দেশে বড় বন্যার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের কমপক্ষে চারটি জেলা বন্যা কবলিত হয়েছে। এরই মধে মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে, চলতি মাসে দেশে বন্যা ও বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেতে পারে।
ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর ও নেত্রকোনা এবং সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায় আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্যার শঙ্কা রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেসরকারি আবহাওয়াবিষয়ক ওয়েবসাইট আবহাওয়া ডটকমের প্রধান আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন
জানা যায়, ভারতের মেঘালয় ও আসামে টানা ভারি বর্ষণের পানি উজান থেকে নেমে আসছে। পাশাপাশি শেরপুরে গত চার দিনের থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলা এবং সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বিভিন্ন নদীতে পাহাড়ি ঢল শুরুর আশঙ্কা রয়েছে। গতকাল থেকে আজ বুধবার দুপুর ১২টার মধ্যে রংপুর, ময়মনিসংহ ও সিলেট বিভাগের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে একনাগাড়ে মাঝারি থেকে ভারি মানের বৃষ্টিপাত অতিক্রমের প্রবল আশঙ্কা করা যাচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলা এবং সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায় বন্যার শঙ্কা রয়েছে। ভারতের মেঘালয় ও আসামে টানা ভারি বর্ষণ এবং শেরপুরে গত ৪ দিনের থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ১০টায় চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত রাত ১০টায় যা ছিল ৩৯ সেন্টিমিটারের ওপর। মুষলধারে বৃষ্টি এবং উজানে অতিরিক্ত বর্ষণের কারণে আবারও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে পাউবো। সকাল সাড়ে ১১টার পর থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত রংপুর, ময়মনিসংহ ও সিলেট বিভাগের জেলাগুলোর ওপর দিয়ে একের পর এক বজ্র-বৃষ্টি অতিক্রমের প্রবল আশঙ্কা করা যাচ্ছে। ভারি বর্ষণে শেরপুরের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এতে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত সোমবার রাতে এই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। একইভাবে ভোগাই নদীর পানি (নকুগাঁও পয়েন্ট) বিপৎসীমার ৩৭৯ সেন্টিমিটার নিচে, নালিতাবাড়ী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৫৭ সেন্টিমিটার নিচে ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬৮৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় এখনো ৬ শতাংশ ধান কাটা বাকি রয়েছে। কেটে নেওয়া অনেক ধান এখনো মাড়াই হয়নি। অনেক কৃষকের খড় এখনো কাঁচা। টানা বৃষ্টিপাতে অনেকের কেটে নেওয়া ধান ও খড় বৃষ্টির পানিতে পচে যাচ্ছে। শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, ‘৯৪ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। বাকি ধান দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আশাকরি এক সপ্তাহের মধ্যে সব ধান কাটা শেষ হবে। ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, ‘বৃষ্টি ও উজানের ঢলে পানি বেড়েছে। তবে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কয়েক দিন থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও সোমবার রাতের ভারি বর্ষণে রংপুর নগরীর নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা তলিয়ে গেছে। কোনো কোনো অলিগলি এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এ কারণে দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন মানুষ। গত সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত নগরীতে ১১৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে রংপুর আবহাওয়া কার্যালয় জানিয়েছে।
নগরীর ‘ফুসফুস’ খ্যাত শ্যামা সুন্দরী খাল খনন না করায় পানি উপচে আশপাশের বাড়িঘর ও রাস্তায় প্রবেশ করেছে। নগরীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের অনেক স্থান তলিয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর মুন্সীপাড়া, মুলাটোল, বাবু খাঁ, গোমস্তপাড়া, জুম্মাপাড়া, হনুমানতলাসহ কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫টি মহল্লার বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। ফলে কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পানি উঠায় স্কুলের শিক্ষার্থীরা পড়েছেন বিপাকে। রংপুর আবহাওয়া কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, দুই দিনে রংপুরে ২২৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বৃষ্টি হয়েছে। আরও বৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবিরাম বর্ষণের কারণে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। পানি বৃদ্ধি পেলেও এখনো বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আকস্মিক অবিরাম বৃষ্টিতে চরাঞ্চলের অনেক এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ধানক্ষেতসহ রবি শস্যের অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরের উপশহর, তেররতন, সোবহানীঘাট, তালতলা, মাছুদিঘির পাড়, ছড়ার পাড়, মণিপুরী রাজবাড়ি, শেখঘাট, ঘাসিটুলা, বাবনা ও স্টেশন রোডসহ অনেক এলাকা পানির নিচে চলে যায়। সিলেট নগরে গতকাল ভোর থেকে শুরু হওয়া ভারি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে অন্তত ২০টি এলাকায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। অপরদিকে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জাফলংসহ সিলেটের কয়েকটি উপজেলায় নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে।
সকালে মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরের উপশহর, তেররতন, সোবহানীঘাট, তালতলা, মাছুদিঘির পাড়, ছড়ার পাড়, মণিপুরী রাজবাড়ি, শেখঘাট, ঘাসিটুলা, বাবনা ও স্টেশন রোডসহ অনেক এলাকা পানির নিচে চলে যায়। বাড়িঘর ও দোকানপাটেও পানি ঢুকে পড়ে। নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা আগে থেকেই জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় ছিলেন। সকালেই তা বাস্তবে রূপ নেয়। তালতলা এলাকার বাসিন্দা কায়সার আহমদ বলেন, সকালের বৃষ্টিতে আমার ঘরে পানি ঢুকে যায়। অফিস, বাচ্চাদের স্কুল বাদ দিয়ে ঘরের পানি সেচে পরিষ্কার করতে হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার পানি ঢুকলো। অথচ এখনও বর্ষাকাল আসেনি। সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শহরে ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট ও ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে আরও মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। জলাবদ্ধতা সিলেট নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও এখনও কার্যকর সমাধান আসেনি। সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) জানায়, ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, দুই বছর আগের বন্যার পর নিম্নাঞ্চলের নাগরিকদের সুরক্ষায় নদীতীর সংরক্ষণ ও সেচ প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এসব এখনো আলোচনার পর্যায়েই আছে। অন্যদিকে, ভারি বৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে সিলেটের অন্যতম পর্যটন এলাকা জাফলং। সোমবার সকাল ১০টার দিকে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা ঢলে পিয়াইন নদীতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়। এতে জিরো পয়েন্টসহ আশপাশের এলাকা দ্রুত পানির নিচে চলে যায়। নদীর পানির প্রবল স্রোতে জাফলংয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয় বসতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব ধরনের পর্যটন কার্যক্রম। স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। জাফলং ছাড়াও গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার নদীতীরবর্তী কিছু এলাকায় কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
শিরোনাম
চার জেলায় বন্যার পদধ্বনি
ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ মে ২০২৫
- ।
- 40
জনপ্রিয় সংবাদ























