◉ ৩০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে কারখানা
◉ শিল্পের পাশাপাশি গ্যাস-সংকটে পড়েছে আবাসিক ও বিদ্যুৎ খাত
◉ বন্ধ আছে তিনটি ইউরিয়া সার উৎপাদন কারখানা
╰┈➤ গ্যাস-সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে, অনেক কারখানা উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না : মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি, বিকেএমইএ
╰┈➤ উৎপাদনে অনাগ্রহ ও আমদানিনির্ভরতা সংকটের জন্য দায়ী : অধ্যাপক বদরূল ইমাম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় সেক্টর হচ্ছে পোশাক শিল্প। দীর্ঘদিন বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এই শিল্প। চলমান এই সহিংসতার পাশাপাশি তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে এই শিল্পে। শিল্প কারখানায় গ্যাস সংকট নতুন নয়। তবে বেশ কিছুদিন এ সংকট তীব্র হয়ে পড়েছে কারখানাগুলোতে। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পের উৎপাদন। বস্ত্র কারখানার মালিকরা অন্তর্বর্তী সরকারকে গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উন্নত করতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জ্বালানি সংকটের কারণে বেশিরভাগ কারখানা এখন ৩০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে। মালিকদের দাবি গ্যাস সংকটের কারণে সঠিক সময়ে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে বিদেশি বায়ারদের যথাসময়ে ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতিকর। গ্যাস সংকটের কারণে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি আবাসিক ও বিদ্যুৎ খাতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে যার কারণে লোডশেডিং হচ্ছে গ্রাম পর্যায়ে। একই সমস্যার কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সার উৎপাদন কারখানায়।
গ্যাস সংকটে সমস্যা বারবার দেখা গেলেও তার স্থায়ী সমাধান নেই। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এটির বিকল্প নেই। গ্যাস উদ্বৃত্তের দেশ বলা হতো বাংলাদেশকেও। দেশে গ্যাস খাতে এখন পর্যন্ত প্রমাণিত মজুত প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। যদিও এ মজুতের মধ্যে ২১ টিসিএফের বেশি উত্তোলন হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চালানো সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশে গ্যাস মজুতের পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোভিত্তিক কনসালট্যান্সি ফার্ম ‘গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটস’ ২০১১ সালে গ্যাসের মজুদ নিয়ে এক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। ওই প্রতিবেদনে গুস্তাভসন জানায়, দেশের গ্যাসের সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণ ৩৮ টিসিএফ। ৫০ শতাংশ মজুদ সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোয় এর পরিমাণ ৬৩ টিসিএফের কিছু বেশি। এ তথ্য ২০১১ সালে এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হলেও গ্যাস মজুদ নিয়ে গুস্তাভসনের তথ্য মোটেও বিশ্বাস করেনি সরকার। ওই প্রতিবেদনে ৫০ শতাংশ মজুদ সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোয় এর পরিমাণ ৬৩ টিসিএফের কিছু বেশি বলে জানানো হয়। তবে এসব প্রতিবেদন নিয়ে সরকার কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। বরং গ্যাসের নানামুখী সম্ভাবনার প্রস্তাব অতীতে দেয়া হলেও সম্ভাবনার বিপরীতে অনুসন্ধান জিইয়ে রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে গ্যাস খাতের সংকট তৈরি করা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন। দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। কোনো কারণে সরবরাহ এর চেয়ে কমলেই বেড়ে যায় সংকট। এখন সরবরাহ হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দিনে এখন উৎপাদন হচ্ছে ২০০ কোটি ঘনফুট। বাকিটা নেওয়া হয় এলএনজি থেকে।
গ্যাস-সংকটে পড়েছে শিল্প, আবাসিক ও বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ খাতে দিনে গ্যাসের চাহিদা ২৩০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ১৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ চায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। যদিও তারা সর্বোচ্চ সরবরাহ পেত দিনে ১৩০ কোটি ঘনফুট। এখন সরবরাহ করা হচ্ছে ৯০ কোটি ঘনফুট। এতে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।
গ্যাসের সরবরাহ কমায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলা জ্বালাতে হিমশিম খাচ্ছেন গ্রাহকেরা। শিল্পকারখানায় আগেই উৎপাদন কমে এসেছিল গ্যাসের অভাবে। এখন কারখানা চালাতে সমস্যা আরও বেড়েছে। গ্যাসের অভাবে বন্ধ আছে তিনটি ইউরিয়া উৎপাদনের সার কারখানা। বছরের বেশির ভাগ সময়ই কোনো না কোনো সার কারখানা বন্ধ রাখতে হয়।
গাজীপুরের চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, প্রতি মাসে বিল দিলেও গ্যাসের সংকটের কারণে রান্না করতে পারছেন না। নারায়ণগঞ্জের দক্ষিণ সস্তাপুর এলাকার গৃহিণী মার্জিয়া রহমান বলেন, গ্যাসের চাপ একেবারে নেই। গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডারে রান্নার কাজ করতে হচ্ছে। এতে সংসারে খরচ বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গাজীপুরের বেশির ভাগ এলাকায় কয়েক বছর ধরেই গ্যাস-সংকট চলে এলেও দুই মাস ধরে এটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। নগরের বাসন, ভোগাড় কোনাবাড়ী, ভবানীপুর, কালিয়াকৈর, কাশিমপুর ও এর আশপাশের এলাকার বেশির ভাগ কারখানায় গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন তাঁদের লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা না হলে রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
নারায়ণগঞ্জে বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ এলাকায় অবস্থিত রপ্তানিমুখী টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডে প্রতিদিন উৎপাদন ক্ষমতা ১০ টন। কিন্তু গ্যাস-সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবিরুল ইসলাম বলেন, আগে কিছু গ্যাস পাওয়া যেত। ৬ আগস্টের পর থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে।
নিয়মিত অভিযোগ জানিয়েও গ্যাসের সমস্যার কোনো সমাধানে পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। পোশাক খাতের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস-সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক কারখানা উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না। এতে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য রপ্তানি করা কঠিন হয়ে উঠেছে। বাড়তি খরচ করে উড়োজাহাজে বা মূল্যছাড় দিয়ে রপ্তানি পণ্য পাঠানো লাগতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, ‘বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান করা যায়নি, তার প্রধানত কারণ অনুসন্ধানে অনাগ্রহ ছিল। অন্যদিকে আমদানির প্রতি মনোযোগও ছিল অনেক বেশি। ফলে গ্যাস ব্যবহার হয়েছে কিন্তু রিজার্ভের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে নানা সময়ে অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনীতিও কাজ করেছে। বাংলাদেশ নানা অজানা কারণে গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারেনি। কেন করেনি বা করা যায়নি সেটি মোটা দাগে বলতে গেলে এক ধরনের অনাগ্রহ ও আমদানি নির্ভরতায় মনোযোগী হওয়াকেই দায়ী করতে হয়।’

























