০২:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভারি বর্ষণে পাহাড়ধসের শঙ্কা: সতর্কতা জারি

ভারি বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথা বলেছে আবহাওয়া অফিস। এদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের কিছু অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে। এদিকে, টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বাসিন্দাদের জন্য আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যেকোনো মূহূর্তে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। বৃষ্টি স্থায়িত্ব হওয়ায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কতা জারি করেছে এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেলে বাসিন্দারা যেন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়।
জেলায় ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে সরকারি হিসেবে ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। তবে বেসরকারিভাবে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এরপর ২০১৮ সালেও পাহাড়ধসে জেলার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বসবাসরত ১১ জনের প্রাণহানি হয়। মূলত এ ধরনের প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে প্রশাসন অগ্রিম সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাতে শুরু করেছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙামাটির স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মোবারক হোসেন জেলা শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন এবং স্থানীয়দের সতর্ক করেন। বৃষ্টির পরিমাণ বাড়াতে কালবিলম্ব না করে দ্রুত সময়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাসিন্দাদের অনুরোধ জানিয়েছেন। জেলার নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) নাবিল নওরোজ বৈশাখ বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ায় প্রাণহানি এবং জান-মালের ক্ষতি এড়াতে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসরতদের মাঝে প্রশাসন অগ্রিম সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। বৃষ্টি যতদিন থাকবে প্রশাসন ততদিন এ ধরনের সতর্কতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে বৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী হলে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে জানান এনডিসি। রাঙামাটি দেশের বৃহৎ জেলা হলেও এখানে সমতল ভূমির পরিধি অত্যন্ত কম। পুরো এলাকা পাহাড় বেষ্টিত। সরকার একাধিকবার তাদের পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরানোর চেষ্টা করলেও তাদের জন্য স্থায়ী আবাসস্থলের ব্যবস্থা করতে না পারায় এ সমস্যা দীর্ঘ বছর থেকে গেছে। বর্ষাকাল আসলে পাহাড়ধসের ঘটনায় মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে।
চট্টগ্রামের বন্দরনগরীতে রয়েছে ২৬টি পাহাড়। এসব পাহাড়ের পাদদেশেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার। অবৈধ এসব বসতিতে বৈধভাবেই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় তাদের কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছে না। যে কারণে ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসে মৃত্যু হয়েছে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষের। নগরের মতিঝর্না ও বাটালীহিল পাহাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে ৪৩১ পরিবার। বেশিরভাগ বাড়ির লাগোয়া রয়েছে বড় বড় গাছ, যা ধসে পাশের বাড়িতে পড়তে পারে টানা বৃষ্টিপাত হলেই। একটু দূরেই বিশাল উঁচু পাহাড়, সেই পাহাড়ের পেট বরাবর কাটা হয়েছে মাটি। পরিস্থিতি এমন—হালকা বৃষ্টি কিংবা ভারী চাপে ভেঙে পড়তে পারে পাহাড়টি। আর এই পাহাড় ভেঙে পড়লেই ধ্বংস হয়ে যাবে নিচে থাকা কয়েকশ পরিবারের জীবন। একই চিত্র আকবরশাহ থানার ফয়’স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়েও। সেখানে থাকে প্রায় ৪ হাজার ৪৭৬ পরিবার। বেশিরভাগই রয়েছেন পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে। নূর উদ্দিন সুমন নামে এক ভ্যানচালক স্ত্রী-সন্তানসহ সেখানে বসবাস করেন দীর্ঘদিন। তিনি বলেন, এই এলাকায় থাকা-খাওয়ায় খুব বেশি খরচ হয় না। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। এ কারণেই প্রাণ গেলেও নিরূপায় হয়েই এখানে বসবাস করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন পাহাড়গুলোতে অবৈধভাবে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে রীতিমতো বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন করেই দেওয়া হয় বিদ্যুৎ। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিটি সভায় সেবা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কার্যত তা বাস্তবায়ন করা হয় না।
বান্দরবানে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই: পাহাড়ে ভারি বৃষ্টি হলেই আশঙ্কা থাকে পাহাড়ধসের। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে থাকা বসবাসকারীরা। আর তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দিনভর চলে মাইকিং। প্রশাসন থেকে নেওয়া হয় আরও কিছু অস্থায়ী উদ্যোগ। এর পরও দিনে বের করে দিলে আবারও রাতেই আশ্রয় নেন তারা। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ বসবাস করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয়। ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপে দেখা যায়, জেলার সাতটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়ে ১ হাজার ৪৪৪টি পরিবার বসবাস করছে। এরপর আর কোনো জরিপ হয়নি।
