এখনও সিন্ডিকেটের কব্জায় গ্যাস সিলিন্ডার

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

* সরকারের নির্ধারিত দামেও মিলছে না এলপিজি 
* খুচরায় ১২ কেজির প্রতিসিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২৫০০-২৮০০ টাকা

“গণশুনানি করে দাম বাড়ালেও স্বস্তি মেলেনি। নিজস্ব গ্যাসকূপ খনন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার তদারকি ও সরকারি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে”
— অধ্যাপক এম শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

“অতি দরিদ্র মানুষের জন্য ভারত সরকারের মতো কম দামে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। দাম পুনর্মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তা যাচাই করা প্রয়োজন”
— শফিকুল আলম, লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট, আইআইইএফএ

 

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের এলপিজি সিলিন্ডারের বাজারে। পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এই জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বাজারে মিলছে না পর্যাপ্ত গ্যাস সিলিন্ডার। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার সুযোগে এখনও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কব্জায় আটকে রয়েছে এলপিজি’র বাজার। তবে অতিরিক্ত দাম দিলেই আলাদিনের চেরাগের মতো মিলছে রান্নার অন্যতম এই জ্বালানি। সরকার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম দফায় দফায় বাড়লেও নির্ধারিত দামে মিলছে না সিলিন্ডার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। অপরদিকে বিক্রেতারা বলছেন, বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে তাদের। এর সঙ্গে রয়েছে সরবরাহ সংকট। সব মিলিয়ে এলপিজি কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে বাজারে সরবরাহ সংকট, অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও সিন্ডিকেটের দাপটে ভোগান্তিতে রয়েছেন গ্রাহকেরা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিজস্ব গ্যাসকূপ খনন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার তদারকি ও সরকারি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। এলপিজির দাম নিয়েও ভোক্তাদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ-অসন্তোষ। অক্টোবর পর্যন্ত ছয়বার দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে দুইবার দাম কমলেও পাঁচ দফায় মোট বেড়েছে ১১৭৭ টাকা। তারপরও নির্ধারিত দামে পণ্যটি পাওয়া যাচ্ছে না। সংকটের মধ্যে সিন্ডিকেটের দাপট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে অসহায় হয়ে পড়েছেন ভোক্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যা দৈনিক হিসেবে প্রায় ৪ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন। এই চাহিদার বড় অংশ (প্রায় ৮০%) গৃহস্থালির রান্নায় এবং বাকি অংশ দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের এলপিজি বাজারের ৯৮.৬৭% নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি অপারেটররা। বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব টার্মিনালে কয়েক দিনের বাফারিং মজুদ থাকে। সাধারণত এলপিজির বড় কোনো স্থায়ী ঘাটতি থাকে না, কারণ এটি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরাসরি আমদানি করা হয়। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট কিংবা লোহিত সাগর/মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিগত উত্তেজনার কারণে আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে মাঝে মাঝে বাজারে প্রায় ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয়। বাংলাদেশে সাধারণত প্রতি মাসে গড়ে ১.৩ লাখ থেকে ১.৫৮ লাখ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিগত আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার ১২৯ টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। যা বছরে মোট আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ মেট্রিক টন।
বাংলাদেশে বার্ষিক এলপিজির চাহিদা প্রায় ১২ লাখ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টন (শিল্পের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১.২ থেকে ১.৬ বা ১৭-১৮ লাখ টন)। দৈনিক গড়ে এই চাহিদা প্রায় ৩,৩০০ থেকে ৫,০০০ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯৮% বা তার বেশি পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। সরকারিভাবে (যেমন: এলপি গ্যাস লিমিটেড) খুব সামান্য পরিমাণ (বার্ষিক প্রায় ৩৩,০০০ মেট্রিক টন) উৎপাদন করা হয়, বাকিটা বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে সরবরাহ করে। পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে আবাসিক ও শিল্প খাতে এলপিজির ওপর চাপ অনেক বেড়েছে। ফলে মাঝেমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানিতে জটিলতা দেখা দিলে বাজারে কৃত্রিম বা বাস্তব সংকট ও ঘাটতি তৈরি হয়। মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৮০% ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি বা আবাসিক কাজে (প্রধানত রান্নায় যেখানে পাইপলাইনের গ্যাস নেই)। বাণিজ্যিক ও শিল্প খাত: মোট এলপিজির প্রায় ১৭% বর্তমানে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহার হচ্ছে। পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালু রাখতে এলপিজি সিলিন্ডার বা বাল্ক (ইঁষশ) এলপিজি ব্যবহারে ঝুঁকছে। শিল্প খাতে মাসিক ব্যবহার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫,৫০০ মেট্রিক টন। 

