চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষক নিয়োগের নতুন নীতিমালার আওতায় ফলাফলে পিছিয়ে থাকলেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে। পূর্বের নীতিমালা অনুযায়ী কেবল ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও বর্তমান প্রশাসন নিয়োগের নতুন নীতিমালা অনুমোদন করেছে। প্রভাষক হিসেবে প্রোভিসি শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীম ফাইন্যান্স বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এই নিয়োগ নিয়ে শুরু হয়েছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে আলোচনা।
বিভাগীয় ফলাফলে একাধিক প্রার্থী এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীম। গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় তার নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। সভাটি উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ফেরানোর লক্ষ্যে নতুন নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগের নতুন নীতিমালা অনুমোদনের পরপরই কার্যকর করা হয়। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, একজন শিক্ষক প্রার্থীকে ক্রমান্বয়ে তিনটি ধাপে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। প্রথমত লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে প্রার্থীর প্রেসেন্টেশন নিবে নিয়োগ বোর্ড। প্রেজেন্টেশনে উত্তীর্ণ প্রার্থীকে ভাইবা বোর্ডে বসতে হবে। এই তিন ধাপের পরীক্ষায় সর্বাধিক নাম্বার পেয়ে যেই প্রার্থী উত্তীর্ণ হবেন তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, এই নীতিমালার আওতায় বর্তমান প্রশাসনের সময়ে এ পর্যন্ত মোট ৭৮ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ৫৬৫তম সিন্ডিকেটে বিভিন্ন বিভাগে ১৮ জন এবং তার আগের ৫৬৪তম সিন্ডিকেটে ৩৮ জন শিক্ষক নিয়োগ পান। অর্থাৎ দুই সিন্ডিকেট মিলিয়ে ৫৬ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর আগে গত বছরের ১৯ আগস্ট ফাইন্যান্স বিভাগে চারটি প্রভাষক পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে প্রভাষক পদে চারজন শিক্ষক নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১৯ ডিসেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয় এবং উপাচার্যের কার্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বলেও উল্লেখ ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ফাইন্যান্স বিভাগের চারটি প্রভাষক পদের বিপরীতে শিক্ষক হিসেবে আবেদন করেন মোট ৫১ জন প্রার্থী। এই চার পদের মধ্যে একটি সহকারী অধ্যাপক পদের বিপরীতে এবং আরেকটি সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। সর্বমোট ৪ পদের মধ্যে দুটি স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ এবং দুটি অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
রেজিস্টার দপ্তর থেকে প্রকাশিত আবেদনকারীদের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীমের নাম তালিকাভুক্ত ছিল ৪৩ নম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী ফাইন্যান্স বিভাগে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। আবেদনকারী ৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে এতে উত্তীর্ণ হন মাত্র ৮ জন প্রার্থী। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা পরবর্তী ধাপে নিয়োগ বোর্ডের সামনে প্রেজেন্টেশন দেন এবং এরপর অনুষ্ঠিত হয় মৌখিক পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন ও ভাইবা এই তিন ধাপের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত চারজন প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। এই চারজনের মধ্য থেকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য মাহিরা শামীমকে সুপারিশ করে নিয়োগ বোর্ড।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এই তালিকায় দেখা যায়, মাহেরা শামীম ১১ জন প্রার্থীর নিচে অবস্থান করছেন। আবেদনকারী প্রার্থীদের সিজিপিএ এর ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেজিস্ট্রার দপ্তর। তালিকার প্রার্থীরা নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিলে অধিকাংশ প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়নি বলে নিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।
ফাইন্যান্স বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, মাহিরা শামীম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষের ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি স্নাতক পর্যায়ে সিজিপিএ ৩.৮০ পেয়ে বিভাগের মেধাতালিকায় অষ্টম স্থান অর্জন করেন এবং ২০২২ সালে এমবিএ পরীক্ষায় সিজিপিএ ৩.৭৮ পেয়ে বিভাগের মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। বিশ্ববিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্প্রিংগার (Springer)-এ তার দুটি গবেষণা প্রকাশনা ও একটি বুক চ্যাপ্টার প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ২০২২ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব চিটাগং এবং প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামে শিক্ষকতা করে আসছেন।
ফাইন্যান্স বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী একজন প্রভাষক প্রার্থীর অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৭৫ থাকতে হয়। বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থী অনার্সে ভালো ফলাফল করলেও মাস্টার্সে প্রয়োজনীয় সিজিপিএ অর্জন করতে না পারায় তারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের আবেদনই করতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে মাহিরা শামীমের চেয়ে কেবল একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল বলে নিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।
ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর। নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার। বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. নসরুল কদির, যিনি বর্তমানে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে ছিলেন সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হাসমত আলী। বোর্ডে আরও উপস্থিত ছিলেন ফাইন্যান্স বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নেছারুল করিম।
জানতে চাইলে ফাইন্যান্স বিভাগের নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এস. এম. নসরুল কদির বলেন, আমি নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ ছিলাম। আমার তত্ত্বাবধানে লিখিত পরীক্ষা হয়েছে। বাকিটা তো মৌখিক পরীক্ষাতে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে প্রোভিসির মেয়েকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ফাইন্যান্স বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষায় কোন প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয় কে বা তার অভিভাবকের পরিচয় কে কখনোই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. হাসমত আলী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা নিয়োগ বোর্ডে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছি। এখানে কে শিক্ষকের সন্তান আর কার কোন প্রভাব সেটা আমাদের দেখার বিষয় ছিলো না। আমরা লিখিত, প্রেজেনটেশন, ভাইবার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই বাচাই করে মার্কিং করেছি। সেখানে যে চার জনের মার্ক এগিয়ে ছিলো তাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে। ঐ চারজনের একজন প্রোভিসির মেয়ে। তার উপর মাহিরা শামীমের আন্তর্জাতিক জার্নালে দুটির মত গবেষণা আছে। সে দিক দিয়েও সে এগিয়ে ছিলো। এখন তার যোগ্যতা দিয়ে নিয়োগ পাওয়াটা যদি শিক্ষকদের মেয়ে হিসেবে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে বলে আলোচনা হয় তাহলে তো আর কিছু বলার নাই।
এ সম্পর্কে আরও জানতে ফাইন্যান্স বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নেছারুল করিমকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও ম্যাসেজ দিয়ে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি
উপ-উপাচার্যর কন্যার নিয়োগের খবর প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র মজলিসের সভাপতি সাকিব মাহমুদ রুমি প্রতিবাদস্বরূপ একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। ক্যাম্পাসের ড. এ আর মল্লিক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘বাবা আমায় একটা নিয়োগ দেবে?’
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান বলেন, ফাইন্যান্স বিভাগের নিয়োগের সঙ্গে আমি কোনোভাবে যুক্ত ছিলাম না। আমি নিয়োগ বোর্ডের সদস্যই নই। নিয়োগ বোর্ড কীভাবে হচ্ছে আমি জানি না। আমার মেয়ে সেখানে আবেদন করেছে এটুকুই মাত্র। তাছাড়া এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভালো বলতে পারবেন, কেননা তিনি নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি।
জানতে চাইলে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, আমরা কয়েক ধাপে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছি। এখানে স্বজনপ্রীতি কিংবা পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হচ্ছে কিনা এজন্য আমরা সবাইকে আহ্বান করেছি যে আপনারা এসে আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দেখে যান। কিন্তু কেউই আমাদের কথা কর্ণপাত করেননি।” তিনি বলেন, “আমরা প্রথমে লিখিত পরীক্ষা নিই। এরপর লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে প্রার্থীকে ডেমনস্ট্রেশনের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। সেখানে উত্তীর্ণ হলে প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এই তিন পরীক্ষায় যারা ভালো ফলাফল করে তাদের মধ্যে সেরা প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য বেছে নেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন পুরোপুরি নিরপেক্ষতার সাথে শিক্ষকদের নিয়োগ দিচ্ছেন। অথচ দেশের আরও বড় তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল ভাইবার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এটা কোনো যথাযথ প্রক্রিয়া না। কেবল ভাইবার মাধ্যমে নিয়োগ দিলে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ আছে।”
শু/সবা






















