০৭:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

থামছেই না দখল-চাঁদাবাজি

 

◉ মঙ্গলী মেলার দোকানপ্রতি ২০০ টাকা উত্তোলন
◉ গাউছিয়া-নিউমার্কেটে দখলদারিত্ব
◉ মামলা হলেও তদন্তে ধীরগতি

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তোরণ ঘটেনি। দখল-চাঁদাবাজি ও মাদক বাণিজ্য বন্ধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কঠোর সতর্কবার্তা দিলেও তার প্রতিফলন ঘটেনি। থানা কম্পাউন্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছেন। এখনো পুলিশ প্রশাসনে ভয়-আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীরা কেউ থানায় গিয়ে মামলা বা জিডি করলেও তা তদন্তের জন্য আগের মতো মাঠপর্যায়ে পুলিশের কোনো জোর তৎপরতা নেই। এর ফলে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী নানা কৌশলে মাঠে নেমে দখল-চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, পুরান ঢাকার লালবাগের মঙ্গলী মেলার সহস্রাধিক দোকানপ্রতি ২০০ টাকা করে চাঁদা উত্তোলন করেছে দুটি গ্রুপ। অপরদিকে গাউছিয়া, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও সায়েন্স ল্যাবের মিরপুর রোডের দু’পাশে হকার বসাকে কেন্দ্র করে দখলদারিত্ব শুরু হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দখল-ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির ঘটনায় মামলা করলেও আসামি গ্রেপ্তারে কোনো অগ্রগতি নেই। বরং মামলা তুলে নিতে আসামিরা হুমকি-ধামকি অব্যাহত রেখেছে। গতকাল বুধবার ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্র আন্দোলন চলাকালে লালবাগে খালেদ হাসান সাইফুল্লাহকে হত্যার দায়ে তার বাবা কামরুল হাসান বাদী হয়ে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও কামরাঙ্গীরচরের দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসী ৫৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনসহ ৮৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এছাড়া চকবাজারের বকশি বাজার এলাকায় ছেলে হত্যার অভিযোগে চকবাজার থানার ডিএসসিসি’র কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনসহ ১৮২ জনের নাম উল্লেখ্য করে একটি হত্যা মামলা করেন নিহতের মা রহিমা আক্তার। এছাড়া ক্ষমতায় থাকাবস্থায় কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রাম এলাকায় সাগির আহম্মেদ সুজনের কাছে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন। নির্ধারিত চাঁদা না দেওয়ায় ঢাকা-২ আসনের এমপি ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী গম কেলেঙ্কারির হোতা অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের ইন্ধন ও নির্দেশে এবং ডিএসসিসি’র মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের যোগসাজশে ৫৬ নংম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন, লালচাঁন সুমন, জাবেদুল ইসলাম জাবেদসহ অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী সুজনের বাড়িতে ব্যাপক হামলা, ভাঙ্চুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনায় জড়িত ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে তৎকালীন সময় থানায় মামলা করতে যান ভুক্তভোগী সুজন। কিন্তু থানা পুলিশ তার মামলা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে আদালতেও যান মামলা করতে। অবশেষে গত ৪ এপ্রিল ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি সি আর মামলা করেন। যার নম্বর-২৫৫। সুজনের পক্ষে আদালতে মামলাটির আবেদন করেন আইনজীবী আরিফ উদ্দিন আহমেদ। পরে বিজ্ঞ আদালত আবেদন গ্রহণ করে কামরাঙ্গীরচর থানাকে মামলা গ্রহণ ও তদন্তের আদেশ দেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে পুলিশ তা আমলে নেয়নি। বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ একাধিক মামলা হলেও এখনো তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আত্মগোপনে থেকেই মামলা তুলে নিতে বাদী সুজনসহ তার পরিবারকে আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মামলার বাদী ভুক্তভোগী সাগির আহমেদ সুজন। মামলার অভিযুক্ত আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, দুবাইয়ে অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে তদন্তের জন্য দুদকে আবেদন করেছেন তিনি।

ভুক্তভোগীরা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্যে, নিউ মার্কেট, পলাশী, ঢাকা মেডিকেল এলাকার দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ হোসেনসহ তার ক্যাডার বাহিনী, ছাত্রজনতা গণহত্যার পিছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন কামরাঙ্গীরচর ৫৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর থানা ও র‌্যাব ১০ অফিসে হামলার লুটপাট ও আগুন সন্ত্রাসের পিছনে মাস্টারমাইন্ড দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ হোসেন কাউন্সিলর জড়িত ছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। অভিযুক্তরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থী খালিদ হাসান সাইফুল্লাহ ও শহীদ ইয়াকুব হত্যা মামলার আসামি। কামরাঙ্গীরচরের দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসী ৫৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি আবেদন করেছেন সুজন। মামলার বাদি সগির আহমেদ সুজন এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মোহাম্মদ হোসেনসহ তার বিশাল ক্যাডার বাহিনী এখনো অধরাই রয়েছে। তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র এবং শত শত কোটি অবৈধ টাকা রয়েছে। অবৈধ অস্ত্র ও টাকার বিনিময় তার যে কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানান সুজন। কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনসহ তার ক্যাডার বাহিনীসহ মামলার অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তারা জানান, আত্মগোপনে থেকে এখনো এলাকার আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে আসামিরা। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মনে শান্তি ফিরে আসবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। এদিকে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার লালবাগের নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধে হলি-ডে মার্কেট বসে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হকার জানান, ওই মার্কেটটি মঙ্গলী মেলা হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিত। মেলায় এক হাজারেরও অধিক ছোট-বড় দোকান বসে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ডিএসসিসি’র মাধ্যমে কথিত লিজের নামে শ্রেণিভেদে দোকানপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ হাজার টাকা চাঁদা তুলতেন থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জাকির হোসেন, নবাবগঞ্জ বাজার কমিটি ও আ.লীগ নেতা ইয়ার মোহাম্মদসহ তাদের অনুসারীরা। কিন্তু সরকার পতনের পর মঙ্গলী মেলা থেকে চাঁদা তোলা বন্ধ করে দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় সমন্বয়করা। দোকানিরা জানান, একমাস চাঁদামুক্ত থাকলেও এখন একটি গোষ্ঠী নানা কৌশলে চাঁদা তুলে নিচ্ছেন। গেল এক মাস পর গত ১০ সেপ্টেম্বর ৮-১০ জনের পৃথক দুটি চাঁদাবাজ গ্রুপ চৌকি ভাড়া বাবদ ১০০ ও পরিচ্ছন্নতা বাবদ ১০০ টাকা হারে গড়ে মোট ২০০ টাকা হারে মোট ২ লক্ষাধিক টাকার চাঁদা তুলে নিয়েছেন দুটি গ্রুপের সদস্যরা। কেউ প্রতিবাদ করলেই দোকান তুলে দেওয়া ও হামলা, ভাঙচুর ও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন মঙ্গলী মেলার ভুক্তভোগী অনেক দোকানি। তবে কে বা কারা চাঁদার টাকা উত্তোলন করেছেন এমন প্রশ্নে ভয়ে কেউ তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। বলেন, মাঠে ফিরে আসা রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাউছিয়া, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাব, বণলতা কাঁচা বাজার ফুটপাত ও মিরপুর রোডের দু’পাশের একাধিক হকার জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই অপর একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দখলদারিত্ব শুরু করেছে। শ্রেণিভেদে দোকানপ্রতি দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা হারে অন্তত ২ হাজার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে মকবুল, জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী ও সাত্তারের নেতৃত্বে চাঁদা তুলছেন ও নতুন দোকান বসাচ্ছেন মনির, মোস্তফা, মিজান বেপারি, সাইফুল, পাগলা শফিক, শাহাবুদ্দিন, ফকির আলমগীর, সামসু, ফরিদ, গাজী, শহীদ, ইসমাইল, আব্দুল লতিফ, সবুজ, মোস্তফা-২সহ আরও অনেকে। এদের নেতৃত্বদানকারীরা পুরনো হকারদের ফোনে ডেকে নিয়ে আর্থিক সমঝোতার প্রস্তাব দিচ্ছেন। সেই প্রস্তাব না মানলেই হকারদের জোরপূর্বক উঠিয়ে দিয়ে নিজেদের ঘরোনার নতুন হকার বসিয়ে দিচ্ছেন। এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এতে তারা দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন। এমন বাস্তবতায় প্রতিকার চেয়ে এরই মধ্যেই ডাকযোগে প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান, আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা চাঁদামুক্ত পরিবেশে ক্ষুদ্র ব্যবসা চালানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয় জানতে মকবুল, পাগলা শফিকসহ কয়েকজনের মুফোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের কারও কোনো বক্তব্য মেলেনি।
এদিকে গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর বাজারে হাট পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। আহত শিক্ষার্থী শান্ত জানান, বিএনপির কিছু নেতাকর্মী হাটে চাঁদা তুলতেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা হাট উন্মুক্ত করে দেয়। হাট চলাকালে রাত ৮টার দিকে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। এতে ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, সাপ্তাহিক হাট পরিচালনাকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
অপরদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগে নীলফামারীতে সাবেক দুই এমপি, সদর থানার সাবেক ওসি ও সাংবাদিকসহ ৬০ জনের নামে মামলা হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর জেলা চিফ জুডিসিয়াল আমলী আদালত-১ এ মামলাটি দায়ের করেন মো. সৌমিক হাসান সোহান নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি শহরের পূর্ব কুখাপাড়ার শামীম হোসেনের ছেলে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সদর থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন প্রতিহত করতে অবৈধভাবে দেশীয় অস্ত্রসহ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, বলপ্রয়োগ ও গত ১৮ জুলাই থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা-মামলার নামে ভয়ভীতিসহ চাঁদা দাবির অভিযোগ আনা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