জানা যায়, সরবরাহ ও মজুদ থাকা সত্বেও দেশের খুচরা দোকানে ন্যূনতম ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার। এ নিয়ে প্রায়ই ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা লেগেই থাকে। অনেক দোকানি ঝামেলা এড়াতে দোকান বন্ধ রেখে মুঠোফোনে দরদাম নির্ধারণ করে বাসা-বাড়ি বা চায়ের দোকানগুলোতে চাহিদানুযায়ী সিলিন্ডার গ্যাস পৌঁছে দেন। এছাড়া তরলীকৃত তিতাস গ্যাস লিমিটেড কোম্পানিও ভোক্তাদের সঙ্গে ছলচাতুড়ি করে পাইপলাইনে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ না করেই মাসিক হারে প্রতি ডাবলচুলা বাবদ ১০৮০ টাকার বিল তুলে নিচ্ছে। কেউ না দিলে তার সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে বলে জানান ভোক্তারা। 

গত সোমবার (২ নভেম্বর) তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকটের মধ্যেই আবারও দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত ৪ অক্টোবর একই পরিমাণ সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। দফায় দফায় এই দাম বৃদ্ধির ফলে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই। নতুন নির্ধারিত দাম গত সোমবার রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। সে অনুযায়ী নতুন দামে সিলিন্ডার বিক্রি শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু ১২ কেজি নয়, ৫ থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত সব ধরনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে। 

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, লালবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আগারগাঁও এলাকা সরেজমিন ঘুরে এলপিজি সিলিন্ডারের ক্রেতা, ব্যবহারকারী ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, দফায় দফায় দাম বাড়ায় বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ভোক্তারা।

বাসায় রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুরের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘স্ত্রী আর সন্তান নিয়ে আমাদের তিনজনের পরিবার। ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার কিনি প্রতি মাসে। একমাস চলে যায়। কিন্তু এর দামতো প্রতিনিয়তই বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে হলেতো চলা মুশকিল। তার ওপর সরকার যে দাম নির্ধারণ করে সেই দামেও কেনা যায় না। কিনতে হয় চার পাঁচশো টাকা বেশি দিয়ে। যখন গ্যাসের দাম ১৮০০ টাকার মতো ছিল তখন কিনেছি ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায়। আর এখনতো সরকারই করে দিয়েছে ২০৬০ টাকা; এখনতো তাহলে কিনতে হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে ২৮০০ টাকার বেশি দিয়ে। সবকিছুরই যদি এভাবে দাম বাড়তে থাকে তাহলে আমাদের জীবন যে আসলে কীভাবে যাবে আমি বুঝতে পারি না।

স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি হোটেলের রান্নার কাজে ব্যবহার করেন এলপিজি সিলিন্ডার। তিনি ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার ব্যবহার করে থাকেন। তিনি বলেন, ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার আগে যখন সরকারি নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৮৫০ টাকার মতো তখনও আমাদের ২১০০ থেকে ২৩৫০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। এখন সরকারি দাম ২০৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমার ধারণা, বিক্রেতারা এখন আরও বেশি দাম নেবে। দাম বাড়ার পরে এখনও কেনা লাগেনি তাই বলতে পারছি না কত করে রাখে। তবে যতদূর শুনতে পারছি, খুচরা দোকানিরা ১২ কেজির প্রতিসিলিন্ডার দাম রাখছেন ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকা।  আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা সরাসরি ডিলারের কাছ থেকে গ্যাস আনি না, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনি। তাই সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েই আমাদের কিনতে হয়। তিনি বলেন, আমার দুটি চুলা রয়েছে। দুইটা চুলায় দুইটা সিলন্ডার থাকে। একটি রুটি তৈরির জন্য, অন্যটি পরোটা তৈরির জন্য। তিন দিন পরপর দুটি সিলিন্ডার লাগে। এখনতো গ্যাসের দাম বাড়ছেই। আবার এর সঙ্গে অন্যান্য উপকরণ, বিশেষ করে ময়দার দামও বেড়েছে। সবকিছুর দাম বাড়ায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন ১০ টাকা করে একটি পরোটা বিক্রি করি। কিন্তু বর্তমান খরচে ১০ টাকায় পরোটা বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। হয় দাম বাড়াতে হবে, নয়তো ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। গ্যাসের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে একসময় হোটেলই বন্ধ করে দিতে হতে পারে। আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এত বেশি দামে গ্যাস কেনা কঠিন। আগে সরকারি দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে হয়েছে। এখন সরকারি দাম আরও বাড়িয়েছে। বিক্রেতারা এখন আরও বেশি দাম নিচ্ছে। এটা সিন্ডিকেটের কব্জায় চলে গেছে।

