০২:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

র‌্যাব বিলুপ্তিসহ একগুচ্ছ সুপারিশ গুম কমিশনের

সংবাদ সম্মেলনে গুম সংক্রান্ত কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। একইসঙ্গে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করা, সব নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন০২০০৯ বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধনসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী। এসময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এর আগে, রবিবার (৪ জানুয়ারি) গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের প্রত্যেকটা গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘নাক গলায়’। কারণ, তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়। তাদেরকে অপব্যবহার করা হয়েছে। এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে। এটা কি ডিজিএফআইয়ের কাজ ছিল? বা মিডিয়া হাউজ দখল করা কি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিজিএফআইয়ের কাজ? সংস্থাগুলোকে নানাভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগের সরকারগুলো এবং ‘সদ্য বিদায়ী’ সরকার, সবাই তাদের অপব্যবহার করেছে। তবে ‘সদ্য বিদায়ী’ সরকার অনেক বেশি করেছে। সেই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে গুম কমিশনের প্রধান বলেন, পুলিশের কাজ হচ্ছে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। আর সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে ক্যান্টনমেন্টের থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা, নতুন নতুন যুদ্ধ কৌশল রপ্ত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সেনা কর্মকর্তাদের কাজ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। বরং পুলিশের মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি এলিট ফোর্স গঠন করা যেতে পারে। গুম কমিশন তার প্রতিবেদনে র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে।

কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র‌্যাব জড়িত, এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপকহারে গুম করেছে। বহুক্ষেত্রে সাদাপোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর ধরন থেকে স্পষ্ট যে, গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে র‍্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত হয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন অসদাচরণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কমিশনে দাখিল করা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্য হতে একাধিকবার করা ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিক তদন্তের পর গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল, যার মধ্যে ২৫১ জন নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষাসহ সম্ভাব্য সবরকম বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করেছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এই কাজে যুক্ত করা হয়। তদন্তে মোট ৪০টি ‘ডিটেনশন সেন্টার’ (বন্দিশালা) পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে র‌্যাবের ২২ থেকে ২৩টি। গুম কমিশন কাজ শুরু করার পর র‌্যাব সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংস করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কমিশন গুমের ভুক্তভোগী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে পরামর্শ সভা, ৩০০ জনের অধিক বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য চারটি কর্মশালা এবং বেশ কিছু প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মাধ্যমে গুম বিষয়ক এক ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়। কমিশন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত থেকেছে, সবাই গুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশনের কাজের প্রশংসা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেন।

এমআর/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

র‌্যাব বিলুপ্তিসহ একগুচ্ছ সুপারিশ গুম কমিশনের

আপডেট সময় : ০৮:৪৪:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। একইসঙ্গে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করা, সব নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন০২০০৯ বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধনসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সার্বিক বিষয় তুলে ধরেন কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী। এসময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এর আগে, রবিবার (৪ জানুয়ারি) গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের প্রত্যেকটা গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘নাক গলায়’। কারণ, তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়। তাদেরকে অপব্যবহার করা হয়েছে। এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে। এটা কি ডিজিএফআইয়ের কাজ ছিল? বা মিডিয়া হাউজ দখল করা কি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিজিএফআইয়ের কাজ? সংস্থাগুলোকে নানাভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগের সরকারগুলো এবং ‘সদ্য বিদায়ী’ সরকার, সবাই তাদের অপব্যবহার করেছে। তবে ‘সদ্য বিদায়ী’ সরকার অনেক বেশি করেছে। সেই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে গুম কমিশনের প্রধান বলেন, পুলিশের কাজ হচ্ছে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। আর সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে ক্যান্টনমেন্টের থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা, নতুন নতুন যুদ্ধ কৌশল রপ্ত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সেনা কর্মকর্তাদের কাজ নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। বরং পুলিশের মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি এলিট ফোর্স গঠন করা যেতে পারে। গুম কমিশন তার প্রতিবেদনে র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে।

কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র‌্যাব জড়িত, এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপকহারে গুম করেছে। বহুক্ষেত্রে সাদাপোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর ধরন থেকে স্পষ্ট যে, গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে র‍্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত হয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন অসদাচরণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কমিশনে দাখিল করা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্য হতে একাধিকবার করা ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিক তদন্তের পর গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল, যার মধ্যে ২৫১ জন নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষাসহ সম্ভাব্য সবরকম বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করেছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এই কাজে যুক্ত করা হয়। তদন্তে মোট ৪০টি ‘ডিটেনশন সেন্টার’ (বন্দিশালা) পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে র‌্যাবের ২২ থেকে ২৩টি। গুম কমিশন কাজ শুরু করার পর র‌্যাব সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংস করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কমিশন গুমের ভুক্তভোগী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে পরামর্শ সভা, ৩০০ জনের অধিক বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য চারটি কর্মশালা এবং বেশ কিছু প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মাধ্যমে গুম বিষয়ক এক ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়। কমিশন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত থেকেছে, সবাই গুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশনের কাজের প্রশংসা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেন।

এমআর/সবা