০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্পিডগান সংকটে পুলিশ

➤ গতিসীমায় ওভারটেকিং ও দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা
➤ আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থার বাস্তবতায় গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণটি বিজ্ঞানসম্মত নয় : অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বুয়েট
➤ অতিরিক্ত গতি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ, বর্তমানে আইনের ফলে প্রয়োগ করা পুলিশের জন্য সহজ হবে : মো. শাহাবুদ্দিন খান, অতিরিক্ত আইজিপি, হাইওয়ে পুলিশপ্রধান
➤ মহাসড়কে বাসের গতির চেয়েও মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে : মো. মোজাম্মেল হক, মহাসচিব, যাত্রী কল্যাণ সমিতি

দেশের সব সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমাতে সব ধরনের যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দিয়েছে সরকার। যদিও সেই গতিসীমা নির্ধারণ নিয়ে রয়েছে নানামুখী সমালোচনা। এর মধ্যেই নতুন গতিসীমা নীতিমালা কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখনো মেট্রোপলিটন এলাকায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। হাইওয়েতে আগেই চালু ছিল, সেখানে এখন নতুন আইন প্রয়োগ হচ্ছে। গতি পরিমাপের জন্য ব্যবহার করা হয় স্পিডগান। হাইওয়ে পুলিশ ছাড়া বাকি ইউনিটের রয়েছে স্পিডগানস্বল্পতা। যে কারণে মেট্রোপলিটন এলাকায় এখনো আইন প্রয়োগ শুরু হয়নি। সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অনেক নিয়ম-কানুনের মতো সড়কে যান চলাচলের নতুন গতিসীমা নির্ধারণে গোড়া গুছিয়ে কাজ করা হয়নি। যে কারণে ঘোষণা দিয়েও প্রয়োগ নেই। হাইওয়ে ও মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সড়ক-মহাসড়কে গাড়ির গতি পরিমাপক যন্ত্র ‘স্পিডগান’ পর্যাপ্ত নেই। আইন প্রয়োগের আগে স্পিডগানের ব্যবস্থা করা ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় খালি চোখে গাড়ির গতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। হাইওয়ে পুলিশপ্রধান বলছেন, অতিরিক্ত গতি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তবে নতুন যে আইন করা হয়েছে তাতে গতি নিয়ন্ত্রণে স্পীডগান ব্যবহারে আইনপ্রয়োগ সহজ হবে। গতকাল মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যেই নতুন এ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত এ গতিসীমা দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কতটা কমবে তা নিয়ে সাধারণ জনমনে নানান প্রশ্ন উঠেছে। এই ভিন্ন ভিন্ন গতিসীমায় ওভারটেকিং ও দুর্ঘটনা বাড়ার আশঙ্কাও করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের এক্সপ্রেসওয়ে, মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার আর নগর-মহানগরে সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ৪০ কিলোমিটার। জাতীয় মহাসড়কে (ক্যাটাগরি ‘এ’) প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস, মিনিবাসসহ অন্য হালকা যানবাহনগুলো সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করতে পারবে। সেসব সড়কে ট্রাক, মোটরসাইকেল ও আর্টিকুলেটেড লরির গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার।

 

 

একই সঙ্গে জাতীয় সড়কে (ক্যাটাগরি ‘বি’) প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার। আর মোটরসাইকেলের জন্য ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার এবং ট্রাক ও আর্টিকুলেটেড লরি চলবে ৪৫ কিলোমিটার গতিতে। পাশাপাশি আন্তঃজেলা সড়কে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার, মোটরসাইকেল ৫০ কিলোমিটার এবং ট্রাক ও আর্টিকুলেটেড লরি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৫ কিলোমিটার গতিবেগে চলতে পারবে। এছাড়া সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা শহরের ভেতরের রাস্তায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার এবং ট্রাক, মোটরসাইকেল ও আর্টিকুলেটেড লরির গতিসীমা হবে ৩০ কিলোমিটার। ওই নির্দেশনায় উপজেলা ও গ্রামের রাস্তার গতিসীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানকার গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণ করবে স্থানীয় প্রশাসন। তা কোনোভাবেই জাতীয় মহাসড়কের ক্ষেত্রে ৪০ কিলোমিটার এবং আঞ্চলিক মহাসড়কের ক্ষেত্রে ৩০ কিলোমিটারের বেশি হবে না। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত যানবাহনের গতিসীমা এক্ষেত্রে শিথিল থাকবে।

