চট্টগ্রামে গত দুই বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে ১৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ট্রেনে কাটা পড়ে অসংখ্য লোক আহত ও পঙ্গুগুত্ব বরণ করেছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চালুর গত এক বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে ১২ জন নারী-পুরুষ এবং একটি বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে গত ৭ নভেম্বর কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদ নগরের উত্তর কাহাতিয়া এলাকায় ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। এরা হলেন-মোহাম্মদ ওয়াহিদ ও তার বন্ধু মোহাম্মদ হোসেন। তারা ট্রেন আসছে দেখেও রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় মোটরসাইকেল রেললাইনে ওঠার পর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী একটি ট্রেন তাদের ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই দুই জনের মৃত্যু হয়।
এ ছাড়াও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে মীর কাসেম (৬২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। ২২ নভেম্বর কক্সবাজারের ঈদগাওয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে ৫৫ বছরের অজ্ঞাত ব্যক্তি মারা যান। ওই বছরের ১০ জানুয়ারি ভোরে কক্সবাজার ঈদগাহ এলাকায় ট্রেনের ইঞ্জিনের বগিতে কাটা পড়ে আব্দুস সালাম (৪০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। ওই বছরের ১৪ জানুয়ারি চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের গৌবিন্দপুরে রেললাইনে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মো. শাহ আলম (৬৫) নামে এক ব্যক্তি মারা যান। ২৮ জানুয়ারি কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনে কাটা পড়ে এক অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের চান্দগাঁও বাহির সিগন্যাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। ৭ জানুয়ারি কক্সবাজার রামুতে ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আলী আহমেদ (৭০) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। রামু জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের চা-বাগান গাইনপাড়া এলাকায় কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ২৭ জুন পটিয়া উপজেলার পৌরসভার গোবিন্দরখীল এলাকায় কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে লায়লা বেগম (৭৫) নামে বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। ১১ অক্টোবর চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার উত্তর ঢেমশা এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে এক অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু হয়।
অপরদিকে, গত ১৩ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ঈদ স্পেশাল ট্রেনের ধাক্কায় এক বন্য হাতি আহত হয়। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের এলিফ্যান্ট ওভারপাসের উত্তর পাশে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার দুই দিন পর ১৫ অক্টোবর রেলওয়ের একটি রিলিফ ট্রেনে করে আহত হাতিটিকে ডুলহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাতিটির মৃত্যু হয়।
এ ছাড়াও চট্টগ্রামে ট্রেনে কাটা পড়ে গেলো ২০২৪ সালে মোট ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ৮২ জন।
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রেলপথের উদ্বোধন করেন। এরপর ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনের উদ্বোধন করা হয়। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে যুক্ত হয় ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেন। গত বছরের ৮ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চালু করা হয় ঈদ স্পেশাল ট্রেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানা সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ৮৪টি ট্রেনে কাটা পড়ার ঘটনায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১০ জন, মার্চে ৫ জন, এপ্রিলে ৭ জন, মে মাসে ৫ জন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৬ জন, আগস্টে ৬ জন, সেপ্টেম্বরে ২ জন, অক্টোবরে ১৩ জন, নভেম্বরে ৭ জন এবং ডিসেম্বরে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ থানার আওতাধীন চট্টগ্রামের রেললাইনের নিচে কাটা পড়ে ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন অনেকেই।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্র জানিয়েছে, ১৮৬১ সালের ৫ নম্বর আইনের ১২ নম্বর ধারা মোতাবেক রেললাইনের দুপাশে ১০ ফুট করে এলাকার মধ্যে রেলের কর্মী ছাড়া সাধারণ মানুষ কিংবা গবাদিপশুর প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ওই এলাকায় সব সময়ই ১৪৪ ধারা জারি থাকে।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চট্টগ্রাম স্টেশনের ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ বলেন, ‘রেললাইন ধরে চলাচল বা বসে থাকা যে নিষিদ্ধ ও দন্ডনীয় অপরাধ এমন আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই অনেক লোকজনের। বিশেষ করে অসাবধানতাবশত চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি।’
ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অসাবধানতার কারণে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ট্রেনে কাটা পড়ে কেউ মারা গেলে নিয়ম অনুযায়ী ট্রেনের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে পারে না। বরং ট্রেন চাইলে মামলা করতে পারে। এ কারণে যারা ট্রেনে কাটা পড়ে আহত হন তারা আমাদের অবহিত না করেই চুপিসারে চিকিৎসা করান।
তিনি আরও বলেন, ‘ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণের মধ্যে রয়েছে চলন্ত অবস্থায় ট্রেনে ওঠানামা, ছাদে ভ্রমণ, দুই বগির সংযোগস্থলে বসা, ট্রেনের দরজায় হাতলে ঝুলে যাতায়াত, কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনে হাঁটা, রেললাইনে সেলফি তোলা, অবৈধ রেলক্রসিং ও অসতর্কভাবে রেললাইন পার হওয়া।’




















