০৭:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সফলতা নিয়ে কাটছে না অনিশ্চয়তা

◉ক্লাসে মানা হচ্ছে না কারিকুলামের যথাযথ নিয়ম
◉এখনো প্রশিক্ষণের বাইরে বহু শিক্ষক
◉সঠিক নির্দেশনা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা
◉অ্যাসাইনমেন্ট-গ্রুপ ওয়ার্কে বাড়ছে অনলাইন নির্ভরতা
◉দেড় বছরের মাথায় পরিবর্তন আসছে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে
◉কর্তৃপক্ষের মনিটরিং জোরদারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

শিক্ষায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে গত বছর থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলছে নতুন কারিকুলামে। প্রথম বছর তিনটি এবং চলতি বছর চারটিসহ স্কুল-মাদ্রাসার মোট ৭টি শ্রেণিতে এই শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে নতুন কারিকুলাম। এতে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতার পরিবর্তে উপস্থাপনা ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কমানো হয়েছে পাঠ্যপুস্তকের পরিমাণ, বাতিল করা হয়েছে আগের সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি। তবে নতুন এই কারিকুলাম নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক দেখা দেয় সংশ্লিষ্ট মহলে, যা এখনও অব্যাহত আছে। তাছাড়া যে উদ্যেশ্য নিয়ে এই কারিকুলাম চালু হয়েছে, নানা জটিলতার কারণে আদৌ তা সফলতার মুখ দেখবে কি না- তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এমনকি আগের বিভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতির ন্যায় নতুন এই কারিকুলামের স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কায় আছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

সংশ্লিষ্টদের অভিমত-কারিকুলামটি আধুনিক হলেও এদেশের প্রেক্ষাপটে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাছাড়া এতে নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক লেখাপড়ার গতি থেমে গেছে। অবশ্য পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া ও ভালো ফল বা রোল নম্বরের প্রথম দিকে থাকার সেই প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। একই সঙ্গে বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ফেলের তেমন কোনো অপশন এবং একক কোনো কৃতিত্ব দেখানোর সুযোগ না থাকার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কিছুটা সংশোধনী আনা হচ্ছে। তবে এতেও খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না অভিভাবক মহল।

 

এখন পর্যন্ত এই কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন বেশিরভাগ শিক্ষক ও অভিভাবক। কারণ শিক্ষকরাই এখনো নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারেননি। এখনো অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি। ফলে তারা শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো বোঝাতে বা নির্দেশনা দিতে পারছেন না। যে যার মতো করে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। আর গ্রুপ ওয়ার্ক ও হোম ওয়ার্কের নামে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততার পাশাপাশি অভিভাবকদের ভোগান্তিও বেড়েছে। কারণ অধিকাংশ স্কুলের ক্লাসে শিক্ষকরা অ্যাসাইনমেন্ট বা গ্রুপ ওয়ার্কের বিষয়ে সঠিক কোনো নির্দেশনা দিচ্ছে না। এ বিষয়ে পাঠ্যবইয়েও বিস্তারিত কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গুগল-ইউটিউব সহ অনলাইনের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে তারা। অনেকে আবার কোচিং-প্রাইভেট শিক্ষকদের মাধ্যমে ক্লাসের কাজ সমাধা করছে।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের একজন শিক্ষক জানান, কারিকুলামটি অনেক ভালো। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনা শক্তি অনেক বাড়ছে। তবে এ বিষয়ে সব শিক্ষক এখনো প্রশিক্ষণ পাননি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরও ক্লাসে যেতে অনেক স্টাডি করতে হচ্ছে। সবার প্রশিক্ষণ শেষ করে এটি চালু করলে ভালো হতো। মফস্বলের স্কুলগুলোর জন্য এটি আরও কঠিন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ৭ জুলাই ষন্মাসিক মূল্যায়ন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো আমরা পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুই জানি না। সব স্কুলে এটা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না- সে বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিং নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রাজধানীর একটি স্কুলে ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, শিক্ষকরা ক্লাসে কোনো নির্দেশনা দিচ্ছেন না। এতে ভালো শিক্ষার্থীরাও অবমূল্যায়িত হচ্ছে বা লেখাপড়ার গতি হারাচ্ছে। শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রিত কোচিংয়ের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা উপস্থাপনায় পারদর্শী হলেও অ্যাসাইনমেন্ট ও দলীয় কাজে গুগল-ইউটিউব নির্ভর হচ্ছে। এতে সঠিক তথ্য শেখা অনিশ্চিত হচ্ছে।

