১০:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সিন্ডিকেটের বেড়াজালেই এনবিআর

❖ সংস্থাটির স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন
❖ দুর্নীতিপরায়ণদেরই দাপট বেশি, রয়েছে সিন্ডিকেট
❖ থুবড়ে পড়ছে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির মুখ

➢ জবাবদিহিতা ও দোষারোপের সংস্কৃতি চালু না হলে দুর্নীতির পরিবর্তন ঘটবে না : ড. তৌহিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
➢ সমাজের সব জায়গায় দুর্নীতি পৌঁছে গেছে, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণ সহজ নয় : মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, উপদেষ্টা, আইবিএফবি ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর

সরকারের চালিকাশক্তি হিসেবে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অথচ এক ছাগলকাণ্ডে এনবিআর কর্মকর্তাদের একের পর এক দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচিত হওয়ায় এই সেক্টরের কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপকর্ম নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন উঠেছে। এতে দুর্নীতি দমনে সরকারের নেওয়া জিরো টলারেন্স নীতির মুখ থুবড়ে পড়ছে। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধুমাত্র এনবিআর নয়, অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই জড়িয়ে পড়ছেন দুর্নীতিতে। জবাবদিহিতা না থাকায় পুরনোরাই নতুনদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে দুর্নীতিতে উৎসাহিত করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে। একে অপরকে দোষারোপ করে মূলত দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা সহসাই পার পেয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবছর এদের সম্পদের হিসাব সংগ্রহ করে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার আওতায় আনা না গেলে কখনোই দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইবিএফবি’র উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়। যেকোনো অন্যায়-অনিয়ম ব্যাপারেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। গতকাল সোমবার এনবিআরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারের চালিকাশক্তি হিসেবে আর্থিকখাতকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিভিন্ন খাতের তুলনায় শুধুমাত্র এনবিআরের খাত থেকেই রাজস্ব আহরণ হচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ। অথচ এক ছাগলকাণ্ডে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআরের) কর্মকর্তা মতিউর রহমান আলোচনায় আসর পর আরো দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। যারা এতদিন মতিউর সিন্ডিকেটের ভয়ে কথা বলার সাহস পেত না তারাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসছে সমজোতামূলক এনবিআরের ঘুষ কেলেঙ্কারির নানান তথ্য-উপাত্য।

এনবিআরের সাবেক কমিশনারসহ একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২ বছর আগে বেনাপোল কাস্টমস হাউস থেকে প্রতি সপ্তাহে এনবিআরে মতিউর সিন্ডিকেটের একজন সদস্যের কাছে সপ্তাহে ২৫ লাখ টাকা পাঠানো হতো। ব্যাগ ভর্তি এই টাকা বহন করে বিমানযোগে ঢাকায় এনবিআরে টার্গেটকৃত কর্মকর্তার অফিস বা বাসায় পৌঁছে দিতেন পিয়ন থেকে পদোন্নতি পাওয়া মুকুল হোসেন। এভাবে প্রতি মাসে কমপক্ষে কোটি টাকা ঢাকায় পৌঁছাতেন। কিন্তু ২০২২ সালের আগস্ট মাসে বিমানে ব্যাগ তল্লাশির সময় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে টাকার বান্ডিলসহ ধরা পড়েন মুকুল। অবশেষে অর্থ পাচারকারী হিসেবে মুকুলের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। যা এখনো তদন্ত চলছে। মূলত ‘পানির ধর্ম নিচের দিকেই গড়ায়…’। দুর্নীতি দমন কমিশন বা অন্য কোন সংস্থা দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করলে থলের মূল বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। ওই সময়ের এনবিআরের একজন মেম্বার ও বেনাপোলের কাস্টমসের একজন কমিশনার জড়িত। তাদের নির্দেশে টাকাগুলো বিমানযোগে ঢাকায় আনা হতো। বড় কর্তারা রেহাই পেলেও বিপাকে পড়েছেন টাকা বহনকারী মুকুল। অথচ মূল হোতারা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। মুকুলের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা দিয়ে এখনও অনুসন্ধান চালালে রাঘব-বোয়ালরা ধরা পড়বেন। সূত্র জানায়, বেনাপোল কাস্টমসে গোডাউন থেকে স্বর্ণসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরিসহ নানা ঘটনা ঘটলেও পরে তদন্তে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। এভাবে বেনাপোল কাস্টমসের প্রতিনিয়ত নানা অপকর্ম ঘটছে। বেনাপোল ছাড়াও ঢাকার কাস্টমস হাউসের গোডাউন থেকে স্বর্ণসহ মূল্যবান সামগ্রী হারিয়েছে। তা নিয়ে এখনো গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছেন।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এনবিআরসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থায় বর্তমানে দুর্নীতির যে চিত্র দেখছি, তা রাষ্ট্র এবং সমাজকে শঙ্কার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অপরদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। যিনি সাধারণ মানুষকে স্বচ্ছতার আওতায় আনতে দুর্নীতি ধরছেন, তারাই আবার দুর্নীতিতে জড়াচ্ছেন। রাজস্ব আদায়ে যেসব কাগজপত্র উপস্থাপনের কথা, সেগুলোর নিয়ম ভেঙে সাধারণ মানুষের ওপর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে আর্থিক সুবিধা নিয়ে রাতারাতি অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে যাচ্ছেন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা। কারো দুর্নীতির তথ্য উঠে আসলে এক সংস্থা আরেক সংস্থাকে দোষারোপ করে দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয়-ব্যয় ও সম্পত্তির হিসাব প্রতিবছর সরকারকে দিতে হবে এবং তা জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে ড, তৌহিদুল হক বলেন, দুর্নীতি করার জন্য কেউ কেউ আগে থেকেই টার্গেট করে চাকরিতে প্রবেশ করে। আবার অনেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পুরোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতিতে জড়াচ্ছেন। এর কারণ হচ্ছেÑ নতুনরা কর্মস্থলে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই পুরোনো কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের দুর্নীতির খাতকে শক্তিশালী সিন্ডিকেট করতে নতুনদের দলে ভেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি চালু না করলে দেশ ও সমাজ থেকে দুর্নীতির পরিবর্তন ঘটবে না। এসব বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবদুল মজিদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যেকোন অন্যায়-অনিয়ম ব্যাপারেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি রয়েছে। শুধু রাজস্ব খাত বললে হবে না। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক এই সচিব আরও বলেন, দুর্নীতিই দুর্নীতির উৎস। সমাজের সব জায়গায় দুর্নীতি পৌঁছে গেছে। দুর্নীতির ভিতের উপর কোনো কিছু তৈরি হলে সেখান থেকে আর কি আশা করা যায়। এগুলো এখন সবার সামনে দৃশ্যমান। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়।

এদিকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি এ কে আব্দুল মোমেন গত ২৯ জুন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন- দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে বদলি কোনো কার্যকরী শাস্তি হতে পারে না। বরং দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদের সঠিক হিসাব বের করতে হবে এবং তার সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া দরকার। তিনি আরও লিখেন, ‘অবশ্যই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের তড়িতবেগে চাকরিচ্যুত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকারি চাকরিজীবী সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ও সম্পদ হচ্ছে তার চাকরি। দুর্নীতিপরায়ণরা জনগণের শত্রু, দেশের শত্রু।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিসিবি পরিচালক পদত্যাগ না করলে ক্রিকেট বর্জনের আলটিমেটাম

সিন্ডিকেটের বেড়াজালেই এনবিআর

আপডেট সময় : ০৭:৫৩:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুলাই ২০২৪

❖ সংস্থাটির স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন
❖ দুর্নীতিপরায়ণদেরই দাপট বেশি, রয়েছে সিন্ডিকেট
❖ থুবড়ে পড়ছে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির মুখ

➢ জবাবদিহিতা ও দোষারোপের সংস্কৃতি চালু না হলে দুর্নীতির পরিবর্তন ঘটবে না : ড. তৌহিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
➢ সমাজের সব জায়গায় দুর্নীতি পৌঁছে গেছে, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণ সহজ নয় : মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, উপদেষ্টা, আইবিএফবি ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর

সরকারের চালিকাশক্তি হিসেবে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অথচ এক ছাগলকাণ্ডে এনবিআর কর্মকর্তাদের একের পর এক দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচিত হওয়ায় এই সেক্টরের কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপকর্ম নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন উঠেছে। এতে দুর্নীতি দমনে সরকারের নেওয়া জিরো টলারেন্স নীতির মুখ থুবড়ে পড়ছে। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধুমাত্র এনবিআর নয়, অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই জড়িয়ে পড়ছেন দুর্নীতিতে। জবাবদিহিতা না থাকায় পুরনোরাই নতুনদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে দুর্নীতিতে উৎসাহিত করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে। একে অপরকে দোষারোপ করে মূলত দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা সহসাই পার পেয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবছর এদের সম্পদের হিসাব সংগ্রহ করে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার আওতায় আনা না গেলে কখনোই দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইবিএফবি’র উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়। যেকোনো অন্যায়-অনিয়ম ব্যাপারেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। গতকাল সোমবার এনবিআরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারের চালিকাশক্তি হিসেবে আর্থিকখাতকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিভিন্ন খাতের তুলনায় শুধুমাত্র এনবিআরের খাত থেকেই রাজস্ব আহরণ হচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ। অথচ এক ছাগলকাণ্ডে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআরের) কর্মকর্তা মতিউর রহমান আলোচনায় আসর পর আরো দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। যারা এতদিন মতিউর সিন্ডিকেটের ভয়ে কথা বলার সাহস পেত না তারাও মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসছে সমজোতামূলক এনবিআরের ঘুষ কেলেঙ্কারির নানান তথ্য-উপাত্য।

এনবিআরের সাবেক কমিশনারসহ একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২ বছর আগে বেনাপোল কাস্টমস হাউস থেকে প্রতি সপ্তাহে এনবিআরে মতিউর সিন্ডিকেটের একজন সদস্যের কাছে সপ্তাহে ২৫ লাখ টাকা পাঠানো হতো। ব্যাগ ভর্তি এই টাকা বহন করে বিমানযোগে ঢাকায় এনবিআরে টার্গেটকৃত কর্মকর্তার অফিস বা বাসায় পৌঁছে দিতেন পিয়ন থেকে পদোন্নতি পাওয়া মুকুল হোসেন। এভাবে প্রতি মাসে কমপক্ষে কোটি টাকা ঢাকায় পৌঁছাতেন। কিন্তু ২০২২ সালের আগস্ট মাসে বিমানে ব্যাগ তল্লাশির সময় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে টাকার বান্ডিলসহ ধরা পড়েন মুকুল। অবশেষে অর্থ পাচারকারী হিসেবে মুকুলের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। যা এখনো তদন্ত চলছে। মূলত ‘পানির ধর্ম নিচের দিকেই গড়ায়…’। দুর্নীতি দমন কমিশন বা অন্য কোন সংস্থা দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করলে থলের মূল বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। ওই সময়ের এনবিআরের একজন মেম্বার ও বেনাপোলের কাস্টমসের একজন কমিশনার জড়িত। তাদের নির্দেশে টাকাগুলো বিমানযোগে ঢাকায় আনা হতো। বড় কর্তারা রেহাই পেলেও বিপাকে পড়েছেন টাকা বহনকারী মুকুল। অথচ মূল হোতারা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। মুকুলের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা দিয়ে এখনও অনুসন্ধান চালালে রাঘব-বোয়ালরা ধরা পড়বেন। সূত্র জানায়, বেনাপোল কাস্টমসে গোডাউন থেকে স্বর্ণসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরিসহ নানা ঘটনা ঘটলেও পরে তদন্তে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। এভাবে বেনাপোল কাস্টমসের প্রতিনিয়ত নানা অপকর্ম ঘটছে। বেনাপোল ছাড়াও ঢাকার কাস্টমস হাউসের গোডাউন থেকে স্বর্ণসহ মূল্যবান সামগ্রী হারিয়েছে। তা নিয়ে এখনো গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছেন।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এনবিআরসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থায় বর্তমানে দুর্নীতির যে চিত্র দেখছি, তা রাষ্ট্র এবং সমাজকে শঙ্কার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অপরদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। যিনি সাধারণ মানুষকে স্বচ্ছতার আওতায় আনতে দুর্নীতি ধরছেন, তারাই আবার দুর্নীতিতে জড়াচ্ছেন। রাজস্ব আদায়ে যেসব কাগজপত্র উপস্থাপনের কথা, সেগুলোর নিয়ম ভেঙে সাধারণ মানুষের ওপর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে আর্থিক সুবিধা নিয়ে রাতারাতি অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে যাচ্ছেন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা। কারো দুর্নীতির তথ্য উঠে আসলে এক সংস্থা আরেক সংস্থাকে দোষারোপ করে দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয়-ব্যয় ও সম্পত্তির হিসাব প্রতিবছর সরকারকে দিতে হবে এবং তা জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে ড, তৌহিদুল হক বলেন, দুর্নীতি করার জন্য কেউ কেউ আগে থেকেই টার্গেট করে চাকরিতে প্রবেশ করে। আবার অনেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পুরোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতিতে জড়াচ্ছেন। এর কারণ হচ্ছেÑ নতুনরা কর্মস্থলে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই পুরোনো কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের দুর্নীতির খাতকে শক্তিশালী সিন্ডিকেট করতে নতুনদের দলে ভেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি চালু না করলে দেশ ও সমাজ থেকে দুর্নীতির পরিবর্তন ঘটবে না। এসব বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবদুল মজিদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যেকোন অন্যায়-অনিয়ম ব্যাপারেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি রয়েছে। শুধু রাজস্ব খাত বললে হবে না। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক এই সচিব আরও বলেন, দুর্নীতিই দুর্নীতির উৎস। সমাজের সব জায়গায় দুর্নীতি পৌঁছে গেছে। দুর্নীতির ভিতের উপর কোনো কিছু তৈরি হলে সেখান থেকে আর কি আশা করা যায়। এগুলো এখন সবার সামনে দৃশ্যমান। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দুর্নীতিবাজদের নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়।

এদিকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি এ কে আব্দুল মোমেন গত ২৯ জুন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন- দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে বদলি কোনো কার্যকরী শাস্তি হতে পারে না। বরং দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদের সঠিক হিসাব বের করতে হবে এবং তার সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া দরকার। তিনি আরও লিখেন, ‘অবশ্যই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের তড়িতবেগে চাকরিচ্যুত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকারি চাকরিজীবী সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ও সম্পদ হচ্ছে তার চাকরি। দুর্নীতিপরায়ণরা জনগণের শত্রু, দেশের শত্রু।