১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
কোম্পানির প্রতিনিধিদের উৎপাত

ওষুধ বিপণনকারীদের দৌরাত্ন্য

❖ হাসপাতাল ঘিরে রিপ্রেজেন্টেটিভদের সিন্ডিকেট
❖ নির্ধারিত সময়ে চেম্বারে আসেন না চিকিৎসক, সাক্ষাৎ পেতে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা
❖ রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলায় টানা-হেঁচড়া, অতিষ্ঠ রোগীরা

⮞ রোগীর প্রেসক্রিপশন আইনতই পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল। সুতরাং কেউ কিছুতেই এটির ছবি তুলতে পারে না : অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ, আইইডিসিআর’র সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

রাজধানীর নামি-দামি বেসরকারি কিছু হাসপাতালে বিধি-নিষেধ থাকলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। এরা হাসপাতাল ঘিরে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নির্ধারিত সময়ে চেম্বারে আসেন না মেডিক্যাল অফিসাররা। এর ফলে রোগীরা যথাসময়ে ডক্তারের সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না। অথচ মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই যখন-তখন ঢুকে পড়ছেন চিকিৎসকের কক্ষে। আবার রোগীরা চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রেসক্রিপশন নিয়ে শুরু করেন টানা-হেঁচড়া। এতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল প্রতিনিধিরা বলছেন, ডাক্তাররা কী ধরনের ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখছেন তা দেখে ছবি তুলে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, রোগীর প্রেসক্রিপশন আইনতই পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল। সুতরাং কেউ কিছুতেই এটির ছবি তুলতে পারে না। যদি কেউ করে থাকে, তাহলে বিধিবহির্ভূত। গতকাল সোমবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল সকাল ৮টায় পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের পুরোনো চিত্র পাল্টে গেছে। জরুরি বিভাগ, আউটডোর-ইনডোরসহ প্রতিটি বিভাগেই শূনশান নীরবতা। নেই দালাল ও ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের উৎপাত। রোগীরা বিভিন্ন বিভাগে সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে একের পর একজন ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকছেন, বের হচ্ছেন। আগে থেকেই হাসপাতালে কর্তব্যরত সব বিভাগের ডাক্তার-নার্স ও কর্মচারীরা যার যার কর্মস্থলে হাজির হয়েছেন। হঠাৎ দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মচারি মামুনুর রশিদ বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসেছেন। কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া থেকে পেটের ব্যাথা নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগে মেডিসিন ইউনিটে আসেন গৃহবধূ আমেনা বেগম। তিনি বলেন, এর আগেও এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছি, ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে দুর্ভোগও পোহাতে হয়েছে। তবে আজ কোথাও কোনো দুর্ভোগে পড়তে হয়নি। নির্ধারিত সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এখন বাসায় ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু মন্ত্রী চলে যাওয়ার পরই পুরোনো চেহারায় ফিরে হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ। রোগীদের অভিযোগ, যারা টাকা দিচ্ছে তাদেরকে পেছন থেকে সিরিয়াল ব্রেক করে ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকানো হচ্ছে। অথচ ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেও সিরিয়াল পাওয়া যায়নি। সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগের বিভিন্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, ডাক্তারের প্রতিটি চেম্বারে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। মেডিসিন বিভাগের বিভিন্ন কক্ষে রোগী দেখছেন ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা।

