6:16 am, Saturday, 27 June 2026

পাহাড়ের গাছ-বাঁশের স্কুল থেকে ঢাকায় ম্রো শিশুদের গল্প

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদের নাম চংককপাড়া। যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কিংবা নিরাপদ পানির সুবিধা সবকিছু থেকেই বহু দূরে এই পাহাড়ি গ্রাম। সেখানেই গাছ, বাঁশ আর ছনের ছাউনি দেওয়া এক ব্যতিক্রমী স্কুল ‘পাওমুম থারক্লা’। ম্রো ভাষায় যার অর্থ, ‘ফুলের কলি ফোটাতে হবে’। পাহাড়ের আড়ালে থাকা যে শিশুদের স্বপ্ন এতদিন নিভৃতে বেড়ে উঠছিল, তারাই এবার প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে নিজেদের গল্প শোনাতে হাজির হয়েছে।

গত বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে উদ্বোধন হয়েছে ‘পাওমুম পার্বণ ২০২৫’। উৎসবের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে টানানো ম্রো শিশুদের আঁকা ছবি। রঙের ভাষায় সেখানে উঠে এসেছে পাহাড়, জুমচাষ, বন, ঝিরিপথ, উৎসব আর দৈনন্দিন জীবনের গল্প। ছবির পাশাপাশিই রয়েছে তাদের জীবনযাপনের নানা মুহূর্ত ধারণ করা আলোকচিত্র, যা দর্শনার্থীদের নিয়ে যায় পাহাড়ের নিভৃত জগতে।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের আরেকটি গ্যালারিতে জায়গা করে নিয়েছে শিশুদের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম। পুঁতির মালা, যার দাম ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত। পাশাপাশি রয়েছে নিজেদের হাতে বোনা কম্বল ও চাদর, বাঁশের তৈরি কারুশিল্প ‘তৈয়া’ (পানির পাত্র), গয়না এবং ম্রো ভাষায় লেখা বই। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে ঢাউস আকৃতির একটি বাঁশি ম্রো জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত ‘প্লুং’ নামে। গ্যালারির এক কোণে মেঝেতে রাখা এই বাঁশিটি যেন পুরো সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পাওমুম থারক্লা স্কুলের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, “লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ে চংককপাড়ায় কোনো বিদ্যুৎ নেই, নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে শুরুর দিকে আমাদের নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।” তিনি জানান, ২০১৬ সালে মাত্র তিনজন শিশুকে নিয়ে ম্রো মাতৃভাষা শেখানোর মাধ্যমে স্কুলটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনধারা কৃষিনির্ভর হওয়ায় শিশুদের স্কুলমুখী করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রতিদিন মাত্র দুই টাকার বিস্কিট দিয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করা হতো। ধীরে ধীরে শিশুরা মাতৃভাষা শেখা শেষ করলে তাদের জন্য চালু করা হয় শিশু শ্রেণি, এরপর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এইভাবে পর্যায়ক্রমে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু হয়।

বর্তমানে পাওমুম থারক্লা স্কুলে পড়াশোনা করছে ৬৮ জন ম্রো শিশু। এর মধ্যে ৩০ জন শিক্ষার্থী স্কুলের হোস্টেলে থাকে, যা বান্দরবান জেলা পরিষদের সহায়তায় নির্মিত। স্কুলটিতে চারজন শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান করেন এবং শিশুদের খাবারের দায়িত্বে রয়েছেন একজন বাবুর্চি। এখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা, গণিত ও ইংরেজিও শিখছে।

২০১৯ সালে এই স্কুল থেকেই প্রথমবারের মতো পিএসসি পাস করে এক মাইলফলক গড়ে তোলে মাংচুন ম্রো নামে এক শিক্ষার্থী। ঢাকায় আসার অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “ম্রো জনগোষ্ঠী অনেক পিছিয়ে পড়া একটি জনগোষ্ঠী। শুনেছি ঢাকায় একটা প্রোগ্রাম হবে, যেখানে আমাদের সুখ-দুঃখ আর স্বপ্নের কথা তুলে ধরতে পারব এই আশাতেই এসেছি। আমরা চাই আমাদের কথাগুলো সবাই জানুক।”

তিনি আরও বলেন,“এই স্কুল না থাকলে হয়তো আমার মতো অনেকেরই পড়াশোনা হতো না। কোনো দিন ভাবিনি, এভাবে রাজধানীতে আসতে পারব। শহরবাসী আমাদের যেভাবে গ্রহণ করেছে, তা সত্যিই ভোলার নয়।”

উল্লেখ্য, আগামী ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে ‘পাওমুম পার্বণ ২০২৫’। এই উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে শিশুদের তৈরি শিল্পকর্ম ও বুননশিল্প, শর্ট ফিল্ম, বাঁশের কারুশিল্প, ফটোগ্রাফি এবং নানা লাইভ পারফরম্যান্স। এর মধ্যে রয়েছে ম্রো নৃত্য, গান এবং ঐতিহ্যবাহী প্লুং বাঁশির সুর। পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন কর্মশালা, গাইডেড ট্যুর এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সংলাপ।

শু/সবা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

four × 4 =

About Author Information

M Rahman

বদলগাছীতে সবজি ও মসলা জাতীয় কৃষি পণ্যের দাম কম

পাহাড়ের গাছ-বাঁশের স্কুল থেকে ঢাকায় ম্রো শিশুদের গল্প

Update Time : ০৮:৩৪:২০ pm, Friday, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদের নাম চংককপাড়া। যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কিংবা নিরাপদ পানির সুবিধা সবকিছু থেকেই বহু দূরে এই পাহাড়ি গ্রাম। সেখানেই গাছ, বাঁশ আর ছনের ছাউনি দেওয়া এক ব্যতিক্রমী স্কুল ‘পাওমুম থারক্লা’। ম্রো ভাষায় যার অর্থ, ‘ফুলের কলি ফোটাতে হবে’। পাহাড়ের আড়ালে থাকা যে শিশুদের স্বপ্ন এতদিন নিভৃতে বেড়ে উঠছিল, তারাই এবার প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে নিজেদের গল্প শোনাতে হাজির হয়েছে।

গত বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে উদ্বোধন হয়েছে ‘পাওমুম পার্বণ ২০২৫’। উৎসবের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে টানানো ম্রো শিশুদের আঁকা ছবি। রঙের ভাষায় সেখানে উঠে এসেছে পাহাড়, জুমচাষ, বন, ঝিরিপথ, উৎসব আর দৈনন্দিন জীবনের গল্প। ছবির পাশাপাশিই রয়েছে তাদের জীবনযাপনের নানা মুহূর্ত ধারণ করা আলোকচিত্র, যা দর্শনার্থীদের নিয়ে যায় পাহাড়ের নিভৃত জগতে।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের আরেকটি গ্যালারিতে জায়গা করে নিয়েছে শিশুদের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম। পুঁতির মালা, যার দাম ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত। পাশাপাশি রয়েছে নিজেদের হাতে বোনা কম্বল ও চাদর, বাঁশের তৈরি কারুশিল্প ‘তৈয়া’ (পানির পাত্র), গয়না এবং ম্রো ভাষায় লেখা বই। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে ঢাউস আকৃতির একটি বাঁশি ম্রো জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত ‘প্লুং’ নামে। গ্যালারির এক কোণে মেঝেতে রাখা এই বাঁশিটি যেন পুরো সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পাওমুম থারক্লা স্কুলের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা শাহরিয়ার পারভেজ বলেন, “লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ে চংককপাড়ায় কোনো বিদ্যুৎ নেই, নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে শুরুর দিকে আমাদের নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।” তিনি জানান, ২০১৬ সালে মাত্র তিনজন শিশুকে নিয়ে ম্রো মাতৃভাষা শেখানোর মাধ্যমে স্কুলটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনধারা কৃষিনির্ভর হওয়ায় শিশুদের স্কুলমুখী করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রতিদিন মাত্র দুই টাকার বিস্কিট দিয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করা হতো। ধীরে ধীরে শিশুরা মাতৃভাষা শেখা শেষ করলে তাদের জন্য চালু করা হয় শিশু শ্রেণি, এরপর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এইভাবে পর্যায়ক্রমে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু হয়।

বর্তমানে পাওমুম থারক্লা স্কুলে পড়াশোনা করছে ৬৮ জন ম্রো শিশু। এর মধ্যে ৩০ জন শিক্ষার্থী স্কুলের হোস্টেলে থাকে, যা বান্দরবান জেলা পরিষদের সহায়তায় নির্মিত। স্কুলটিতে চারজন শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান করেন এবং শিশুদের খাবারের দায়িত্বে রয়েছেন একজন বাবুর্চি। এখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা, গণিত ও ইংরেজিও শিখছে।

২০১৯ সালে এই স্কুল থেকেই প্রথমবারের মতো পিএসসি পাস করে এক মাইলফলক গড়ে তোলে মাংচুন ম্রো নামে এক শিক্ষার্থী। ঢাকায় আসার অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “ম্রো জনগোষ্ঠী অনেক পিছিয়ে পড়া একটি জনগোষ্ঠী। শুনেছি ঢাকায় একটা প্রোগ্রাম হবে, যেখানে আমাদের সুখ-দুঃখ আর স্বপ্নের কথা তুলে ধরতে পারব এই আশাতেই এসেছি। আমরা চাই আমাদের কথাগুলো সবাই জানুক।”

তিনি আরও বলেন,“এই স্কুল না থাকলে হয়তো আমার মতো অনেকেরই পড়াশোনা হতো না। কোনো দিন ভাবিনি, এভাবে রাজধানীতে আসতে পারব। শহরবাসী আমাদের যেভাবে গ্রহণ করেছে, তা সত্যিই ভোলার নয়।”

উল্লেখ্য, আগামী ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে ‘পাওমুম পার্বণ ২০২৫’। এই উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে শিশুদের তৈরি শিল্পকর্ম ও বুননশিল্প, শর্ট ফিল্ম, বাঁশের কারুশিল্প, ফটোগ্রাফি এবং নানা লাইভ পারফরম্যান্স। এর মধ্যে রয়েছে ম্রো নৃত্য, গান এবং ঐতিহ্যবাহী প্লুং বাঁশির সুর। পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন কর্মশালা, গাইডেড ট্যুর এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সংলাপ।

শু/সবা