হাজারীবাগের চা বিক্রি করেন আব্দুল হক। সিলিন্ডার গ্যাস তার ব্যবসার ভরসা। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। এই সিলিন্ডার দিয়ে ১১ থেকে ১৩ দিন চলে। এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে যখন কিনেছি, তখন সরকারি নির্ধারিত দাম কত ছিল, তা মনে নেই। এখন সরকার আবার দাম বাড়িয়েছে, সিলিন্ডাওয়ালারাও (বিক্রেতা) দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এবার ২৫০০ তেকে ২৮০০ টাকার মতো দাম চাইছে। তিনি বলেন, এভাবে দাম বাড়লে ব্যবসায় সমস্যা হবে। তারপরও ব্যবসা চালাতে হবে। এখন কী করার আছে... একটিতে লোকসান হলে অন্যটি দিয়ে তা পুষিয়ে নিয়ে হবে। কিন্তু চায়ের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করলে কাস্টমার খেতে চাইবেন না। তাই অন্যান্য পণ্য বিক্রি করেই গ্যাসের বাড়তি খরচ পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে। আরতো কিছু করার দেখছি না।  

এলপিজি সিলিন্ডার দাম বেড়ে যাওয়া ও বেচাকেনা প্রসঙ্গে মা হাজেরা এন্টারপ্রাইজের তরলীকৃত গ্যাসের বিক্রেতা বাবু বলেন, বর্তমানে আমার কাছে সবই ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। এগুলোই বিক্রি করছি। আমার কাছে পেট্রোম্যাক্স, ইউনি গ্যাস ও আই গ্যাস আছে। আরও অনেক কোম্পানির সিলিন্ডার আছে; বসুন্ধরার, বেক্সিমকোর, তীর কোম্পানীর...। কিন্তু আমার কাছে এখন ওগুলো নাই। তিনি বলেন, পেট্রোম্যাক্সের ১২ কেজির গ্যাসসহ সিলিন্ডার ৪ হাজার টাকা এবং অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার গ্যাসসহ ৩ হাজার ৫০০ টাকা। তবে কোম্পানিভেদে গ্যাস ও বোতলের দামের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পেট্রোম্যাক্সের বোতলটা ভালো তাই দাম বেশি। আর গ্যাস রিফিল করার ক্ষেত্রে ইউনি গ্যাসের ১২ কেজির দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা। অপরদিকে পেট্রোম্যাক্স ও আই গ্যাসের দাম ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকা। তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বর্তমানে একটি সিলিন্ডার কিনতেই ২ হাজার ৩০০ টাকা খরচ হচ্ছে। তাহলে আমরা কীভাবে বিক্রি করবো? ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ রেখে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু কাস্টমার বেশি দাম শুনলে আমাদের সঙ্গে ঝগড়া করেন। বলে যে, গ্যাসের দাম ২০০-৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছি।  

গ্যাসের দাম বাড়াতে ব্যবসা চলানো কঠিন হয়ে পড়ছে জানিয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, কাস্টমার খালি বোতল ফেরত দিয়ে যায়। এতে বোতল নিয়ে নতুন করে ঝামেলা তৈরি হয়। কোম্পানিভেদে বোতলেরও আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। এক কোম্পানির বোতল দিয়ে অন্য কোম্পানির গ্যাস নেওয়া বা বিনিময় করা যায় না। এ কারণে ক্রেতাদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে হয়। আমি চাই না ক্রেতাদের সঙ্গে ঝগড়া করতে। এখন মালামাল কম পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর বেশি দামে কিনে বিক্রি করতে গিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে ঝামেলা তৈরি হচ্ছে। এভাবে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে গ্যাস বিক্রি করতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঝগড়া করতে হতো। এ কারণে একসময় ব্যবসা ছেড়ে চাকরি নিয়েছিলাম। তারপর আবার ব্যবসা শুরু করি। কিন্তু এখন আবার একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে এলপিজির দাম কিছুটা বাড়লেও দেশের বাজারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দাম যাচাইয়ের পাশাপাশি দরিদ্র গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আইআইইএফএ’র লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, অতি দরিদ্র মানুষের জন্য ভারত সরকারের মতো কম দামে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি এলপিজির দাম পুনর্মূল্যায়ন করে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে তা যাচাই করা প্রয়োজন। সংকট মোকাবিলায় মজুত সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিজস্ব গ্যাসকূপ খননে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আমদানিনির্ভরতা কমানোই দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, চালের দাম বেড়ে গেলে সরকার বাজারে সরবরাহ বাড়াতে চাল কেনে এবং ট্রাকে বিক্রির ব্যবস্থা করে। একইভাবে এলপিজির দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য সরবরাহ ও মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারের অন্তত ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এলপিজি সরবরাহের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে প্রতিমাসে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ১২ কেজি ওজনের প্রায় ৮৩ লাখ সিলিন্ডার গ্রাহকদের কাছে পৌঁছায়। সরকারি সংস্থাগুলোর মতে, স্বাভাবিক সময়ে মজুদ সন্তোষজনক থাকলেও, আন্তর্জাতিক সংকট বা পেমেন্ট জটিলতার কারণে সময়ে সময়ে স্থানীয় মজুদ ও বিতরণ ব্যাহত হয়।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL