◉ নিউইয়র্কে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ^ নেতার বৈঠক
◉ নানা উন্নয়ন-সহযোগিতার আশ^াস
◉ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব কমার প্রত্যাশা
◉ পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ
অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বৈদেশিক সফরে যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান করলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আর এই অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে বাংলাদেশিদের জন্য এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন তিনি। নিয়ে গেলেন নিজের দেশকে এক অনন্য উচ্চতায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোসহ ডজনখানেক বিশ^নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এসময় পেয়েছেন বাংলাদেশের উন্নয়নে অনেক বেশি সহযোগিতার আশ^াস। তাকে বিশ^ নেতৃবৃন্দ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করায় তা বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতায় অনেক বেশি উপকার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিমার ছবিতে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরেন। হাতে হাত রেখে বলেন, বাংলাদেশের সংস্কারের যে লক্ষ্য নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ঠিক করেছেন, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে সবধরনের সহযোগিতা করবে হোয়াইট হাউস।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের জাতিসংঘে উপস্থিতির পর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো যে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা থেকে বাংলাদেশও যেমন সহযোগিতার বার্তা পেয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা পেয়েছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকের ব্যাপারে হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশের নতুন সংস্কার কর্মসূচিতে মার্কিন সমর্থন অব্যাহত থাকবে। এছাড়া, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়দানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে প্রায় ২০ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকেই তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বাংলাদেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করার জের ধরে উভয় দেশের মধ্যে একটি অদৃশ্য টানাপোড়েন ছিলই। সেই টানাপোড়েনে নতুনমাত্রা পায় হাসিনা সরকারের আমলে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনেককেই প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেগেটিভ মন্তব্য করতে দেখা যায়। এবার ইউনূস বাইডেনের বৈঠকের মধ্য দিয়ে সেই দূরত্ব ঘুচবে বলেই মনে করছেন অনেকে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো দেশের শীর্ষনেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তেমন নজির নেই। যেটি হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এমনটিই বলছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম। তিনি বলেন, আজকের বৈঠকটি ছিল ঐতিহাসিক। কারণ, জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের কোনো শীর্ষনেতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কোনো বৈঠক হয়নি। বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজ থেকে বাংলাদেশে কী কী সমর্থন ও সহযোগিতা দেওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি তার সরকারের পূর্ণ সমর্থন বাংলাদেশ পাবে বলে জানান। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরল ওই বৈঠকের পর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের সদরদপ্তরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে সাক্ষাতকালে প্রধান উপদেষ্টা ‘দ্য আর্ট অব ট্রায়াম্ফ’ উপহার দিয়েছেন। তার প্রেস উইং জানায় এসময় ড. ইউনূস বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আরও ভিসা দিতে ট্রুডোকে অনুরোধ জানান।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দেন ড. ইউনূস। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ইউনূস ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, মরিশাসের প্রেসিডেন্ট পৃথ্বিরাজ সিং রূপন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার সম্পর্কিত হাইকমিশনার ভলকার টুর্কসহ অন্যান্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
জাতিসংঘের সদরদপ্তরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন ড. ইউনূস। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে এ কুশল বিনিময় হয়।
ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম জানিয়েছেন, তারা অভিবাসী ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইতালিতে যাওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথ অবলম্বন করেন, তাই ড. ইউনূস বৈধ বা আইনি উপায় খোঁজার কথা জানিয়েছেন। যাতে আরও বেশি বাংলাদেশি ইতালিতে গিয়ে কাজ করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী মেলোনিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোদারের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। একইসঙ্গে দুই নেতা বাংলাদেশে নেপালি শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কথা স্বীকার করেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে তার সুবিধামতো সময়ে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে বাংলাদেশে সোলার প্যানেল প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়টির কথা জানান। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তার দেশ গভীরভাবে কাজ করতে চায় বলেন জানান তিনি।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতকালে বাংলাদেশকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা দেবেন বলে জানান। বৈঠকে ড. ইউনূস তার নেওয়া সংস্কার কাজের জন্য বিশ্বব্যাংকের আরও সহায়তা চান।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় উভয় নেতা কুশল বিনিময় করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রতিষ্ঠান ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের গল্প তুলে ধরেন। ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ লিডারস স্টেজ’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন তিনি। এসময় তিনি তরুণরা কিভাবে নতুন সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে এবং ক্লিনটনের সঙ্গে যোগাযোগ কিভাবে হয় এবং তারা কিভাবে একটি সুন্দর বিশ^ তৈরির লক্ষ্যে কিভাবে একযোগে কাজ করছেন তার বর্ণনা দেন।
দেশে ছাত্রজনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ড. ইউনূস তাদের কথাও বলেন। তিনি তাদের মঞ্চে ডেকে নিয়ে আসেন। এ সময় তিনি বলেন, দেশ গড়তে, নিজেদের গড়তে যে শব্দে, যে ভাষায় তারা (আন্দোলনকারীরা) কথা বলেছে, তা অসাধারণ। আমি আগে কখনো এভাবে কাউকে কথা বলতে শুনিনি। তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ করতে প্রস্তুত। দয়া করে তাদের সাহায্য করুন, সমর্থন করুন। তাদের স্বপ্ন যেন সত্য হয়। আমরা একসঙ্গে এ দায়িত্ব নিতে পারি। এ স্বপ্ন পূরণে আপনি (ক্লিনটন) আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
ড. ইউনূসের এই সফর প্রসঙ্গে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের জন্য বার্তাটা পরিষ্কার যে, নতুন প্রেক্ষাপটে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এখন তারা যাতে সহযোগিতা করতে পারে, সেই ক্ষেত্র বাংলাদেশকে প্রস্তুত করতে হবে।
বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। এবছর এই সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে। আজ শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ড. ইউনূসের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তিনি দেশে ফিরবেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ড. ইউনূস এখন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। ‘ক্লাইমেট ফরওয়ার্ড’ সম্মেলনে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আটকে থাকবে, ততক্ষণ জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি কার্যকর হবে না।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই ড. ইউনূসের
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমাকে দেখে কি মনে হয়, আমি নির্বাচনে লড়ব? গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস আয়োজিত ‘ক্লাইমেট ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে করা প্রশ্নে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, কেন হবে না? অপরাধ করে থাকলে তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কবে নির্বাচন হবে, এর কোনো সময়সীমা আমার কাছে নেই। যে কয়েকটি কমিশন গঠন করা হয়েছে, তারা সামনের মাসগুলোতে সংস্কার সুপারিশ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। তারপর নির্বাচনের জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করা হবে।


