কক্সবাজারে পাহাড় কেটে বা পাদদেশে ঝুঁকিতে বাস করছে তিন লক্ষাধিক মানুষ। ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত জেলায় ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে ঝুঁকিতে বাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করে দায়িত্ব শেষ করে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিভিন্ন সময় পাহাড়ধসে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চকরিয়া, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া ও মহেশখালীতে পাহাড় কেটে ঝুঁকিতে বসবাস বাড়ছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কক্সবাজার পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কক্সবাজার জেলা সভাপতি এইচএম এরশাদ বলেন, প্রতি বছর জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুধু বর্ষা এলেই শুরু হয়। তাও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। শুষ্ক মৌসুমে আর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। ফলে অনেকটা বাধাহীনভাবে পাহাড় নিধন করে টাকার বিনিময়ে বসতির ব্যবস্থা করে দেন প্রভাবশালীরা। এতে পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। রাঙামাটিতে পাহাড়ের পাদদেশে ও ওপরে কী পরিমাণ মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছে তার সঠিক তথ্য নেই। অতীতে দেওয়া জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, জেলায় ৫ হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছে। জেলা শহরে পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে ৩১টি পয়েন্ট। যার মধ্যে শিমুলতলী, রূপনগর, যুব উন্নয়ন এলাকা অন্যতম। এসব এলাকায় জনবসতি কমার পরিবর্তে প্রতিবছর নতুন নতুন জনবসতি সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা।
সিলেটে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে বারবার বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকা। একটি বন্যা শেষ হতে না হতেই ভারি বৃষ্টিপাতে শঙ্কিত সিলেটের মানুষ। প্রতিবছর বন্যায় টিলাধসে অনেক মানুষ মারা যায় সিলেটে। বা বার টিলাধসে অনেক মানুষের মৃত্যু হলেও কঠোর অবস্থানে যেতে পারে না প্রশাসন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, শুধু বর্ষা এলে লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযানে পাহাড় টিলা রক্ষা বা প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব নয়। সিলেটে পাহাড় ও টিলা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশজুড়ে এলপি গ্যাসের হাহাকার

ভারি বর্ষণে পাহাড়ধসের শঙ্কা: সতর্কতা জারি

আপডেট সময় : ০৪:৫৯:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ মে ২০২৫

ভারি বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথা বলেছে আবহাওয়া অফিস। এদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের কিছু অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে। এদিকে, টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বাসিন্দাদের জন্য আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যেকোনো মূহূর্তে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। বৃষ্টি স্থায়িত্ব হওয়ায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্কতা জারি করেছে এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেলে বাসিন্দারা যেন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়।
জেলায় ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে সরকারি হিসেবে ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। তবে বেসরকারিভাবে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এরপর ২০১৮ সালেও পাহাড়ধসে জেলার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বসবাসরত ১১ জনের প্রাণহানি হয়। মূলত এ ধরনের প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে প্রশাসন অগ্রিম সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাতে শুরু করেছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙামাটির স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মোবারক হোসেন জেলা শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন এবং স্থানীয়দের সতর্ক করেন। বৃষ্টির পরিমাণ বাড়াতে কালবিলম্ব না করে দ্রুত সময়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাসিন্দাদের অনুরোধ জানিয়েছেন। জেলার নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) নাবিল নওরোজ বৈশাখ বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ায় প্রাণহানি এবং জান-মালের ক্ষতি এড়াতে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসরতদের মাঝে প্রশাসন অগ্রিম সতর্কতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। বৃষ্টি যতদিন থাকবে প্রশাসন ততদিন এ ধরনের সতর্কতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে বৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী হলে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে জানান এনডিসি। রাঙামাটি দেশের বৃহৎ জেলা হলেও এখানে সমতল ভূমির পরিধি অত্যন্ত কম। পুরো এলাকা পাহাড় বেষ্টিত। সরকার একাধিকবার তাদের পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরানোর চেষ্টা করলেও তাদের জন্য স্থায়ী আবাসস্থলের ব্যবস্থা করতে না পারায় এ সমস্যা দীর্ঘ বছর থেকে গেছে। বর্ষাকাল আসলে পাহাড়ধসের ঘটনায় মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে।