 

বিআরটিএ’র তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে সড়কে ৫ হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪ জন নিহত ও ৭ হাজার ৪৯৫ জন আহত হয়েছে। বিআরটিএ বলেছে, কেউ গতিসীমা লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন অমান্যকারীকে তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে।

 

 

ট্রাফিক-গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আব্দুল মোমেন বলেন, পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় বিভিন্ন যানবাহন অতিরিক্ত গতিতে চলে। সেখানে স্পিডগান দিয়ে দিনে ও বিশেষ করে রাতের বেলায় বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়।

 

গাজীপুর মহানগর (জিএমপি) ট্রাফিক পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আলমগীর হোসেন বলেন, স্পিডগান এখনো পর্যাপ্ত নেই। তবে আমাদের এরিয়াতে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ওই ক্যামেরাগুলো দিয়ে নম্বর প্লেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চললে অটোমেটিক মামলা হয়ে যাবে।

 

দেশের বিভিন্ন বিভাগের ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। তার আগে আইন প্রয়োগ করলে ব্যত্যয় হতে পারে। প্রথমে জনসচেতনতা তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন গতিসীমা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। আইন প্রয়োগের আগে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্পিডগানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অন্যথায় খালি চোখে গাড়ির গতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এতে দুর্ঘটনার শঙ্কাও রয়েছে।

 

বিআরটিএ রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, নতুন নির্দেশিকা সম্পর্কে জনগণকে জানানোর জন্য প্রচারণা কর্মসূচি চালানো হবে। বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে। এই অন্তর্র্বতী সময়কালে গতিসীমা লঙ্ঘন প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহার করা হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কঠোরভাবে নতুন গতিসীমা প্রয়োগ করা হবে। যানবাহনের গতি মনিটর করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্পিডগান ব্যবহার করবে।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকার গাড়ির গতি নিয়ে যে নতুন সিদ্ধান্ত দিয়েছে বেশিরভাগ মানুষই সেই আইন মেনে চলবে। তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশের কাছে যথেষ্ট স্পিডগান রয়েছে। যেসব ইউনিটে স্পিডগান নেই তাদেরও পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হবে।

 

হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. শাহাবুদ্দিন খান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত গতি। আগে গতি সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনার আইন ছিল না। বর্তমানে এ আইনের ফলে তা প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা পুলিশের জন্য সহজ হবে। তবে কোন সড়কে কত গতি তার জন্য সাইনবোর্ড প্রয়োজন। গতিসীমার আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রচারণা এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। তবে এ লক্ষ্যে আমরা প্রতিনিয়তই কাজ করছি।

 

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, নতুন এ নীতিমালা কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মনে হয়নি। মহাসড়কে বাসের গতির চেয়েও মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, ঢাকার সঙ্গে রংপুর বা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে চলাচলকারী গাড়ির গতি এক নয়।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যানবাহনের যে গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থার বাস্তবতায় সেটি বিজ্ঞানসম্মত নয়। তিনি বলেন, বাইরের দেশে গতিসীমা নির্ধারিত থাকলেও সেখানে লেনভিত্তিক গাড়ি চলে। কোন লেনে কোন গাড়ি চলবে, সেটাও নির্ধারণ করা থাকে। ঢাকা শহরের কথাই যদি ভাবি, সেখানে তো লেনভিত্তিক গাড়ি চলে না। এখানে মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সব ধরণের যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক গাড়ি একসঙ্গে এলোমেলোভাবে একই সড়কে চলাচল করছে। সুতরাং গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণে নতুন আইন প্রয়োগ ও স্পীডগান ব্যবহারে ওভারটেকিংয়ে দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আইসিবিতে শুরু হলো প্রাণিস্বাস্থ্য ও মৎস্য খাতের প্রদর্শনী