তবে মেডিকেল অফিসার ও প্রফেসররা ইনডোরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাউন্ডে রয়েছেন বলে জানান কর্মচারিরা। রামপুরা থেকে আসা আমির হোসেন নামের এক রোগী কানের সমস্যা নিয়ে বহির্বিভাগের দোতলায় ডাক্তার দেখাতে আসেন। তিনি বলেন, ডাক্তার দেখিয়ে চেম্বারের বাইরে বের না হতেই ওষুধ কোম্পানির লোকজন আমাকে ঘিরে ধরেন। টানাটানি শুরু করেন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। এরপর তারা মোবাইলে ছবি তুলে আমাকে সান্তনা দিয়ে বলেন, যান, নিচ তলার ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওষুধ কোম্পানির লোকজন কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে পড়েন। তারা কলম-প্যাড এবং ওষুধের স্যাম্পল ডাক্তারের সামনে রেখে কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লেখার অনুরোধ জানান। চেম্বারের ভেতর ওষুধ কোম্পানির লোকজন থাকলে রোগ সম্পর্কে ডাক্তারকে বিস্তারিত বলা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ভুল চিকিৎসারও শঙ্কা থেকে যায়। এমন চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। সরেজমিন দেখা যায়, এসব হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগীরা আসছেন। ডাক্তাররা এসব রোগীকে প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখছেন কিনা, তা দেখতে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ইউনিট ও চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে ঘোরাঘুরি করেন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা। রোগীরা হাসপাতালের বহির্বিভাগের ডাক্তার দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ডাক্তারদের কাছে থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি তুলছেন। এছাড়া ডাক্তারের চেম্বার থেকে রোগীরা বের হওয়ার পরপরই বেশির ভাগ রিপ্রেজেন্টেটিভ কৌশলে তাদের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসব কারণে রোগী এবং স্বজনরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মর্জিনা বেগম বলেন, রাজবাড়ী থেকে এই হাসপাতালে এসেছি একটু কম খরচে চিকিৎসা করাতে। তিনি বলেন, ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পরেই ওষুধ কোম্পানির লোকেরা আমাকে ঘিরে ধরে প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলেছেন। সে সময় একজন বলেছিলেন, তার কোম্পানির দুইটা ওষুধ লিখেছেন, আরেকজন বলছেন তার কোম্পানির একটা লিখেছেন চিকিৎসক। মর্জিনা বেগমের অভিযোগ, তার হাতে সময় ছিল না, এটা বলারও সময় দেননি ওষুধ কোম্পানির লোকজন। ক্ষোভ প্রকাশ করে একই অভিযোগ করেন মাদারীপুর থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আব্দুস মজিদসহ আরো অনেকে। তারা জানান, হাসপাতালে যেসব রোগী আসেন, তাদের মধ্যে অনেক গুরুতর অসুস্থ রোগী থাকেন, টেনশনও থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ কোম্পানির লোকেরা কেন এমনভাবে রোগী ও স্বজনদের বিব্রত করেন জানিনা। জানা যায়, গত ৮ জুন দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চিকিৎসা নিতে বিএসএমএমইউতে এসে ডাক্তার দেখান আনিসুর রহমান। ডাক্তারের রুম থেকে বের হওয়ার সময় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা তার কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন চায়। তিনি ছবি তুলতে না দেওয়ায় তারা দলবদ্ধ হয়ে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের সামনেই তাকে মারধর করেন। এ ঘটনায় তিনি হাসপাতাল পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আউটডোর-ইনডোরে থাকা ওষুধ কোম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মার্কেটিংয়ের জন্য কোম্পানি ভেদে তাদের প্রতিদিন ৫০-১০০ জন রোগীর প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার টার্গেট দেওয়া হয়। এই টার্গের পূরণ করতে না পারলে কোম্পানি থেকে চাপ আসে। এজন্য প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে হয়। এতে রোগীরা বিরক্ত হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাদের কিছুই করার নেই। কারণ, ডাক্তাররা তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখছেন কিনা, সেটা দেখার জন্য কোম্পানি তাদের নিয়োগ দিয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে চিকিৎসকেরাও অবগত আছেন। তবে এ বিষয়ে কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

এদিকে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক বলেন, রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো, দামি ওষুধ লেখা, কমিশন বাণিজ্যসহ চিকিৎসকদের অনৈতিক যে কোনো বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কোনো কোনো চিকিৎসক আবার রোগীদের অপ্রয়োজনীয় দামি ওষুধ দিয়ে থাকেন। যাকে মানুষ ‘ডিব্বা প্র্যাকটিস’ বলে থাকে, এ ধরনের ‘ডিব্বা প্র্যাকটিস’ দমন করা হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদের মতে, একজন ডাক্তার যখন রোগীকে দেখেন, তখন রোগীর অনুমতি ছাড়া কোনো আত্মীয়কেও ভেতরে থাকতে দিতে পারেন না। রোগীর প্রেসক্রিপশন আইনতই পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল। সুতরাং কেউ কিছুতেই এটির ছবি তুলতে পারে না। রোগীর দুর্ভোগ কমাতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের এমন অপতৎপরতা রোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কোম্পানির প্রতিনিধিদের উৎপাত

