➤সম্পত্তির অনুসন্ধানসহ নজরদারিতে দুদক
➤মতিউর ও তার স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাংক-বিও হিসাব স্থগিতের নির্দেশ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদ্য সাবেক সদস্য মো. মতিউর রহমানের অবস্থান এখন কোথায়, সে বিষয়ে তার স্বজন ও সহকর্মীরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছেও তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে দুদক জানতে পেরেছে, মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদ্য সাবেক সদস্য মো. মতিউরের দেশত্যাগে গত সোমবার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের দেওয়া এ নিষেধাজ্ঞার আওতার মধ্যে আরও রয়েছেন তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ ও তাদের ছেলে আহাম্মেদ তৌফিকুর রহমান (অর্ণব)। লায়লা কানিজ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান। কোরবানির ঈদের পর থেকে তাকেও আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। উপজেলা পরিষদেও যাচ্ছেন না তিনি। মতিউর ও তার পরিবার সম্পর্কে কোনো সংস্থার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় দেশে তাদের অবস্থান নিয়ে সাধারণ জনমনে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। তবে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, মতিউর ও তার পরিবার দেশেই অবস্থান করছেন। তারা গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। একই সঙ্গে তার সম্পত্তির অনুসন্ধানে নেমেছে দুদুকের অনুসন্ধান দল। এদিকে মতিউর ও তার স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাংক-বিও হিসাব স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ। গতকাল মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা যায়, মো. মতিউরের দ্বিতীয় সংসারের ছেলে মুশফিকুর রহমান (ইফাত) গেল ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য ১৫ লাখ টাকায় ছাগল কিনতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে আলোচনায় আসেন। তার বিলাসী জীবনযাপনের নানা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে। একজন সরকারি চাকরিজীবীর কলেজপড়ুয়া ছেলে কীভাবে এত বিলাসী জীবনযাপন করতে পারেন, সে প্রশ্ন ওঠে। একপর্যায়ে মো. মতিউর ও তার পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। আলোচিত এই কর্মকর্তা ও তার স্বজনদের নামে এখন পর্যন্ত ৬৫ বিঘা (২ হাজার ১৪৫ শতাংশ) জমি, ৮টি ফ্ল্যাট, ২টি রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট এবং ২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, যশোর ও নাটোরে মোট ৮৪৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ (২৫ দশমিক ৭০ বিঘা) জমি রয়েছে। ঢাকাতেই তার নামে ফ্ল্যাট রয়েছে অন্তত চারটি। ২০২৩-২৪ করবর্ষের আয়কর বিবরণীতে লায়লা কানিজ তার মোট সম্পদ দেখিয়েছেন ১০ কোটি ৩০ লাখ ৫১ হাজার টাকা। শেয়ারবাজারে মো. মতিউর পরিচিত ছিলেন বাজে কোম্পানির ‘প্লেসমেন্ট-শিকারি’ হিসেবে। স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ নিজের নামে খোলা পাঁচটি বিও হিসাব থেকে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা মুনাফা তুলে নিয়েছেন তিনি।
এর বাইরে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে ১৫টির বেশি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। মো. মতিউরের প্রথম সংসারের মেয়ে কানাডাপ্রবাসী ফারজানা রহমানের নামে গ্লোবাল শুজ অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেডের ৪৯ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০টি শেয়ার এবং ছেলে আহাম্মেদ তৌফিকুর রহমানের নামে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০টি শেয়ার আছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকদের একজন তৌফিকুর। এখানে তার নামে ১০ লাখ শেয়ার রয়েছে। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবসা করার কোনো সুযোগ নেই। এনবিআর প্রশাসন শাখার একাধিক কর্মকর্তা জানান, জমি, বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কোনো ক্ষেত্রেই এনবিআরের অনুমতি নেননি মো. মতিউর রহমান। এছাড়া শেয়ারবাজারে যে ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেটি করতে গিয়ে তিনি সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ঈদের ছুটির পর গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সরকারি অফিস খোলা থাকলেও মো. মতিউর এনবিআরে তার কার্যালয়ে যাননি। এরপর গত রোববার তাকে এনবিআর থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে (আইআরডি) সংযুক্ত করা হয়। তবে গতকাল সোমবার পর্যন্ত তিনি আইআরডিতে যোগ দেননি। তার ব্যবহৃত দুটি ফোন নম্বর এখনো বন্ধ রয়েছে।
মো. মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন কাগজপত্রে তাদের ঠিকানা হিসেবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকার তিনটি ফ্ল্যাটের (ধানমন্ডি, বসুন্ধরা ও কাকরাইল) কথা উল্লেখ করেছেন। গত চারদিন ধরে এই তিন ঠিকানায় একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোথাও তাদের পাওয়া যায়নি। এদিকে কোনো কোনো গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ করা হয়েছে আলোচিত কর্মকর্তা মো. মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশ ছেড়েছেন। তবে এর সত্যতা সম্পর্কে দুদক বা পুলিশের দিক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মো. মতিউরের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী, প্রথম স্ত্রীর বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়ি ফেনীর সোনাগাজীতে। তিনটি জায়গাতেই তার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন কোথায় আছেন বা অবস্থান করছেন এমন প্রশ্নে স্বজনেরা নিশ্চিতভাবে কিছু জানাতে পারেননি।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মতিউর তার পরিবার নিয়ে দেশেই আছেন, তিনি যেন বিদেশে যেতে না পারেন সেজন্য সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন তারা। মতিউর রহমান যাকে তার সন্তান হিসেবে অস্বীকার করেছেন সেই ইফাত এখন দেশে নেই। তিনি তিনদিন আগেই বিদেশে চলে গেছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, ইফাত তাদের কাছে কোন বড় বিষয় নয়, বিষয় হলো মতিউর রহমান। এনবিআরের এই কর্মকর্তা কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন সেটি তদন্তের দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। কিন্তু মতিউর রহমান যেন বেনজীরের মতো সটকে পড়তে না পারেন বা তিনি যেন তার নামে-বেনামে রাখা সম্পদগুলো বিক্রি-বায়না করতে না পারেন সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে মতিউর রহমানকে । শুধু দেশে নয়, বিদেশেও মতিউর রহমানের বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মতিউরের অবস্থান, তার দুই স্ত্রীর অবস্থান এবং তার সন্তানদের অবস্থান সম্পর্কে সার্বক্ষণিক তথ্য গ্রহণ করা হচ্ছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে যখনই দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করবে, সাথে সাথে যেন তাকে আইনের আওতায় আনা যায় সেলক্ষ্যে এরইমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে গোয়েন্দা সংস্থা।
এদিকে দুদকের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, এনবিআরের সদস্য এবং কাস্টমস ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট মতিউরের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে দুদকের অনুসন্ধান দল। এক্ষেত্রে বেনজীরের মতো মতিউর রহমানের সম্পত্তির অনুসন্ধান করে সেই সম্পত্তিগুলো আদালতের মাধ্যমে ক্রোক করার পরিকল্পনাও নিয়েছে সংস্থাটি। অপরদিকে মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাংক ও বিও হিসাব (বেনিফিশিয়ারি অ্যাকাউন্ট) স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দুদকের নির্দেশনার পর আর্থিক খাতের এ গোয়েন্দা সংস্থাটি কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।