স্পিডগান সংকটে পুলিশ

আপডেট সময় : ০৭:৫১:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ মে ২০২৪

➤ গতিসীমায় ওভারটেকিং ও দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা
➤ আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থার বাস্তবতায় গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণটি বিজ্ঞানসম্মত নয় : অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বুয়েট
➤ অতিরিক্ত গতি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ, বর্তমানে আইনের ফলে প্রয়োগ করা পুলিশের জন্য সহজ হবে : মো. শাহাবুদ্দিন খান, অতিরিক্ত আইজিপি, হাইওয়ে পুলিশপ্রধান
➤ মহাসড়কে বাসের গতির চেয়েও মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে : মো. মোজাম্মেল হক, মহাসচিব, যাত্রী কল্যাণ সমিতি

দেশের সব সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমাতে সব ধরনের যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দিয়েছে সরকার। যদিও সেই গতিসীমা নির্ধারণ নিয়ে রয়েছে নানামুখী সমালোচনা। এর মধ্যেই নতুন গতিসীমা নীতিমালা কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখনো মেট্রোপলিটন এলাকায় তা বাস্তবায়ন হয়নি। হাইওয়েতে আগেই চালু ছিল, সেখানে এখন নতুন আইন প্রয়োগ হচ্ছে। গতি পরিমাপের জন্য ব্যবহার করা হয় স্পিডগান। হাইওয়ে পুলিশ ছাড়া বাকি ইউনিটের রয়েছে স্পিডগানস্বল্পতা। যে কারণে মেট্রোপলিটন এলাকায় এখনো আইন প্রয়োগ শুরু হয়নি। সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অনেক নিয়ম-কানুনের মতো সড়কে যান চলাচলের নতুন গতিসীমা নির্ধারণে গোড়া গুছিয়ে কাজ করা হয়নি। যে কারণে ঘোষণা দিয়েও প্রয়োগ নেই। হাইওয়ে ও মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সড়ক-মহাসড়কে গাড়ির গতি পরিমাপক যন্ত্র ‘স্পিডগান’ পর্যাপ্ত নেই। আইন প্রয়োগের আগে স্পিডগানের ব্যবস্থা করা ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় খালি চোখে গাড়ির গতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। হাইওয়ে পুলিশপ্রধান বলছেন, অতিরিক্ত গতি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তবে নতুন যে আইন করা হয়েছে তাতে গতি নিয়ন্ত্রণে স্পীডগান ব্যবহারে আইনপ্রয়োগ সহজ হবে। গতকাল মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যেই নতুন এ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত এ গতিসীমা দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কতটা কমবে তা নিয়ে সাধারণ জনমনে নানান প্রশ্ন উঠেছে। এই ভিন্ন ভিন্ন গতিসীমায় ওভারটেকিং ও দুর্ঘটনা বাড়ার আশঙ্কাও করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের এক্সপ্রেসওয়ে, মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার আর নগর-মহানগরে সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ৪০ কিলোমিটার। জাতীয় মহাসড়কে (ক্যাটাগরি ‘এ’) প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস, মিনিবাসসহ অন্য হালকা যানবাহনগুলো সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করতে পারবে। সেসব সড়কে ট্রাক, মোটরসাইকেল ও আর্টিকুলেটেড লরির গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার।

 

 

একই সঙ্গে জাতীয় সড়কে (ক্যাটাগরি ‘বি’) প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার। আর মোটরসাইকেলের জন্য ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার এবং ট্রাক ও আর্টিকুলেটেড লরি চলবে ৪৫ কিলোমিটার গতিতে। পাশাপাশি আন্তঃজেলা সড়কে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার, মোটরসাইকেল ৫০ কিলোমিটার এবং ট্রাক ও আর্টিকুলেটেড লরি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৫ কিলোমিটার গতিবেগে চলতে পারবে। এছাড়া সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা শহরের ভেতরের রাস্তায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার এবং ট্রাক, মোটরসাইকেল ও আর্টিকুলেটেড লরির গতিসীমা হবে ৩০ কিলোমিটার। ওই নির্দেশনায় উপজেলা ও গ্রামের রাস্তার গতিসীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানকার গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণ করবে স্থানীয় প্রশাসন। তা কোনোভাবেই জাতীয় মহাসড়কের ক্ষেত্রে ৪০ কিলোমিটার এবং আঞ্চলিক মহাসড়কের ক্ষেত্রে ৩০ কিলোমিটারের বেশি হবে না। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত যানবাহনের গতিসীমা এক্ষেত্রে শিথিল থাকবে।

 

বিআরটিএ’র তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে সড়কে ৫ হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪ জন নিহত ও ৭ হাজার ৪৯৫ জন আহত হয়েছে। বিআরটিএ বলেছে, কেউ গতিসীমা লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন অমান্যকারীকে তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে।

 

 

ট্রাফিক-গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আব্দুল মোমেন বলেন, পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় বিভিন্ন যানবাহন অতিরিক্ত গতিতে চলে। সেখানে স্পিডগান দিয়ে দিনে ও বিশেষ করে রাতের বেলায় বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়।

 

গাজীপুর মহানগর (জিএমপি) ট্রাফিক পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আলমগীর হোসেন বলেন, স্পিডগান এখনো পর্যাপ্ত নেই। তবে আমাদের এরিয়াতে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ওই ক্যামেরাগুলো দিয়ে নম্বর প্লেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চললে অটোমেটিক মামলা হয়ে যাবে।

 

দেশের বিভিন্ন বিভাগের ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। তার আগে আইন প্রয়োগ করলে ব্যত্যয় হতে পারে। প্রথমে জনসচেতনতা তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন গতিসীমা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। আইন প্রয়োগের আগে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্পিডগানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অন্যথায় খালি চোখে গাড়ির গতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এতে দুর্ঘটনার শঙ্কাও রয়েছে।

 

বিআরটিএ রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, নতুন নির্দেশিকা সম্পর্কে জনগণকে জানানোর জন্য প্রচারণা কর্মসূচি চালানো হবে। বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে। এই অন্তর্র্বতী সময়কালে গতিসীমা লঙ্ঘন প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহার করা হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কঠোরভাবে নতুন গতিসীমা প্রয়োগ করা হবে। যানবাহনের গতি মনিটর করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্পিডগান ব্যবহার করবে।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকার গাড়ির গতি নিয়ে যে নতুন সিদ্ধান্ত দিয়েছে বেশিরভাগ মানুষই সেই আইন মেনে চলবে। তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশের কাছে যথেষ্ট স্পিডগান রয়েছে। যেসব ইউনিটে স্পিডগান নেই তাদেরও পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হবে।

 

হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. শাহাবুদ্দিন খান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত গতি। আগে গতি সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনার আইন ছিল না। বর্তমানে এ আইনের ফলে তা প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা পুলিশের জন্য সহজ হবে। তবে কোন সড়কে কত গতি তার জন্য সাইনবোর্ড প্রয়োজন। গতিসীমার আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রচারণা এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। তবে এ লক্ষ্যে আমরা প্রতিনিয়তই কাজ করছি।

 

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, নতুন এ নীতিমালা কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মনে হয়নি। মহাসড়কে বাসের গতির চেয়েও মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, ঢাকার সঙ্গে রংপুর বা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে চলাচলকারী গাড়ির গতি এক নয়।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যানবাহনের যে গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থার বাস্তবতায় সেটি বিজ্ঞানসম্মত নয়। তিনি বলেন, বাইরের দেশে গতিসীমা নির্ধারিত থাকলেও সেখানে লেনভিত্তিক গাড়ি চলে। কোন লেনে কোন গাড়ি চলবে, সেটাও নির্ধারণ করা থাকে। ঢাকা শহরের কথাই যদি ভাবি, সেখানে তো লেনভিত্তিক গাড়ি চলে না। এখানে মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সব ধরণের যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক গাড়ি একসঙ্গে এলোমেলোভাবে একই সড়কে চলাচল করছে। সুতরাং গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণে নতুন আইন প্রয়োগ ও স্পীডগান ব্যবহারে ওভারটেকিংয়ে দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।