রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। যার কারণে, সেখানে রোগী নিয়ে আসা স্বজনদের যেমন বিপদে পড়তে হয় তেমনি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য অফিস স্টাফদের সমস্যায় পড়তে হয়। রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় এই দুর্ভোগ লাঘবের জন্য অবিলম্বে নেটওয়ার্ক সেবা চালুর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ।
রাজধানীর বড় বড় হাসপাতালগুলো যেমনÑ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), জাতীয় বিজ্ঞান ও চক্ষু হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনরা জানিয়েছেন হাসপাতালের ভেতরে বেশিরভাগ স্থানে মোবাইলে ঠিকমতো নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়, যার প্রভাব প্রতিটা কাজের মধ্যে পড়ে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বোনের শ^াশুড়ি স্ট্রোক করায় তাকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে এসেছেন নাসিমা খাতুন। তিনি দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এখানে খুবই সমস্যা মোবাইলে নেটওয়ার্ক থাকে না। এত সমস্যা নেটে কারো সাথে হোয়াটসঅ্যাপে বা মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করা যায় না। ফোন করার জন্য ওয়ার্ড থেকে বাইরে বের হয়ে কথা বলতে হয়। তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা ভালো না। একটু পরপর নার্স ডাকে। মোবাইল নিয়ে বাইরেও যাওয়া যায় না। আবার রুমে থেকেও কাজ হয়না। সবদিকেই সমস্যা। এটা হাসপাতাল, এখানে নেটওয়ার্ক থাকলে খুব উপকার হতো।
নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে, শুধু যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা অসুবিধার সম্মুখীন হন তা নয়, হাসপাতালে কর্মরত সকলেই সমস্যার সম্মুখীন হন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নার্স রেবেকা বলেন, হাসপাতালের ভেতরে যখন থাকি পরিচিত কেউ ফোন করলে মনে করে ইচ্ছে করে ফোন বন্ধ করে রেখেছি। আসলে বিষয়টা এমন নয়। হাসপাতালের সবখানে মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। কিন্তু নিজের মানুষ মনে করে ইচ্ছা করে মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছি। এটা খুবই বড় সমস্যা।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, চিকিৎসা সেবায় যখন ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি সেবায় অভাবনীয় সাফল্য এনে দিচ্ছে সেই সময় ঢাকার অতি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালসমূহে ফোরজি বা চতুর্থ প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। গত এক সপ্তাহে আমরা একটি পর্যবেক্ষণ টিম রাজধানীর বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবা পর্যবেক্ষণ করেছে। ঢাকার জনগুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় যে ক’টি চিকিৎসা কেন্দ্র বা হাসপাতাল রয়েছে তা রাজধানীতেই আর এসব হাসপাতাল ভবনের ৮৫ ভাগ স্থানে পাওয়া যায় না ফোরজি ইন্টারনেট সেবা। টুজি সেবা পাওয়া গেলেও সেটিও মানসম্পন্ন নয়। অসুস্থ রোগীরা ও তাদের স্বজনরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বেশ বিড়ম্বনার সম্মুখীন হচ্ছে। ডাক্তারদের চেম্বারে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা থাকায় তাদের চেম্বারে তারা ইন্টারনেট সেবা পেলেও ডাক্তাররা যখন রাউন্ডে থাকেন তখন তারা ইন্টারনেট সেবার বাইরে থাকেন। দেশের স্বাস্থ্য খাতে যখন সরকার আধুনিক উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার জন্য দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব আরোপ করছেন সে সময় জনগুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্রে ইন্টারনেট সেবা না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার রোগী রাজধানী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের সঙ্গে পরিবার পরিজন আত্মীয়-স্বজন সবাই উৎকণ্ঠায় থাকেন এবং অর্থ লেনদেনের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই টেলিযোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সেবা হাসপাতালগুলোর জন্য এবং গ্রাহকদের কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। আর এই মাধ্যমটি যখন অকার্যকর থাকে তখন বর্তমান সময়ে গ্রাহকরা হতাশাগ্রস্ত হয়। পর্যবেক্ষণকালে অনেক রোগীর আত্মীয়-স্বজন আমাদের কাছে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দ্রুততার সঙ্গে আহ্বান জানান। একইভাবে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান। আমরা বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ বিধায় গণমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ করে মেডিক্যাল কলেজ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং কর্তৃপক্ষকে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি লায়ন সাব্বির আহমেদ হাজরা বলেন, হাসপাতালের এই সমস্যাটা আমরা অনেকের কাছেই অভিযোগ শুনেছি। এরপর সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জরিপ করা হয়েছে। আমরা এর আগেও দেখেছি নগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত না। তখন সে স্থানগুলোর কথা বলার পর মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধান করেছে। যেমন বায়তুল মোকাররমে নেটওয়ার্কের এই সমস্যা ছিল। এখন হাসপাতালের বিষয়ে আমরা কথা বলছি। আশা করছি, জিপি, রবি এই কোম্পানিগুলো নেটওয়ার্ক সমস্যার দ্রুত সমাধান করবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের তথ্যমতে, দেশে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৯১.৩৮ মিলিয়ন মোবাইল ব্যবহারকারী রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ ফোন ব্যবহার করে ৪৩ শতাংশ ব্যবহারকারী, রবি ব্যবহার করে ৩১ শতাংশ, বাংলা লিংক ব্যবহার করে ২৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব মোবাইল কোম্পানি টেলিটক ব্যবহার করে মাত্র তিন শতাংশ ব্যবহারকারী।




















