০১:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পুরুষতন্ত্রের এবং ধর্মীয় আধিপত্যবাদের কাছে পরাজিত হচ্ছে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন: রোকেয়া কবীর

পর্ব – ৫

আইন এবং বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত যারা আছেন, তারা প্রথমে নারীকে মানুষ হিসেবে যদি না দেখেন এবং পরবর্তী হলো নারীর যে স্পেশাল ইস্যুগুলো আছে সেগুলোকে যদি না দেখেন তাহলে এই সমাজ থেকে নারী ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এটাকে বন্ধ করা যাবেনা। আর এই ধর্মের নামে ধর্মীয় নেতারা – তেঁতুল হুজুর আবার যে বলেছেন, মৌলানা শফি – স্কুল-কলেজ জেনার কারবার। তাহলে মাদ্রাসাগুলো কি? এতিমখানা গুলো কি? ধর্মীয় নেতারা মসজিদ-মাদ্রাসা সব যায়গায় এসব অন্যায় আচরণ করেন। টাকা পয়সার দুর্নীতি তো আছেই। পাশাপাশি এই তারা নারী নির্যাতনকারি, নারী ধর্ষণকারি, নারীকে ভোগের বস্তু ছাড়া আর মানুষ হিসেবে দেখেই না। সমান মানুষ তো দূরের কথা মানুষ হিসেবেই দেখে না। সুতরাং আমার বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের সমাজে যে বিষয়টা আছে, শিক্ষা, সামাজিক আন্দোলনে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, মানবাধিকার আন্দোলনে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের মানবাধিকার আন্দালনেও কিছু সমস্যা আছে।

এলিট গ্রুপের কারো বিরুদ্ধে কিছু হলে তখন সবাই কিন্তু এককাতার, কিন্তু এই যে শরীয়ত বয়াতী। তার ঘটনায় কিন্তু আমি ঐ ধরণের আন্দোলন দেখছি না। কেন? তার মানে আমাদের মানবাধিকারের মধ্যেও কিন্তু প্রবলেম আছে। শহীদুল ইসলামের সময় বা মতিউর রহমানের সময় যেভাবে আন্দোলন গড়ে উঠল সমানভাবে শরীয়ত বয়াতীর পক্ষে সবারই কিন্তু রাস্তায় নামা উচিত ছিল। সমানভাবে এই তেঁতুল হুজুর যে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে যে কথাটা বলছেন, তার বিরুদ্ধে কিন্তু সবারই রাস্তায় নামা উচিত ছিল। কিন্তু কেউ রাস্তায় নামছেন না। কেন কোন বক্তব্য দিচ্ছেন না। তারা এটা নারী আন্দোলনের বিষয় হিসেবে রেখে দিচ্ছে। নারীর ইস্যুতে বলা হচ্ছে, নারীরা কেন রাস্তায় নামে না? নারীরা কিভাবে রাস্তায় নামবে? ইয়াসমিন ধর্ষণ, হত্যাবিরোধী আন্দোলনে আমরা দেখেছি এই যে আমরা জমায়েত করলাম বড় বড় প্রত্যেকটা জমায়েতে তখন আমাদের সংগঠনের যত টাকা ছিল তার ফিফটি পার্সেন্ট আমরা ব্যয় করেছি। আমরা শুধু ডোনারদের লিখেছি যে আমরা একটা বড় আন্দোলন শুরু করেছি। এটার জন্য এই খাতে আমরা টাকা ব্যয় করব। কিভাবে অর্গানাইজ করতে হয়েছে? বিভিন্ন বস্তি এলাকায় যে আমাদের সংগঠন ছিল তাদেরকে আনার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তাদেরকে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বাসের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তাদের শিশু সন্তান, তাদের বয়স্ক যারা পরিবারের সদস্য আছেন, তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা, তখন আমরা ভলান্টিয়ারের ব্যবস্থা করেছি। কিছু পুরুষ যাদের আমরা সচেতন করেছিলাম নারীর সমানাধিকার সম্পর্কে।