চট্টগ্রামের বন্দরনগরীতে রয়েছে ২৬টি পাহাড়। এসব পাহাড়ের পাদদেশেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার। অবৈধ এসব বসতিতে বৈধভাবেই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় তাদের কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছে না। যে কারণে ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসে মৃত্যু হয়েছে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষের। নগরের মতিঝর্না ও বাটালীহিল পাহাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে ৪৩১ পরিবার। বেশিরভাগ বাড়ির লাগোয়া রয়েছে বড় বড় গাছ, যা ধসে পাশের বাড়িতে পড়তে পারে টানা বৃষ্টিপাত হলেই। একটু দূরেই বিশাল উঁচু পাহাড়, সেই পাহাড়ের পেট বরাবর কাটা হয়েছে মাটি। পরিস্থিতি এমন—হালকা বৃষ্টি কিংবা ভারী চাপে ভেঙে পড়তে পারে পাহাড়টি। আর এই পাহাড় ভেঙে পড়লেই ধ্বংস হয়ে যাবে নিচে থাকা কয়েকশ পরিবারের জীবন। একই চিত্র আকবরশাহ থানার ফয়’স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়েও। সেখানে থাকে প্রায় ৪ হাজার ৪৭৬ পরিবার। বেশিরভাগই রয়েছেন পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে। নূর উদ্দিন সুমন নামে এক ভ্যানচালক স্ত্রী-সন্তানসহ সেখানে বসবাস করেন দীর্ঘদিন। তিনি বলেন, এই এলাকায় থাকা-খাওয়ায় খুব বেশি খরচ হয় না। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। এ কারণেই প্রাণ গেলেও নিরূপায় হয়েই এখানে বসবাস করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন পাহাড়গুলোতে অবৈধভাবে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে রীতিমতো বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন করেই দেওয়া হয় বিদ্যুৎ। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিটি সভায় সেবা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কার্যত তা বাস্তবায়ন করা হয় না।
বান্দরবানে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই: পাহাড়ে ভারি বৃষ্টি হলেই আশঙ্কা থাকে পাহাড়ধসের। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে থাকা বসবাসকারীরা। আর তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দিনভর চলে মাইকিং। প্রশাসন থেকে নেওয়া হয় আরও কিছু অস্থায়ী উদ্যোগ। এর পরও দিনে বের করে দিলে আবারও রাতেই আশ্রয় নেন তারা। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ বসবাস করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয়। ২০১৭ সালে জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপে দেখা যায়, জেলার সাতটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি নিয়ে ১ হাজার ৪৪৪টি পরিবার বসবাস করছে। এরপর আর কোনো জরিপ হয়নি।
কক্সবাজারে পাহাড় কেটে বা পাদদেশে ঝুঁকিতে বাস করছে তিন লক্ষাধিক মানুষ। ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত জেলায় ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে ঝুঁকিতে বাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করে দায়িত্ব শেষ করে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিভিন্ন সময় পাহাড়ধসে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চকরিয়া, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া ও মহেশখালীতে পাহাড় কেটে ঝুঁকিতে বসবাস বাড়ছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কক্সবাজার পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কক্সবাজার জেলা সভাপতি এইচএম এরশাদ বলেন, প্রতি বছর জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুধু বর্ষা এলেই শুরু হয়। তাও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। শুষ্ক মৌসুমে আর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। ফলে অনেকটা বাধাহীনভাবে পাহাড় নিধন করে টাকার বিনিময়ে বসতির ব্যবস্থা করে দেন প্রভাবশালীরা। এতে পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। রাঙামাটিতে পাহাড়ের পাদদেশে ও ওপরে কী পরিমাণ মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছে তার সঠিক তথ্য নেই। অতীতে দেওয়া জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, জেলায় ৫ হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছে। জেলা শহরে পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে ৩১টি পয়েন্ট। যার মধ্যে শিমুলতলী, রূপনগর, যুব উন্নয়ন এলাকা অন্যতম। এসব এলাকায় জনবসতি কমার পরিবর্তে প্রতিবছর নতুন নতুন জনবসতি সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা।
সিলেটে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে বারবার বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকা। একটি বন্যা শেষ হতে না হতেই ভারি বৃষ্টিপাতে শঙ্কিত সিলেটের মানুষ। প্রতিবছর বন্যায় টিলাধসে অনেক মানুষ মারা যায় সিলেটে। বা বার টিলাধসে অনেক মানুষের মৃত্যু হলেও কঠোর অবস্থানে যেতে পারে না প্রশাসন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, শুধু বর্ষা এলে লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযানে পাহাড় টিলা রক্ষা বা প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব নয়। সিলেটে পাহাড় ও টিলা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।