিশ্রামের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে দেশের জাতীয় এই মসজিদটি। বিশেষ করে মসজিদের পূর্বপাশের রাস্তা ও প্রধান গেট খুব জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জাতীয় মসজিদের সামনে দিয়ে নতুন কোনো পথচারী বা মুসল্লি চলাচল করলেও তার হয়ত  বিশ্বাস হতে কষ্ট হবে যে- এটা বায়তুল মোকাররম। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা বিরাজ করলেও মসজিদটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা উন্নয়নমূলক কোনো কাজ ধর্ম মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প তালিকায় দেখা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের গেটসংলগ্ন গোটা এলাকাজুড়ে রয়েছে ফুটপাতের দোকান। চলছে নানা সামগ্রীর বেচাকেনা। অবশ্য রমজান উপলক্ষে দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলা চলছে। তবে এর বাইরেও দক্ষিণ গেট ঘিরে বসেছে বহু অস্থায়ী দোকানপাট। এমনকি দক্ষিণ পাশের সিড়িতেও কয়েকজন হকারকে বসে জিনিসপত্র বিক্রি করতে দেখা যায়। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ ও ছিন্নমূল নানা শ্রেণির মানুষ সেখানে বসে বা শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন।

একই অবস্থা দেখা গেছে পূর্বদিকেও। সিড়ি দিয়ে ওঠার পর টিনশেডের বাইরে খোলা চত্বরে নানা শ্রেণির ছিন্নমূল মানুষকে সেখানে শোয়া অবস্থায় দেখা যায়। দেখে বিশ^াস করা কঠিন যে, এটা একটা জাতীয় মসজিদ। তাছাড়া পূর্ব পাশের সড়কের অবস্থা চরম বেহাল। বর্তমানে সড়কটিতে যানবাহন বা মানুষের চলাচল অযোগ্য হয়ে রয়েছে। নানা জটিলতায় হারাতে বসেছে পূর্ব পাশের প্রধান গেটের সৌন্দর্য। একসময় সংস্কার বা পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু হলেও তা বর্তমানে বন্ধ থাকায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে এ পাশটি। গেটসংলগ্ন এলাকায় আছে অস্থায়ী নানা সামগ্রীর দোকান।

এছাড়া পশ্চিম পাশে বায়তুল মোকাররম মার্কেটসংলগ্ন সড়কজুড়েও রয়েছে অস্থায়ী বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির বাইরের সৌন্দর্য যেন হারিয়ে গেছে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের দখলে। যদিও এসব দোকানপাটের সঙ্গে বায়তুল মোকাররমের কোনো সম্পৃক্ততা বা নিয়ন্ত্রণ নেই বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটের পাশের একটি দোকানদার সবুজ বাংলাকে জানান, ফুটপাতের এসব দোকানের সঙ্গে বায়তুল মোকাররম বা সিটি করপোরেশনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দীর্ঘদিন ধরে যারা দখল করে আছেন তারাই মূলত ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফুটপাত বিক্রি বা ভাড়ার বিষয়টিও তাদের নিয়ন্ত্রণেই হয়। তবে এসব ব্যবসার জন্য সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাশালী লোকদের নির্ধারিত হারে টাকা দেয়া লাগে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মসজিদের উত্তর পাশের চত্বরে একটি ফুলের বাগান থাকলেও তা পরিচর্যার অভাবে যেন জঙ্গলে রূপ নিচ্ছে। সেখানে নানা পরিত্যক্ত জিনিসপত্রও ফেলে রাখা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে মুসল্লিরা নামাজ পড়লেও সেখানে প্রায় সময় ধুলাবালি লেগে থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর মসজিদের মূল অংশ, করিডোর এবং পাশের বিভিন্ন অংশে ভ্রাম্যমাণ ক্লান্ত মানুষ ও ছিন্নমূল লোকজনের শুয়ে ও ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়।

জাতীয় মসজিদের এ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ও মার্কেট বিভাগের একজন কর্মকর্তা গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের গেটের বাইরে যেসব ফুটপাত দোকান ও ভ্রাম্যমাণ হকার রয়েছে তাদের সঙ্গে বায়তুল মোকাররমের কোনো সম্পৃক্ততা বা নিয়ন্ত্রণ নেই। মসজিদের সৌন্দর্য রক্ষায় আমরা মাঝে মাঝে তাদের উঠিয়ে দিই, তবে আবার তারা সেখানে বসে। একইভাবে মসজিদ এলাকায় যেসব ভাসমান লোক অবস্থান করে তাদেরও আমাদের খাদেমদের মাধ্যমে উঠিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু তারা অন্যদিক থেকে তাড়া খেয়ে আবার মসজিদে এসে অবস্থান নেয়। আমাদের সীমিত গার্ড দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণও সম্ভব হয় না। এসব ভাসমান মানুষের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে মসজিদের পরিবেশ ভালো থাকবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সৌন্দর্য রক্ষায় হকারমুক্ত ও ভাসমান মানুষমুক্ত পরিবেশ আমরাও চাই। তবে সামগ্রিকভাবে নানা কারণে তার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে মসজিদের কয়েকজন নিয়মিত মুসল্লি জানান, বিভিন্ন দেশের রাজধানীর প্রধান মসজিদগুলোর চিত্র থাকে খুবই সৌন্দর্যমন্ডিত। অথচ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশের জাতীয় মসজিদের চিত্র খুবই খারাপ। মসজিদটি যে সৌন্দর্যে তৈরি করা হয়, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে তাও হারিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্র্র্তৃপক্ষের জোর নজর দেয়া উচিত। তাছাড়া মসজিদের প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ করা জরুরি বলেও মত দেন তিনি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, মূলত বায়তুল মোকাররমের দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হাতে দেয়াই ভুল হয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্টরা মসজিদের সৌন্দর্য রক্ষার চেয়ে নতুন নতুন দোকান তৈরিতে মনোযোগ বেশি দেন। মসজিদটি বর্তমানে চরম সৌন্দর্যহীন অবস্থায় রয়েছে।

বায়তুল মোকাররমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা উন্নয়নমূলক কাজের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না- এ বিষয়ে গতকাল মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মু. আ. হামিদ জমাদ্দার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মন্ত্রণালয়টির চলমান কোনো প্রকল্পের তালিকায় বায়তুল মোকাররমের নাম নেই বলে ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রমতে, রাজধানী ঢাকায় একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণ এবং এর মাধ্যমে ইসলামী দ্বীনি শিক্ষার প্রচার ও প্রসার, ইসলামী প্রস্তক ও সাময়িকী প্রকাশ, মুসলিম বেকারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, দারুল উমুল ও দারুল ইফতা প্রতিষ্ঠা-ইত্যাদি ব্যাপক কর্মসূচিকে সামনে রেখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল ওমরাও খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং আলহ্বাজ আবদুল লতিফ ইবরাহীম বাওয়ানী প্রমুখ শিল্পপতির উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ‘বায়তুল মুকাররম সোসাইটি’ নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদ নির্মাণ ও উল্লেখিত কার্যসমূহের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য মসজিদসংলগ্ন একটি মার্কেটও প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

১৯৬০ সালের ফেব্র্রুয়ারি মাসে এ মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আইয়ুব খান। বায়তুল মোকাররম কমপ্লেক্স এর নকশা প্রণয়ন করেন প্রখ্যাত স্থপতি আবুল হোসেন থারিয়ানী। মসজিদটি সাত তলাবিশিষ্ট। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র্রে পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বর্তমানে মূল মসজিদে এবং দক্ষিণ ও পূর্ব সাহান মিলিয়ে সর্বমোট পয়ঁত্রিশ হাজারের বেশি মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদের অভ্যন্তরে অজুর ব্যবস্থাসহ নারীদের জন্য পৃথক নামাজ কক্ষ ও পাঠাগার রয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার নারী মুসল্লির নামাজের সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদে। মসজিদের নিচতলায় রয়েছে একটি বৃহত্তর ও অত্যাধুনিক সুসজ্জিত মার্কেট কমপ্লেক্স। রয়েছে কার পার্কিং, রাজধানী ঢাকার খ্যাতনামা জুয়েলারি, ইলেকট্রনিক্স, লেদার, ইসলামি পুস্তক ও টুপি, আতর, তসবির বিশাল মার্কেট বায়তুল মোকাররম অবস্থিত। এ মার্কেটে প্রায় এক হাজার দোকান রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন পরিচালক এ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।