ওষুধ বিপণনকারীদের দৌরাত্ন্য

আপডেট সময় : ০৫:৩২:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুলাই ২০২৪

❖ হাসপাতাল ঘিরে রিপ্রেজেন্টেটিভদের সিন্ডিকেট
❖ নির্ধারিত সময়ে চেম্বারে আসেন না চিকিৎসক, সাক্ষাৎ পেতে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা
❖ রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলায় টানা-হেঁচড়া, অতিষ্ঠ রোগীরা

⮞ রোগীর প্রেসক্রিপশন আইনতই পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল। সুতরাং কেউ কিছুতেই এটির ছবি তুলতে পারে না : অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ, আইইডিসিআর’র সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

রাজধানীর নামি-দামি বেসরকারি কিছু হাসপাতালে বিধি-নিষেধ থাকলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। এরা হাসপাতাল ঘিরে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নির্ধারিত সময়ে চেম্বারে আসেন না মেডিক্যাল অফিসাররা। এর ফলে রোগীরা যথাসময়ে ডক্তারের সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না। অথচ মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই যখন-তখন ঢুকে পড়ছেন চিকিৎসকের কক্ষে। আবার রোগীরা চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রেসক্রিপশন নিয়ে শুরু করেন টানা-হেঁচড়া। এতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল প্রতিনিধিরা বলছেন, ডাক্তাররা কী ধরনের ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখছেন তা দেখে ছবি তুলে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, রোগীর প্রেসক্রিপশন আইনতই পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল। সুতরাং কেউ কিছুতেই এটির ছবি তুলতে পারে না। যদি কেউ করে থাকে, তাহলে বিধিবহির্ভূত। গতকাল সোমবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল সকাল ৮টায় পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের পুরোনো চিত্র পাল্টে গেছে। জরুরি বিভাগ, আউটডোর-ইনডোরসহ প্রতিটি বিভাগেই শূনশান নীরবতা। নেই দালাল ও ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের উৎপাত। রোগীরা বিভিন্ন বিভাগে সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে একের পর একজন ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকছেন, বের হচ্ছেন। আগে থেকেই হাসপাতালে কর্তব্যরত সব বিভাগের ডাক্তার-নার্স ও কর্মচারীরা যার যার কর্মস্থলে হাজির হয়েছেন। হঠাৎ দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মচারি মামুনুর রশিদ বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসেছেন। কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া থেকে পেটের ব্যাথা নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগে মেডিসিন ইউনিটে আসেন গৃহবধূ আমেনা বেগম। তিনি বলেন, এর আগেও এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছি, ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে দুর্ভোগও পোহাতে হয়েছে। তবে আজ কোথাও কোনো দুর্ভোগে পড়তে হয়নি। নির্ধারিত সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এখন বাসায় ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু মন্ত্রী চলে যাওয়ার পরই পুরোনো চেহারায় ফিরে হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ। রোগীদের অভিযোগ, যারা টাকা দিচ্ছে তাদেরকে পেছন থেকে সিরিয়াল ব্রেক করে ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকানো হচ্ছে। অথচ ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেও সিরিয়াল পাওয়া যায়নি। সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগের বিভিন্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, ডাক্তারের প্রতিটি চেম্বারে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। মেডিসিন বিভাগের বিভিন্ন কক্ষে রোগী দেখছেন ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা।