তাদেরকে ভলান্টিয়ার রেখে প্রত্যেক বস্তি থেকে আমরা কিন্তু সেই মেয়েদের এনে অংশগ্রহণ করিয়েছি। ঘরের সমস্ত দায়িত্ব মেয়েদেরকে পালন করতে হচ্ছে। আর এই চিন্তাটাই সবার মাথায় যে, মেয়েদের দায়িত্ব ঘরে। মূল দায়িত্ব নারীর ঘরে হলেও আধিপত্যটা পুরুষের। সমস্ত সিদ্ধান্ত পুরুষরা নেয়। সেখানে মেয়েরা কিভাবে প্রতিবাদ করার জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে ঘরের বাইরে আসবে। ডোনাররাও কিন্তু – আমি ডোনারদেরকেও বলি, তোমরা এখন যেভাবে টাকা পয়সা দাও, এইভাবে আন্দোলন করা যায়না। আন্দোলন করার পরিবেশটা অন্যরকম। সুতরাং ডোনারদেরও এই বিষয়টা দেখতে হবে। এখন দেখবেন যেমন ছয়মাস মাতৃত্বকালিন ছুটি সরকার দিয়েছে। আমরা কিভাবে দিব মাতৃত্বকালিন ছুটি। আমার একটা সাবস্টিটিউট কর্মী লাগবে। সেই কর্মীর জন্য ডোনার কোন টাকা দেয় না। শুধু তাই না, গার্ডিয়ানে হত বছরের জুলাই মাসের দুই তারিখে একটা রিপোর্ট উঠেছে সেই রিপোর্ট বলছে, জেন্ডার সমতার জন্য ডে বাজেট আছে গ্লোবালি, সেই বাজেটের মাত্র ২ ভাগ যায় নারী  সংগঠনগুলোর কাছে। তাহলে কিভাবে নারী আন্দোলন শক্তিশালী হবে?

শুধু আমাদের সরকার না, বিশ্বব্যাপী এটা কিন্তু সবাই একই সিস্টেমে চলছে। পুরুষের আধিপত্য- অর্থসম্পদ কন্ট্রোল করা, রাজনীতি কন্ট্রোল করা, তাদের পরিবার, শিক্ষা কন্ট্রোল, সংস্কৃতি কন্টোল করা সব কিছুতে পুরুষ আছে। বাংলাদেশে মুসলিম বাঙালি আধিপত্যবাদ, ভারতে হিন্দু আধিপত্যবাদ, ব্যবসায়ীদের আধিপত্যবাদ – গ্লোবালি ট্রাম্পের হোয়াইট সুপ্রিমেসি এবং ইউরোপে আবার হোয়াইট সুপ্রিমেসি। এই হোয়াইট সুপ্রিমেসিগুলো কিন্তু হিটলারের পলিসি। হিটলারের দর্শন। এগুলোর বিরুদ্ধে কিন্তু ইউরোপে এখন দক্ষিণপন্থী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। সারা পৃথিবীতেই কিন্তু এই ধরণের মনোভাবগুলো আছে কিন্তু বাংলাদেশে এটা অনেক বেশি। বাংলাদেশে এটা বুঝতেই পারে না, গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি নির্বাচন। গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি না সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ। সকল প্রকার আধিপত্যবাদ দূরীকরণ সমাজ থেকে। একেকজন তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলে কিন্তু একটু জিজ্ঞেস করলে যে, বঙ্গবন্ধু যে সাতই মার্চের বক্তৃতায় যে কথাটা বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমরা দেশের স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু নারী মুক্তি হয়নি। শোষণ থেকে বৈষম্য থেকে মুক্তি হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ঐ মুক্তির আন্দোলনটা কে করবে?

আগামী কাল প্রকাশিত হবে ষষ্ঠ পর্ব। এই সাক্ষাতকারটি ২০২০ সালে নেয়া।
জনপ্রিয় সংবাদ

টিউশনের নামে প্রতারণার ফাঁদ

পুরুষতন্ত্রের এবং ধর্মীয় আধিপত্যবাদের কাছে পরাজিত হচ্ছে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন: রোকেয়া কবীর

আপডেট সময় : ০৫:৩৪:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ জুন ২০২৪

পর্ব – ৫

আইন এবং বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত যারা আছেন, তারা প্রথমে নারীকে মানুষ হিসেবে যদি না দেখেন এবং পরবর্তী হলো নারীর যে স্পেশাল ইস্যুগুলো আছে সেগুলোকে যদি না দেখেন তাহলে এই সমাজ থেকে নারী ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এটাকে বন্ধ করা যাবেনা। আর এই ধর্মের নামে ধর্মীয় নেতারা – তেঁতুল হুজুর আবার যে বলেছেন, মৌলানা শফি – স্কুল-কলেজ জেনার কারবার। তাহলে মাদ্রাসাগুলো কি? এতিমখানা গুলো কি? ধর্মীয় নেতারা মসজিদ-মাদ্রাসা সব যায়গায় এসব অন্যায় আচরণ করেন। টাকা পয়সার দুর্নীতি তো আছেই। পাশাপাশি এই তারা নারী নির্যাতনকারি, নারী ধর্ষণকারি, নারীকে ভোগের বস্তু ছাড়া আর মানুষ হিসেবে দেখেই না। সমান মানুষ তো দূরের কথা মানুষ হিসেবেই দেখে না। সুতরাং আমার বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের সমাজে যে বিষয়টা আছে, শিক্ষা, সামাজিক আন্দোলনে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, মানবাধিকার আন্দোলনে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের মানবাধিকার আন্দালনেও কিছু সমস্যা আছে।

এলিট গ্রুপের কারো বিরুদ্ধে কিছু হলে তখন সবাই কিন্তু এককাতার, কিন্তু এই যে শরীয়ত বয়াতী। তার ঘটনায় কিন্তু আমি ঐ ধরণের আন্দোলন দেখছি না। কেন? তার মানে আমাদের মানবাধিকারের মধ্যেও কিন্তু প্রবলেম আছে। শহীদুল ইসলামের সময় বা মতিউর রহমানের সময় যেভাবে আন্দোলন গড়ে উঠল সমানভাবে শরীয়ত বয়াতীর পক্ষে সবারই কিন্তু রাস্তায় নামা উচিত ছিল। সমানভাবে এই তেঁতুল হুজুর যে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে যে কথাটা বলছেন, তার বিরুদ্ধে কিন্তু সবারই রাস্তায় নামা উচিত ছিল। কিন্তু কেউ রাস্তায় নামছেন না। কেন কোন বক্তব্য দিচ্ছেন না। তারা এটা নারী আন্দোলনের বিষয় হিসেবে রেখে দিচ্ছে। নারীর ইস্যুতে বলা হচ্ছে, নারীরা কেন রাস্তায় নামে না? নারীরা কিভাবে রাস্তায় নামবে? ইয়াসমিন ধর্ষণ, হত্যাবিরোধী আন্দোলনে আমরা দেখেছি এই যে আমরা জমায়েত করলাম বড় বড় প্রত্যেকটা জমায়েতে তখন আমাদের সংগঠনের যত টাকা ছিল তার ফিফটি পার্সেন্ট আমরা ব্যয় করেছি। আমরা শুধু ডোনারদের লিখেছি যে আমরা একটা বড় আন্দোলন শুরু করেছি। এটার জন্য এই খাতে আমরা টাকা ব্যয় করব। কিভাবে অর্গানাইজ করতে হয়েছে? বিভিন্ন বস্তি এলাকায় যে আমাদের সংগঠন ছিল তাদেরকে আনার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তাদেরকে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বাসের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তাদের শিশু সন্তান, তাদের বয়স্ক যারা পরিবারের সদস্য আছেন, তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা, তখন আমরা ভলান্টিয়ারের ব্যবস্থা করেছি। কিছু পুরুষ যাদের আমরা সচেতন করেছিলাম নারীর সমানাধিকার সম্পর্কে।

তাদেরকে ভলান্টিয়ার রেখে প্রত্যেক বস্তি থেকে আমরা কিন্তু সেই মেয়েদের এনে অংশগ্রহণ করিয়েছি। ঘরের সমস্ত দায়িত্ব মেয়েদেরকে পালন করতে হচ্ছে। আর এই চিন্তাটাই সবার মাথায় যে, মেয়েদের দায়িত্ব ঘরে। মূল দায়িত্ব নারীর ঘরে হলেও আধিপত্যটা পুরুষের। সমস্ত সিদ্ধান্ত পুরুষরা নেয়। সেখানে মেয়েরা কিভাবে প্রতিবাদ করার জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে ঘরের বাইরে আসবে। ডোনাররাও কিন্তু – আমি ডোনারদেরকেও বলি, তোমরা এখন যেভাবে টাকা পয়সা দাও, এইভাবে আন্দোলন করা যায়না। আন্দোলন করার পরিবেশটা অন্যরকম। সুতরাং ডোনারদেরও এই বিষয়টা দেখতে হবে। এখন দেখবেন যেমন ছয়মাস মাতৃত্বকালিন ছুটি সরকার দিয়েছে। আমরা কিভাবে দিব মাতৃত্বকালিন ছুটি। আমার একটা সাবস্টিটিউট কর্মী লাগবে। সেই কর্মীর জন্য ডোনার কোন টাকা দেয় না। শুধু তাই না, গার্ডিয়ানে হত বছরের জুলাই মাসের দুই তারিখে একটা রিপোর্ট উঠেছে সেই রিপোর্ট বলছে, জেন্ডার সমতার জন্য ডে বাজেট আছে গ্লোবালি, সেই বাজেটের মাত্র ২ ভাগ যায় নারী  সংগঠনগুলোর কাছে। তাহলে কিভাবে নারী আন্দোলন শক্তিশালী হবে?

শুধু আমাদের সরকার না, বিশ্বব্যাপী এটা কিন্তু সবাই একই সিস্টেমে চলছে। পুরুষের আধিপত্য- অর্থসম্পদ কন্ট্রোল করা, রাজনীতি কন্ট্রোল করা, তাদের পরিবার, শিক্ষা কন্ট্রোল, সংস্কৃতি কন্টোল করা সব কিছুতে পুরুষ আছে। বাংলাদেশে মুসলিম বাঙালি আধিপত্যবাদ, ভারতে হিন্দু আধিপত্যবাদ, ব্যবসায়ীদের আধিপত্যবাদ – গ্লোবালি ট্রাম্পের হোয়াইট সুপ্রিমেসি এবং ইউরোপে আবার হোয়াইট সুপ্রিমেসি। এই হোয়াইট সুপ্রিমেসিগুলো কিন্তু হিটলারের পলিসি। হিটলারের দর্শন। এগুলোর বিরুদ্ধে কিন্তু ইউরোপে এখন দক্ষিণপন্থী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। সারা পৃথিবীতেই কিন্তু এই ধরণের মনোভাবগুলো আছে কিন্তু বাংলাদেশে এটা অনেক বেশি। বাংলাদেশে এটা বুঝতেই পারে না, গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি নির্বাচন। গণতন্ত্র বলতে আমরা বুঝি না সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ। সকল প্রকার আধিপত্যবাদ দূরীকরণ সমাজ থেকে। একেকজন তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলে কিন্তু একটু জিজ্ঞেস করলে যে, বঙ্গবন্ধু যে সাতই মার্চের বক্তৃতায় যে কথাটা বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমরা দেশের স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু নারী মুক্তি হয়নি। শোষণ থেকে বৈষম্য থেকে মুক্তি হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ঐ মুক্তির আন্দোলনটা কে করবে?

আগামী কাল প্রকাশিত হবে ষষ্ঠ পর্ব। এই সাক্ষাতকারটি ২০২০ সালে নেয়া।