০৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাহাড়ে বাড়ছে আতঙ্ক

* ১০-১২টি গ্রæপে সক্রিয় দেড় শতাধিক অপহরণকারী
* তিন দিনে ৩০ জনকে তুলে নিলো দুর্বৃত্তরা
* এক বছরে অপহরণের শিকার ১৮৭ জন
* মুক্তিপণ-অভিযানে মুক্তি মিললেও অনেকেই গুম-খুনের শিকার
* দুর্গম পাহাড়ে ইউপিডিএফ’র দুটি গোপন আস্তানা পেল সেনাবাহিনী

দেশের পট পরিবর্তনেও পাহাড়ি জনপদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। দিনের পর দিন অশান্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদ। এখানকার বাসিন্দারা এখন অজানা শঙ্কা নিয়ে দিনযাপন করছেন। টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে ১০-১২টি গ্রæপে সক্রিয় রয়েছে দেড় শতাধিক অপহরণকারী। গত তিন দিনেই চক্রের সদস্যরা ৩০ জনকে তুলে নিয়ে গেছে দুর্গম পাহাড়ে। মুক্তিপণের দাবিতে গোপন আস্তানায় তাদের আটকে রেখে স্বজন-পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিদায়ি বছর-২০২৪ সালে এই জনপদে অন্তত ১৮৭ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আবার মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। আবার অনেকেই গুম-খুনের শিকার হচ্ছেন। এমন ভীতিকর পরিস্থিতিতে দিনের বেলায়ও অবাধ চলাচল করতে সাহস পাচ্ছেন না পাহাড়-সমুদ্রঘেঁষা টেকনাফের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদিকে চলমান অভিযানে রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ের টিলায় পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ’র দুটি গোপন আস্তানার খোঁজ পেয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সূর্য্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে সাগর-নদী ও পাহাড়বেষ্টিত পার্বত্য অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ৩টি জেলা। সন্ধ্যা নামতেই উদ্বেগ আতঙ্ক নিয়েই পাহাড়ে বসবাস করছেন লাখো মানুষ। মারণাস্ত্র বহনকারী অপহরণচক্রের প্রধান টার্গেটে পর্যটকরা। একই সঙ্গে পাহাড়ের অধিবাসীরাও তাদের কিলিং টার্গেটের শিকার হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন বলছে, পাহাড়ে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার। একই সঙ্গে পাহাড়ি জনপদে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চলছে। এরই মধ্যে চক্রের অনেককেই গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গতকাল শনিবার আইএসপিআরসহ স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত জেলা সদর হতে ৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে টেকনাফ উপজেলা অবস্থিত। প্রশাসনিকভাবে শহরটি টেকনাফ উপজেলার বৃহত্তম শহরাঞ্চল। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের শহর এই উপজেলা। এর আয়তন ৩৮৮.৬৬ বর্গ কিমি। শহরটির অবস্থান: ২০.২৩ থেকে ২১.০৯ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২.০৫ থেকে ৯২.২৩ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। টেকনাফের সীমানা- উত্তরে উখিয়া উপজেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে মায়ানমারের আরাকান রাজ্য, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। উত্তরে সবুজ বৃক্ষরাজি শোভিত সুউচ্চ পাহাড় ও উখিয়া উপজেলা, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে নাফ নদী ও মায়ানমার।
পাহাড়-সমুদ্রঘেঁষা এই উপজেলায় ১টি পৌরসভা, ৬টি ইউনিয়ন, ১২টি মৌজা ও ১৮৪টি গ্রাম রয়েছে। এছাড়া পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ড ও ১৬টি মহল্লা রয়েছে। ইউনিয়নগুলো হচ্ছেÑ টেকনাফ, বাহারছরা, সাবরং, হোয়াইক্যং, নীলা ও সেন্টমার্টিন। বিস্তির্ণ এই জনপদের জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৪ হাজার ৩৮৯। এর মধ্যে পুরুষ ১৩ লাখ ৩ হাজার ১০৬ ও মহিলা ১৩ লাখ ১ হাজার ২৮৩ জন। ২৫ লাখ ৮ হাজার ২৪৫ জন মুসলিম, ২ হাজার ৯৬৭ হিন্দু, ৩ হাজার ৮৯ জন বৌদ্ধ, ৯ জন খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ৭৯ জন। সূত্র জানায়, প্রশাসন টেকনাফ থানা গঠিত হয় ১৯৩০ সালে এবং ১৯৮৩ সালে থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখানে ১টি কলেজ, ১১টি উচ্চ বিদ্যালয় (বালক), ২টি উচ্চ বিদ্যালয় (বালিকা), ৩টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি ৩৪টি, রেজিস্টার্ড ২৩টি ও আনরেজিস্টার্ড ৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১১টি মাদ্রাসা রয়েছে। এখানে শিক্ষার হার ১৯.৭২ শতাংশ। সড়ক ও জনপথ বিভাগের মোট রাস্তা রয়েছে ৬৫ কিমি. অন্যান্য রাস্তা (এলজিইডি) পাকা রাস্তা ৪৭.১২ কিমি., কাচা রাস্তা ৩৫৮.২৬ কিমি., আধাপাকা ৭৪.৩৯ কিমি. ও নির্মানাধীন রয়েছে ১০ কিমি. রাস্তা।
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে রয়েছে ১টি নদীপথ (নাফ নদী), স্থলবন্দর ১টি, হাটবাজার ১৩টি ও ৫১টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। মৎস বিভাগের শুটকীকরণ কারখানা রয়েছে ৬টি, সরকারি মৎস খামার ১টি ও বেসরকারি ৪২৬টি। বরফ কল-৫টি, খাদ্য গুদাম ১টি। সরকারি ৪টি ও বেসরকারি ২টি ব্যাংক রয়েছে। সার বিতরণ কেন্দ্র রয়েছে ৮টি। এখানকার প্রধান ফসল ধান ও প্রধান ব্যবসা লবন চাষ।
সমবায়ের অধীনে আশ্রয়ন প্রকল্প রয়েছে ৭টি, নির্মিত ব্যারাক ৩৭টি। পুর্ণবাসিত পরিবার সংখ্যা ৩৭০টি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর মাঝে সবুজ পাহাড়ঘেরা উপজেলা টেকনাফ। এই সীমান্ত উপজেলার পাহাড়ের বাঁকে-বাঁকে এখন বড় আতঙ্কের নাম অপহরণ ও মুক্তিপণ-বাণিজ্য। এমন আতঙ্কে টেকনাফের লাখো মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত। এমনকি অপহরণের পর খোঁজ না পাওয়া মানুষের লাশও মিলছে পাহাড়ে। দিন দিন এ ধরনের ঘটনা বেড়ে চললেও কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি। কারা এসব করছে, কেন করছে- প্রশ্নের উত্তর মিলছে না কারও কাছে, প্রতিকারও পাচ্ছেন না স্থানীয় জেলে-কৃষক থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ উপজেলার জনসংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কারণে এ উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে টেকনাফে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে স্থানীয়রা এমনিতেই নানা সংকটে পড়েছেন। তার ওপর এখন যুক্ত হয়েছে অপহরণ আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, গত এক বছরে টেকনাফে অন্তত ১৮৭ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯১ জন স্থানীয় ও বাকিরা রোহিঙ্গা। এর মধ্যে অন্তত দেড়শ জনকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেতে হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের পরিবার ও জনপ্রতিনিধিদের।
পাহাড়-সমুদ্রঘেঁষা পার্বত্য জেলা কক্সবাজারের টেকনাফ এখন মূর্তমান আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ১০-১২টি ডাকাত গ্রæপের অন্তত দেড় শতাধিক ডাকাত সদস্য এসব অপহরণ বাণিজ্যে জড়িত। তাদের হাতে রয়েছে, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র। অপহরণের পর মুক্তিপণ দিয়ে বা কোনোমতে উদ্ধার করাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই ডাকাতদের হাতে অপহরণ-মুক্তিপণ আদায় নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে গেলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। এতে আতঙ্ক এবং ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল এলাকায় মৃত আব্বাস মিয়ার ছেলে রাজমিস্ত্রি ছৈয়দ হোছাইন অপহরণের শিকার হয়েছেন। গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নেমে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পাহাড়ে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
স্থানীয় নুর হোসেন বলেন, মাগরিবের পর পাহাড়ি ডাকাতদল এলাকায় নেমে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একজনকে অপহরণ নিয়ে যায়। এ ঘটনায় নিজেরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
বাহারছড়ার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যায় ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরপর বাড়ি থেকে একজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনেছি। তার আগে দিনের বেলায় আরও দুই জনকে ডেকে নিয়ে পাহাড়ে আটকে রেখেছে বলে জানতে পেরেছি।
বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক শোভন কুমার সাহা বলেন, ‘ফাঁকা গুলিবর্ষণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছি। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে সহকারে দেখছি। এ ছাড়া অপহৃতকে উদ্ধারেও অভিযান চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, টেকনাফে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে ৩০ জন অপহরণের শিকার হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও মুক্তিপণ দিয়ে ২৬ জন ফিরে এলেও এখনও চারজন অপহরণ চক্রের কবলে রয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে মুদিদোকানি জসীমের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবি করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। তবে গত ৩ জানুয়ারি এ অপহৃতদের মধ্যে ১৮ শ্রমিককে উদ্ধার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। এদিন বিকেলে হ্নীলা ইউনিয়নের লেদার রংগীখালী পশ্চিমের দুর্গম পাহাড় থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। এদিকে ৩১ ডিসেম্বর সকালে হোয়াইক্যং-শামলাপুর সড়কে দুটি অটোরিকশা থামিয়ে চালকসহ আরও ৮ জনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে মুখোশধারীরা। খবর পেয়ে বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে অপহৃতদের নাম-ঠিকানা জানা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের এক সদস্য বলেন, অপহরণের ভয়ে এই এলাকার লোকজন সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হন না। গত পাঁচ মাসে আমার এলাকায় অর্ধশতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন বেশিরভাগ। হত্যার ভয়ে অপহরণের শিকার লোকজন থানায় যেতে চান না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অপহরণের অধিকাংশ ঘটনার রহস্যভেদ করতে পারছে না পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা শুধু অপহরণের ঘটনা ঘটলে কিছুটা তৎপরতা দেখায়। ঘটনার পর তদন্তে বা অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোনও অগ্রগতি থাকে না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বিশেষ করে উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও বাহারছড়ায় অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটছে। সবচেয়ে বেশি বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, বড় ডেইল, মাথাভাঙা, জাহাজপুড়া, ভাগগুনা, মারিশবনিয়া, হোয়াই্যকংয়ের ঢালা, চৌকিদারপাড়া, দক্ষিণ শীলখালী গ্রামের মানুষ বেশি অপহরণ ভয়ের মধ্য আছেন। মূলত পাহাড়ি এলাকাগুলোয় বেশ কয়েকটি অপহরণ চক্র সক্রিয়। স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় তারা বিভিন্ন অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
বাহারছড়ার এক জনপ্রতিনিধি বলেন, মূলত পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে টেকনাফে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। গত দুই মাসে আমার এলাকায় ৩০ জনের বেশি অপহরণের শিকার হয়েছেন। সবাই মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন।
বাহারছড়ার ইউপি সদস্য হুমায়ুন কবির বলেন, যতক্ষণ স্থানীয় মানুষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জনপ্রতিনিধিরা যৌথভাবে কাজ না করবেন, ততদিন এ অপরাধ রোধ অসম্ভব।
বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক শোভন কুমার সাহা জানান, অটোরিকশা থেকে চালকসহ যাত্রী অপহরণের ঘটনা শুনে অভিযান চালানো হচ্ছে। কতজন অপহৃত হয়েছেন সেটির সঠিক তথ্য এখনও জানা যায়নি। অটোরিকশা দুটি উদ্ধার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অপহৃতদের অবস্থান জানার চেষ্টা করে পুলিশ। আমরা গত বছরের জানুয়ারি থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৮ জন অপহৃতকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। ২০টি মামলায় বেশ কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দুর্গম পাহাড়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তারও করেছে র‌্যাবের আভিযানিক দল। সর্বশেষ গত ৩১ ডিসেম্বর দীর্ঘ অভিযানে বনে অপহৃত ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
টেকনাফের ইউএনও শেখ এহেসান উদ্দীন বলেন, পাহাড়ে স্থানীয়দের সহায়তায় অপহৃতদের উদ্ধারে র‌্যাব ড্রোন অভিযান চালাচ্ছে। আশা করছি, তাদের দ্রæত উদ্ধার করতে সক্ষম হব। পাশাপাশি অপহরণ-মুক্তিপণ বন্ধে কর্তৃপক্ষকে যৌথ অভিযান চালানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, অপহরণের ঘটনাগুলো কোন কোন পয়েন্টে হয় সেটি নির্ধারণ করে সেখানে নজরদারি বৃদ্ধি করাসহ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় সে বিষয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করবো।
এদিকে পার্বত্য অঞ্চলের আরেকটি দুর্গম পাহাড়ি জেলা রাঙামাটি। এই জেলার বন্দুকভাঙ্গা রেঞ্জে গত ৩ ডিসেম্বর ইউপিডিএফের (মূল) দুটি ক্যাম্পের সন্ধান পেয়েছে সেনাবাহিনী। ৪ জানুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
আইএসপিআর জানায়, সেনাবাহিনীর রাঙামাটি রিজিয়ন কর্তৃক চলমান বিশেষ অভিযানে বন্দুকভাঙ্গা রেঞ্জে তল্লাশি অভিযান পরিচালনাকালে পাগলিছড়ি ও যমচুক এলাকায় পাহাড়ের চ‚ড়ায় দুটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত বিশেষ অভিযানের কারণে ইউপিডিএফের (মূল) সন্ত্রাসীরা উক্ত ক্যাম্প দুটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যায়। পাগলিছড়ি এলাকায় পাহাড়ের চ‚ড়ায় সন্ধান পাওয়া ইউপিডিএফের সম্ভাব্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্পটি বড় জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এই ক্যাম্পে চলাচলের রাস্তাসহ পর্যবেক্ষণ চৌকি, প্রশিক্ষণ মাঠ এবং বাসস্থান রয়েছে। এছাড়া যমচুক এলাকায় সন্ধান পাওয়া ক্যাম্পটিতে বাঙ্কারসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সন্ত্রাসী বসবাসের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে অবস্থানকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অপারেশন প্রতিরোধ করার জন্য এই ক্যাম্পে বাঙ্কার খনন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকাÐ রোধে এ ধরনের অপারেশন চলমান রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাহাড়ে বাড়ছে আতঙ্ক

আপডেট সময় : ০৭:৪৪:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৫

* ১০-১২টি গ্রæপে সক্রিয় দেড় শতাধিক অপহরণকারী
* তিন দিনে ৩০ জনকে তুলে নিলো দুর্বৃত্তরা
* এক বছরে অপহরণের শিকার ১৮৭ জন
* মুক্তিপণ-অভিযানে মুক্তি মিললেও অনেকেই গুম-খুনের শিকার
* দুর্গম পাহাড়ে ইউপিডিএফ’র দুটি গোপন আস্তানা পেল সেনাবাহিনী

দেশের পট পরিবর্তনেও পাহাড়ি জনপদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। দিনের পর দিন অশান্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদ। এখানকার বাসিন্দারা এখন অজানা শঙ্কা নিয়ে দিনযাপন করছেন। টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে ১০-১২টি গ্রæপে সক্রিয় রয়েছে দেড় শতাধিক অপহরণকারী। গত তিন দিনেই চক্রের সদস্যরা ৩০ জনকে তুলে নিয়ে গেছে দুর্গম পাহাড়ে। মুক্তিপণের দাবিতে গোপন আস্তানায় তাদের আটকে রেখে স্বজন-পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিদায়ি বছর-২০২৪ সালে এই জনপদে অন্তত ১৮৭ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আবার মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। আবার অনেকেই গুম-খুনের শিকার হচ্ছেন। এমন ভীতিকর পরিস্থিতিতে দিনের বেলায়ও অবাধ চলাচল করতে সাহস পাচ্ছেন না পাহাড়-সমুদ্রঘেঁষা টেকনাফের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদিকে চলমান অভিযানে রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ের টিলায় পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ’র দুটি গোপন আস্তানার খোঁজ পেয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সূর্য্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে সাগর-নদী ও পাহাড়বেষ্টিত পার্বত্য অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ৩টি জেলা। সন্ধ্যা নামতেই উদ্বেগ আতঙ্ক নিয়েই পাহাড়ে বসবাস করছেন লাখো মানুষ। মারণাস্ত্র বহনকারী অপহরণচক্রের প্রধান টার্গেটে পর্যটকরা। একই সঙ্গে পাহাড়ের অধিবাসীরাও তাদের কিলিং টার্গেটের শিকার হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন বলছে, পাহাড়ে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার। একই সঙ্গে পাহাড়ি জনপদে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চলছে। এরই মধ্যে চক্রের অনেককেই গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গতকাল শনিবার আইএসপিআরসহ স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত জেলা সদর হতে ৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে টেকনাফ উপজেলা অবস্থিত। প্রশাসনিকভাবে শহরটি টেকনাফ উপজেলার বৃহত্তম শহরাঞ্চল। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের শহর এই উপজেলা। এর আয়তন ৩৮৮.৬৬ বর্গ কিমি। শহরটির অবস্থান: ২০.২৩ থেকে ২১.০৯ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২.০৫ থেকে ৯২.২৩ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। টেকনাফের সীমানা- উত্তরে উখিয়া উপজেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে মায়ানমারের আরাকান রাজ্য, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। উত্তরে সবুজ বৃক্ষরাজি শোভিত সুউচ্চ পাহাড় ও উখিয়া উপজেলা, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে নাফ নদী ও মায়ানমার।
পাহাড়-সমুদ্রঘেঁষা এই উপজেলায় ১টি পৌরসভা, ৬টি ইউনিয়ন, ১২টি মৌজা ও ১৮৪টি গ্রাম রয়েছে। এছাড়া পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ড ও ১৬টি মহল্লা রয়েছে। ইউনিয়নগুলো হচ্ছেÑ টেকনাফ, বাহারছরা, সাবরং, হোয়াইক্যং, নীলা ও সেন্টমার্টিন। বিস্তির্ণ এই জনপদের জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৪ হাজার ৩৮৯। এর মধ্যে পুরুষ ১৩ লাখ ৩ হাজার ১০৬ ও মহিলা ১৩ লাখ ১ হাজার ২৮৩ জন। ২৫ লাখ ৮ হাজার ২৪৫ জন মুসলিম, ২ হাজার ৯৬৭ হিন্দু, ৩ হাজার ৮৯ জন বৌদ্ধ, ৯ জন খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ৭৯ জন। সূত্র জানায়, প্রশাসন টেকনাফ থানা গঠিত হয় ১৯৩০ সালে এবং ১৯৮৩ সালে থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখানে ১টি কলেজ, ১১টি উচ্চ বিদ্যালয় (বালক), ২টি উচ্চ বিদ্যালয় (বালিকা), ৩টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি ৩৪টি, রেজিস্টার্ড ২৩টি ও আনরেজিস্টার্ড ৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১১টি মাদ্রাসা রয়েছে। এখানে শিক্ষার হার ১৯.৭২ শতাংশ। সড়ক ও জনপথ বিভাগের মোট রাস্তা রয়েছে ৬৫ কিমি. অন্যান্য রাস্তা (এলজিইডি) পাকা রাস্তা ৪৭.১২ কিমি., কাচা রাস্তা ৩৫৮.২৬ কিমি., আধাপাকা ৭৪.৩৯ কিমি. ও নির্মানাধীন রয়েছে ১০ কিমি. রাস্তা।
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে রয়েছে ১টি নদীপথ (নাফ নদী), স্থলবন্দর ১টি, হাটবাজার ১৩টি ও ৫১টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। মৎস বিভাগের শুটকীকরণ কারখানা রয়েছে ৬টি, সরকারি মৎস খামার ১টি ও বেসরকারি ৪২৬টি। বরফ কল-৫টি, খাদ্য গুদাম ১টি। সরকারি ৪টি ও বেসরকারি ২টি ব্যাংক রয়েছে। সার বিতরণ কেন্দ্র রয়েছে ৮টি। এখানকার প্রধান ফসল ধান ও প্রধান ব্যবসা লবন চাষ।
সমবায়ের অধীনে আশ্রয়ন প্রকল্প রয়েছে ৭টি, নির্মিত ব্যারাক ৩৭টি। পুর্ণবাসিত পরিবার সংখ্যা ৩৭০টি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর মাঝে সবুজ পাহাড়ঘেরা উপজেলা টেকনাফ। এই সীমান্ত উপজেলার পাহাড়ের বাঁকে-বাঁকে এখন বড় আতঙ্কের নাম অপহরণ ও মুক্তিপণ-বাণিজ্য। এমন আতঙ্কে টেকনাফের লাখো মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত। এমনকি অপহরণের পর খোঁজ না পাওয়া মানুষের লাশও মিলছে পাহাড়ে। দিন দিন এ ধরনের ঘটনা বেড়ে চললেও কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি। কারা এসব করছে, কেন করছে- প্রশ্নের উত্তর মিলছে না কারও কাছে, প্রতিকারও পাচ্ছেন না স্থানীয় জেলে-কৃষক থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ উপজেলার জনসংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কারণে এ উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে টেকনাফে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে স্থানীয়রা এমনিতেই নানা সংকটে পড়েছেন। তার ওপর এখন যুক্ত হয়েছে অপহরণ আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র বলছে, গত এক বছরে টেকনাফে অন্তত ১৮৭ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯১ জন স্থানীয় ও বাকিরা রোহিঙ্গা। এর মধ্যে অন্তত দেড়শ জনকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেতে হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের পরিবার ও জনপ্রতিনিধিদের।
পাহাড়-সমুদ্রঘেঁষা পার্বত্য জেলা কক্সবাজারের টেকনাফ এখন মূর্তমান আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ১০-১২টি ডাকাত গ্রæপের অন্তত দেড় শতাধিক ডাকাত সদস্য এসব অপহরণ বাণিজ্যে জড়িত। তাদের হাতে রয়েছে, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র। অপহরণের পর মুক্তিপণ দিয়ে বা কোনোমতে উদ্ধার করাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই ডাকাতদের হাতে অপহরণ-মুক্তিপণ আদায় নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে গেলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। এতে আতঙ্ক এবং ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল এলাকায় মৃত আব্বাস মিয়ার ছেলে রাজমিস্ত্রি ছৈয়দ হোছাইন অপহরণের শিকার হয়েছেন। গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নেমে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পাহাড়ে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
স্থানীয় নুর হোসেন বলেন, মাগরিবের পর পাহাড়ি ডাকাতদল এলাকায় নেমে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একজনকে অপহরণ নিয়ে যায়। এ ঘটনায় নিজেরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
বাহারছড়ার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যায় ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরপর বাড়ি থেকে একজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনেছি। তার আগে দিনের বেলায় আরও দুই জনকে ডেকে নিয়ে পাহাড়ে আটকে রেখেছে বলে জানতে পেরেছি।
বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক শোভন কুমার সাহা বলেন, ‘ফাঁকা গুলিবর্ষণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছি। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে সহকারে দেখছি। এ ছাড়া অপহৃতকে উদ্ধারেও অভিযান চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, টেকনাফে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে ৩০ জন অপহরণের শিকার হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও মুক্তিপণ দিয়ে ২৬ জন ফিরে এলেও এখনও চারজন অপহরণ চক্রের কবলে রয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে মুদিদোকানি জসীমের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবি করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। তবে গত ৩ জানুয়ারি এ অপহৃতদের মধ্যে ১৮ শ্রমিককে উদ্ধার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। এদিন বিকেলে হ্নীলা ইউনিয়নের লেদার রংগীখালী পশ্চিমের দুর্গম পাহাড় থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। এদিকে ৩১ ডিসেম্বর সকালে হোয়াইক্যং-শামলাপুর সড়কে দুটি অটোরিকশা থামিয়ে চালকসহ আরও ৮ জনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে মুখোশধারীরা। খবর পেয়ে বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে অপহৃতদের নাম-ঠিকানা জানা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের এক সদস্য বলেন, অপহরণের ভয়ে এই এলাকার লোকজন সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হন না। গত পাঁচ মাসে আমার এলাকায় অর্ধশতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন বেশিরভাগ। হত্যার ভয়ে অপহরণের শিকার লোকজন থানায় যেতে চান না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অপহরণের অধিকাংশ ঘটনার রহস্যভেদ করতে পারছে না পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা শুধু অপহরণের ঘটনা ঘটলে কিছুটা তৎপরতা দেখায়। ঘটনার পর তদন্তে বা অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোনও অগ্রগতি