০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বেপরোয়া সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি

  • ৩ বছরে শিক্ষার্থীসহ ১৩ জনের প্রাণহানি
  • চালকদের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সনদ
  • আইনি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতার অভাবে বাড়ছে দুর্ঘটনা

ট্রাফিক আইনের কোনো বিধি-বিধানই মানছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির চালকরা। ক্রমেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ভারী এ যানবাহন চালাচ্ছেন সিটি করপোরেশনের অদক্ষ হেলপার, মশককর্মী, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নকর্মী এবং অফিস সহায়করা। ময়লাবাহী এসব গাড়ির চাপায় গত তিন বছরে অন্তত ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার মুগদা এলাকায় ডিএসসিসি’র ময়লাবাহী গাড়ির চাপায় মো. মাহিন আহমেদ নামের সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তদন্ত কমিটি হলেও এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশনের চালকদের অনেকেরই নেই ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স। এরই মধ্যেই সড়কে প্রাণহানির প্রতিবাদে কয়েক দফা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ-সমাবেশও করেছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ নানান শ্রেণিপেশার মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত এড়াতে পর্যাপ্ত সুপারিশও করেছে বিভিন্ন সংগঠন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা না থাকায় বারবারই পার পেয়ে যাচ্ছেন দুর্ঘটনায় জড়িত চালকরা। এর ফলে  প্রতিনিয়তই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা। একই সঙ্গে দুই সিটি করপোরেশনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাও কোনো অংশে দায়ী কম নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন করেছিল শিক্ষার্থীরা। তীব্র গণআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি সংস্থাগুলো বলেছিল, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। কিন্তু রাজধানীর সড়ক পরিস্থিতি দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুলে যাওয়া চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন সড়কে ঝরছে প্রাণ। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি কমিটি করা হয়। ওই বছরের আগস্টে কমিটি বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়। ঢাকায় অবস্থিত সব সংস্থার আওতাধীন যানবাহন এবং কর্মচারীরা যেন ট্রাফিক আইন মেনে চলে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থার প্রধানদের বিষয়টি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় ৭ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ মোড়ে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন বাসসের সংবাদকর্মী খালিদ। এপ্রিলে যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচায় নিহত হন এক রিকশাচালক। তখন ক্ষুব্ধ লোকজন ময়লার গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০২১ সালের মে মাসে শাহজাহানপুর এলাকায় ময়লার গাড়ির চাপায় একজন এবং ৯ আগস্ট শ্যামপুরের দোলাইরপাড় এলাকায় পোশাককর্মী নিহত হন। ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে প্রাণ হারান নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসান। পরদিন ২৫ নভেম্বর দুপুরে পান্থপথ এলাকায় সংবাদকর্মী আহসান কবির খানের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে ময়লার গাড়ি দুর্ঘটনায় অন্তত চারজন মারা যান। ওই বছরের ২ এপ্রিল খিলগাঁওয়ে ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন নাসরিন খানম। ২৩ জানুয়ারি মহাখালীতে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নকর্মী শিখা রাণী ঘরামি। একই বছরের জুলাইয়ে মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজের সামনে প্রাণ হারায় সাব্বির আহমেদ নামের এক তরুণ। ওই বছরের ৩১ মে রাতে মুগদার টিটিপাড়া মোড়ে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন পথচারী নাজমা বেগম। ২০২৩ সালের ৬ মার্চ ডিএনসিসি ময়লাবাহী গাড়িচাপায় মারা যান আবু তৈয়ব (২৬) নামের একজন কাপড় ব্যবসায়ী। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নাঈমের মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেন। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর ওয়ারী এলাকায় ময়লার গাড়ির ধাক্কায় স্বপন কুমার সরকার নামের আরেকজন নিহত হন। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মুগদা এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। ওই শিক্ষার্থীর নাম মাহিন আহমেদ (১৩)। মাহিন মতিঝিল সরকারি আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিহত শিক্ষার্থীর ভাই মাহফুজ আহমেদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ঘটনার সময় মুগদায় নিজ বাসার অদুরে আমার ভাই মাহিন তার এক বন্ধুর বাসায় যাবে বলে বাসা থেকে বের হয়। সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী দ্রুতগতির একটি গাড়ি আমার ভাইকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে সে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল পরে রাত সাড়ে ১০টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে সেখানে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত মাহিন ছিলেন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার মো. মাসুম আহমেদের ছেলে। বর্তমানে মুগদার মামা-ভাগনে গলিতে পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতো। তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। একই দিন দিবাগত গভীর রাতে গেন্ডারিয়া থানা এলাকায় অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় অজ্ঞাতনামা (৬০) এক নারী নিহত হয়েছেন। এতো মৃত্যুর পরও টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। বছরের পর বছর এমন কাণ্ড ঘটে চললেও সিটি করপোরেশন জেনেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নগরবিদ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মতে, এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মূলত সিটি করপোরেশনের বর্জ্য পরিবহনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা। একাধিক দুর্ঘটনার তদন্তে সংস্থাটির পরিবহন বিভাগের অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম ও গাড়িচালকের গাফিলতি ছিল বলে উঠে এসেছে। সিটি করপোরেশনের গাড়িচালকদের নিজেদের অনুকূলে বরাদ্দ থাকা গাড়ি বহিরাগত লোকদের দিয়ে চালানোরও অভিযোগ রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্যানুসারে, হতাহত ব্যক্তিদের বড় অংশ কর্মক্ষম। দেশে গত তিন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৩ শতাংশই শিক্ষার্থী। গত তিন মাসে দিনে গড়ে দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে সড়কে। এরপরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি, বরং আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পরিবহন পুল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, সংস্থা দুটিতে এখনো দক্ষ চালকের অভাব রয়েছে।