নতুন কারিকুলামের সার্বিক বিষয় নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, বিভিন্ন স্কুলের অস্থায়ী কিছু শিক্ষক ছাড়া প্রায় সবাই নতুন কারিকুলামের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ প্রশিক্ষণ এখনো চলমান আছে। তবে মাদ্রাসা ও কারিগরির যেসব বিষয় পরিবর্তন হয়নি সেগুলোর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন না থাকায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, নতুন কারিকুলাম মফস্বলের স্কুলগুলোতে ঠিকমতো বাস্তবায়ন হলেও শহরের তথাকথিত নামি স্কলগুলোতে সমস্যা করা হচ্ছে। সেখানকার শিক্ষকরা কারিকুলাম সম্পর্কে নানা ভয় দেখাচ্ছেন। আসলে এসব স্কুলের শিক্ষকরা আগেও ক্লাসে পড়াতেন না, ফাঁকি দিতেন, এখনও একই কাজ করছেন। তা না হলে ভালো স্কুলে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হয়। তাদের কেন প্রাইভেট-কোচিং পড়া লাগে? নতুন কারিকুলাম ঠিক মতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না- তা দেখার জন্য অন্যান্য স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী মাউশি ও বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন জানিয়ে এ বিষয়ে মনিটরিং আরও জোরদার করা দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রসঙ্গে এনসিটিবির এই কর্মকর্তা বলেন, সামস্টিক মূল্যায়নের লিখিত ও কার্যক্রম অংশ আগে সমান ছিল। এখন লিখিত অংশ ৬৫ শতাংশ এবং কার্যক্রমভিত্তিক অংশ ৩৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার জন্য এটা ঠিক করা হলেও সব ক্লাসেই এই একই পদ্ধতি চালু হবে। চলতি মাসের মধ্যেই এটির চূড়ান্ত অনুমোদন হবে বলে জানান তিনি।

সূত্রমতে, গত সোমবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ নিয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। সভায় মন্ত্রণালয়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, এনসিটিবি সংশোধিত মূল্যায়ন পদ্ধতির সুপারিশটিতে দ্রুত আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষ করলে এটিকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পূর্বনির্ধারিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় তোলা হবে। সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী লিখিত ও কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়ন মিলিয়ে সময়টি পাঁচ ঘণ্টাই রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যায়ন পদ্ধতিটি দ্রুত চূড়ান্ত করা উচিত। কারণ, বর্তমানে যারা নবম শ্রেণিতে পড়ে, তারা নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষা দেবে। নবম শ্রেণিতে তাদের অধ্যয়নকাল পাঁচ মাস চলছে। কিন্তু তাদের এসএসসি পরীক্ষার মূল্যায়ন কেমন করে হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও একই অবস্থা।

নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন (শুক্রবার ও শনিবার) করা হয়েছে। ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা রাখা হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা নেই। প্রাথমিক শ্রেণিতে সবার জন্য ৮টি বই এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ১০টি বই পড়তে হচ্ছে। শুধু এসএসসি তে গিয়ে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা হবে। নবম শ্রেণিতে তথা এসএসসি পর্যায়ে কোনো বিভাগ থাকছে না। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির দুইটি পাবলিক পরীক্ষার সমন্বয়ে ফলাফল হওয়ার কথা রয়েছে।

