১২:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রাণ হারাচ্ছে বাংলাবাজারের প্রকাশনা শিল্প

◉ কাগজের উচ্চ মূল্যে বিপাকে প্রকাশকরা
◉ হারিয়ে যাওয়ার পথে অনেক প্রকাশনী
◉ পেশা বদলাচ্ছেন বই শ্রমিকরা

❖৩০ শতাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে: শ্যামল পাল, সহসভাপতি, পুস্তক প্রকাশনা সমিতি।

কাগজ ও মুদ্রণ কাঁচামালের উচ্চমূল্য, নতুন শিক্ষাক্রম, সৃজনশীল বইয়ের পাঠক সংকট, ডিজিটালাইজেশনসহ নানামুখী সংকটে ধুঁকছে দেশের প্রকাশনা ও বই ব্যবসার সর্ববৃহৎ কেন্দ্র বাংলাবাজারের প্রকাশনা শিল্প। সৃজনশীল, পাঠ্যবইয়ের সহায়ক বই, ধর্মীয়সহ সকল ধরণের বইয়ের ব্যবসাতেই মন্দা চলছে বিগত কয়েকবছর ধরে। এমনকি ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলাতেও আশানরূপ বই বিক্রি না হওয়ায় হতাশ প্রকাশকরা। এছাড়া ও নতুন শিক্ষাক্রমে চাহিদা হারিয়েছে সহায়ক বইগুলো। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও ছাপাখানা ও বাঁধাই কারাখানাগুলোতে। ফলে অনেক প্রকাশনই গুটিয়েছে ব্যবসা আবার হারিয়ে যাওয়ার পথে অনেকে। পেশা বদল করছেন এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত শ্রমিকরাও।
বাংলাবাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাঠকের সব ধরনের বইয়ের চাহিদা পূরণ করেন বাংলাবাজারের প্রকাশক-ব্যবসায়ীরা। একাডেমিক বই থেকে শুরু করে নোট-গাইড, চাকরির প্রস্তুতি, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, অনুবাদ, শিশুতোষসহ সব ধরনের বই প্রস্তুত ও বিক্রি হয় এখানে। দেশের বড় বড় প্রকাশনীগুলোও গড়ে উঠেছে সদরঘাট পাশর্^বর্তী এই বাজারে। যেখানে একসময় বইয়ের ভ্যান ও কুলিদের চাপে ঢোকায় মুশকিল ছিলো, সেখানে নেই চিরচেনা ব্যস্ততা। অনেকটায় অলস সময় কাটাচ্ছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো, নেই বই শ্রমিকদরে হইচই। পাশ^বর্তী প্যারিদাস লেন, শিরিষ দাস লেন, পাতলা খান লেন, রূপচান লেন, জয়চন্দ্র ঘোষ লেনগুলোতে যেখানে চারিদিক থেকে ভেসে আসতো ছাপাখানার ঠুকঠাক আওয়াজ, সেখানেও নিরাবতা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার পর থেকেই নিজের স্বকীয়তা হারিয়েছে বাংলাবাজার। বন্ধ হচ্ছে একের পর এক প্রকাশনী, ছাপাখানা ও বাঁধাই কারাখানা। বই