তবে মেডিকেল অফিসার ও প্রফেসররা ইনডোরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাউন্ডে রয়েছেন বলে জানান কর্মচারিরা। রামপুরা থেকে আসা আমির হোসেন নামের এক রোগী কানের সমস্যা নিয়ে বহির্বিভাগের দোতলায় ডাক্তার দেখাতে আসেন। তিনি বলেন, ডাক্তার দেখিয়ে চেম্বারের বাইরে বের না হতেই ওষুধ কোম্পানির লোকজন আমাকে ঘিরে ধরেন। টানাটানি শুরু করেন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। এরপর তারা মোবাইলে ছবি তুলে আমাকে সান্তনা দিয়ে বলেন, যান, নিচ তলার ফার্মেসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওষুধ কোম্পানির লোকজন কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে পড়েন। তারা কলম-প্যাড এবং ওষুধের স্যাম্পল ডাক্তারের সামনে রেখে কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রিপশনে লেখার অনুরোধ জানান। চেম্বারের ভেতর ওষুধ কোম্পানির লোকজন থাকলে রোগ সম্পর্কে ডাক্তারকে বিস্তারিত বলা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ভুল চিকিৎসারও শঙ্কা থেকে যায়। এমন চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। সরেজমিন দেখা যায়, এসব হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগীরা আসছেন। ডাক্তাররা এসব রোগীকে প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখছেন কিনা, তা দেখতে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ইউনিট ও চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে ঘোরাঘুরি করেন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা। রোগীরা হাসপাতালের বহির্বিভাগের ডাক্তার দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ডাক্তারদের কাছে থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি তুলছেন। এছাড়া ডাক্তারের চেম্বার থেকে রোগীরা বের হওয়ার পরপরই বেশির ভাগ রিপ্রেজেন্টেটিভ কৌশলে তাদের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসব কারণে রোগী এবং স্বজনরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মর্জিনা বেগম বলেন, রাজবাড়ী থেকে এই হাসপাতালে এসেছি একটু কম খরচে চিকিৎসা করাতে। তিনি বলেন, ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পরেই ওষুধ কোম্পানির লোকেরা আমাকে ঘিরে ধরে প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলেছেন। সে সময় একজন বলেছিলেন, তার কোম্পানির দুইটা ওষুধ লিখেছেন, আরেকজন বলছেন তার কোম্পানির একটা লিখেছেন চিকিৎসক। মর্জিনা বেগমের অভিযোগ, তার হাতে সময় ছিল না, এটা বলারও সময় দেননি ওষুধ কোম্পানির লোকজন। ক্ষোভ প্রকাশ করে একই অভিযোগ করেন মাদারীপুর থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আব্দুস মজিদসহ আরো অনেকে। তারা জানান, হাসপাতালে যেসব রোগী আসেন, তাদের মধ্যে অনেক গুরুতর অসুস্থ রোগী থাকেন, টেনশনও থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ কোম্পানির লোকেরা কেন এমনভাবে রোগী ও স্বজনদের বিব্রত করেন জানিনা। জানা যায়, গত ৮ জুন দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চিকিৎসা নিতে বিএসএমএমইউতে এসে ডাক্তার দেখান আনিসুর রহমান। ডাক্তারের রুম থেকে বের হওয়ার সময় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা তার কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন চায়। তিনি ছবি তুলতে না দেওয়ায় তারা দলবদ্ধ হয়ে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের সামনেই তাকে মারধর করেন। এ ঘটনায় তিনি হাসপাতাল পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের আউটডোর-ইনডোরে থাকা ওষুধ কোম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মার্কেটিংয়ের জন্য কোম্পানি ভেদে তাদের প্রতিদিন ৫০-১০০ জন রোগীর প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার টার্গেট দেওয়া হয়। এই টার্গের পূরণ করতে না পারলে কোম্পানি থেকে চাপ আসে। এজন্য প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে হয়। এতে রোগীরা বিরক্ত হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাদের কিছুই করার নেই। কারণ, ডাক্তাররা তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখছেন কিনা, সেটা দেখার জন্য কোম্পানি তাদের নিয়োগ দিয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে চিকিৎসকেরাও অবগত আছেন। তবে এ বিষয়ে কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

এদিকে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক বলেন, রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো, দামি ওষুধ লেখা, কমিশন বাণিজ্যসহ চিকিৎসকদের অনৈতিক যে কোনো বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কোনো কোনো চিকিৎসক আবার রোগীদের অপ্রয়োজনীয় দামি ওষুধ দিয়ে থাকেন। যাকে মানুষ ‘ডিব্বা প্র্যাকটিস’ বলে থাকে, এ ধরনের ‘ডিব্বা প্র্যাকটিস’ দমন করা হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদের মতে, একজন ডাক্তার যখন রোগীকে দেখেন, তখন রোগীর অনুমতি ছাড়া কোনো আত্মীয়কেও ভেতরে থাকতে দিতে পারেন না। রোগীর প্রেসক্রিপশন আইনতই পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল। সুতরাং কেউ কিছুতেই এটির ছবি তুলতে পারে না। রোগীর দুর্ভোগ কমাতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের এমন অপতৎপরতা রোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।