গত কয়েক বছরে দুই সিটিতে কিছু চালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো চালকের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ২০২১ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) দিনের বেলায় ময়লাবাহী গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে বর্জ্য সরানোর কাজ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে ঘোষণা দিয়েই দায় সেরেছে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। এখনো দিনের বেলায় বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় চলছে। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পর ২০২০ সালের আগস্টে সন্ধ্যার পর বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করার নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহের সার্বিক কাজ শেষ করার কথা ছিল।

কিন্তু অনেক ওয়ার্ডেই এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। গতকাল শুক্রবার এ বিষয়ে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান এবং প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাছিম আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউই ফোন ধরেননি। তবে দুই সিটির কর্মকর্তারা জানান, গত প্রায় ছয় বছরে সংস্থার চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে আলাদা করে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বরং সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির চালকদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বেপরোয়া যান চালানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো নয়া ঘাতক হিসেবে দেখা দিয়েছে। এগুলো দুর্ঘটনা না, অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলোতে সব ধরনের অব্যবস্থাপনা বিদ্যমান। এসব ভারী যানবাহনের ফিটনেস সনদ নেই, দক্ষ চালক নেই। সিটি করপোরেশনের জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এমন দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বাড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিসিবি পরিচালক পদত্যাগ না করলে ক্রিকেট বর্জনের আলটিমেটাম

বেপরোয়া সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি

আপডেট সময় : ১২:০৭:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৪
  • ৩ বছরে শিক্ষার্থীসহ ১৩ জনের প্রাণহানি
  • চালকদের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সনদ
  • আইনি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতার অভাবে বাড়ছে দুর্ঘটনা

