০৬:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সোমালিয়ার জলদস্যুদের দুর্দিন চলছে

কার্গো জাহাজ ছিনতাই। সেই জাহাজের ক্রুদের ধরে সোমালিয়া নিয়ে যাওয়া। এরপর সবাইকে গায়েব করে দেওয়া। পূর্ব আফ্রিকায় একসময় এটি প্রায় চিরায়ত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। আর তাতে জড়িয়ে ছিল সোমালিয়ার জলদস্যুরা। বলতে গেলে তারা জীবিকাই নির্বাহ করে আসছে এভাবে। তবে, এ নিয়ে বেশ বিতর্কও রয়েছে। অনেকেই বলে থাকেন, এসব ছিনতাই হতো অনেকটা রবিনহুড স্টাইলে। সাগরে অবৈধভাবে যারা মাছ ধরছেন, তাদের সর্বস্ব লুট করে গরীবদের বিলিয়ে দিতেন তারা। তবে, এ মতের পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। গত সাত বছর ধরে এ ঘটনা তেমন একটা দেখা যায়নি।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ও মাল্টার পতাকাবাহী এমভি রুয়েন সফলভাবে ছিনতাই করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। যদিও এমভি রুয়েন নিজেদের কবজায় রাখতে পারেনি তারা। এমনকি জলদস্যুরা এখন ভারতে আছেন সাজার অপেক্ষায়। সুদিনের আশায় সাগরে নামা জলদস্যুদের দুর্দিনেই ফিরে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। এর আগে এভাবে একের পর এক জাহাজ ছিনতাই রুখতে ২০১১ সালে সাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। থেমে যেতে হয় জলদস্যুদের। এবার তারা সাগরে ফিরেছেন মূলত কয়েকটি কারণে। এর মধ্যে একটি হলো হুতিদের হামলা।

 

গত ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হয়। এরপর থেকে আরব সাগরসহ বিভিন্ন জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করছে হুতিরা। এতে এসব জাহাজ পথ পরিবর্তন করছে, আর এই সুযোগটা নিচ্ছে জলদস্যুরা। জলদস্যুদের নজরদারি করা যুক্তরাজ্যের মেরিন ট্রেড অপারেশনস বলছে, গত মধ্য ডিসেম্বর থেকে ছিনতাই করে ছয়বার সোমালিয়া বন্দরে আনা হয় বিভিন্ন জাহাজ। বছরখানেক আগে ফ্রান্সের ম্যারিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি এমআইসিএ জানায়, ২০২৩ সালে জলদস্যুদের আবারও উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে। ওই বছর রেকর্ড নয়বার এ ধরনের আক্রমণ হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই পুন্টল্যান্ডের কাছাকাছি নেওয়া হয়। বাংলাদেশের এমভি আবদুল্লাহও সেখানেই রয়েছে বলে জানা গেছে।

 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক ওমর মাহমুদ বলেছেন, অতীতে যেমন হতো, বড় জাহাজ ছিনতাই করার আগে মাছ ধরার ট্রলার কিংবা ছোটখাটো জাহাজ ছিনতাই করতেন জলদস্যুরা। এবারও সেই পথেই এগিয়েছেন তারা। হুতির হামলা রুখতে কার্গো জাহাজগুলো লোহিত সাগরের নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে যাচ্ছে। এতে জলদস্যুদের বরং সুবিধাই হচ্ছে। এছাড়া সোমালিয়ার বর্তমান অবস্থাও জলদস্যুদের স্বরুপে ফিরে আসার আরেকটি কারণ। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনের কারণে উপকূলে নিরাপত্তা কমিয়ে দিয়েছে সরকার।

 

আর এতেই অপরাধের জাল বিস্তার করেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। এ ব্যাপারে পুন্টল্যান্ড ম্যারিন পুলিশের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল একটি জায়গায়। সোমালিয়া উপকূলে মাছ ধরছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইরান ও ইউরোপের মাছ ধরার ট্রলারগুলো। এভাবে মাছ ধরার কারণে সোমালিয়ার জেলেদের জীবিকা নির্বাহ হুমকির মুখে পড়ছে। তবে, সাগরে স্বরুপে ফিরলেও আগের মতোই হয়তো দুর্দিনেই যেতে হচ্ছে জলদস্যুদের। এর কারণ সাগরে বিদেশি নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারি ও যুদ্ধজাহাজের তাড়া। এর আগে ২০১১ সালে জলদস্যুরা সর্বশেষ সুসময় কাটিয়েছিলেন। এবার সেই সময় ফিরতে চেয়েও পারছেন না তারা। ফের দুর্দিনে আপতিত হচ্ছেন। তাদের উপকূলে এখন জাপান, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলের নজরদারি। চলতি শতকের প্রথমদিকে নজরদারিতে এত কড়াকড়ি ছিল না। এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই জলদস্যুদের কার্যক্রম, গতিবিধি ও বণিকদের জাহাজ পর্যবেক্ষণ করছে বিভিন্ন নৌবাহিনী। আর সে তুলনায় তাদের কাছে রয়েছে কেবল সেই মান্দাতার আমলের অস্ত্র ও জাহাজ চালনার কৌশল।

জনপ্রিয় সংবাদ

সোমালিয়ার জলদস্যুদের দুর্দিন চলছে

আপডেট সময় : ০৭:৫৬:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ এপ্রিল ২০২৪

কার্গো জাহাজ ছিনতাই। সেই জাহাজের ক্রুদের ধরে সোমালিয়া নিয়ে যাওয়া। এরপর সবাইকে গায়েব করে দেওয়া। পূর্ব আফ্রিকায় একসময় এটি প্রায় চিরায়ত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। আর তাতে জড়িয়ে ছিল সোমালিয়ার জলদস্যুরা। বলতে গেলে তারা জীবিকাই নির্বাহ করে আসছে এভাবে। তবে, এ নিয়ে বেশ বিতর্কও রয়েছে। অনেকেই বলে থাকেন, এসব ছিনতাই হতো অনেকটা রবিনহুড স্টাইলে। সাগরে অবৈধভাবে যারা মাছ ধরছেন, তাদের সর্বস্ব লুট করে গরীবদের বিলিয়ে দিতেন তারা। তবে, এ মতের পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। গত সাত বছর ধরে এ ঘটনা তেমন একটা দেখা যায়নি।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ও মাল্টার পতাকাবাহী এমভি রুয়েন সফলভাবে ছিনতাই করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। যদিও এমভি রুয়েন নিজেদের কবজায় রাখতে পারেনি তারা। এমনকি জলদস্যুরা এখন ভারতে আছেন সাজার অপেক্ষায়। সুদিনের আশায় সাগরে নামা জলদস্যুদের দুর্দিনেই ফিরে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। এর আগে এভাবে একের পর এক জাহাজ ছিনতাই রুখতে ২০১১ সালে সাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। থেমে যেতে হয় জলদস্যুদের। এবার তারা সাগরে ফিরেছেন মূলত কয়েকটি কারণে। এর মধ্যে একটি হলো হুতিদের হামলা।

 

গত ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হয়। এরপর থেকে আরব সাগরসহ বিভিন্ন জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করছে হুতিরা। এতে এসব জাহাজ পথ পরিবর্তন করছে, আর এই সুযোগটা নিচ্ছে জলদস্যুরা। জলদস্যুদের নজরদারি করা যুক্তরাজ্যের মেরিন ট্রেড অপারেশনস বলছে, গত মধ্য ডিসেম্বর থেকে ছিনতাই করে ছয়বার সোমালিয়া বন্দরে আনা হয় বিভিন্ন জাহাজ। বছরখানেক আগে ফ্রান্সের ম্যারিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি এমআইসিএ জানায়, ২০২৩ সালে জলদস্যুদের আবারও উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে। ওই বছর রেকর্ড নয়বার এ ধরনের আক্রমণ হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই পুন্টল্যান্ডের কাছাকাছি নেওয়া হয়। বাংলাদেশের এমভি আবদুল্লাহও সেখানেই রয়েছে বলে জানা গেছে।

 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক ওমর মাহমুদ বলেছেন, অতীতে যেমন হতো, বড় জাহাজ ছিনতাই করার আগে মাছ ধরার ট্রলার কিংবা ছোটখাটো জাহাজ ছিনতাই করতেন জলদস্যুরা। এবারও সেই পথেই এগিয়েছেন তারা। হুতির হামলা রুখতে কার্গো জাহাজগুলো লোহিত সাগরের নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে যাচ্ছে। এতে জলদস্যুদের বরং সুবিধাই হচ্ছে। এছাড়া সোমালিয়ার বর্তমান অবস্থাও জলদস্যুদের স্বরুপে ফিরে আসার আরেকটি কারণ। সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনের কারণে উপকূলে নিরাপত্তা কমিয়ে দিয়েছে সরকার।

 

আর এতেই অপরাধের জাল বিস্তার করেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। এ ব্যাপারে পুন্টল্যান্ড ম্যারিন পুলিশের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল একটি জায়গায়। সোমালিয়া উপকূলে মাছ ধরছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইরান ও ইউরোপের মাছ ধরার ট্রলারগুলো। এভাবে মাছ ধরার কারণে সোমালিয়ার জেলেদের জীবিকা নির্বাহ হুমকির মুখে পড়ছে। তবে, সাগরে স্বরুপে ফিরলেও আগের মতোই হয়তো দুর্দিনেই যেতে হচ্ছে জলদস্যুদের। এর কারণ সাগরে বিদেশি নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারি ও যুদ্ধজাহাজের তাড়া। এর আগে ২০১১ সালে জলদস্যুরা সর্বশেষ সুসময় কাটিয়েছিলেন। এবার সেই সময় ফিরতে চেয়েও পারছেন না তারা। ফের দুর্দিনে আপতিত হচ্ছেন। তাদের উপকূলে এখন জাপান, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলের নজরদারি। চলতি শতকের প্রথমদিকে নজরদারিতে এত কড়াকড়ি ছিল না। এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই জলদস্যুদের কার্যক্রম, গতিবিধি ও বণিকদের জাহাজ পর্যবেক্ষণ করছে বিভিন্ন নৌবাহিনী। আর সে তুলনায় তাদের কাছে রয়েছে কেবল সেই মান্দাতার আমলের অস্ত্র ও জাহাজ চালনার কৌশল।