০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ডিবির অভিযোগ অস্বীকার গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের

◉ প্রশ্ন ফাঁস ফল বিভ্রাট ও জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে সচেতন মহলে তোলপাড়
◉ বিভ্রাটের পর সংশোধিত ফলে উত্তীর্ণ বেড়ে দ্বিগুণ
◉ক্ষোভ ও হতাশায় সাধারণ চাকরি প্রার্থীরা
◉ যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট মহলে অনিশ্চয়তা
◉ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও পরীক্ষা বাতিল দাবি
◉প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও ফাঁস হয়নি দাবি মন্ত্রণালয়ের
◉ফল বিভ্রাটের জন্য বুয়েট কর্তৃপক্ষকে দায়ী করলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না মন্ত্রণালয়

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ শেষে এখন উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। তবে এ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, ফল প্রকাশে বিভ্রাট ও জালিয়াতিসহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এরইমধ্যে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরসঙ্গে জড়িতদের খুঁজছে গোয়েন্দারা। আর সংশোধিত ফলাফল প্রকাশের নামে প্রথমবারের চেয়ে দ্বিগুণ পরীক্ষার্থীকে উত্তীণ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে সাধারণ চাকরি প্রার্থীদের মাঝে। সংশ্লিষ্ট মহলে এ পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন অনিশ্চিত বলে মনে করছেন অনেকে। সূত্রমতে, বিতর্কিত এ পরীক্ষায় যোগ্য অনেক প্রার্থী যেমন বাদ পড়েছেন, তেমনি অনেক অযোগ্য প্রার্থীও দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় অবিলম্বে এ পরীক্ষা ও ফলাফল বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা গ্রহণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি নিয়োগ পরীক্ষাগুলো পিএসসির অধীনে গ্রহণেরও দাবি করেছেন অনেকে। অবশ্য যারা প্রকৃত মেধায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তারা কোনোভাবেই এ পরীক্ষার ফল বাতিলের পক্ষে নন। আর পরীক্ষায় একটি চক্র ডিভাইস ব্যবহার করলেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এছাড়া ফল বিভ্রাটের জন্য বুয়েটকে দায়ী করলেও তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। গত ২১ এপ্রিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাজস্ব খাতে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৩-এর ৩য় গ্রুপের (৩টি পার্বত্য জেলা ব্যতীত ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ২১ টি জেলা) লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। পরীক্ষায় ২৩ হাজার ৫৭ জন উত্তীর্ণ হন বলে ওই দিন বিকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকাশিত ফলাফলে মেঘনা ও যমুনা সেটের পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নে কারিগরি ত্রুটি পরিলক্ষিত হওয়ায় তাদের উত্তরপত্র আইআইসিটি, বুয়েটের কারিগরি টিম এরই মধ্যে পুনঃমূল্যায়ন কাজ শুরু করেছে। রাত ১২টার মধ্যে সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করা হবে বলেও জানানো হয়। সে অনুযায়ী রাত একটা ২১ মিনিটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংশোধিত ফল প্রকাশের কথা জানানো হয়। এতে ৪৬ হাজার ১৯৯ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। অর্থাৎ সংশোধিত ফলে ২৩ হাজার ১৪২ জন বেশি উত্তীর্ণ হন। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ জুন এ নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ২৯ মার্চ এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার্থী ছিলেন ৩ লাখ ৪৯ হাজার ২৯৩ জন। এ পরীক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৩ নামের একটি ফেসবুক পেজের এক স্ট্যাটাসে বলা হয়েছে- ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। শুধু ডিজিটাল ডিভাইস না, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা ও তার সহকারী। জড়িত আছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিছন্নকর্মী পরিদর্শক। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি করা হয়। স্ট্যাটাসে আরও বলা হয়, পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। সম্ভবত ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এই কাজ করানো হয়েছে। এটা শুধু ৩য় ধাপে নয়, আগের ২টিতেও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ একজন এমন করেছেন। তার জানামাতে, ৩৫ জন পরীক্ষার্থীকে আগের দিন একত্রিত করে প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল। সবগুলো পরীক্ষা বাতিল করা হোক। এদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক। সংশ্লিষ্টরা জানান, যোগ্য প্রার্থী বাছাই ও বেকারদের বিশ্বস্তের জায়গা পিএসসি। প্রাইমারিসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর জবের পরীক্ষাগুলো পিএসসির অধীনে হওয়া উচিত। সাদিয়া মেহেরিন রেণু নামের একজন জানান, আর যারা প্রশ্ন না পেয়েও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের নিয়েও ভাবা উচিত। অনেকে আছে দিন- রাত পরিশ্রম করে সফল হয়েছে কিছু দুর্নীতিবাজের কারণে তাদের জীবনও নষ্ট হতে যাচ্ছে ভাইভা বোর্ডে। শিউলি আক্তার নামের একজন ফেসবুক কমেন্টে বলেন, ‘প্রশ্ন আউট হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভালো হয়েছে। টাকা নিয়েছে প্রশ্ন আউট করেছে। এখন কর্তৃপক্ষ কী করবে। হাজার হাজার মেধাবী বঞ্চিত হবে, আর অযোগ্যরা স্কুলে গিয়ে কী শেখাবে। স্কুলে গিয়ে ঘুমাবে। মাথার উকুন মারাবে এ ছাড়া যা পড়াবে তা আর কি বলবো। যতোই প্রমাণ থাক তবুও পরীক্ষা বাতিল করবে না। নুরে আলম রুবেল নামের একজনের মন্তব্য- মি-ি নমাম লজ্জাবোধ যদি থাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের, তাহলে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা পুনরায় আয়োজন করা উচিত। যেখানে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণসহ নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করা হয়, সেখানে ভাইবার আয়োজন করাটা একটা বেহায়াপনা ছাড়া আর কিছু না। তৃষ্ণা রানী নামের একজন মন্তব্য করেন- প্রমাণ হওয়ার পরেও কেন পরীক্ষা বাতিল হয়নি। কেমন দেশে বাস করছি আমরা। এদেশের আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছুই রইল না। কেন তাহলে পরীক্ষাটা নিলো? তাদের নিজেদের লোকদেরকে নিয়োগ দিয়ে দিলেই তো হয়। কেন বেকারদের সঙ্গে এমন করল? শুধুমাত্র কটা টাকার জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান করে দিল? ছিঃ ছিঃ ধিক্কার জানাই এই ব্যবস্থাকে। শত শত বেকারদের স্বপ্নটাকেই ভেঙে দিল। আমাদের তো আর পরীক্ষা দেওয়ার বয়সও নাই। আরেকজন দাবি করে এর দায়ভার বুয়েটের। কর্তৃপক্ষের উচিত বুয়েটকে আর প্রশ্ন করতে না দেওয়া। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান হতো জগন্নাথ হলে: এদিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবি বলছে, এই চক্রের হোতা অসিম গাইন। তার হয়ে প্রশ্নের সমাধান করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দুই শিক্ষার্থী। তারা ঢাবির জগন্নাথ হলে বসে এ পরীক্ষার প্রশ্নের সমাধান করতেন। পরীক্ষা শুরুর আগেই মোবাইলের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যেত সেসব সমাধান করা প্রশ্ন। গত ২১ এপ্রিল ঢাবির ক্যাম্পাস থেকে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জ্যোতির্ময় গাইন ও সুজন চন্দ্র গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ। তারা দুজনেই ঢাবির জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তাদের দুই দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকিদের তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করে ডিবি। পরে ২৪ এপ্রিল মাদারী- পুর থেকে পরীক্ষার্থী মনিষ গাইন, পঙ্কজ গাইন ও লাভলী মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরমধ্যে মনিষ ও পংকজকে পুলিশ হেফাজতে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। আর লাভলীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ২৫ এপ্রিল রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, গত ২৯ মার্চ পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নের উত্তরপত্র ও ডিভাইসসহ মাদারীপুরে সাতজন ও রাজবাড়ীতে একজন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। দুটি ঘটনায় পৃথক মামলা করেন সংশ্লিষ্টরা।

এর মধ্যে রাজবাড়ীতে আটক হওয়া পরীক্ষার্থী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তারা ডিবিকে জানায়, পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন তারা। প্রশ্ন প্রতি ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময় সমাধান করিয়ে নেন চক্রের হোতা অসিম গাইন। এ প্রস্তাবে জ্যোতির্ময় ও সুজনসহ সাতজন জগন্নাথ হলের জ্যোতির্ময়গুহ ঠাকুরতা ভবনের ২২৪ রুমে বসে প্রশ্নের সমাধান করে পাঠান। চাকরির বয়স শেষের দিকে এমন পরীক্ষার্থীদের টার্গেট করে তাদের সঙ্গে দুই থেকে তিনমাস আগ থেকেই যোগাযোগ শুরু করে চক্রটি। তাদের পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি করত। পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগেই প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষার্থীদের কাছে পাঠিয়ে দিত অসিম। তাদের সমাধান করে দেওয়া প্রশ্নের মধ্যে ৭২ থেকে ৭৫টি সঠিক থাকত। তিনি বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। জড়িত কেউ ছাড় পাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে ডিবি প্রধানের বক্তব্য প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ বহন করে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন। গতকাল তিনি সবুজ বাংলাকে বলেন, পরীক্ষায় ডিভাইসের ব্যবহার হয়েছে, প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। কারণ পরীক্ষার পরে ডিভাইসে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ফল প্রকাশে বিভ্রাটের বিষয়ে মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তুহিন বলেন, ফল বিভ্রাটের দায় বুয়েটের। তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের চুক্তি রয়েছে। এটা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ফল প্রকাশের পর স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী মৌখিক পরীক্ষাসহ পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে পরীক্ষা বা প্রকাশিত ফল বাতিলের কোনো আশঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে বিয়য়টিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে জানতে গতকাল দুপুরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের মোবাইলে (ওয়েবসাইটে উল্লেখিত নম্বর) যোগাযোগ করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত পবিপ্রবি?

ডিবির অভিযোগ অস্বীকার গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের

আপডেট সময় : ১২:১৩:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৪

◉ প্রশ্ন ফাঁস ফল বিভ্রাট ও জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে সচেতন মহলে তোলপাড়
◉ বিভ্রাটের পর সংশোধিত ফলে উত্তীর্ণ বেড়ে দ্বিগুণ
◉ক্ষোভ ও হতাশায় সাধারণ চাকরি প্রার্থীরা
◉ যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট মহলে অনিশ্চয়তা
◉ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও পরীক্ষা বাতিল দাবি
◉প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও ফাঁস হয়নি দাবি মন্ত্রণালয়ের
◉ফল বিভ্রাটের জন্য বুয়েট কর্তৃপক্ষকে দায়ী করলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না মন্ত্রণালয়

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ শেষে এখন উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। তবে এ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, ফল প্রকাশে বিভ্রাট ও জালিয়াতিসহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এরইমধ্যে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরসঙ্গে জড়িতদের খুঁজছে গোয়েন্দারা। আর সংশোধিত ফলাফল প্রকাশের নামে প্রথমবারের চেয়ে দ্বিগুণ পরীক্ষার্থীকে উত্তীণ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে সাধারণ চাকরি প্রার্থীদের মাঝে। সংশ্লিষ্ট মহলে এ পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন অনিশ্চিত বলে মনে করছেন অনেকে। সূত্রমতে, বিতর্কিত এ পরীক্ষায় যোগ্য অনেক প্রার্থী যেমন বাদ পড়েছেন, তেমনি অনেক অযোগ্য প্রার্থীও দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় অবিলম্বে এ পরীক্ষা ও ফলাফল বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা গ্রহণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি নিয়োগ পরীক্ষাগুলো পিএসসির অধীনে গ্রহণেরও দাবি করেছেন অনেকে। অবশ্য যারা প্রকৃত মেধায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তারা কোনোভাবেই এ পরীক্ষার ফল বাতিলের পক্ষে নন। আর পরীক্ষায় একটি চক্র ডিভাইস ব্যবহার করলেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এছাড়া ফল বিভ্রাটের জন্য বুয়েটকে দায়ী করলেও তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। গত ২১ এপ্রিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাজস্ব খাতে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৩-এর ৩য় গ্রুপের (৩টি পার্বত্য জেলা ব্যতীত ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ২১ টি জেলা) লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। পরীক্ষায় ২৩ হাজার ৫৭ জন উত্তীর্ণ হন বলে ওই দিন বিকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকাশিত ফলাফলে মেঘনা ও যমুনা সেটের পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নে কারিগরি ত্রুটি পরিলক্ষিত হওয়ায় তাদের উত্তরপত্র আইআইসিটি, বুয়েটের কারিগরি টিম এরই মধ্যে পুনঃমূল্যায়ন কাজ শুরু করেছে। রাত ১২টার মধ্যে সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করা হবে বলেও জানানো হয়। সে অনুযায়ী রাত একটা ২১ মিনিটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংশোধিত ফল প্রকাশের কথা জানানো হয়। এতে ৪৬ হাজার ১৯৯ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। অর্থাৎ সংশোধিত ফলে ২৩ হাজার ১৪২ জন বেশি উত্তীর্ণ হন। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ জুন এ নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ২৯ মার্চ এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার্থী ছিলেন ৩ লাখ ৪৯ হাজার ২৯৩ জন। এ পরীক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৩ নামের একটি ফেসবুক পেজের এক স্ট্যাটাসে বলা হয়েছে- ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। শুধু ডিজিটাল ডিভাইস না, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা ও তার সহকারী। জড়িত আছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিছন্নকর্মী পরিদর্শক। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি করা হয়। স্ট্যাটাসে আরও বলা হয়, পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। সম্ভবত ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এই কাজ করানো হয়েছে। এটা শুধু ৩য় ধাপে নয়, আগের ২টিতেও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ একজন এমন করেছেন। তার জানামাতে, ৩৫ জন পরীক্ষার্থীকে আগের দিন একত্রিত করে প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল। সবগুলো পরীক্ষা বাতিল করা হোক। এদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক। সংশ্লিষ্টরা জানান, যোগ্য প্রার্থী বাছাই ও বেকারদের বিশ্বস্তের জায়গা পিএসসি। প্রাইমারিসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর জবের পরীক্ষাগুলো পিএসসির অধীনে হওয়া উচিত। সাদিয়া মেহেরিন রেণু নামের একজন জানান, আর যারা প্রশ্ন না পেয়েও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের নিয়েও ভাবা উচিত। অনেকে আছে দিন- রাত পরিশ্রম করে সফল হয়েছে কিছু দুর্নীতিবাজের কারণে তাদের জীবনও নষ্ট হতে যাচ্ছে ভাইভা বোর্ডে। শিউলি আক্তার নামের একজন ফেসবুক কমেন্টে বলেন, ‘প্রশ্ন আউট হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভালো হয়েছে। টাকা নিয়েছে প্রশ্ন আউট করেছে। এখন কর্তৃপক্ষ কী করবে। হাজার হাজার মেধাবী বঞ্চিত হবে, আর অযোগ্যরা স্কুলে গিয়ে কী শেখাবে। স্কুলে গিয়ে ঘুমাবে। মাথার উকুন মারাবে এ ছাড়া যা পড়াবে তা আর কি বলবো। যতোই প্রমাণ থাক তবুও পরীক্ষা বাতিল করবে না। নুরে আলম রুবেল নামের একজনের মন্তব্য- মি-ি নমাম লজ্জাবোধ যদি থাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের, তাহলে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা পুনরায় আয়োজন করা উচিত। যেখানে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণসহ নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করা হয়, সেখানে ভাইবার আয়োজন করাটা একটা বেহায়াপনা ছাড়া আর কিছু না। তৃষ্ণা রানী নামের একজন মন্তব্য করেন- প্রমাণ হওয়ার পরেও কেন পরীক্ষা বাতিল হয়নি। কেমন দেশে বাস করছি আমরা। এদেশের আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছুই রইল না। কেন তাহলে পরীক্ষাটা নিলো? তাদের নিজেদের লোকদেরকে নিয়োগ দিয়ে দিলেই তো হয়। কেন বেকারদের সঙ্গে এমন করল? শুধুমাত্র কটা টাকার জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান করে দিল? ছিঃ ছিঃ ধিক্কার জানাই এই ব্যবস্থাকে। শত শত বেকারদের স্বপ্নটাকেই ভেঙে দিল। আমাদের তো আর পরীক্ষা দেওয়ার বয়সও নাই। আরেকজন দাবি করে এর দায়ভার বুয়েটের। কর্তৃপক্ষের উচিত বুয়েটকে আর প্রশ্ন করতে না দেওয়া। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান হতো জগন্নাথ হলে: এদিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবি বলছে, এই চক্রের হোতা অসিম গাইন। তার হয়ে প্রশ্নের সমাধান করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দুই শিক্ষার্থী। তারা ঢাবির জগন্নাথ হলে বসে এ পরীক্ষার প্রশ্নের সমাধান করতেন। পরীক্ষা শুরুর আগেই মোবাইলের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যেত সেসব সমাধান করা প্রশ্ন। গত ২১ এপ্রিল ঢাবির ক্যাম্পাস থেকে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জ্যোতির্ময় গাইন ও সুজন চন্দ্র গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ। তারা দুজনেই ঢাবির জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তাদের দুই দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকিদের তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি করে ডিবি। পরে ২৪ এপ্রিল মাদারী- পুর থেকে পরীক্ষার্থী মনিষ গাইন, পঙ্কজ গাইন ও লাভলী মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরমধ্যে মনিষ ও পংকজকে পুলিশ হেফাজতে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। আর লাভলীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ২৫ এপ্রিল রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, গত ২৯ মার্চ পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নের উত্তরপত্র ও ডিভাইসসহ মাদারীপুরে সাতজন ও রাজবাড়ীতে একজন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। দুটি ঘটনায় পৃথক মামলা করেন সংশ্লিষ্টরা।

এর মধ্যে রাজবাড়ীতে আটক হওয়া পরীক্ষার্থী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তারা ডিবিকে জানায়, পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন তারা। প্রশ্ন প্রতি ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময় সমাধান করিয়ে নেন চক্রের হোতা অসিম গাইন। এ প্রস্তাবে জ্যোতির্ময় ও সুজনসহ সাতজন জগন্নাথ হলের জ্যোতির্ময়গুহ ঠাকুরতা ভবনের ২২৪ রুমে বসে প্রশ্নের সমাধান করে পাঠান। চাকরির বয়স শেষের দিকে এমন পরীক্ষার্থীদের টার্গেট করে তাদের সঙ্গে দুই থেকে তিনমাস আগ থেকেই যোগাযোগ শুরু করে চক্রটি। তাদের পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি করত। পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগেই প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষার্থীদের কাছে পাঠিয়ে দিত অসিম। তাদের সমাধান করে দেওয়া প্রশ্নের মধ্যে ৭২ থেকে ৭৫টি সঠিক থাকত। তিনি বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। জড়িত কেউ ছাড় পাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে ডিবি প্রধানের বক্তব্য প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ বহন করে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন। গতকাল তিনি সবুজ বাংলাকে বলেন, পরীক্ষায় ডিভাইসের ব্যবহার হয়েছে, প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। কারণ পরীক্ষার পরে ডিভাইসে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ফল প্রকাশে বিভ্রাটের বিষয়ে মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তুহিন বলেন, ফল বিভ্রাটের দায় বুয়েটের। তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের চুক্তি রয়েছে। এটা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ফল প্রকাশের পর স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী মৌখিক পরীক্ষাসহ পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে পরীক্ষা বা প্রকাশিত ফল বাতিলের কোনো আশঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে বিয়য়টিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে জানতে গতকাল দুপুরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের মোবাইলে (ওয়েবসাইটে উল্লেখিত নম্বর) যোগাযোগ করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।