ট্রাফিক আইনের কোনো বিধি-বিধানই মানছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির চালকরা। ক্রমেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ভারী এ যানবাহন চালাচ্ছেন সিটি করপোরেশনের অদক্ষ হেলপার, মশককর্মী, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নকর্মী এবং অফিস সহায়করা। ময়লাবাহী এসব গাড়ির চাপায় গত তিন বছরে অন্তত ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার মুগদা এলাকায় ডিএসসিসি’র ময়লাবাহী গাড়ির চাপায় মো. মাহিন আহমেদ নামের সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তদন্ত কমিটি হলেও এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশনের চালকদের অনেকেরই নেই ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স। এরই মধ্যেই সড়কে প্রাণহানির প্রতিবাদে কয়েক দফা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ-সমাবেশও করেছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ নানান শ্রেণিপেশার মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত এড়াতে পর্যাপ্ত সুপারিশও করেছে বিভিন্ন সংগঠন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা না থাকায় বারবারই পার পেয়ে যাচ্ছেন দুর্ঘটনায় জড়িত চালকরা। এর ফলে  প্রতিনিয়তই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা। একই সঙ্গে দুই সিটি করপোরেশনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাও কোনো অংশে দায়ী কম নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন করেছিল শিক্ষার্থীরা। তীব্র গণআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি সংস্থাগুলো বলেছিল, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। কিন্তু রাজধানীর সড়ক পরিস্থিতি দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুলে যাওয়া চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন সড়কে ঝরছে প্রাণ। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি কমিটি করা হয়। ওই বছরের আগস্টে কমিটি বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়। ঢাকায় অবস্থিত সব সংস্থার আওতাধীন যানবাহন এবং কর্মচারীরা যেন ট্রাফিক আইন মেনে চলে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থার প্রধানদের বিষয়টি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় ৭ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ মোড়ে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন বাসসের সংবাদকর্মী খালিদ। এপ্রিলে যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচায় নিহত হন এক রিকশাচালক। তখন ক্ষুব্ধ লোকজন ময়লার গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০২১ সালের মে মাসে শাহজাহানপুর এলাকায় ময়লার গাড়ির চাপায় একজন এবং ৯ আগস্ট শ্যামপুরের দোলাইরপাড় এলাকায় পোশাককর্মী নিহত হন। ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে প্রাণ হারান নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসান। পরদিন ২৫ নভেম্বর দুপুরে পান্থপথ এলাকায় সংবাদকর্মী আহসান কবির খানের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে ময়লার গাড়ি দুর্ঘটনায় অন্তত চারজন মারা যান। ওই বছরের ২ এপ্রিল খিলগাঁওয়ে ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন নাসরিন খানম। ২৩ জানুয়ারি মহাখালীতে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নকর্মী শিখা রাণী ঘরামি। একই বছরের জুলাইয়ে মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজের সামনে প্রাণ হারায় সাব্বির আহমেদ নামের এক তরুণ। ওই বছরের ৩১ মে রাতে মুগদার টিটিপাড়া মোড়ে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন পথচারী নাজমা বেগম। ২০২৩ সালের ৬ মার্চ ডিএনসিসি ময়লাবাহী গাড়িচাপায় মারা যান আবু তৈয়ব (২৬) নামের একজন কাপড় ব্যবসায়ী। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নাঈমের মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেন। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর ওয়ারী এলাকায় ময়লার গাড়ির ধাক্কায় স্বপন কুমার সরকার নামের আরেকজন নিহত হন। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মুগদা এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে। ওই শিক্ষার্থীর নাম মাহিন আহমেদ (১৩)। মাহিন মতিঝিল সরকারি আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিহত শিক্ষার্থীর ভাই মাহফুজ আহমেদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ঘটনার সময় মুগদায় নিজ বাসার অদুরে আমার ভাই মাহিন তার এক বন্ধুর বাসায় যাবে বলে বাসা থেকে বের হয়। সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী দ্রুতগতির একটি গাড়ি আমার ভাইকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে সে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল পরে রাত সাড়ে ১০টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে সেখানে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত মাহিন ছিলেন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার মো. মাসুম আহমেদের ছেলে। বর্তমানে মুগদার মামা-ভাগনে গলিতে পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতো। তিন ভাই, এক বোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। একই দিন দিবাগত গভীর রাতে গেন্ডারিয়া থানা এলাকায় অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় অজ্ঞাতনামা (৬০) এক নারী নিহত হয়েছেন। এতো মৃত্যুর পরও টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। বছরের পর বছর এমন কাণ্ড ঘটে চললেও সিটি করপোরেশন জেনেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নগরবিদ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মতে, এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মূলত সিটি করপোরেশনের বর্জ্য পরিবহনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা। একাধিক দুর্ঘটনার তদন্তে সংস্থাটির পরিবহন বিভাগের অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম ও গাড়িচালকের গাফিলতি ছিল বলে উঠে এসেছে। সিটি করপোরেশনের গাড়িচালকদের নিজেদের অনুকূলে বরাদ্দ থাকা গাড়ি বহিরাগত লোকদের দিয়ে চালানোরও অভিযোগ রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্যানুসারে, হতাহত ব্যক্তিদের বড় অংশ কর্মক্ষম। দেশে গত তিন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৩ শতাংশই শিক্ষার্থী। গত তিন মাসে দিনে গড়ে দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে সড়কে। এরপরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি, বরং আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পরিবহন পুল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, সংস্থা দুটিতে এখনো দক্ষ চালকের অভাব রয়েছে।

গত কয়েক বছরে দুই সিটিতে কিছু চালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো চালকের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ২০২১ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) দিনের বেলায় ময়লাবাহী গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে বর্জ্য সরানোর কাজ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে ঘোষণা দিয়েই দায় সেরেছে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। এখনো দিনের বেলায় বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় চলছে। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পর ২০২০ সালের আগস্টে সন্ধ্যার পর বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করার নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহের সার্বিক কাজ শেষ করার কথা ছিল।

কিন্তু অনেক ওয়ার্ডেই এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। গতকাল শুক্রবার এ বিষয়ে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান এবং প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাছিম আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউই ফোন ধরেননি। তবে দুই সিটির কর্মকর্তারা জানান, গত প্রায় ছয় বছরে সংস্থার চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে আলাদা করে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বরং সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির চালকদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে বেপরোয়া যান চালানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো নয়া ঘাতক হিসেবে দেখা দিয়েছে। এগুলো দুর্ঘটনা না, অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলোতে সব ধরনের অব্যবস্থাপনা বিদ্যমান। এসব ভারী যানবাহনের ফিটনেস সনদ নেই, দক্ষ চালক নেই। সিটি করপোরেশনের জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এমন দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বাড়বে।