থামছেই না দখল-চাঁদাবাজি

আপডেট সময় : ০৭:১৮:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪

 

◉ মঙ্গলী মেলার দোকানপ্রতি ২০০ টাকা উত্তোলন
◉ গাউছিয়া-নিউমার্কেটে দখলদারিত্ব
◉ মামলা হলেও তদন্তে ধীরগতি

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তোরণ ঘটেনি। দখল-চাঁদাবাজি ও মাদক বাণিজ্য বন্ধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কঠোর সতর্কবার্তা দিলেও তার প্রতিফলন ঘটেনি। থানা কম্পাউন্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছেন। এখনো পুলিশ প্রশাসনে ভয়-আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীরা কেউ থানায় গিয়ে মামলা বা জিডি করলেও তা তদন্তের জন্য আগের মতো মাঠপর্যায়ে পুলিশের কোনো জোর তৎপরতা নেই। এর ফলে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী নানা কৌশলে মাঠে নেমে দখল-চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, পুরান ঢাকার লালবাগের মঙ্গলী মেলার সহস্রাধিক দোকানপ্রতি ২০০ টাকা করে চাঁদা উত্তোলন করেছে দুটি গ্রুপ। অপরদিকে গাউছিয়া, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও সায়েন্স ল্যাবের মিরপুর রোডের দু’পাশে হকার বসাকে কেন্দ্র করে দখলদারিত্ব শুরু হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দখল-ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির ঘটনায় মামলা করলেও আসামি গ্রেপ্তারে কোনো অগ্রগতি নেই। বরং মামলা তুলে নিতে আসামিরা হুমকি-ধামকি অব্যাহত রেখেছে। গতকাল বুধবার ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাত্র আন্দোলন চলাকালে লালবাগে খালেদ হাসান সাইফুল্লাহকে হত্যার দায়ে তার বাবা কামরুল হাসান বাদী হয়ে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ও কামরাঙ্গীরচরের দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসী ৫৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনসহ ৮৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এছাড়া চকবাজারের বকশি বাজার এলাকায় ছেলে হত্যার অভিযোগে চকবাজার থানার ডিএসসিসি’র কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনসহ ১৮২ জনের নাম উল্লেখ্য করে একটি হত্যা মামলা করেন নিহতের মা রহিমা আক্তার। এছাড়া ক্ষমতায় থাকাবস্থায় কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রাম এলাকায় সাগির আহম্মেদ সুজনের কাছে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন। নির্ধারিত চাঁদা না দেওয়ায় ঢাকা-২ আসনের এমপি ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী গম কেলেঙ্কারির হোতা অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের ইন্ধন ও নির্দেশে এবং ডিএসসিসি’র মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের যোগসাজশে ৫৬ নংম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন, লালচাঁন সুমন, জাবেদুল ইসলাম জাবেদসহ অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী সুজনের বাড়িতে ব্যাপক হামলা, ভাঙ্চুর ও লুটপাট চালায়। এ ঘটনায় জড়িত ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে তৎকালীন সময় থানায় মামলা করতে যান ভুক্তভোগী সুজন। কিন্তু থানা পুলিশ তার মামলা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে আদালতেও যান মামলা করতে। অবশেষে গত ৪ এপ্রিল ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি সি আর মামলা করেন। যার নম্বর-২৫৫। সুজনের পক্ষে আদালতে মামলাটির আবেদন করেন আইনজীবী আরিফ উদ্দিন আহমেদ। পরে বিজ্ঞ আদালত আবেদন গ্রহণ করে কামরাঙ্গীরচর থানাকে মামলা গ্রহণ ও তদন্তের আদেশ দেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে পুলিশ তা আমলে নেয়নি। বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ একাধিক মামলা হলেও এখনো তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আত্মগোপনে থেকেই মামলা তুলে নিতে বাদী সুজনসহ তার পরিবারকে আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মামলার বাদী ভুক্তভোগী সাগির আহমেদ সুজন। মামলার অভিযুক্ত আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, দুবাইয়ে অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে তদন্তের জন্য দুদকে আবেদন করেছেন তিনি।

ভুক্তভোগীরা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্যে, নিউ মার্কেট, পলাশী, ঢাকা মেডিকেল এলাকার দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ হোসেনসহ তার ক্যাডার বাহিনী, ছাত্রজনতা গণহত্যার পিছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন কামরাঙ্গীরচর ৫৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর থানা ও র‌্যাব ১০ অফিসে হামলার লুটপাট ও আগুন সন্ত্রাসের পিছনে মাস্টারমাইন্ড দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ হোসেন কাউন্সিলর জড়িত ছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। অভিযুক্তরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থী খালিদ হাসান সাইফুল্লাহ ও শহীদ ইয়াকুব হত্যা মামলার আসামি। কামরাঙ্গীরচরের দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাসী ৫৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি আবেদন করেছেন সুজন। মামলার বাদি সগির আহমেদ সুজন এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মোহাম্মদ হোসেনসহ তার বিশাল ক্যাডার বাহিনী এখনো অধরাই রয়েছে। তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র এবং শত শত কোটি অবৈধ টাকা রয়েছে। অবৈধ অস্ত্র ও টাকার বিনিময় তার যে কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানান সুজন। কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনসহ তার ক্যাডার বাহিনীসহ মামলার অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তারা জানান, আত্মগোপনে থেকে এখনো এলাকার আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে আসামিরা। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মনে শান্তি ফিরে আসবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। এদিকে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার লালবাগের নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধে হলি-ডে মার্কেট বসে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হকার জানান, ওই মার্কেটটি মঙ্গলী মেলা হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিত। মেলায় এক হাজারেরও অধিক ছোট-বড় দোকান বসে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ডিএসসিসি’র মাধ্যমে কথিত লিজের নামে শ্রেণিভেদে দোকানপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ হাজার টাকা চাঁদা তুলতেন থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জাকির হোসেন, নবাবগঞ্জ বাজার কমিটি ও আ.লীগ নেতা ইয়ার মোহাম্মদসহ তাদের অনুসারীরা। কিন্তু সরকার পতনের পর মঙ্গলী মেলা থেকে চাঁদা তোলা বন্ধ করে দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় সমন্বয়করা। দোকানিরা জানান, একমাস চাঁদামুক্ত থাকলেও এখন একটি গোষ্ঠী নানা কৌশলে চাঁদা তুলে নিচ্ছেন। গেল এক মাস পর গত ১০ সেপ্টেম্বর ৮-১০ জনের পৃথক দুটি চাঁদাবাজ গ্রুপ চৌকি ভাড়া বাবদ ১০০ ও পরিচ্ছন্নতা বাবদ ১০০ টাকা হারে গড়ে মোট ২০০ টাকা হারে মোট ২ লক্ষাধিক টাকার চাঁদা তুলে নিয়েছেন দুটি গ্রুপের সদস্যরা। কেউ প্রতিবাদ করলেই দোকান তুলে দেওয়া ও হামলা, ভাঙচুর ও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন মঙ্গলী মেলার ভুক্তভোগী অনেক দোকানি। তবে কে বা কারা চাঁদার টাকা উত্তোলন করেছেন এমন প্রশ্নে ভয়ে কেউ তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। বলেন, মাঠে ফিরে আসা রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাউছিয়া, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাব, বণলতা কাঁচা বাজার ফুটপাত ও মিরপুর রোডের দু’পাশের একাধিক হকার জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই অপর একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দখলদারিত্ব শুরু করেছে। শ্রেণিভেদে দোকানপ্রতি দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা হারে অন্তত ২ হাজার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে মকবুল, জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী ও সাত্তারের নেতৃত্বে চাঁদা তুলছেন ও নতুন দোকান বসাচ্ছেন মনির, মোস্তফা, মিজান বেপারি, সাইফুল, পাগলা শফিক, শাহাবুদ্দিন, ফকির আলমগীর, সামসু, ফরিদ, গাজী, শহীদ, ইসমাইল, আব্দুল লতিফ, সবুজ, মোস্তফা-২সহ আরও অনেকে। এদের নেতৃত্বদানকারীরা পুরনো হকারদের ফোনে ডেকে নিয়ে আর্থিক সমঝোতার প্রস্তাব দিচ্ছেন। সেই প্রস্তাব না মানলেই হকারদের জোরপূর্বক উঠিয়ে দিয়ে নিজেদের ঘরোনার নতুন হকার বসিয়ে দিচ্ছেন। এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এতে তারা দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন। এমন বাস্তবতায় প্রতিকার চেয়ে এরই মধ্যেই ডাকযোগে প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান, আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা চাঁদামুক্ত পরিবেশে ক্ষুদ্র ব্যবসা চালানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয় জানতে মকবুল, পাগলা শফিকসহ কয়েকজনের মুফোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের কারও কোনো বক্তব্য মেলেনি।
এদিকে গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর বাজারে হাট পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। আহত শিক্ষার্থী শান্ত জানান, বিএনপির কিছু নেতাকর্মী হাটে চাঁদা তুলতেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা হাট উন্মুক্ত করে দেয়। হাট চলাকালে রাত ৮টার দিকে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। এতে ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, সাপ্তাহিক হাট পরিচালনাকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
অপরদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগে নীলফামারীতে সাবেক দুই এমপি, সদর থানার সাবেক ওসি ও সাংবাদিকসহ ৬০ জনের নামে মামলা হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর জেলা চিফ জুডিসিয়াল আমলী আদালত-১ এ মামলাটি দায়ের করেন মো. সৌমিক হাসান সোহান নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি শহরের পূর্ব কুখাপাড়ার শামীম হোসেনের ছেলে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সদর থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন প্রতিহত করতে অবৈধভাবে দেশীয় অস্ত্রসহ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, বলপ্রয়োগ ও গত ১৮ জুলাই থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা-মামলার নামে ভয়ভীতিসহ চাঁদা দাবির অভিযোগ আনা হয়েছে।