থাকে না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বিশেষ করে উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও বাহারছড়ায় অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটছে। সবচেয়ে বেশি বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া, বড় ডেইল, মাথাভাঙা, জাহাজপুড়া, ভাগগুনা, মারিশবনিয়া, হোয়াই্যকংয়ের ঢালা, চৌকিদারপাড়া, দক্ষিণ শীলখালী গ্রামের মানুষ বেশি অপহরণ ভয়ের মধ্য আছেন। মূলত পাহাড়ি এলাকাগুলোয় বেশ কয়েকটি অপহরণ চক্র সক্রিয়। স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় তারা বিভিন্ন অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
বাহারছড়ার এক জনপ্রতিনিধি বলেন, মূলত পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে টেকনাফে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। গত দুই মাসে আমার এলাকায় ৩০ জনের বেশি অপহরণের শিকার হয়েছেন। সবাই মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন।
বাহারছড়ার ইউপি সদস্য হুমায়ুন কবির বলেন, যতক্ষণ স্থানীয় মানুষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জনপ্রতিনিধিরা যৌথভাবে কাজ না করবেন, ততদিন এ অপরাধ রোধ অসম্ভব।
বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক শোভন কুমার সাহা জানান, অটোরিকশা থেকে চালকসহ যাত্রী অপহরণের ঘটনা শুনে অভিযান চালানো হচ্ছে। কতজন অপহৃত হয়েছেন সেটির সঠিক তথ্য এখনও জানা যায়নি। অটোরিকশা দুটি উদ্ধার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অপহৃতদের অবস্থান জানার চেষ্টা করে পুলিশ। আমরা গত বছরের জানুয়ারি থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৮ জন অপহৃতকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। ২০টি মামলায় বেশ কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দুর্গম পাহাড়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তারও করেছে র‌্যাবের আভিযানিক দল। সর্বশেষ গত ৩১ ডিসেম্বর দীর্ঘ অভিযানে বনে অপহৃত ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
টেকনাফের ইউএনও শেখ এহেসান উদ্দীন বলেন, পাহাড়ে স্থানীয়দের সহায়তায় অপহৃতদের উদ্ধারে র‌্যাব ড্রোন অভিযান চালাচ্ছে। আশা করছি, তাদের দ্রæত উদ্ধার করতে সক্ষম হব। পাশাপাশি অপহরণ-মুক্তিপণ বন্ধে কর্তৃপক্ষকে যৌথ অভিযান চালানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, অপহরণের ঘটনাগুলো কোন কোন পয়েন্টে হয় সেটি নির্ধারণ করে সেখানে নজরদারি বৃদ্ধি করাসহ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় সে বিষয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করবো।
এদিকে পার্বত্য অঞ্চলের আরেকটি দুর্গম পাহাড়ি জেলা রাঙামাটি। এই জেলার বন্দুকভাঙ্গা রেঞ্জে গত ৩ ডিসেম্বর ইউপিডিএফের (মূল) দুটি ক্যাম্পের সন্ধান পেয়েছে সেনাবাহিনী। ৪ জানুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
আইএসপিআর জানায়, সেনাবাহিনীর রাঙামাটি রিজিয়ন কর্তৃক চলমান বিশেষ অভিযানে বন্দুকভাঙ্গা রেঞ্জে তল্লাশি অভিযান পরিচালনাকালে পাগলিছড়ি ও যমচুক এলাকায় পাহাড়ের চ‚ড়ায় দুটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত বিশেষ অভিযানের কারণে ইউপিডিএফের (মূল) সন্ত্রাসীরা উক্ত ক্যাম্প দুটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যায়। পাগলিছড়ি এলাকায় পাহাড়ের চ‚ড়ায় সন্ধান পাওয়া ইউপিডিএফের সম্ভাব্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্পটি বড় জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এই ক্যাম্পে চলাচলের রাস্তাসহ পর্যবেক্ষণ চৌকি, প্রশিক্ষণ মাঠ এবং বাসস্থান রয়েছে। এছাড়া যমচুক এলাকায় সন্ধান পাওয়া ক্যাম্পটিতে বাঙ্কারসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সন্ত্রাসী বসবাসের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে অবস্থানকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অপারেশন প্রতিরোধ করার জন্য এই ক্যাম্পে বাঙ্কার খনন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকাÐ রোধে এ ধরনের অপারেশন চলমান রয়েছে।