বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর জন্মস্থান দিনাজপুরে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে যিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক ও স্নেহশীল—সে কথাই উঠে এসেছে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের স্মৃতিচারণে।
খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়ি দিনাজপুর শহরের পৌর এলাকার বালুবাড়িতে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। মায়ের নামানুসারেই বাড়িটির নাম রাখা হয় ‘তৈয়বা ভিলা’। শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে এই বাড়িতেই। বর্তমানে সেখানে পরিবারের কেউ বসবাস না করলেও তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দিনভর সেখানে ভিড় করেন বিএনপির নেতাকর্মী ও স্থানীয় মানুষ।

খালেদা জিয়ার খালাতো ভাই আবু তাহের আবু বলেন, ‘তিনি আমাদের কাছে শুধু একজন বড় নেত্রী নন, ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। নিকটজনদের তিনি “তুই” করে ডাকতেন।’ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে দিনাজপুরে এসে খালেদা জিয়া তাঁকে আদর করে ডাকেন—‘কিরে পটল, কেমন আছিস?’ তাঁর মতে, ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি আপনজনদের কথা ভুলে যাননি, সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।
আবু তাহের আরও জানান, সর্বশেষ ২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর গোর-এ-শহীদ ময়দানে এক জনসভায় অংশ নিতে দিনাজপুরে এসেছিলেন খালেদা জিয়া। এর আগে ২০০৮ সালে মায়ের মৃত্যুর সময়ও তিনি জন্মভূমিতে এসেছিলেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দিনাজপুর জেলা বিএনপির কার্যালয় ও বালুবাড়ির পৈতৃক নিবাসে কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই জেল রোডের দলীয় কার্যালয়ে ভিড় করেন নেতাকর্মীরা। জেলার বিভিন্ন স্থানে চলছে স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা ও শোক প্রকাশ।
শিক্ষাজীবনের শুরুটাও হয়েছিল দিনাজপুরেই। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি দিনাজপুর মিশন স্কুলে ভর্তি হন। পরে ১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখান থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক নাজমা ইয়াসমিন বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া দিনাজপুরের গর্ব, দেশের গর্ব। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন অভিভাবককে হারালো।’
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নিজের জন্মস্থান দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে গত রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) জেলা বিএনপির নেতারা তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন। নেত্রীর প্রার্থী হওয়ার খবরে দীর্ঘদিনের বিভেদ ভুলে একত্রিত হয়েছিলেন নেতাকর্মীরা। কিন্তু তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে সেই উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়।
জেলা বিএনপির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, ‘বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রীকে হারিয়ে দেশ আজ এক অভিভাবকশূন্য। এই শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।’ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. মোকাররম হোসেন বলেন, ‘নেত্রীর মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। জানাজায় অংশ নিতে জেলার সর্বত্র থেকে নেতাকর্মীরা রাজধানীর পথে রওনা হচ্ছেন।’

উল্লেখ্য, খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে। শৈশবে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানকে বিয়ের পর তিনি খালেদা জিয়া নামে পরিচিত হন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮৩ সালে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
চলতি বছরের ২৩ নভেম্বর তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা ৩৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তিই নয়, দিনাজপুরসহ সারা দেশে হারিয়ে গেল এক অভিভাবকসুলভ নেতৃত্বের ছায়া।
এমআর/সবা




















