* পঞ্চম দিনেও শ্রমিক অসন্তোষ

রণক্ষেত্র সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর-ফতুল্লায় সংঘর্ষ

এসএম দেলোয়ার হোসেন
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:

* মিরপুরে পুলিশি তৎপরতায় রাস্তায় নামতে পারেনি শ্রমিকেরা
* গাজীপুরেও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, অর্ধশত কারখানা বন্ধ
* শিল্পাঞ্চলঘিরে ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, মাঠে রয়েছে এসআরবি

 

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে গত কয়েকদিনের চলমান আন্দোলন ঘিরে এখনও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সড়কে দফায় দফায় মিছিল করেছে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর ফলে কোথাও কোনো আন্দোলনকারীর উপস্থিতি দেখা যায়নি। তবে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সাভার-আশুলিয়া ও হেমায়েতপুরের শিল্পাঞ্চল এলাকা। এ সময় বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা ওসির গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে গাজীপুরে শ্রমিক মৃত্যুর জেরে আবারও সড়কে নেমে বিক্ষোভ-অবরোধ করেছে শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বেতন বাড়ানোর দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ নিয়ে উভয়পক্ষে উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ ধারণ করে। 

মিরপুর
টানা পঞ্চম দিনের মতো বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকা সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকাজুড়ে পর্যাপ্ত পুলিশ ও এসআরবি সদস্যদের উপস্থিতি। এছাড়াও সাঁজোয়া যান ও একটি জলকামানের গাড়ি থাকতে দেখা গেছে। মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনের নিচেও সাঁজোয়া যান ও পুলিশের অবস্থান দেখা যায়। একই সঙ্গে মিরপুর ১২ নম্বর এলাকায় পুলিশের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে। এদিন সকাল থেকে মিরপুর এলাকায় দুই দফায় বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মিছিল করেছে। মিছিল থেকে ‘শ্রমিক-জনতা ভাই ভাই, আওয়ামী লীগের রক্ষা নাই’, ‘আপা আপা করিস না, তোদের আপা ফিরবে না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।

জানা গেছে, এর আগে বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল ৯টার দিকে পল্লবীর শিল্পাঞ্চল এলাকার বিভিন্ন কারখানার সামনে শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। একই সময়ে রূপনগরের শিয়ালবাড়ী এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, সকাল থেকে মিরপুর-১১ নম্বর ও শিয়ালবাড়ী এলাকায় কয়েকবার শ্রমিকরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করেছিল। আমরা তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দিয়েছি।

এদিকে আন্দোলন ঘিরে মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর মো. মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মিরপুর-১, পল্লবীর বিভিন্ন এলাকা, রূপনগর, মিরপুর-১২ ও কাফরুল রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। আন্দোলনের নামে যারা দেশকে অস্থিতিশীল করা, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরপুরের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর মহিদুল ইসলাম বলেন, বুধবার (৪ নভেম্বর) শ্রমিকদের সড়কে নামার সুযোগ হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অনেক পোশাক কারখানার শ্রমিক কাজে ফিরে গেছেন এবং কারখানাগুলোতে কাজ চলছে। আশা করি শ্রমিকরা কাজে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। পুলিশের পাশাপাশি অভিযানে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে জানিয়ে মহিদুল ইসলাম বলেন, সব ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। সমন্বিতভাবে কাজ করে যারা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, তাদের প্রতিহত করা হয়েছে। আন্দোলনের নামে সহিংসতাকারীদের সতর্ক করে মহিদুল ইসলাম বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা পুলিশের দায়িত্ব। আন্দোলনের নামে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড, কারখানায় আগুন দেওয়া ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে শ্রমিক মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও কাজ চলছে। প্রকৃত শ্রমিকরা ধ্বংসাÍক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে যারা এসব অপরাধ করাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং গার্মেন্টস খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক বা যত ষড়যন্ত্রই করুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ যাতে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সতর্ক রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

সাভার-আশুলিয়া-হেমায়েতপুর
ঢাকার শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। অন্যদিকে, সাভারের হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকায় সংঘর্ষের সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনায় সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও। ওই ঘটনায় শ্রমিক-পুলিশ-সাংবাদিক ও পথচারীসহ অন্তত শতাধিক আহত হন। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল থেকে আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় সড়কে অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শ্রমিকরা। তাদের সরিয়ে দিতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। জবাবে শ্রমিকরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। দুপুর একটা পর্যন্ত থেমে থেমে চলে সংঘর্ষ। এতে পুরো সাভার-আশুলিয়া ও হেমায়েতপুর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তখন আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মুহুর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
অন্যদিকে, সাভারের হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় ও হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সকাল থেকেই শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। সকাল ৯টার দিকে একদল শ্রমিক ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করলে উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে মহাসড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। সংঘর্ষে সাভার থানার ওসি সাইফুল আলমসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। মারধরের শিকার হন কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুপুর ১২টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
শ্রমিক অসন্তোষের মুখে আশুলিয়া ও হেমায়েতপুরের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তবে আশুলিয়ার বেশ কিছু কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়।

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সকালে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি ভালো থাকলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অশান্ত হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন থাকার পরও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তিনি আরও বলেন, সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাভার থানার একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হয়। দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পর দুপুরের দিকে আশুলিয়া ও হেমায়েতপুরের বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে গেলে সড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়।

গাজীপুর
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে গাজীপুরে চলমান পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে এবং এর তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল বুধবার দিনভর শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, কারখানা ছুটি এবং মহাসড়ক অবরোধের মতো ঘটনা ঘটেছে। এর আগে, গত ২ নভেম্বর বাহাদুরপুর এলাকায় আন্দোলন চলাকালীন ভাঙচুরের ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় হামলায় গুরুতর আহত তৌফিক শেখ (২১) নামের এক পোশাকশ্রমিক বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর বোর্ডবাজার, বড়বাড়ী, সাইনবোর্ড, ভোগড়া বাইপাস এবং চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের তীব্র ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস (টিয়ার শেল) এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। চলমান উত্তেজনা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে গাজীপুরের ৩০ থেকে ৫০টিরও বেশি পোশাক কারখানায় গতকাল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু কিছু কারখানা ১ থেকে ৩ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সকাল থেকে মহাসড়কে শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং অনেক বাস মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। তবে দুপুরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজীপুরে ২৫ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি (১২ প্লাটুন), পুলিশ, এসআরবি (৮ প্লাটুন) এবং আনসার (৫ প্লাটুন) সদস্যদের সমন্বয়ে মোট ২৫ প্লাটুন যৌথবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।


নারায়ণগঞ্জ-ফতুল্লা
মজুরি বৃদ্ধিসহ পাঁচ দফা দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো গতকাল বুধবার সকালে আন্দোলনে নেমেছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পোশাকশ্রমিকেরা। এ সময় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে বিক্ষোভ ও অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে ফতুল্লার কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে ফতুল্লার শিবু মার্কেট, কাঠেরপুলসহ আশপাশের শিল্প এলাকার শ্রমিকেরা নিয়মিতভাবে কারখানায় কাজে যোগ দেন। কিছুক্ষণ পর কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কাঠেরপুল এলাকার মেট্রো গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পরে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে কয়েকজনকে আটক করে।

স্থানীয় দোকানি জামাল মিয়া বলেন, বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা জড়ো হওয়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে পুলিশ এসে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে। একপর্যায়ে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। অন্যদিকে, আন্দোলনকারী শ্রমিকদের অভিযোগ, তারা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এ সময় বিএনপির নেতারা এসে তাদের মারধর করেন। এরপর পুলিশ তাদের ওপর অভিযান চালায়।

নারায়ণগঞ্জের এএসপি তারেক আল মেহেদী বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।

এর আগে গত সোমবার ও মঙ্গলবার একই দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। বিশেষ করে গত মঙ্গলবারের আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ১০ পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ছাড়া চার শ্রমিককে আটক করা হয়। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, সব পোশাক কারখানায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বাস্তবায়ন, শ্রমিক আমজাদ হোসেন কামালসহ নিহত শ্রমিকদের হত্যার বিচার এবং বিনা কারণে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ ও শ্রম আইন পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।

বিজিবি’র ভাষ্য
শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট শ্রম অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোট ২৪ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এই তথ্য জানান।

বিজিবি জানায়, সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকায় ৫ প্লাটুন; গাজীপুরের চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস, পোড়াবাড়ি, মাস্টারবাড়ি বিদ্যুৎ এলাকা, তেলিপাড়া, সফিপুর, চন্দ্রা ও কালিয়াকৈর এলাকায় ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, চাষাঢ়া, ঝালকুড়ি ব্রিজ, বিসিক শিল্প এলাকা ও কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায় ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। মোতায়েনকৃত বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে বিজিবির নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান বিজিবি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL