০৬:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের তাগিদ আসন্ন বাজেটে

🟠বাজেটের আকার কমিয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ আইএমএফের
🟠আসন্ন বাজেটে আড়াই লাখ কোটি টাকা ঋণ নেবে সরকার

🟠আসছে অর্থবছরে সতর্কতামূলক বাজেটের বিকল্প নেই- ড. জাহিদ হোসেন, অর্থনীতিবিদ
🟠বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে খুব বেশি ঋণ করা ঠিক হবে না আহসান এইচ মনসুর, অর্থনীতিবিদ
🟠অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে জরুরি মাহবুব আহমেদ, সাবেক অর্থসচিব
🟠বাজেটের সুবিধা নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে হলে প্রথমে লুটপাট বন্ধ করতে হবে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, প্রাক্তন এমডি, অগ্রণী ব্যাংক

নানা সংকটে দেশের অর্থনীতি। এ সংকট একদিকে দেশীয়, আরেকদিকে বৈশ্বিক। সামষ্টিক অর্থনীতির এমন কোনো সূচক নেই, যা ইতিবাচক। ভুল পরিকল্পনার ফাঁদে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আর এমন পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা চলছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে। আসন্ন বাজেটে সতর্কতার সঙ্গে আকার ছোট করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ এখন চলমান। অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার পরিকল্পনা করছেন।
এবারের বাজেটে আকার বাড়লেও ঋণ থাকবে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। তবে সূত্রগুলো জানায়, নতুন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

সূত্র বলছে, এক বাজেট বৈঠকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে। বলা হয়, সুদের হার যে এখন বাড়ছে, তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) একই জায়গায় আটকে আছে দেশ। রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও আশানুরূপ নয়। আবার আছে ভর্তুকির বাড়তি চাপ।
এদিকে আসন্ন বাজেট নিয়ে নানা হিসাব কষছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকও করেছে ইতোমধ্যে। বাজেট তৈরি হওয়ার অনেক আগেই আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে তারা মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেন। এবারেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে এবার আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সফর মূলত ঋণ পাওয়ার শর্ত নিয়ে আলোচনা হলেও বাজেটের ব্যাপারে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ কমেনি। বরং বাজেটের আকার কী হবে, বাজেটে কী ধরনের, কোথায় কোথায় শুল্ক ছাড় দেওয়া হচ্ছে তা খতিয়ে শুধু দেখছে না। বরং বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ প্রতিনিধি দল প্রথমেই আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রাথমিকভাবে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করলেও আইএমএফ পরামর্শ দিচ্ছে আকার কমাতে। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি কমানো ও রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি তারা ভর্তুকির পরিমাণ কমানোর তাগিদ দিয়েছে। যে কারণে সরকার বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর ব্যাপারে একমত হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল এবার বাজেটের জন্য একটি ভালো পরামর্শ দিয়েছে। তা হলো, দরিদ্রদের ভাতা বাড়ানো। বিদ্যমান ভাতার পরিমাণ কোনোটা ৫০০, আবার কোনোটা ৫৫০ ও ৬০০ টাকা হলেও আইএমএফ চাইছে এ ভাতার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা হোক। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর ব্যাপারে আইএমএফ প্রতিনিধির এ সুপারিশ বা পরামর্শ ইতিমধ্যে সরকারের মন্ত্রিসভা কমিটিতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১১৫টি কর্মসূচি রয়েছে। আগামী অর্থবছরের তেমন কর্মসূচি বাড়ছে না। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৩৩টি শিল্প খাতে কর অবকাশ তুলে নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। এসব শিল্প বিগত ১০ বছর ধরে অবকাশ সুবিধা পেয়ে আসছে। আয়কর আইনে উল্লেখ রয়েছে, উৎপাদন খাতের কর অবকাশ ২০২৫ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ আগামী বছরের জুনে তা শেষ হয়ে যাবে। তবে এ মেয়াদের পর যেন আর নবায়ন না করা হয় সে ব্যাপারে আইএমএফের বিশেষ তাগিদ রয়েছে। তবে রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইএমএফের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও তিন বছরের মধ্যে সব ধরনের কর ছাড় বাতিল করার তাগিদ রয়েছে। যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজেটের বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, আগামী ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের জন্য এফবিসিসিআইর বাজেট প্রস্তাবনা প্রণয়নের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন থেকে বেশ কিছু প্রস্তাবনা আমরা পেয়েছি, যেগুলো যাচাই-বাছাইপূর্বক এফবিসিসিআইর প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়ে কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে এফবিসিসিআই কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও এফবিসিসিআইর আয়কর, আমদানি শুল্ক ও মূসক বিষয়ে মৌলিক প্রস্তাবনা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, মূসক ও শুল্ক বিষয়ক বাজেট টাস্কফোর্সে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আসন্ন বাজেট সম্পর্কে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে জরুরি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়েছে, ঋণের সুদহারের সীমা তুলে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের সঙ্গে সংকোচনমূলক রাজস্ব নীতি নেওয়া জরুরি ছিল।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার যেটা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে খুব বেশি ঋণ করা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের চাহিদা বিবেচনা করতে হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য সতর্কতামূলক বাজেটের বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি মন্তব্য করেন, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নাজুক। এছাড়া দীর্ঘসময় ধরে চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ। আছে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট। আর্থিক খাত দুর্দশাগ্রস্ত। জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুর্বল। পাশাপাশি বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে যে টিম রয়েছে সেটিও একেবারেই নতুন। তাদের প্রথম বাজেট তৈরির অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি নির্বাচনের পর বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় নির্বাচনি ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। অন্যদিকে অর্থনীতির যে অবস্থা এতে খুব বেশি উচ্চাভিলাষী বাজেট তৈরির সুযোগ নেই বললেই চলে।

অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, বাজেটের সুবিধা নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে হলে প্রথমে লুটপাট বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে। অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে ভঙ্গুর ব্যাংক খাত। কমিয়ে আনতে হবে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের তাগিদ আসন্ন বাজেটে

আপডেট সময় : ০৬:৫৫:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ মে ২০২৪

🟠বাজেটের আকার কমিয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ আইএমএফের
🟠আসন্ন বাজেটে আড়াই লাখ কোটি টাকা ঋণ নেবে সরকার

🟠আসছে অর্থবছরে সতর্কতামূলক বাজেটের বিকল্প নেই- ড. জাহিদ হোসেন, অর্থনীতিবিদ
🟠বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে খুব বেশি ঋণ করা ঠিক হবে না আহসান এইচ মনসুর, অর্থনীতিবিদ
🟠অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে জরুরি মাহবুব আহমেদ, সাবেক অর্থসচিব
🟠বাজেটের সুবিধা নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে হলে প্রথমে লুটপাট বন্ধ করতে হবে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, প্রাক্তন এমডি, অগ্রণী ব্যাংক

নানা সংকটে দেশের অর্থনীতি। এ সংকট একদিকে দেশীয়, আরেকদিকে বৈশ্বিক। সামষ্টিক অর্থনীতির এমন কোনো সূচক নেই, যা ইতিবাচক। ভুল পরিকল্পনার ফাঁদে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আর এমন পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা চলছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে। আসন্ন বাজেটে সতর্কতার সঙ্গে আকার ছোট করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ এখন চলমান। অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার পরিকল্পনা করছেন।
এবারের বাজেটে আকার বাড়লেও ঋণ থাকবে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। তবে সূত্রগুলো জানায়, নতুন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

সূত্র বলছে, এক বাজেট বৈঠকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে। বলা হয়, সুদের হার যে এখন বাড়ছে, তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) একই জায়গায় আটকে আছে দেশ। রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও আশানুরূপ নয়। আবার আছে ভর্তুকির বাড়তি চাপ।
এদিকে আসন্ন বাজেট নিয়ে নানা হিসাব কষছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকও করেছে ইতোমধ্যে। বাজেট তৈরি হওয়ার অনেক আগেই আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে তারা মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেন। এবারেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে এবার আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সফর মূলত ঋণ পাওয়ার শর্ত নিয়ে আলোচনা হলেও বাজেটের ব্যাপারে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ কমেনি। বরং বাজেটের আকার কী হবে, বাজেটে কী ধরনের, কোথায় কোথায় শুল্ক ছাড় দেওয়া হচ্ছে তা খতিয়ে শুধু দেখছে না। বরং বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ প্রতিনিধি দল প্রথমেই আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রাথমিকভাবে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করলেও আইএমএফ পরামর্শ দিচ্ছে আকার কমাতে। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি কমানো ও রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি তারা ভর্তুকির পরিমাণ কমানোর তাগিদ দিয়েছে। যে কারণে সরকার বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর ব্যাপারে একমত হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল এবার বাজেটের জন্য একটি ভালো পরামর্শ দিয়েছে। তা হলো, দরিদ্রদের ভাতা বাড়ানো। বিদ্যমান ভাতার পরিমাণ কোনোটা ৫০০, আবার কোনোটা ৫৫০ ও ৬০০ টাকা হলেও আইএমএফ চাইছে এ ভাতার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা হোক। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর ব্যাপারে আইএমএফ প্রতিনিধির এ সুপারিশ বা পরামর্শ ইতিমধ্যে সরকারের মন্ত্রিসভা কমিটিতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১১৫টি কর্মসূচি রয়েছে। আগামী অর্থবছরের তেমন কর্মসূচি বাড়ছে না। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৩৩টি শিল্প খাতে কর অবকাশ তুলে নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। এসব শিল্প বিগত ১০ বছর ধরে অবকাশ সুবিধা পেয়ে আসছে। আয়কর আইনে উল্লেখ রয়েছে, উৎপাদন খাতের কর অবকাশ ২০২৫ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ আগামী বছরের জুনে তা শেষ হয়ে যাবে। তবে এ মেয়াদের পর যেন আর নবায়ন না করা হয় সে ব্যাপারে আইএমএফের বিশেষ তাগিদ রয়েছে। তবে রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইএমএফের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও তিন বছরের মধ্যে সব ধরনের কর ছাড় বাতিল করার তাগিদ রয়েছে। যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজেটের বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, আগামী ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের জন্য এফবিসিসিআইর বাজেট প্রস্তাবনা প্রণয়নের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন থেকে বেশ কিছু প্রস্তাবনা আমরা পেয়েছি, যেগুলো যাচাই-বাছাইপূর্বক এফবিসিসিআইর প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়ে কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে এফবিসিসিআই কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও এফবিসিসিআইর আয়কর, আমদানি শুল্ক ও মূসক বিষয়ে মৌলিক প্রস্তাবনা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, মূসক ও শুল্ক বিষয়ক বাজেট টাস্কফোর্সে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আসন্ন বাজেট সম্পর্কে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে জরুরি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়েছে, ঋণের সুদহারের সীমা তুলে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের সঙ্গে সংকোচনমূলক রাজস্ব নীতি নেওয়া জরুরি ছিল।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার যেটা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে খুব বেশি ঋণ করা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের চাহিদা বিবেচনা করতে হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য সতর্কতামূলক বাজেটের বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। তিনি মন্তব্য করেন, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নাজুক। এছাড়া দীর্ঘসময় ধরে চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ। আছে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট। আর্থিক খাত দুর্দশাগ্রস্ত। জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুর্বল। পাশাপাশি বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে যে টিম রয়েছে সেটিও একেবারেই নতুন। তাদের প্রথম বাজেট তৈরির অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি নির্বাচনের পর বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় নির্বাচনি ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সেগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। অন্যদিকে অর্থনীতির যে অবস্থা এতে খুব বেশি উচ্চাভিলাষী বাজেট তৈরির সুযোগ নেই বললেই চলে।

অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, বাজেটের সুবিধা নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে হলে প্রথমে লুটপাট বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে। অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে ভঙ্গুর ব্যাংক খাত। কমিয়ে আনতে হবে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ।