◉ সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছে জাপা
◉ মামলা আতঙ্ক কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে
◉ ঐক্যের উদ্যোগ রওশনের
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আপত্তির মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছে সাবেক সেনা শাসক হোসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় পার্টির (জাপা)। পাশপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিতর্কিত তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ফ্যসিস্টের দোসর হিসেবে চিহ্নত করা হচ্ছে দলটিকে বিভিন্ন মহল থেকে। আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতাকর্মীদের পাশপাশি জাপা চেয়ারম্যান ও বিলুপ্ত হওয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা জি এম কাদেরসহ দলের একাধিক সাবেক এমপি ও নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে সার্বিক ভাবে রাজনীতিতে কোনটাসা হয়ে পড়েছে দলটি।
জানা যায়, শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথম থেকেই সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন জি এম কাদের। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকটা কোণঠাসা দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছে দলটি। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ৩য় দফার সংলাপ চলছে। তবে প্রথম দফার সংলাপে জাতীয় পার্টিকে (জাপা) আমন্ত্রণ জানানো হলেও এবার তাদের ডাকা হয়নি। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জাপাকে নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। দলটিকে আওয়ামী স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে অভিহিত করে সমালোচনাও হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের পক্ষ থেকে জাপাকে নিয়ে আপত্তি এসেছে। অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ এরই মধ্যে জাপাকে নিয়ে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, স্বৈরাচারের দোসর জাতীয় পার্টিকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হলে, আমরা সেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও কঠোর বিরোধিতা করব। অপর সমন্বয়ক সারজিস আলম প্রশ্ন রেখেছেন, জাতীয় পার্টির মতো মেরুদণ্ডহীন ফ্যাসিস্টের দালালদের প্রধান উপদেষ্টা কীভাবে আলোচনায় ডাকে?
জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু মনে করেন, সংলাপে ডাকা না ডাকা সরকারের বিষয়। তারা নিজেদের মতো করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবেন। দুই সমন্বয়কের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কেউ যদি এমন কথা বলতে চায় তাহলে বলতেই পারে। কিন্তু মাঠে এভাবে বলে লাভ নেই। আমাদের জিজ্ঞেস করলে আমরা আমাদের মতো করে উত্তর দেব। এটার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আছে।
এদিকে ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যায় মদদ দেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে বিএনপি, গণ অধিকার পরিষদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। দলগুলোর অভিযোগ বিষয়ে মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, জাতীয় পার্টি নির্বাচনমুখী দল। ২০২৪ সালের নির্বাচন যখন সব দল বর্জন করে তখন জাতীয় পার্টিও নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ জন্য আওয়ামী লীগ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দিয়ে আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। সারা দেশের জনগণ এটি জানে।
জাপা সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার নিকটবর্তী দল হিসেবে পরিচিত। দলটি ক্ষমতাসীন বড় দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে বলে নানা সময়ে সমালোচিত হয়েছে। জাতীয় পার্টির ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন দিলেও সুযোগ বুঝে রাজনৈতিক ফায়দা নিয়েছে, যে কারণে তারা এখন কোণঠাসা। বিষয়টি বুঝে এ পরিস্থিতিতে দলের করণীয় ঠিক করতে গত ৭ অক্টোবর দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে সারা দেশে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন জি এম কাদের। জাপার কয়েকজন শীর্ষ নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এ অভিযোগ অস্বীকার করে এসব মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। গত বৃগস্পতিবার দলটি মামলার প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে।
জাপার এক নেতা বলেন, জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, একটি চক্র জাতীয় পার্টিকে ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষের দল হিসেবে চিহ্নিত করতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ আন্দোলনে আমরা সমর্থন দিয়েছি, আমাদের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে অংশ নিয়ে হামলা-মামলার শিকার হয়ে জেল খেটেছেন। ওই আন্দোলনে হত্যা মামলায় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের আসামি করা হচ্ছে। জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছি। আমাদের চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রকাশ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন। এখন আমাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হচ্ছে, এ অভিযোগ ভিত্তিহীন। নেতাকর্মীদের সারা দেশে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দিয়েছি।
এদিকে জাপার ঘরের কোন্দলও দলটিকে বর্তমানর পরিস্থিতি আরও কঠিন করছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চলতি বছরের ৯ মার্চ জি এম কাদের এবং দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় জাতীয় পার্টি। এছাড়া ওই নির্বাচন ঘিরে দ্বন্দ্বের জেরে দলটি ছেড়ে যান অন্তত ৬৬৮ নেতাকর্মী। ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ে দলের সাংগঠনিক শক্তিতে। বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির এক নেতা বলেন, সর্বশেষ ভাঙন এবং দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর দলের অবস্থা কিছুটা খারাপ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যার অভিযোগ শীর্ষনেতাদের নামে মামলা হলে হাতে গোনা কয়েকটি জেলা বাদে বেশিরভাগ জেলায়ই কোনো কর্মসূচি পালন করা যায়নি। সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিই দলটির বর্তমান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন মুজিবুল হক চুন্নু।
এদিকে জাতীয় পার্টির ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছে একাংশের সভাপতি রওশন এরশাদ। এলক্ষ্যে গতকাল জাতীয় পার্টি (কাজি জাফার) একাংশের চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী জনাব মোস্তফা জামাল হায়দারের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় রওশনের অনুসারীদের। বিস্তারিত আলোচনায় জাতীয় পার্টির সকল অংশকে একত্রে ঐক্যবদ্ধ করে একক জাতীয় পার্টি করার বিষয়ে ঐক্যমত্য হয় তারা।
রওশনপহ্নীরা জানান, সকল অংশের নেতৃবৃন্দের সাথে অনুরুপ আলোচনা করে একতৃত জাতীয় পার্টিতে গঠন প্রক্রিয়ার অংশ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বেজেপি) চেয়ারম্যান সাবেক এমপি ব্যারিষ্টার আন্দলিব রহমান পার্থ এবং জাতীয় পার্টির আরেক অংশ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (ড. এম. এ. মতিন) এর চেয়ারম্যান জনাব ড. এম,এ মূকিত এর সাথে দ্রুত আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।


