সফলতা নিয়ে কাটছে না অনিশ্চয়তা

আপডেট সময় : ০৮:০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪

◉ক্লাসে মানা হচ্ছে না কারিকুলামের যথাযথ নিয়ম
◉এখনো প্রশিক্ষণের বাইরে বহু শিক্ষক
◉সঠিক নির্দেশনা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা
◉অ্যাসাইনমেন্ট-গ্রুপ ওয়ার্কে বাড়ছে অনলাইন নির্ভরতা
◉দেড় বছরের মাথায় পরিবর্তন আসছে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে
◉কর্তৃপক্ষের মনিটরিং জোরদারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

শিক্ষায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে গত বছর থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলছে নতুন কারিকুলামে। প্রথম বছর তিনটি এবং চলতি বছর চারটিসহ স্কুল-মাদ্রাসার মোট ৭টি শ্রেণিতে এই শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে নতুন কারিকুলাম। এতে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতার পরিবর্তে উপস্থাপনা ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কমানো হয়েছে পাঠ্যপুস্তকের পরিমাণ, বাতিল করা হয়েছে আগের সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি। তবে নতুন এই কারিকুলাম নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক দেখা দেয় সংশ্লিষ্ট মহলে, যা এখনও অব্যাহত আছে। তাছাড়া যে উদ্যেশ্য নিয়ে এই কারিকুলাম চালু হয়েছে, নানা জটিলতার কারণে আদৌ তা সফলতার মুখ দেখবে কি না- তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এমনকি আগের বিভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতির ন্যায় নতুন এই কারিকুলামের স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কায় আছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

সংশ্লিষ্টদের অভিমত-কারিকুলামটি আধুনিক হলেও এদেশের প্রেক্ষাপটে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাছাড়া এতে নানা জটিলতা দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক লেখাপড়ার গতি থেমে গেছে। অবশ্য পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া ও ভালো ফল বা রোল নম্বরের প্রথম দিকে থাকার সেই প্রতিযোগিতা বন্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। একই সঙ্গে বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ফেলের তেমন কোনো অপশন এবং একক কোনো কৃতিত্ব দেখানোর সুযোগ না থাকার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কিছুটা সংশোধনী আনা হচ্ছে। তবে এতেও খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না অভিভাবক মহল।

 

এখন পর্যন্ত এই কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন বেশিরভাগ শিক্ষক ও অভিভাবক। কারণ শিক্ষকরাই এখনো নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারেননি। এখনো অনেক শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি। ফলে তারা শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো বোঝাতে বা নির্দেশনা দিতে পারছেন না। যে যার মতো করে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। আর গ্রুপ ওয়ার্ক ও হোম ওয়ার্কের নামে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততার পাশাপাশি অভিভাবকদের ভোগান্তিও বেড়েছে। কারণ অধিকাংশ স্কুলের ক্লাসে শিক্ষকরা অ্যাসাইনমেন্ট বা গ্রুপ ওয়ার্কের বিষয়ে সঠিক কোনো নির্দেশনা দিচ্ছে না। এ বিষয়ে পাঠ্যবইয়েও বিস্তারিত কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গুগল-ইউটিউব সহ অনলাইনের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে তারা। অনেকে আবার কোচিং-প্রাইভেট শিক্ষকদের মাধ্যমে ক্লাসের কাজ সমাধা করছে।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের একজন শিক্ষক জানান, কারিকুলামটি অনেক ভালো। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনা শক্তি অনেক বাড়ছে। তবে এ বিষয়ে সব শিক্ষক এখনো প্রশিক্ষণ পাননি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরও ক্লাসে যেতে অনেক স্টাডি করতে হচ্ছে। সবার প্রশিক্ষণ শেষ করে এটি চালু করলে ভালো হতো। মফস্বলের স্কুলগুলোর জন্য এটি আরও কঠিন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ৭ জুলাই ষন্মাসিক মূল্যায়ন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু এখনো আমরা পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুই জানি না। সব স্কুলে এটা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না- সে বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো পর্যবেক্ষণ বা মনিটরিং নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রাজধানীর একটি স্কুলে ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, শিক্ষকরা ক্লাসে কোনো নির্দেশনা দিচ্ছেন না। এতে ভালো শিক্ষার্থীরাও অবমূল্যায়িত হচ্ছে বা লেখাপড়ার গতি হারাচ্ছে। শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রিত কোচিংয়ের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা উপস্থাপনায় পারদর্শী হলেও অ্যাসাইনমেন্ট ও দলীয় কাজে গুগল-ইউটিউব নির্ভর হচ্ছে। এতে সঠিক তথ্য শেখা অনিশ্চিত হচ্ছে।

