০৮:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাউবির পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তনে দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা

❖বাউবির পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তনে দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা
❖ঢাকার বদলে গাজীপুরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা
❖সারা দেশের শিক্ষার্থীদের চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ

 

 

 

বাংলাদেশের হাজারো কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষাকেন্দ্র উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় তাদের পরীক্ষা কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে। এখন থেকে তারা তাদের সব পরীক্ষা কার্যক্রম ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রের পরিবর্তে গাজীপুরে বিশ^বিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আর এতে চরম বিপদে পড়েছে এই বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া লাখো শিক্ষার্থী।

 

বিশ^বিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমএ, এমএসএস শেষ পর্বের পরীক্ষা আগামী ১৯ এপ্রিল শুরু হওয়ার নোটিস দেয়। নোটিসে শুধু আইন বিভাগের পরীক্ষা ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে হওয়ার কথা জানানো হয়। বাকি ৫টি বিষয়ের (বাংলা, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব) পরীক্ষা গাজীপুরে বিশ^বিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়। এই বিষয়টি জানার পরপরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিশ^বিদ্যালয়ের এহেন স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং অবিলম্বে ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে সব পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানায়। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু তারা এই বিষয়টি পরীক্ষা বিভাগের বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে উপাচার্য বরাবর, পরীক্ষার ভেন্যু পূর্বের অর্থাৎ ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে রাখার দাবি জানিয়ে দরখাস্ত জমা দেন। কিন্তু গতকাল বুধবার পর্যন্ত ভেন্যু পরিবর্তনের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দেখা না যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

 

গত ১ এপ্রিল বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীদের উপাচার্য বরাবরে জমা দেওয়া দরখাস্তে দেখা যায়, তারা লিখেছেন, আমরা বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রের এমএসএস (সমাজতত্ত্ব বিভাগ), ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের এবং শেষ পর্বের শিক্ষার্থীবৃন্দ। আমরা প্রথম পর্বের এমএসএস পরীক্ষা ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে অংশগ্রহণ করেছি। বর্তমানে আমরা এমএসএস শেষ পর্বের পরীক্ষার্থী। এখানে আমরা নিয়মিতভাবে ১৩-১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস করেছি। এরই মধ্যে পরীক্ষার রুটিন আমাদের বাউবি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। পরীক্ষার রুটিনে দেখা যায়, গাজীপুর মূল ক্যাম্পাসে আমাদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আমরা যারা এখানে পড়াশুনা করছি সবাই বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এখানে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। আমাদের কেউ বাশঁখালী-চট্রগ্রাম, রাঙামাটি, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, সিলেট, রাজশাহী এবং খুলনা থেকে এসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এছাড়া ঈদের ছুটি থাকায় ২য় সপ্তাহ গাড়ির টিকিট পাওয়া দুষ্কর হবে যা অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় মূল ক্যাম্পাস গাজীপুর এবং প্রকাশিত রুটিন অনুযায়ী ১৯ শে এপ্রিল হতে পরীক্ষা হলে আমাদের অনেকের পক্ষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য যে, ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে আমাদের ক্লাস ও পরীক্ষা হবে জেনেই আমরা ভর্তি হয়েছিলাম। অতএব, মহোদয়ের নিকট আমাদের বিনীত নিবেদন পরীক্ষার রুটিন ১ সপ্তাহ পিছিয়ে এবং ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুব্যবস্থা করতঃ জনাবের সদয় মর্জি হয়। এই দরখাস্তে শিক্ষার্থীদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন, সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন হাসান ও অন্যান্যরা।
২ এপ্রিল পুনঃরুটিন প্রকাশের একটি তথ্য অনলাইনে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, যেখানে দেখা যায়, পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে পিছিয়ে ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু করা হচ্ছে কিন্তু ভেন্যু পূর্বের টিই থাকছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

 

সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সিদ্দীকী ন্যান্সি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে। এখানেই আমরা ক্লাস করেছি। প্রথম পর্বের পরীক্ষাও দিয়েছি। এখন শেষ পর্বের পরীক্ষা দেওয়ার সময় এই বিড়ম্বনায় পড়ব কল্পনাও করিনি। এখন এই বিপদে কেন পড়লাম বুঝতে পারছি না। কর্তৃপক্ষকে বারবার বোঝাচ্ছি। তারা কিছুতেই বুঝতেও চাইছে না। এই অবস্থায় ভীষণ হতাশ আর অভিভাবকহীন বলে মনে হচ্ছে।

 

বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী উম্মে তামিমা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমার অফিস থেকে ছুটি পাওয়া খুবই কঠিন। এটা এমন না যে ছুটি দেবে না। আমার কাজটাই এমন যে আমি ছুটি নিলে অফিসের অসুবিধা হয়। তার উপর আমার কোলে ছোট শিশু। এই অবস্থায় ঢাকায় ক্লাস করব, পরীক্ষা দিব বলে ভর্তি হয়েছি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এখন যদি বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন আচরণ করে তাহলে হয়ত আমরা পরীক্ষাটা দেয়াই হবে না। বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী দীপন বলেন, আমার বাসা চট্টগ্রামের বাঁশখালী। পাশাপাশি আমি চাকরি করি। এতদূর থেকে আমার জন্য ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়াটা যতটা সম্ভব, গাজীপুর গিয়ে পরীক্ষা দেওয়াটা অসম্ভব কঠিন।

 

বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী নাসরিন বলেন, আমি গাজীপুর গেছি যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, প্রো-ভিসি শিক্ষা ও ভিসি স্যার বরাবর দরখাস্ত জমা দেব। যেতে সময় লেগেছে দুই ঘণ্টা। ফিরতে সময় লেগেছে সাড়ে তিন ঘণ্টা। আমরা যখন ডিন স্যারের রুমের স্টাফদের সঙ্গে কথা বলতে গেছি তারা আমাদের বলছে আপনারা এখানে আগের দিন এসে ডরমেটরিতে থাকবেন। পরদিন পরীক্ষা দেবেন। ডরমেটরির একদিনের থাকার ভাড়া ৪০০ টাকা। নাসরিন আক্ষেপ করে বলেন, এরা যে ছাত্রছাত্রীদের কত কোটিপতি মনে করে আল্লাহ জানে। উনাদের কথা শুনে রাগে গা জ¦লে যাচ্ছে। করে সরকারি চাকরি। মাস শেষে গুনে গুনে বেতন পায়। কি করে বুঝবে ছাত্রীদের কষ্ট কি জিনিস।

 

বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী নয়ন বলেন, আমরা যখন প্রথম পর্বের পরীক্ষা দেই আমাদের এক বন্ধু বরিশাল থেকে আসত। সে এসে পরীক্ষা দিয়ে চলে যেত। কারণ সে যে ঢাকায় এসে থাকবে এমন কোনো আর্থিক সংগতি ছিল না।
শিক্ষার্থী নন্দন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা ঢাকায় ক্লাস করব। ঢাকাতেই পরীক্ষা দিব। এজন্যই এখানে ভর্তি হলাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গে ভার্সিটি এটা কি করল বুঝতে পারছি না। এখন আমাদের পক্ষে এই পরীক্ষা দেওয়াটাই অসম্ভব হয়ে যাবে।

 

আরেক শিক্ষার্থী শামিমা বলেন, আমরা ডিন স্যারের সঙ্গে কথা বলতে গেছি, তার স্টাফরা বলে যে, আপনারা গাড়িতে চড়ে চলে আসবেন কোনো সমস্যা হবে না। তারা বিশ^বিদ্যালয়ের গাড়িতে যাতায়াত করে আর আমাদের যেতে হবে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে। তারা আমাদের কষ্ট কি করে বুঝবে বলেন?
শিক্ষার্থী নন্দন জানান, আমরা আমাদের পরীক্ষার তারিখ পেছানো এবং পরীক্ষার ভেন্যু পূর্বের স্থানে রাখার জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর একটি দরখাস্ত দিয়েছি। পাশাপাশি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য বরাবর দরখাস্তের অনুলিপি দিয়েছি। কিন্তু কোন কাজ না হওয়ায় আমরা সত্যি খুবই হতাশায় আছি। এখন কি করব ভাবছি। সম্ভবত আমরা দূর্বার আন্দোলনে যাব।

 

বিশ^বিদ্যালয় সূত্র জানায়, এই বিশ^বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী চায় পরীক্ষা তাদের পূর্বের ভেন্যু ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রেই অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয়ের ডিন মো. জাহাঙ্গীর আলম চান তিনি পরীক্ষা গাজীপুর মূল ক্যাম্পাসেই নেবেন। এ নিয়ে একাধিক বিভাগের শিক্ষকের সঙ্গে তার বাকবিতন্ডাও হয়েছে। তবু তিনি শিক্ষার্থীদের স্বার্থ না দেখে শুধু নিজেদের স্বার্থই দেখছেন। এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য বিশ^বিদ্যালয়ের ডিন মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন করা হলে তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।

 

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৮৬টি একাডেমিক প্রোগ্রাম কার্যক্রম চালু আছে। বিশ^বিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস গাজীপুরে অবস্থিত। ৮৬টি শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। মোট ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি উপ আঞ্চলিক কেন্দ্র আছে এবং অধ্যয়নকেন্দ্র আছে ১৫৪৫টি। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬,৩৭,৫১৩ জন। প্রায় হাজার খানেক শিক্ষার্থী মাস্টার্স শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বাউবির পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তনে দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা

আপডেট সময় : ০৪:৫৭:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৪

❖বাউবির পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তনে দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা
❖ঢাকার বদলে গাজীপুরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা
❖সারা দেশের শিক্ষার্থীদের চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ

 

 

 

বাংলাদেশের হাজারো কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষাকেন্দ্র উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় তাদের পরীক্ষা কার্যক্রমে পরিবর্তন এনেছে। এখন থেকে তারা তাদের সব পরীক্ষা কার্যক্রম ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রের পরিবর্তে গাজীপুরে বিশ^বিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আর এতে চরম বিপদে পড়েছে এই বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া লাখো শিক্ষার্থী।

 

বিশ^বিদ্যালয় সূত্র জানায়, বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমএ, এমএসএস শেষ পর্বের পরীক্ষা আগামী ১৯ এপ্রিল শুরু হওয়ার নোটিস দেয়। নোটিসে শুধু আইন বিভাগের পরীক্ষা ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে হওয়ার কথা জানানো হয়। বাকি ৫টি বিষয়ের (বাংলা, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব) পরীক্ষা গাজীপুরে বিশ^বিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়। এই বিষয়টি জানার পরপরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিশ^বিদ্যালয়ের এহেন স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং অবিলম্বে ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে সব পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানায়। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু তারা এই বিষয়টি পরীক্ষা বিভাগের বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে উপাচার্য বরাবর, পরীক্ষার ভেন্যু পূর্বের অর্থাৎ ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে রাখার দাবি জানিয়ে দরখাস্ত জমা দেন। কিন্তু গতকাল বুধবার পর্যন্ত ভেন্যু পরিবর্তনের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দেখা না যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

 

গত ১ এপ্রিল বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীদের উপাচার্য বরাবরে জমা দেওয়া দরখাস্তে দেখা যায়, তারা লিখেছেন, আমরা বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রের এমএসএস (সমাজতত্ত্ব বিভাগ), ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের এবং শেষ পর্বের শিক্ষার্থীবৃন্দ। আমরা প্রথম পর্বের এমএসএস পরীক্ষা ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে অংশগ্রহণ করেছি। বর্তমানে আমরা এমএসএস শেষ পর্বের পরীক্ষার্থী। এখানে আমরা নিয়মিতভাবে ১৩-১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস করেছি। এরই মধ্যে পরীক্ষার রুটিন আমাদের বাউবি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। পরীক্ষার রুটিনে দেখা যায়, গাজীপুর মূল ক্যাম্পাসে আমাদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আমরা যারা এখানে পড়াশুনা করছি সবাই বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এখানে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। আমাদের কেউ বাশঁখালী-চট্রগ্রাম, রাঙামাটি, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, সিলেট, রাজশাহী এবং খুলনা থেকে এসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এছাড়া ঈদের ছুটি থাকায় ২য় সপ্তাহ গাড়ির টিকিট পাওয়া দুষ্কর হবে যা অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় মূল ক্যাম্পাস গাজীপুর এবং প্রকাশিত রুটিন অনুযায়ী ১৯ শে এপ্রিল হতে পরীক্ষা হলে আমাদের অনেকের পক্ষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য যে, ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে আমাদের ক্লাস ও পরীক্ষা হবে জেনেই আমরা ভর্তি হয়েছিলাম। অতএব, মহোদয়ের নিকট আমাদের বিনীত নিবেদন পরীক্ষার রুটিন ১ সপ্তাহ পিছিয়ে এবং ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুব্যবস্থা করতঃ জনাবের সদয় মর্জি হয়। এই দরখাস্তে শিক্ষার্থীদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন, সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন হাসান ও অন্যান্যরা।
২ এপ্রিল পুনঃরুটিন প্রকাশের একটি তথ্য অনলাইনে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, যেখানে দেখা যায়, পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে পিছিয়ে ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু করা হচ্ছে কিন্তু ভেন্যু পূর্বের টিই থাকছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

 

সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সিদ্দীকী ন্যান্সি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে। এখানেই আমরা ক্লাস করেছি। প্রথম পর্বের পরীক্ষাও দিয়েছি। এখন শেষ পর্বের পরীক্ষা দেওয়ার সময় এই বিড়ম্বনায় পড়ব কল্পনাও করিনি। এখন এই বিপদে কেন পড়লাম বুঝতে পারছি না। কর্তৃপক্ষকে বারবার বোঝাচ্ছি। তারা কিছুতেই বুঝতেও চাইছে না। এই অবস্থায় ভীষণ হতাশ আর অভিভাবকহীন বলে মনে হচ্ছে।

 

বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী উম্মে তামিমা দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমার অফিস থেকে ছুটি পাওয়া খুবই কঠিন। এটা এমন না যে ছুটি দেবে না। আমার কাজটাই এমন যে আমি ছুটি নিলে অফিসের অসুবিধা হয়। তার উপর আমার কোলে ছোট শিশু। এই অবস্থায় ঢাকায় ক্লাস করব, পরীক্ষা দিব বলে ভর্তি হয়েছি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এখন যদি বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন আচরণ করে তাহলে হয়ত আমরা পরীক্ষাটা দেয়াই হবে না। বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী দীপন বলেন, আমার বাসা চট্টগ্রামের বাঁশখালী। পাশাপাশি আমি চাকরি করি। এতদূর থেকে আমার জন্য ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়াটা যতটা সম্ভব, গাজীপুর গিয়ে পরীক্ষা দেওয়াটা অসম্ভব কঠিন।

 

বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী নাসরিন বলেন, আমি গাজীপুর গেছি যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, প্রো-ভিসি শিক্ষা ও ভিসি স্যার বরাবর দরখাস্ত জমা দেব। যেতে সময় লেগেছে দুই ঘণ্টা। ফিরতে সময় লেগেছে সাড়ে তিন ঘণ্টা। আমরা যখন ডিন স্যারের রুমের স্টাফদের সঙ্গে কথা বলতে গেছি তারা আমাদের বলছে আপনারা এখানে আগের দিন এসে ডরমেটরিতে থাকবেন। পরদিন পরীক্ষা দেবেন। ডরমেটরির একদিনের থাকার ভাড়া ৪০০ টাকা। নাসরিন আক্ষেপ করে বলেন, এরা যে ছাত্রছাত্রীদের কত কোটিপতি মনে করে আল্লাহ জানে। উনাদের কথা শুনে রাগে গা জ¦লে যাচ্ছে। করে সরকারি চাকরি। মাস শেষে গুনে গুনে বেতন পায়। কি করে বুঝবে ছাত্রীদের কষ্ট কি জিনিস।

 

বিশ^বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী নয়ন বলেন, আমরা যখন প্রথম পর্বের পরীক্ষা দেই আমাদের এক বন্ধু বরিশাল থেকে আসত। সে এসে পরীক্ষা দিয়ে চলে যেত। কারণ সে যে ঢাকায় এসে থাকবে এমন কোনো আর্থিক সংগতি ছিল না।
শিক্ষার্থী নন্দন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা ঢাকায় ক্লাস করব। ঢাকাতেই পরীক্ষা দিব। এজন্যই এখানে ভর্তি হলাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গে ভার্সিটি এটা কি করল বুঝতে পারছি না। এখন আমাদের পক্ষে এই পরীক্ষা দেওয়াটাই অসম্ভব হয়ে যাবে।

 

আরেক শিক্ষার্থী শামিমা বলেন, আমরা ডিন স্যারের সঙ্গে কথা বলতে গেছি, তার স্টাফরা বলে যে, আপনারা গাড়িতে চড়ে চলে আসবেন কোনো সমস্যা হবে না। তারা বিশ^বিদ্যালয়ের গাড়িতে যাতায়াত করে আর আমাদের যেতে হবে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে। তারা আমাদের কষ্ট কি করে বুঝবে বলেন?
শিক্ষার্থী নন্দন জানান, আমরা আমাদের পরীক্ষার তারিখ পেছানো এবং পরীক্ষার ভেন্যু পূর্বের স্থানে রাখার জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর একটি দরখাস্ত দিয়েছি। পাশাপাশি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য বরাবর দরখাস্তের অনুলিপি দিয়েছি। কিন্তু কোন কাজ না হওয়ায় আমরা সত্যি খুবই হতাশায় আছি। এখন কি করব ভাবছি। সম্ভবত আমরা দূর্বার আন্দোলনে যাব।

 

বিশ^বিদ্যালয় সূত্র জানায়, এই বিশ^বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী চায় পরীক্ষা তাদের পূর্বের ভেন্যু ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রেই অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয়ের ডিন মো. জাহাঙ্গীর আলম চান তিনি পরীক্ষা গাজীপুর মূল ক্যাম্পাসেই নেবেন। এ নিয়ে একাধিক বিভাগের শিক্ষকের সঙ্গে তার বাকবিতন্ডাও হয়েছে। তবু তিনি শিক্ষার্থীদের স্বার্থ না দেখে শুধু নিজেদের স্বার্থই দেখছেন। এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য বিশ^বিদ্যালয়ের ডিন মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন করা হলে তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।

 

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৮৬টি একাডেমিক প্রোগ্রাম কার্যক্রম চালু আছে। বিশ^বিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস গাজীপুরে অবস্থিত। ৮৬টি শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। মোট ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি উপ আঞ্চলিক কেন্দ্র আছে এবং অধ্যয়নকেন্দ্র আছে ১৫৪৫টি। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬,৩৭,৫১৩ জন। প্রায় হাজার খানেক শিক্ষার্থী মাস্টার্স শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে।