◉ অদৃশ্য সিন্ডিকেটে বাজার ব্যবস্থা
◉ আস্থা সংকটে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার
➥ এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাড়াতে হবে Ñএস এম নাজের হোসেন, সহ-সভাপতি, ক্যাব
➥ সিন্ডিকেটকারীদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে, এখনই সময় বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার Ñমাহফুজ কবির, অর্থনীতিবিদ
শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় ২ মাস হতে চলল। আশা ছিল, ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার পতনে ভোগ্যপণ্যের সিন্ডিকেট এবার ভেঙে যাবে। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র ঠিক উল্টো। সরকার পতনের পর প্রশাসনের অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার বড় বড় সংস্কারের দিকেও এগোচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো সংস্কার কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। অথচ এখানেই সংস্কারের প্রয়োজনটা অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি। বিগত সরকারের বিদায়ের পর কিছুদিন সিন্ডিকেটের প্রভাব না থাকার কারণে নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা কমেছিল। কয়েকদিন পর ঠিক পূর্বের অবস্থা বিরাজ করছে বাজারে। এখনো বাজারে সেই অদৃশ্য সিন্ডিকেট বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। বাজার মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রমের দেখা মিলছে না। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসলেও পণ্যমূল্য না কমায় হতাশা ব্যক্ত করছেন ক্রেতা-ভোক্তা ও বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি অতিদ্রুত এই সিন্ডিকেট ভেঙে বাজারে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
ভোগ্যপণ্যের লাগাম টানতে আলু, পেঁয়াজের শুল্ক কমানো পাশাপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ডিম এবং ব্রয়লার ও সোনালি মুরগিরসহ বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ উল্টোচিত্র নিত্যপণ্যের বাজারে ; বেঁধে দেওয়া দামে মিলছে না পণ্য। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন দাম অনুযায়ী প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৭৯ টাকা ৫৯ পয়সা, সোনালি মুরগি ২৬৯ টাকা ৬৪ পয়সা এবং প্রতিটি ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয় ১১ টাকা ৮৭ পয়সা। এতে প্রতি ডজন ডিমের দাম পড়ে ১৪২ টাকা ৪৪ পয়সা। এদিকে ডিমের সরবরাহ ঠিক রাখতে আমদানি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ভারত থেকে ২ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ ডিম দেশের বাজারে এসেছে। তাতেও যেন পুষ্টিসমৃদ্ধ এ পণ্যটির দাম কমছে না। উল্টো সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি ডজন ডিমে ২০ থেকে ২৫ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
এদিকে ভোক্তারাও বলছেন, সরকারের পরির্তন হলেও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনো আমাদের চোখে পড়ছে না। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ক্রেতা মেহেদি হাসান বলেন, যারা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত তারাও এখন খোলস বদল করেছে। সরকার কয়েকটি পণ্যের শুল্ক কমিয়েছে, বাজারে তারও কোনো প্রতিফলন নেই। এর সুফলও ভোক্তা পাচ্ছে না ওই বাজার সিন্ডিকেটের কারণে। সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তার বাস্তবায়ন যেসব সরকারি সংস্থা করবে সেগুলোতেও এখনো বসে আছে আগের সরকারের লোকেরা। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সরকারকে সহযোগিতা করছে না। সরকার পলিথি বন্ধের মনিটরিং জোরদার করছে, কিন্তু বাজারে মনিটরিং বাড়ানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এখন কথা হচ্ছে, পলিথিন নিয়ন্ত্রণ করা আগে জরুরি, নাকি বাজার মনিটরিং বাড়িয়ে চড়া পণ্যমূল্য কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া বেশি জরুরি।
এদিকে বাজার বিশ্লেষক ও কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর নিত্যপণ্যের দাম কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কয়েকদিন পরই আবার বাড়তে শুরু করেছে, যা এখনো চলমান রয়েছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাড়াতে হবে। সরকার পরির্বতন হলেও ব্যবসায়ীদের যে আচার ব্যবহার তা এখনো পরির্বতন হয় নাই। তারা নতুন করে আবারও সক্রিয় হচ্ছে পাশাপাশি নানাভাবে সরকারকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করতেছে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের দৈনিক চাহিদা, আইন শৃঙ্খলা সংস্কারের পাশাপাশি নিত্য পণ্যের বাজার মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য কাজ করা এটি অপরিহার্য। পণ্য উৎপাদন ও এর সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা ছিল কৃষি অধিদপ্তরে কাজ। কিন্তু তারা এতে অনেক বেশি পিছিয়ে রয়েছে। এর জন্য সরকারও তাদের বেঁধে দেয়া দাম কার্যকর করতে পারছে না।
বাজার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের পর সপ্তাহখানেক সারা দেশের বাজারে ভোগ্যপণ্যের মূল্য কিছুটা কমে এসেছিল। এর পেছনে কারণ ছিল দুটি। প্রথমত, পণ্যবাহী ট্রাকে এবং বাজারগুলোতে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীরাও কিছুটা আতঙ্কে ছিল কারসাজি করলে হয়তো সরকার ছাড় দেবে না। কিন্তু দিন দশেক পর থেকেই বাজারের চিত্র আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কারণ আবারও চাঁদাবাজি শুরু হয়ে যায় এবং ব্যবসায়ীরাও দেখেছে যে, সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ব্যস্ত, বাজারের দিকে কোনো নজর নেই। ব্যবসায়ীরা বুঝে নিয়েছে যে, সরকার তেমন কোনো কিছুই করবে না। তাই আবার আগের মতোই ফ্রি সটাইলে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে লুটপাট শুরু করেছে।
সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে যেভাবে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে সবার আগে উৎপাদক বা মিল পর্যায়ে, পাইকারি পর্যায়ে এবং খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা কি দামে পণ্য কিনছে আর কত দামে বিক্রি করছে সে বিষয়টি সরকারকে জানতে হবে। এটা জানার পর ব্যবসায়ীরা সহনীয় হারে লাভ করছে, নাকি অস্বাভাবিক হারে লাভ করছে সেটি দেখতে হবে। যে ব্যবসায়ী অস্বভাবিক লাভ করবে তাকেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আইন করে দেশে ডিওপ্রথা বাতিল করা হলেও এখনও এসও প্রথার নামে আসলে ডিওপ্রথার মাধ্যমেই মিল ও পাইকারি পর্যায়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই ডিওপ্রথা বা এসও-প্রথার সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোতে ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ রাখার যে বিধান রয়েছে সেটি শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। বাজার অভিযানে যদি একই ব্যবসায়ী বা একই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বারবার অপরাধের প্রমাণ মেলে তা হলে তাকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে, দরকার হলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে।
সিন্ডিকেটের বিষয়ে অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির বলেন, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে ছাত্র-জনতাকে আবারো সক্রিয় হতে হবে। সরকার পতনের পর ছাত্ররা যেভাবে বাজার তদারকি করেছিল, সেটি আবারো নিয়মিত করা যেতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে। সিন্ডিকেটকারীদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। এখনই সময় বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার।


