নতুন কারিকুলামের সার্বিক বিষয় নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, বিভিন্ন স্কুলের অস্থায়ী কিছু শিক্ষক ছাড়া প্রায় সবাই নতুন কারিকুলামের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ প্রশিক্ষণ এখনো চলমান আছে। তবে মাদ্রাসা ও কারিগরির যেসব বিষয় পরিবর্তন হয়নি সেগুলোর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন না থাকায় তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, নতুন কারিকুলাম মফস্বলের স্কুলগুলোতে ঠিকমতো বাস্তবায়ন হলেও শহরের তথাকথিত নামি স্কলগুলোতে সমস্যা করা হচ্ছে। সেখানকার শিক্ষকরা কারিকুলাম সম্পর্কে নানা ভয় দেখাচ্ছেন। আসলে এসব স্কুলের শিক্ষকরা আগেও ক্লাসে পড়াতেন না, ফাঁকি দিতেন, এখনও একই কাজ করছেন। তা না হলে ভালো স্কুলে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হয়। তাদের কেন প্রাইভেট-কোচিং পড়া লাগে? নতুন কারিকুলাম ঠিক মতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না- তা দেখার জন্য অন্যান্য স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী মাউশি ও বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন জানিয়ে এ বিষয়ে মনিটরিং আরও জোরদার করা দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রসঙ্গে এনসিটিবির এই কর্মকর্তা বলেন, সামস্টিক মূল্যায়নের লিখিত ও কার্যক্রম অংশ আগে সমান ছিল। এখন লিখিত অংশ ৬৫ শতাংশ এবং কার্যক্রমভিত্তিক অংশ ৩৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার জন্য এটা ঠিক করা হলেও সব ক্লাসেই এই একই পদ্ধতি চালু হবে। চলতি মাসের মধ্যেই এটির চূড়ান্ত অনুমোদন হবে বলে জানান তিনি।

সূত্রমতে, গত সোমবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ নিয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। সভায় মন্ত্রণালয়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, এনসিটিবি সংশোধিত মূল্যায়ন পদ্ধতির সুপারিশটিতে দ্রুত আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষ করলে এটিকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পূর্বনির্ধারিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় তোলা হবে। সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী লিখিত ও কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়ন মিলিয়ে সময়টি পাঁচ ঘণ্টাই রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যায়ন পদ্ধতিটি দ্রুত চূড়ান্ত করা উচিত। কারণ, বর্তমানে যারা নবম শ্রেণিতে পড়ে, তারা নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষা দেবে। নবম শ্রেণিতে তাদের অধ্যয়নকাল পাঁচ মাস চলছে। কিন্তু তাদের এসএসসি পরীক্ষার মূল্যায়ন কেমন করে হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও একই অবস্থা।

নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন (শুক্রবার ও শনিবার) করা হয়েছে। ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা রাখা হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা নেই। প্রাথমিক শ্রেণিতে সবার জন্য ৮টি বই এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ১০টি বই পড়তে হচ্ছে। শুধু এসএসসি তে গিয়ে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা হবে। নবম শ্রেণিতে তথা এসএসসি পর্যায়ে কোনো বিভাগ থাকছে না। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির দুইটি পাবলিক পরীক্ষার সমন্বয়ে ফলাফল হওয়ার কথা রয়েছে।