০২:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে ভয়াবহ হচ্ছে চিকুনগুনিয়া

চট্টগ্রাম জেলায় গত সাত মাসে প্রায় ৬০০ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। ডেঙ্গুর মতো
মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়ার বিস্তার চট্টগ্রামে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে জনজীবনে
দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। তবে এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে চিকিৎসকরা সবাইকে সচেতন থাকার
পরামর্শ দিয়েছেন।চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে, সর্বশেষ এক দিনের
ব্যবধানে ২২ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই
পর্যন্ত জেলায় এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৯৬ জন।নগরের তিনটি বেসরকারি ল্যাবে বিগত
সাত মাসের (জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই) নমুনা পরীক্ষা ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের হারের তথ্য
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এপিক হেলথ কেয়ারে ১৮৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৫৩ জনের
চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। এ ছাড়া পার্কভিউ হাসপাতালে ৫৩ নমুনার মধ্যে ৪২ জন এবং
এভারকেয়ার হাসপাতালে ১৩২ জনের মধ্যে ৬৫ জনের শরীরে চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। সে হিসাবে
বলা যায়, পরীক্ষার পর গড়ে ৮০ ভাগ নমুনায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হচ্ছে।এদিকে জেলায় চলতি
বছরের জানুয়ারি থেকে গত ২২ জুলাই পর্যন্ত ৭২৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে
৩৩৩ জন নগরের এবং ৩৯৩ জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে চারজনের
মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই নগরের বাসিন্দা।চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া দুটিই
মশাবাহিত রোগ। এসব রোগে মৃত্যুর হার কম। তবে রোগ দুটি থেকে বাঁচতে হলে যত্রতত্র
আবর্জনা, ডাবের খোসা, প্লাস্টিক কন্টেইনার, পলিথিন ফেলা যাবে না। এগুলো যেখানে-সেখানে
ফেলে ডেঙ্গু মশার আবাসস্থল তৈরির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। পরিষ্কার-স্বচ্ছ পানিতে এডিস
মশার বংশ বৃদ্ধি হয়। বিষয়গুলো সাধারণ মানুষকে খেয়াল রাখতে হবে।চট্টগ্রাম নগরের ৮ নম্বর
শুলকবহর ওয়ার্ডের এশিয়ান হাউসিং সোসাইটির বাসিন্দা বুলবুলে জান্নাত (৬০)। তিনি ১৫ দিন
আগে নগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে নমুনা পরীক্ষা করান। তখন
তার চিকনগুনিয়া ধরা পড়ে। সপ্তাহখানেক ভোগানোর পর বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ আছেন। তিনি
বলেন, ‘একবার যার চিকনগুনিয়া বা ডেঙ্গু হয়েছে, সেই জানবে ভোগান্তি কেমন? হাসপাতালগুলোতে
জ্বর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে একেক জায়গায় একেক রকম নমুনা পরীক্ষার ফি নেওয়া
হচ্ছে। এটা নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি।’নগরের রহমান নগর এলাকার বাসিন্দা বিবি আয়েশা
বলেন, আমার পরিবারের চার সদস্য। সবার একসঙ্গে জ্বর হয়েছে। প্রায় একসপ্তাহ আমাদের
সবাইকে ভুগিয়েছে। এই জ্বরে খাবারের রুচি চলে যায়, শরীর প্রচণ্ড ব্যথা ও দুর্বল হয়ে যায়। তবে
আমরা নমুনা পরীক্ষা করাইনি। কারণ হাসপাতালগুলোর অবস্থা ভালো না। তাই ডাক্তারের সঙ্গে
পরামর্শ করে সে অনুযায়ী ওষুধ ও খাবার গ্রহণ করেছি।সিভিল সার্জন কার্যালয়ের
কীটতত্ত্ববিদ মঈন উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু চিকনগুনিয়ার উৎপাদনের এখন উপযুক্ত সময়। থেমে
থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এটাই মশা উৎপাদনের উত্তম পরিবেশ। যে কারণে আমাদের সতর্ক হওয়ার
বিকল্প নেই।চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ
মেহেদী বলেন, হাসপাতাল এবং চেম্বারে যত রোগী আসছেন, তাদের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই
জ্বরের রোগী। টেস্ট করালে দেখা যাচ্ছে কেউ ডেঙ্গু, কেউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। দুটিই
মশাবাহিত রোগ। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি টানাতে
হবে।চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা এম এ হাশেম রাজু বলেন, সিটি করপোরেশন হলো
এটার (ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া) জন্মদাতা। আমাদের নদী-নালাগুলো অপরিষ্কার। সেখানে ময়লা-
আবর্জনা পাহাড় সমান। আমাদের উচিত সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-
কর্মচারীদের দিকে না তাকিয়ে নিজেরাই নিজেদের সবকিছু পরিষ্কার করা। সেটাই উত্তম হবে।
অর্থাৎ স্ব-স্ব অবস্থান থেকে আমরা যদি নিজেরাই পরিষ্কার অভিযান শুরু করি তাহলে আমরা
অনেকাংশেই এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাব।চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান
পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমরা সব সময় চাই
আমাদের নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুক। আমাদের কর্মীরা সকাল-বিকেল দুই বেলা নগরের
৪১টি ওয়ার্ডের সবকিছু পরিষ্কার করে আসে। কিন্তু যারা ভ্যানে করে ডাবসহ বিভিন্ন খাবার
বিক্রি করে, তারাই আমাদের জন্য বড় বাধা। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যবসা করে
সার্বক্ষণিক ময়লা করতে থাকে। তাদের জন্য তো আমার আলাদা জনবল নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে ভয়াবহ হচ্ছে চিকুনগুনিয়া

আপডেট সময় : ০২:০৯:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫

চট্টগ্রাম জেলায় গত সাত মাসে প্রায় ৬০০ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। ডেঙ্গুর মতো
মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়ার বিস্তার চট্টগ্রামে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে জনজীবনে
দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। তবে এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে চিকিৎসকরা সবাইকে সচেতন থাকার
পরামর্শ দিয়েছেন।চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে, সর্বশেষ এক দিনের
ব্যবধানে ২২ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই
পর্যন্ত জেলায় এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৯৬ জন।নগরের তিনটি বেসরকারি ল্যাবে বিগত
সাত মাসের (জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই) নমুনা পরীক্ষা ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের হারের তথ্য
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এপিক হেলথ কেয়ারে ১৮৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৫৩ জনের
চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। এ ছাড়া পার্কভিউ হাসপাতালে ৫৩ নমুনার মধ্যে ৪২ জন এবং
এভারকেয়ার হাসপাতালে ১৩২ জনের মধ্যে ৬৫ জনের শরীরে চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। সে হিসাবে
বলা যায়, পরীক্ষার পর গড়ে ৮০ ভাগ নমুনায় চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হচ্ছে।এদিকে জেলায় চলতি
বছরের জানুয়ারি থেকে গত ২২ জুলাই পর্যন্ত ৭২৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে
৩৩৩ জন নগরের এবং ৩৯৩ জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে চারজনের
মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই নগরের বাসিন্দা।চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া দুটিই
মশাবাহিত রোগ। এসব রোগে মৃত্যুর হার কম। তবে রোগ দুটি থেকে বাঁচতে হলে যত্রতত্র
আবর্জনা, ডাবের খোসা, প্লাস্টিক কন্টেইনার, পলিথিন ফেলা যাবে না। এগুলো যেখানে-সেখানে
ফেলে ডেঙ্গু মশার আবাসস্থল তৈরির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। পরিষ্কার-স্বচ্ছ পানিতে এডিস
মশার বংশ বৃদ্ধি হয়। বিষয়গুলো সাধারণ মানুষকে খেয়াল রাখতে হবে।চট্টগ্রাম নগরের ৮ নম্বর
শুলকবহর ওয়ার্ডের এশিয়ান হাউসিং সোসাইটির বাসিন্দা বুলবুলে জান্নাত (৬০)। তিনি ১৫ দিন
আগে নগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে নমুনা পরীক্ষা করান। তখন
তার চিকনগুনিয়া ধরা পড়ে। সপ্তাহখানেক ভোগানোর পর বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ আছেন। তিনি
বলেন, ‘একবার যার চিকনগুনিয়া বা ডেঙ্গু হয়েছে, সেই জানবে ভোগান্তি কেমন? হাসপাতালগুলোতে
জ্বর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে একেক জায়গায় একেক রকম নমুনা পরীক্ষার ফি নেওয়া
হচ্ছে। এটা নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি।’নগরের রহমান নগর এলাকার বাসিন্দা বিবি আয়েশা
বলেন, আমার পরিবারের চার সদস্য। সবার একসঙ্গে জ্বর হয়েছে। প্রায় একসপ্তাহ আমাদের
সবাইকে ভুগিয়েছে। এই জ্বরে খাবারের রুচি চলে যায়, শরীর প্রচণ্ড ব্যথা ও দুর্বল হয়ে যায়। তবে
আমরা নমুনা পরীক্ষা করাইনি। কারণ হাসপাতালগুলোর অবস্থা ভালো না। তাই ডাক্তারের সঙ্গে
পরামর্শ করে সে অনুযায়ী ওষুধ ও খাবার গ্রহণ করেছি।সিভিল সার্জন কার্যালয়ের
কীটতত্ত্ববিদ মঈন উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু চিকনগুনিয়ার উৎপাদনের এখন উপযুক্ত সময়। থেমে
থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এটাই মশা উৎপাদনের উত্তম পরিবেশ। যে কারণে আমাদের সতর্ক হওয়ার
বিকল্প নেই।চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ
মেহেদী বলেন, হাসপাতাল এবং চেম্বারে যত রোগী আসছেন, তাদের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই
জ্বরের রোগী। টেস্ট করালে দেখা যাচ্ছে কেউ ডেঙ্গু, কেউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। দুটিই
মশাবাহিত রোগ। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি টানাতে
হবে।চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা এম এ হাশেম রাজু বলেন, সিটি করপোরেশন হলো
এটার (ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া) জন্মদাতা। আমাদের নদী-নালাগুলো অপরিষ্কার। সেখানে ময়লা-
আবর্জনা পাহাড় সমান। আমাদের উচিত সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-
কর্মচারীদের দিকে না তাকিয়ে নিজেরাই নিজেদের সবকিছু পরিষ্কার করা। সেটাই উত্তম হবে।
অর্থাৎ স্ব-স্ব অবস্থান থেকে আমরা যদি নিজেরাই পরিষ্কার অভিযান শুরু করি তাহলে আমরা
অনেকাংশেই এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাব।চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান
পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমরা সব সময় চাই
আমাদের নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুক। আমাদের কর্মীরা সকাল-বিকেল দুই বেলা নগরের
৪১টি ওয়ার্ডের সবকিছু পরিষ্কার করে আসে। কিন্তু যারা ভ্যানে করে ডাবসহ বিভিন্ন খাবার
বিক্রি করে, তারাই আমাদের জন্য বড় বাধা। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যবসা করে
সার্বক্ষণিক ময়লা করতে থাকে। তাদের জন্য তো আমার আলাদা জনবল নেই।