১০:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ : লক্ষ্য পূরণে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ

◉২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুহার হাজারে ৫০ এর নিচে নামানোর লক্ষ্য

◉২০২২ সালে লাখে মারা যান ১৫৩ জন

◉১৯৮৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৪৮ জন

◉মাতৃমৃত্যুরোধে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে- ড. রশীদ-ই-মাহবুব

মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ। টার্গেট রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু হার ৫০-এর নিচে নামিয়ে আনা। সেখানে গত ২০২২ সালে ২০২২ সালে এক লাখে গড়ে ১৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৮৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৪৮ জন। বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে এতে করে এই এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের হাতুড়ে চিকিৎসক-নার্সের উপর নির্ভর না করে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্সের কাছে ডেলিভারি করানোর প্রতিই জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসা বিশ্লেষক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলছেন, শুধু সরকারের একার পক্ষে মাতৃমৃত্যুরোধে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব নয়। এরজন্য পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। তাজমহলের গল্প শোনেনি এমন কোনো কাব্যরসিক বাঙালি পাওয়া ভার। প্রেমীমন মাত্রই জীবনে অন্তত একবার তাজমহল পরিদর্শনে যেতে চান। যার জন্য সম্রাট শাহজাহান ভারতের আগ্রায় তাজমহল তৈরি করেন সেই বেগম মমতাজ মহলের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন সম্রাট শাহজাহানের প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহল। যার স্মৃতিরক্ষার্থে পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান তাজমহল তৈরি করেন; যা দেখতে বিশ্বের লাখো পর্যটক দেশটিতে যান। প্রায় ৬০০ বছর আগে সম্রাজ্ঞীর মৃত সন্তান জন্মদানের সময় হলেও এখনও এই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় বাংলাদেশের নারীদের। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২-এর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর হার ১৫৩। অর্থাৎ এক লাখ জীবিত সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ১৫৩ জন মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, গর্ভধারণ কোনো রোগব্যাধি বা অসুস্থতা নয়, বরং একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা। সন্তান প্রসবও স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যখন প্রসূতির মৃত্যু হওয়ার কথা নয়। গর্ভধারণকালে, প্রসবের সময় এবং প্রসবের ৪২ দিনের মধ্যে মৃত্যু হলে তা মাতৃমৃত্যু। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অত্যন্ত পরিচিত পরিবার উপনিমগাছি সরকারপাড়ার পরিবার। সেই পরিবারের তৃতীয় সরকারের বড় মেয়ে মেরি। যেমন চটপটে, লেখাপড়ায় তেমনি আগ্রহী। পুরো বংশের প্রথম মেয়ে সন্তান যিনি বাংলায় এমএ শেষ করে যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে সুপারিনটেন্ডেন্ট হিসেবে চাকরি পান। প্রথমে চাকরি, এরপর বিয়ে, তারপর সন্তান গর্ভে ধারণ। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণের শিকার হন। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত দেয়ার সময় ভুল গ্রুপের রক্ত শরীরে প্রবেশ করায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মেরি। সময়টি ১৯৮৭ সাল। এখনও পরিবারের বড় সন্তানের মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই পরিবারের স্বজনরা। ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সাইদুর রহমান। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। তিনি জানান, তারা পাঁচ ভাই চারবোনের পরিবারে সব ছোটবোন ছিল সাজেনুর। কিশোরী বয়সে পরিবার থেকে বোনের বিয়ে দেওয়া হয়। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সেই বোন মৃত্যুবরণ করেন। সন্তান জন্মদানকালে বোনের এই মৃত্যু এখনও তাকে কাঁদায়। তিনি বলেন, তখন তো এত চিকিৎসক, হাসপাতাল ছিল না, থাকলে হয়ত আমার বোনটাকে ওভাবে অকালে ঝরে যেতে হতো না। নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজাহিদুল ইসলামের দ্বিতীয় মেয়ে রেহানা খাতুন। উচ্চশিক্ষিত বাবা গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর মেয়ের বিয়ে দেন। গর্ভাবস্থায় একলাম্পসিয়ায় আক্রান্ত হন রেহানা। মা হতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার। পরিবারের সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল, প্রাণচঞ্চল মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। সেই ১৯৯৮ সালের এই ঘটনার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে পরিবারের স্বজনরা। শুধু সাজেনুর, মেরি বা রেহানা নয়, প্রতিবছর মা হতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করছে বাংলাদেশে এখনও বহু সংখ্যক নারী। যার মধ্যে অনেক মৃত্যুর খবর একেবারেই থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ফুটবল দলের ফুটবলার মোসাম্মৎ রাজিয়া খাতুনের প্রসব-পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যু সচেতন নাগরিকের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। নিজ বাড়িতে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন রাজিয়া। তবে এরপর তার শারীরিক পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে থাকে এবং সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। রাজিয়া খাতুন সন্তান জন্মদানকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুতে আবারও দেশে মাতৃমৃত্যুর বিষয়টি সবার সামনে আসে। এটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ পূরণে কাজ করছে দেশের স্বাস্থ্যবিভাগ। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে এদেশের মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫০ এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ নারী সন্তান জন্মদান করার সময় মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৬৪৮ জন। তা ধীরে ধীরে ২০০১ সালে ৩৫১ জনে নেমে আসে। ২০০২ সালে তা কিছুটা বেড়ে ৩৯১ জন হয়। প্রতি লাখ সন্তান জন্মদানের বিপরীতে ২০২২ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৫৩ জন। ২০২১ সালে এই হার ছিল ১৬৮ জন। ২০২০ সালে এই হার ছিল ১৬৩ জন। সর্বশেষ প্রকাশিত বিবিএসের তথ্যে মাতৃমৃত্যুর সাতটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- প্রসবকালে জটিলতা, প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ, গর্ভকালে রক্তক্ষরণ, জটিল গর্ভপাত, গর্ভধারণে জটিলতা, ধনুষ্টংকার ও বিলম্বিত প্রসবে মৃত্যু। ইউএসএইডের ২০১৬ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, প্রতি ১০০ জীবিত শিশু জন্মের জন্য মাতৃমৃত্যুর অনুপাত ছিল ১৯৬। এই মাতৃমৃত্যুর ৩৮ শতাংশ প্রসবের দিনে এবং ৬ শতাংশ প্রসবের পর একদিনে ঘটে। মাতৃমৃত্যুর উনিশ শতাংশ বাড়িতে, ৬ শতাংশ সরকারি সুবিধায়, ১৯ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালে ঘটেছে। এদের মধ্যে রক্তক্ষরণ ৪৯ শতাংশ, একলাম্পসিয়ায় ১৩ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটেছে। মাতৃমৃত্যুর একুশ শতাংশ পরোক্ষ কারণে ঘটেছে। ৩১ শতাংশ মৃত্যুর আগে যত্ন চেয়েছিলেন, যার মধ্যে ২৩ শতাংশ বাড়তি থেকে যত্ন চেয়েছিলেন। মাতৃত্বজনিত কারণে মারা যাওয়া তেত্রিশ শতাংশ মহিলা তিন বা ততোধিক বিভিন্ন জায়গা থেকে যত্ন চেয়েছিলেন, যা নির্দেশ করে যে তারা সুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বন্ধ ছিল। পাবলিক ফ্যাসিলিটিতে প্রসব করানো মৃত নারীদের ৮০ শতাংশও পাবলিক ফ্যাসিলিটিতে মারা গেছে। ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, আমরা যখন কোথায় মাতৃমৃত্যু বেশি হচ্ছে এমন তথ্য সংগ্রহ করতে গেছি। সেখানে দেখেছি, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেলিভারি করাতে গিয়ে মৃত্যুর হার কম। সবচেয়ে বেশি মাতৃমৃত্যু হয়েছে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে। আমরা তাই জনগণকে বলছি, বেসরকারি ক্লিনিকে না গিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেন ডেলিভারি করাতে আসে। মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. তৃপ্তি বালা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমার এখানে মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করা হয়। মায়েদের নিয়মিত চেকআপ করা হয়। তাদের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্ধারিত খাবারও দেওয়া হয়। এখানে নর্মাল ডেলিভারি এবং সিজারিয়ান ডেলিভারির ব্যবস্থা আছে। তবে, আমরা নর্মাল ডেলিভারিকে বেশি উৎসাহিত করি। তিনি জানান, ২০২৩ সালে মাতৃত্বকালীন সেবা নিয়েছেন ১১৭৫৯ জন মা। এরমধ্যে নর্মাল ডেলিভারি হয়েছে ১০১৭ জনের। সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছে ২৩১৮ জন মায়ের। তবে, এখানে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এখন আর সেই দিন নেই যে, একজন মায়ের অনেকগুলো সন্তান হলো। এরমধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হলো, কয়েকজন বেঁচে থাকল। এখন প্রতিটি জন্মই অত্যন্ত দামি। প্রতিটি সন্তান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি মা যিনি গর্ভধারণ করছেন সেই মায়ের জীবনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, এখন আর মাতৃমৃত্যুকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি গর্ভধারণ যেন সঠিকভাবে হয়, প্রতিটি সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়া যেন সঠিক থাকে এটা নিয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার একা মাতৃমৃত্যুরোধ করতে পারবে না। এর জন্য পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডাকাতি মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ : লক্ষ্য পূরণে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১০:০০:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০২৪

◉২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুহার হাজারে ৫০ এর নিচে নামানোর লক্ষ্য

◉২০২২ সালে লাখে মারা যান ১৫৩ জন

◉১৯৮৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৪৮ জন

◉মাতৃমৃত্যুরোধে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে- ড. রশীদ-ই-মাহবুব

মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ। টার্গেট রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু হার ৫০-এর নিচে নামিয়ে আনা। সেখানে গত ২০২২ সালে ২০২২ সালে এক লাখে গড়ে ১৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৮৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৪৮ জন। বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে এতে করে এই এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের হাতুড়ে চিকিৎসক-নার্সের উপর নির্ভর না করে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্সের কাছে ডেলিভারি করানোর প্রতিই জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসা বিশ্লেষক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলছেন, শুধু সরকারের একার পক্ষে মাতৃমৃত্যুরোধে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব নয়। এরজন্য পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। তাজমহলের গল্প শোনেনি এমন কোনো কাব্যরসিক বাঙালি পাওয়া ভার। প্রেমীমন মাত্রই জীবনে অন্তত একবার তাজমহল পরিদর্শনে যেতে চান। যার জন্য সম্রাট শাহজাহান ভারতের আগ্রায় তাজমহল তৈরি করেন সেই বেগম মমতাজ মহলের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন সম্রাট শাহজাহানের প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহল। যার স্মৃতিরক্ষার্থে পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান তাজমহল তৈরি করেন; যা দেখতে বিশ্বের লাখো পর্যটক দেশটিতে যান। প্রায় ৬০০ বছর আগে সম্রাজ্ঞীর মৃত সন্তান জন্মদানের সময় হলেও এখনও এই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় বাংলাদেশের নারীদের। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২-এর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর হার ১৫৩। অর্থাৎ এক লাখ জীবিত সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ১৫৩ জন মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, গর্ভধারণ কোনো রোগব্যাধি বা অসুস্থতা নয়, বরং একটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা। সন্তান প্রসবও স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যখন প্রসূতির মৃত্যু হওয়ার কথা নয়। গর্ভধারণকালে, প্রসবের সময় এবং প্রসবের ৪২ দিনের মধ্যে মৃত্যু হলে তা মাতৃমৃত্যু। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অত্যন্ত পরিচিত পরিবার উপনিমগাছি সরকারপাড়ার পরিবার। সেই পরিবারের তৃতীয় সরকারের বড় মেয়ে মেরি। যেমন চটপটে, লেখাপড়ায় তেমনি আগ্রহী। পুরো বংশের প্রথম মেয়ে সন্তান যিনি বাংলায় এমএ শেষ করে যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে সুপারিনটেন্ডেন্ট হিসেবে চাকরি পান। প্রথমে চাকরি, এরপর বিয়ে, তারপর সন্তান গর্ভে ধারণ। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণের শিকার হন। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত দেয়ার সময় ভুল গ্রুপের রক্ত শরীরে প্রবেশ করায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মেরি। সময়টি ১৯৮৭ সাল। এখনও পরিবারের বড় সন্তানের মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই পরিবারের স্বজনরা। ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সাইদুর রহমান। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। তিনি জানান, তারা পাঁচ ভাই চারবোনের পরিবারে সব ছোটবোন ছিল সাজেনুর। কিশোরী বয়সে পরিবার থেকে বোনের বিয়ে দেওয়া হয়। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সেই বোন মৃত্যুবরণ করেন। সন্তান জন্মদানকালে বোনের এই মৃত্যু এখনও তাকে কাঁদায়। তিনি বলেন, তখন তো এত চিকিৎসক, হাসপাতাল ছিল না, থাকলে হয়ত আমার বোনটাকে ওভাবে অকালে ঝরে যেতে হতো না। নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজাহিদুল ইসলামের দ্বিতীয় মেয়ে রেহানা খাতুন। উচ্চশিক্ষিত বাবা গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর মেয়ের বিয়ে দেন। গর্ভাবস্থায় একলাম্পসিয়ায় আক্রান্ত হন রেহানা। মা হতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার। পরিবারের সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল, প্রাণচঞ্চল মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। সেই ১৯৯৮ সালের এই ঘটনার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে পরিবারের স্বজনরা। শুধু সাজেনুর, মেরি বা রেহানা নয়, প্রতিবছর মা হতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করছে বাংলাদেশে এখনও বহু সংখ্যক নারী। যার মধ্যে অনেক মৃত্যুর খবর একেবারেই থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ফুটবল দলের ফুটবলার মোসাম্মৎ রাজিয়া খাতুনের প্রসব-পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যু সচেতন নাগরিকের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। নিজ বাড়িতে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন রাজিয়া। তবে এরপর তার শারীরিক পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে থাকে এবং সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। রাজিয়া খাতুন সন্তান জন্মদানকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুতে আবারও দেশে মাতৃমৃত্যুর বিষয়টি সবার সামনে আসে। এটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ পূরণে কাজ করছে দেশের স্বাস্থ্যবিভাগ। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে এদেশের মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫০ এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ নারী সন্তান জন্মদান করার সময় মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৬৪৮ জন। তা ধীরে ধীরে ২০০১ সালে ৩৫১ জনে নেমে আসে। ২০০২ সালে তা কিছুটা বেড়ে ৩৯১ জন হয়। প্রতি লাখ সন্তান জন্মদানের বিপরীতে ২০২২ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৫৩ জন। ২০২১ সালে এই হার ছিল ১৬৮ জন। ২০২০ সালে এই হার ছিল ১৬৩ জন। সর্বশেষ প্রকাশিত বিবিএসের তথ্যে মাতৃমৃত্যুর সাতটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- প্রসবকালে জটিলতা, প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ, গর্ভকালে রক্তক্ষরণ, জটিল গর্ভপাত, গর্ভধারণে জটিলতা, ধনুষ্টংকার ও বিলম্বিত প্রসবে মৃত্যু। ইউএসএইডের ২০১৬ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, প্রতি ১০০ জীবিত শিশু জন্মের জন্য মাতৃমৃত্যুর অনুপাত ছিল ১৯৬। এই মাতৃমৃত্যুর ৩৮ শতাংশ প্রসবের দিনে এবং ৬ শতাংশ প্রসবের পর একদিনে ঘটে। মাতৃমৃত্যুর উনিশ শতাংশ বাড়িতে, ৬ শতাংশ সরকারি সুবিধায়, ১৯ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালে ঘটেছে। এদের মধ্যে রক্তক্ষরণ ৪৯ শতাংশ, একলাম্পসিয়ায় ১৩ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটেছে। মাতৃমৃত্যুর একুশ শতাংশ পরোক্ষ কারণে ঘটেছে। ৩১ শতাংশ মৃত্যুর আগে যত্ন চেয়েছিলেন, যার মধ্যে ২৩ শতাংশ বাড়তি থেকে যত্ন চেয়েছিলেন। মাতৃত্বজনিত কারণে মারা যাওয়া তেত্রিশ শতাংশ মহিলা তিন বা ততোধিক বিভিন্ন জায়গা থেকে যত্ন চেয়েছিলেন, যা নির্দেশ করে যে তারা সুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বন্ধ ছিল। পাবলিক ফ্যাসিলিটিতে প্রসব করানো মৃত নারীদের ৮০ শতাংশও পাবলিক ফ্যাসিলিটিতে মারা গেছে। ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, আমরা যখন কোথায় মাতৃমৃত্যু বেশি হচ্ছে এমন তথ্য সংগ্রহ করতে গেছি। সেখানে দেখেছি, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেলিভারি করাতে গিয়ে মৃত্যুর হার কম। সবচেয়ে বেশি মাতৃমৃত্যু হয়েছে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে। আমরা তাই জনগণকে বলছি, বেসরকারি ক্লিনিকে না গিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেন ডেলিভারি করাতে আসে। মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. তৃপ্তি বালা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমার এখানে মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করা হয়। মায়েদের নিয়মিত চেকআপ করা হয়। তাদের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্ধারিত খাবারও দেওয়া হয়। এখানে নর্মাল ডেলিভারি এবং সিজারিয়ান ডেলিভারির ব্যবস্থা আছে। তবে, আমরা নর্মাল ডেলিভারিকে বেশি উৎসাহিত করি। তিনি জানান, ২০২৩ সালে মাতৃত্বকালীন সেবা নিয়েছেন ১১৭৫৯ জন মা। এরমধ্যে নর্মাল ডেলিভারি হয়েছে ১০১৭ জনের। সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছে ২৩১৮ জন মায়ের। তবে, এখানে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এখন আর সেই দিন নেই যে, একজন মায়ের অনেকগুলো সন্তান হলো। এরমধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হলো, কয়েকজন বেঁচে থাকল। এখন প্রতিটি জন্মই অত্যন্ত দামি। প্রতিটি সন্তান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি মা যিনি গর্ভধারণ করছেন সেই মায়ের জীবনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই, এখন আর মাতৃমৃত্যুকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি গর্ভধারণ যেন সঠিকভাবে হয়, প্রতিটি সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়া যেন সঠিক থাকে এটা নিয়ে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার একা মাতৃমৃত্যুরোধ করতে পারবে না। এর জন্য পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।