বিক্রি না হওয়া ও কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে লোকসান ঠেকাতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে প্রকাশনী জুপিটার, গ্লোব, আদিল, গ্যালাক্সিসহ অনেক প্রকাশনা। কাজ না থাকায় পেশা পরিবর্তন করছেন এখানকার শ্রমিকরা। যারা আছেন তাদেরও নানান সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাংলাবাজারে কাগজের ব্যবসায় পরিচিতি নাম মুকুল পেপার হাউসের স্বত্বাধিকারী লেলিন হোসেন বলেন, কয়েক দফায় বেড়েছে কাগজের দাম। ২৮ বছরের ব্যবসার বয়সে সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে। করোনার পর থেকে আর ব্যবসা ফেরেনি। বাজারে কাগজের চাহিদা আগের চেয়ে কম। ছাপাখানায় ব্যবহৃত বসুন্ধরা সাদা ৫৫ গ্রাম কাগজ এখন ১ হাজার ৬০০ টাকা রিম; দুই বছর আগে যার দাম ছিল ৮০০ টাকা। অফসেট সাদা কাগজ ৭০ গ্রাম এখন ২ হাজার ৮০০ টাকা, যা দুই বছর আগে ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা।
সোলাইমান বুক বাইন্ডিং হাউসের স্বত্বাধিকারী মো. সোলাইমান বলেন, এখন আর আগের মত কাজ আসে না। এখন গাইড বইয়ের কাজ হয়না নতুন শিক্ষাক্রমের জন্য। বইমেলায়ও বই হয় না তেমন। অল্প কিছু অর্ডার পাই। আগে যেখানে ৩০-৩৫ জন শ্রমিক কাজ করতো, এখন ১০-১২ জন আছে তাও নিয়মিত না। অনেক কারাখানাতো বন্ধ হয়ে গেছে।
ছাপাখানা।
মাহাবুব প্রিন্টসের ম্যানেজার শামীম হাসান বলেন, ছাপাখানার কাজ এখন নাই। মেশিন বন্ধ থাকে প্রায় সময়ই। আগে দিন-রাত কাজ করতাম। এখানে যারা কাজ করতো শ্রমিক হিসেবে, কেউ রিকশা চালাচ্ছে আবার কেউ গ্রামে চলে গেছে।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলা হলে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পাল সবুজ বাংলাকে বলেন, সৃজনশীল বইয়ের পাঠক নেই। মূলত কাগজের দামের কারণে বইয়রে দাম বেড়েছে, একারণে বিক্রিও বেড়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমের কারণে গাইড বইও বন্ধ। একটার পর একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে ৩০ শতাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এই অবস্থায় সরকার আন্তুরিক ন াহলে আমাদের টিকে থাকা মুশকিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রাণ হারাচ্ছে বাংলাবাজারের প্রকাশনা শিল্প

আপডেট সময় : ০৩:৩২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুলাই ২০২৪

◉ কাগজের উচ্চ মূল্যে বিপাকে প্রকাশকরা
◉ হারিয়ে যাওয়ার পথে অনেক প্রকাশনী
◉ পেশা বদলাচ্ছেন বই শ্রমিকরা

❖৩০ শতাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে: শ্যামল পাল, সহসভাপতি, পুস্তক প্রকাশনা সমিতি।

কাগজ ও মুদ্রণ কাঁচামালের উচ্চমূল্য, নতুন শিক্ষাক্রম, সৃজনশীল বইয়ের পাঠক সংকট, ডিজিটালাইজেশনসহ নানামুখী সংকটে ধুঁকছে দেশের প্রকাশনা ও বই ব্যবসার সর্ববৃহৎ কেন্দ্র বাংলাবাজারের প্রকাশনা শিল্প। সৃজনশীল, পাঠ্যবইয়ের সহায়ক বই, ধর্মীয়সহ সকল ধরণের বইয়ের ব্যবসাতেই মন্দা চলছে বিগত কয়েকবছর ধরে। এমনকি ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলাতেও আশানরূপ বই বিক্রি না হওয়ায় হতাশ প্রকাশকরা। এছাড়া ও নতুন শিক্ষাক্রমে চাহিদা হারিয়েছে সহায়ক বইগুলো। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও ছাপাখানা ও বাঁধাই কারাখানাগুলোতে। ফলে অনেক প্রকাশনই গুটিয়েছে ব্যবসা আবার হারিয়ে যাওয়ার পথে অনেকে। পেশা বদল করছেন এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত শ্রমিকরাও।
বাংলাবাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাঠকের সব ধরনের বইয়ের চাহিদা পূরণ করেন বাংলাবাজারের প্রকাশক-ব্যবসায়ীরা। একাডেমিক বই থেকে শুরু করে নোট-গাইড, চাকরির প্রস্তুতি, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, অনুবাদ, শিশুতোষসহ সব ধরনের বই প্রস্তুত ও বিক্রি হয় এখানে। দেশের বড় বড় প্রকাশনীগুলোও গড়ে উঠেছে সদরঘাট পাশর্^বর্তী এই বাজারে। যেখানে একসময় বইয়ের ভ্যান ও কুলিদের চাপে ঢোকায় মুশকিল ছিলো, সেখানে নেই চিরচেনা ব্যস্ততা। অনেকটায় অলস সময় কাটাচ্ছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো, নেই বই শ্রমিকদরে হইচই। পাশ^বর্তী প্যারিদাস লেন, শিরিষ দাস লেন, পাতলা খান লেন, রূপচান লেন, জয়চন্দ্র ঘোষ লেনগুলোতে যেখানে চারিদিক থেকে ভেসে আসতো ছাপাখানার ঠুকঠাক আওয়াজ, সেখানেও নিরাবতা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার পর থেকেই নিজের স্বকীয়তা হারিয়েছে বাংলাবাজার। বন্ধ হচ্ছে একের পর এক প্রকাশনী, ছাপাখানা ও বাঁধাই কারাখানা। বই বিক্রি না হওয়া ও কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে লোকসান ঠেকাতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে প্রকাশনী জুপিটার, গ্লোব, আদিল, গ্যালাক্সিসহ অনেক প্রকাশনা। কাজ না থাকায় পেশা পরিবর্তন করছেন এখানকার শ্রমিকরা। যারা আছেন তাদেরও নানান সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাংলাবাজারে কাগজের ব্যবসায় পরিচিতি নাম মুকুল পেপার হাউসের স্বত্বাধিকারী লেলিন হোসেন বলেন, কয়েক দফায় বেড়েছে কাগজের দাম। ২৮ বছরের ব্যবসার বয়সে সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে। করোনার পর থেকে আর ব্যবসা ফেরেনি। বাজারে কাগজের চাহিদা আগের চেয়ে কম। ছাপাখানায় ব্যবহৃত বসুন্ধরা সাদা ৫৫ গ্রাম কাগজ এখন ১ হাজার ৬০০ টাকা রিম; দুই বছর আগে যার দাম ছিল ৮০০ টাকা। অফসেট সাদা কাগজ ৭০ গ্রাম এখন ২ হাজার ৮০০ টাকা, যা দুই বছর আগে ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা।
সোলাইমান বুক বাইন্ডিং হাউসের স্বত্বাধিকারী মো. সোলাইমান বলেন, এখন আর আগের মত কাজ আসে না। এখন গাইড বইয়ের কাজ হয়না নতুন শিক্ষাক্রমের জন্য। বইমেলায়ও বই হয় না তেমন। অল্প কিছু অর্ডার পাই। আগে যেখানে ৩০-৩৫ জন শ্রমিক কাজ করতো, এখন ১০-১২ জন আছে তাও নিয়মিত না। অনেক কারাখানাতো বন্ধ হয়ে গেছে।
ছাপাখানা।
মাহাবুব প্রিন্টসের ম্যানেজার শামীম হাসান বলেন, ছাপাখানার কাজ এখন নাই। মেশিন বন্ধ থাকে প্রায় সময়ই। আগে দিন-রাত কাজ করতাম। এখানে যারা কাজ করতো শ্রমিক হিসেবে, কেউ রিকশা চালাচ্ছে আবার কেউ গ্রামে চলে গেছে।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলা হলে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পাল সবুজ বাংলাকে বলেন, সৃজনশীল বইয়ের পাঠক নেই। মূলত কাগজের দামের কারণে বইয়রে দাম বেড়েছে, একারণে বিক্রিও বেড়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমের কারণে গাইড বইও বন্ধ। একটার পর একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে ৩০ শতাংশ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এই অবস্থায় সরকার আন্তুরিক ন াহলে আমাদের টিকে থাকা মুশকিল।