০৭:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ওয়াসিম: পেকুয়ায় এখনো কান্নার রোল

“আমার বুকের মানিককে ওরা মাইরা ফেলছে। তার কোনো দোষ ছিলনা। ওয়াসিম বারবার বলতো, বেসরকারি চাকরি না সরকারি চাকরি করবে। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন ছিল আমার ওয়াসিমের। পড়াশোনা শেষ না হতেই পাখির মতো গুলি করে যাদু মনিকে তারা মেরে ফেলেছে। ওরে চাকরি লাগবে না! আমার বুকের মানিককে তুরা ফিরিয়ে দে” কাঁদতে কাঁদতে আহাজারি করে ওয়াসিমের  মা জোসনা বেগম সবুজ বাংলা কে এভাবেই বলছিলেন  ছেলে হারানোর কথা।

“চলে আসুন ষোলশহর” ফেসবুকে এমন পোস্ট দেয়ার কিছুক্ষণ পরেই চট্টগ্রামের ষোলশহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশি হামলার দ্বিতীয় দিন ১৬ ই জুলাই এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওয়াসিমের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে এখনো কাঁদছে তার পরিবার, এখনো আফসোস করছে উপজেলাবাসী। স্তব্ধ হয়ে আছে এলাকার লোকজন। ওয়াসিমের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না কেউ ই।

নিহত ওয়াসিমের আকরামের বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা সদর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ মেহেরনামা বাজার পাড়া। ওয়াসিম মেহেরনামা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি, ২০১৯ সালে বাকলিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০১৯-২০ সেশনে চট্টগ্রাম কলেজে স্নাতকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হয়ে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২ ভাই ৩ বোনের মধ্যে ওয়াসিম দ্বিতীয়। তাঁকে নিজ গ্রামের করবস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ২৩ বছর।

ওয়াসিমের ছোটবোন সাবরিনা ইয়াসিন বলেন, পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ছেলে ছিল বড়ভাই ওয়াসিম। সে আমাকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন নয়ে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করিয়েছিল। বাবা মা এসএসসি পরীক্ষার পর বিয়ে দিয়ে দেয়ার কথা বললে সে চরমভাবে আপত্তি করত। প্রয়োজনে সে চাকরি করে আমার পড়াশোনার খরচ চালাবে এমন কথা বলত। কিন্তু তাঁর পড়াশোনা শেষ না হতেই দেহ থেকে প্রাণ বের করে ফেলেছে তারা।”

নিহতের ছোট চাচি জেয়াসমিন বলেন,  ওয়াসিমের বাবা ফোন করলে আমাকে বলত বিদেশের পরিস্থিতি খুবি খারাপ। তুমি স্নাতক পাশ, তুমি আমার ছেলেকে একটু বুঝিয়ে বল সে যেনো কোনো একটা চাকরি-বাকরি করে। কিন্তু ওয়াসিম বলতো, সে সরকারি চাকরি করবে। তাঁর সেই স্বপ্ন এখন মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। কোটা আন্দোলনে তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।”

ওয়াসিমের মা বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ১৬ তারিখ রাতে আমার মানিক শেষ বারের মতো আমার সাথে কথা বলেছিল। সে বলছিলো, আমার কান ব্যাথার চিকিৎসার জন্য আমাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাবে। কিন্তু পরদিন সে নিয়ে গেলো লাশ নিয়ে আসতে। রাতে সে বলেছিলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমি কিছু দেখতে পাইনি। এমন হবে জানলে তাকে বাসা থেকে বের না হওয়ার জন্য ওয়াদা করাতাম”

বড়বোন মরজিনা মুটোফোনে বলেন, সেদিন হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে। অচেনা কন্ঠস্বর বলছিল আপনারা দ্রুত চট্টগ্রাম আসেন। ওয়াসিম এক্সিডেন করেছে। পরে আমরা গিয়ে তার নিথর দেহ দেখতে পাই। তিনি বলেন, বিচার চাইব কার কাছে। রাষ্ট্রপক্ষই তো হত্যা করেছে। একমাত্র আল্লাহর কাছে আমরা এর বিচার চাইবো।

নিহতের চাচা জয়নাল বলেন, গত ১১ তারিখ  কুরবানি ইদের ছুটিতে ওয়াসিম আমার বাচ্চাদের জন্য আর্জেন্টিনা জার্সি এনেছিল। সে খুবই সাদাসিধা ও নিরহ প্রকৃতির ছিল। ভীষণ পরোপকারী হওয়ায় এলাকার প্রত্যেকে তাকে ভালোবাসতো।

স্থানীয় বাসিন্দা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ মুহাম্মাদ বলেন, ওয়াসিম আকরাম ভাইয়ের লাশ কবরস্থ করার সময় গোরের পাশে ছিলাম। তাঁর স্বজন-সাথীদের কান্নার রোল আকাশ বাতাস এমনভাবে ভারী করছিল যেন গোরস্তানের অনন্য লাশের কানেও পৌঁছে যাচ্ছিল স্বজন হারানোর বিরহরোল। নিজের ভিতর টা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম পাষণ্ড, নির্দয় ঘাতকের একটি নিষ্ঠুর বুলেট কতজনের স্বপ্ন, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব কেড়ে নিতে পারে। বর্তমান-ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দরভাবে বাচার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য স্বেচ্ছায় অস্ত নামা তরুণ অরুণের বিদেহী আত্মাকে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতুল ফেরদৌসের আ’লা মাকান দান করুক।

জনপ্রিয় সংবাদ

গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ওয়াসিম: পেকুয়ায় এখনো কান্নার রোল

আপডেট সময় : ০৭:৫৬:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অগাস্ট ২০২৪

“আমার বুকের মানিককে ওরা মাইরা ফেলছে। তার কোনো দোষ ছিলনা। ওয়াসিম বারবার বলতো, বেসরকারি চাকরি না সরকারি চাকরি করবে। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন ছিল আমার ওয়াসিমের। পড়াশোনা শেষ না হতেই পাখির মতো গুলি করে যাদু মনিকে তারা মেরে ফেলেছে। ওরে চাকরি লাগবে না! আমার বুকের মানিককে তুরা ফিরিয়ে দে” কাঁদতে কাঁদতে আহাজারি করে ওয়াসিমের  মা জোসনা বেগম সবুজ বাংলা কে এভাবেই বলছিলেন  ছেলে হারানোর কথা।

“চলে আসুন ষোলশহর” ফেসবুকে এমন পোস্ট দেয়ার কিছুক্ষণ পরেই চট্টগ্রামের ষোলশহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশি হামলার দ্বিতীয় দিন ১৬ ই জুলাই এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওয়াসিমের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে এখনো কাঁদছে তার পরিবার, এখনো আফসোস করছে উপজেলাবাসী। স্তব্ধ হয়ে আছে এলাকার লোকজন। ওয়াসিমের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না কেউ ই।

নিহত ওয়াসিমের আকরামের বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা সদর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ মেহেরনামা বাজার পাড়া। ওয়াসিম মেহেরনামা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি, ২০১৯ সালে বাকলিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০১৯-২০ সেশনে চট্টগ্রাম কলেজে স্নাতকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হয়ে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২ ভাই ৩ বোনের মধ্যে ওয়াসিম দ্বিতীয়। তাঁকে নিজ গ্রামের করবস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ২৩ বছর।

ওয়াসিমের ছোটবোন সাবরিনা ইয়াসিন বলেন, পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ছেলে ছিল বড়ভাই ওয়াসিম। সে আমাকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন নয়ে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করিয়েছিল। বাবা মা এসএসসি পরীক্ষার পর বিয়ে দিয়ে দেয়ার কথা বললে সে চরমভাবে আপত্তি করত। প্রয়োজনে সে চাকরি করে আমার পড়াশোনার খরচ চালাবে এমন কথা বলত। কিন্তু তাঁর পড়াশোনা শেষ না হতেই দেহ থেকে প্রাণ বের করে ফেলেছে তারা।”

নিহতের ছোট চাচি জেয়াসমিন বলেন,  ওয়াসিমের বাবা ফোন করলে আমাকে বলত বিদেশের পরিস্থিতি খুবি খারাপ। তুমি স্নাতক পাশ, তুমি আমার ছেলেকে একটু বুঝিয়ে বল সে যেনো কোনো একটা চাকরি-বাকরি করে। কিন্তু ওয়াসিম বলতো, সে সরকারি চাকরি করবে। তাঁর সেই স্বপ্ন এখন মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। কোটা আন্দোলনে তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।”

ওয়াসিমের মা বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ১৬ তারিখ রাতে আমার মানিক শেষ বারের মতো আমার সাথে কথা বলেছিল। সে বলছিলো, আমার কান ব্যাথার চিকিৎসার জন্য আমাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাবে। কিন্তু পরদিন সে নিয়ে গেলো লাশ নিয়ে আসতে। রাতে সে বলেছিলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমি কিছু দেখতে পাইনি। এমন হবে জানলে তাকে বাসা থেকে বের না হওয়ার জন্য ওয়াদা করাতাম”

বড়বোন মরজিনা মুটোফোনে বলেন, সেদিন হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে। অচেনা কন্ঠস্বর বলছিল আপনারা দ্রুত চট্টগ্রাম আসেন। ওয়াসিম এক্সিডেন করেছে। পরে আমরা গিয়ে তার নিথর দেহ দেখতে পাই। তিনি বলেন, বিচার চাইব কার কাছে। রাষ্ট্রপক্ষই তো হত্যা করেছে। একমাত্র আল্লাহর কাছে আমরা এর বিচার চাইবো।

নিহতের চাচা জয়নাল বলেন, গত ১১ তারিখ  কুরবানি ইদের ছুটিতে ওয়াসিম আমার বাচ্চাদের জন্য আর্জেন্টিনা জার্সি এনেছিল। সে খুবই সাদাসিধা ও নিরহ প্রকৃতির ছিল। ভীষণ পরোপকারী হওয়ায় এলাকার প্রত্যেকে তাকে ভালোবাসতো।

স্থানীয় বাসিন্দা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ মুহাম্মাদ বলেন, ওয়াসিম আকরাম ভাইয়ের লাশ কবরস্থ করার সময় গোরের পাশে ছিলাম। তাঁর স্বজন-সাথীদের কান্নার রোল আকাশ বাতাস এমনভাবে ভারী করছিল যেন গোরস্তানের অনন্য লাশের কানেও পৌঁছে যাচ্ছিল স্বজন হারানোর বিরহরোল। নিজের ভিতর টা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম পাষণ্ড, নির্দয় ঘাতকের একটি নিষ্ঠুর বুলেট কতজনের স্বপ্ন, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব কেড়ে নিতে পারে। বর্তমান-ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দরভাবে বাচার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য স্বেচ্ছায় অস্ত নামা তরুণ অরুণের বিদেহী আত্মাকে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতুল ফেরদৌসের আ’লা মাকান দান করুক।